হোম গদ্য আলফ্রেড খোকন : বেদনা বোনের সাধারণ কবিতা ভাই

আলফ্রেড খোকন : বেদনা বোনের সাধারণ কবিতা ভাই

আলফ্রেড খোকন : বেদনা বোনের সাধারণ কবিতা ভাই
853
0

ভালো কবিতাই কবিতা, আর সব খারাপ কবিতা। তৃতীয় ধরনের কবিতা হলো সাধারণ কবিতা। অসাধারণ বন্দনার কালে সাধারণ কবিতা লেখা আরেক ধরনের তপস্যা। জল সাধারণ, বৃক্ষেরা আসঙ্গে সাধারণ হয়েই থাকে। মাটির কাছে সবই সাধারণ। সাধারণ কবিতা কি তাহলে সরল সত্যের মোকাম? একক হওয়ার গরিমা ছাড়ার সন্ন্যাস?

উদাহরণ দিয়ে পরখ করানো যায়। যেমন:

বর্ষা যদিও শহরে যাচ্ছে একা
তার সঙ্গে হঠাৎ একদিন
মেঘের হবে দেখা

এই কবিতার আর বাড়তি কিছু বলার নাই, কমানোরও নাই। বর্ষা একটি মেয়ে, মেঘের দেখা পেয়ে সে হয়তো একদিন বর্ষাবে শহরে। অথবা বর্ষা বুঝি সেই ঋতুমন, আছে সে মেঘের অপেক্ষায়। তারপরও ছোট্ট একটা জাদুতে সবতে কেমন মায়াবী প্রলেপ পড়ে যায় কবিতাটা পড়ামাত্রই।

আর লিখতে গেলে?

তোমাকে লিখতে গেলে হৃদয়ের প্রসঙ্গ এসে যায়

যায় তো, যাবেই তো। হৃদয়ের প্রসঙ্গই তো কবিতা আলফ্রেড খোকনের। সাধারণ ও সহজ বলেই তা কঠিন ও দুরূহ পাঠকের বোধেও পৌঁছে যায়। একে এড়ানো যায় না, অস্বীকার করা যায় না, কবিতার যে শ্রুশ্রূষাকারী ক্ষমতা তার আবেশ এড়ানো যায় না।

আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
    এ ধরনের কবিতায়
        শব্দের ওপর শব্দ উঠে খেলা করতে পারে না
            যেমন মানুষের ওপর মানুষ উঠছে।

শব্দের ওপর শব্দকে তোলার নন্দনের সঙ্গে মানুষের ওপরে মানুষ ওঠার সন্ত্রাস মেলাতে সাধারণ হতে হয়েছে তাঁকে।

খোকনের কবিতায় পরিস্থিতি তৈরি হয় আলগোছে। খুব সাধারণভাবে চমকের কাছে নিয়ে ফেলে ওইসব তৈরি করা পরিস্থিতি।

আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
এধরনের কবিতায়

        গাছের পাতা নড়ে না,
                ওরা সবাই ঝাঁকি মেরে
            গাছগুলোকে পাতাশূন্য করে দিচ্ছে
                        ঝাঁকিচিত্রের দায় এড়াতে এড়াতে
                                    বাংলা কবিতা যায়;

তখন সকাল,
বারান্দায় বসে চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট খাচ্ছি,
        এরপর কঠিন কবিতার গায়
                একবার গুলতি মেরে দেখব
            আগামীকাল কিভাবে নুইয়ে পড়ছে
                        দৈনিক অধীনস্থতায়।

আর একজন সহজ বালিকা এলে
        হাতভর্তি সাধারণ কবিতা নিয়ে
                আমি রোজ দাঁড়াব ফাল্গুনের সন্ধ্যায়
                            মাটির পিরিচে।


খোকন তবু সহজ করে রাখেন ভাষাকে। দৃশ্যত দুরূহ কোনো কফিস্বাদ তিনি দিতে চান না।


অসাধারণের নেশা ছেড়ে তাহলে কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন অভিজ্ঞতার জলাশয়ের এই ডুবুরি? ‘নগরে নিবন্ধনহীন’ তাঁর স্মৃতিকথার নাম। এই নামহীনতা থেকেই চলা শুরু তাঁর—এই শহরে। তারপর কষ্টে কষ্টে শহরটাকে অর্জন করতে হয়েছে, অর্জন করতে হয়েছে নাম। তাই এখনো গ্রামের ছেলেকে এসে লিখতে হয় শহরের ‘সাধারণ কবিতা’।

ঢাকায় তখন বাতাস হচ্ছে—বাতাস হলে যা হয়
গ্রামে তখন ধর্ষণ হচ্ছে, গাছ থেকে পাতা পড়ছে
জল স্থির জলের পেপারে—ঢেউ নাইপল নাইপল
চুলে দিচ্ছি মিন্দি আার শিশ্নে আঙুল অনুভূতিময়।

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ থেকে বহুদূরের এসব অভিজ্ঞতা। সহজ কবিতা আর হবে না এই জরাজটিল নগরে।

যা লিখি তা ব্যান্ডেজজড়িত,

            আমার বকুলবনে একজন শাদা নার্স
                    বেদনা তুলতে যেয়ে ব্যথায় মরিত;

খোকন তবু সহজ করে রাখেন ভাষাকে। দৃশ্যত দুরূহ কোনো কফিস্বাদ তিনি দিতে চান না। বকুলবনে ব্যথা তুলতে যেয়ে ব্যথায় মরতে থাকা শাদা নার্সকে কেবল একটু কল্পনা করে নিতে হবে।

কবিতা কল্পনাপ্রতিভাই শেষপর্যন্ত। যে বাস্তবতায় অসম্ভব অমানুষিকতা ঘটে চলে, মানুষের চলাফেরা কাটাকুটি হতে হতে হিজিবিজি রেখা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, কোনো অর্থ যেন নেই তার, তখন কল্পনা ছাড়া ‘বাস্তব’কে উদ্ধার করবে কে? কে মরে পড়ে থাকা সার-সার বাস্তব ভবন, দলাপাকানো সমাজ, অর্থহীন সময়, বৃথা হয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো দেখে রচনা করবে মানুষের স্থানীয় সংবাদ, হৃদয়ের সরেজমিন প্রতিবেদন? বাস্তবের মরে পড়ে থাকা দেহের ভেতরের দপদপানিকে ভাষার মধ্যে দিয়ে জানতে পারবে, সাক্ষ্য দেবে বহতা জীবনের? বাস্তবকে বাস্তব দিয়ে ধরা যায় না, পাখিকে পাখি দিয়ে ধরাও অনুচিত, আগুন ছাড়া মাটি শক্ত হয় না, কল্পনা ছাড়া নদীভাঙনের বাস্তবের সিকস্তি–পয়োস্তি কিভাবে নির্ণয় করা হবে?

আলফ্রেড খোকনের কবিতার শক্তি এই অতি-বাস্তবিক কল্পনা।

এই তো একটি শিশু আঁকল পৃথিবী
এই তো সে বসল পৃথিবীর কোলে
এই তো শিশু কাঁদছে একা একা;
এই তো শিশুর মা কাঁদতে এসেছে


সাধারণ পাঠকের অতি সাধারণ সেই জিজ্ঞাসা নিয়ে খোকনের কবিতা পড়া যায়।


বাংলা কবিতার ময়ূরাক্ষী হলো এর নিহিত দার্শনিকতা—তা তো হারাতেই বসেছে। কিন্তু কত অবলীলায় তা করা যায়, সাধারণভাবে তাকে টের পাওয়ানো যায়, কবিতার হয়ে সেই কাজটি আলফ্রেড খোকন করেন—করতে জানেন বলেই করেন।

যদিও একটি হত্যার জন্য এতগুলো পাথরের
একটি মৃত্যুর জন্য এতগুলি মানুষের এবং
একটি কথার জন্য এতগুলি বর্ণমালার প্রয়োজন নেই;

উত্তর আছে জানবার,

পাথর জন্মাতে পার কিনা দেখ;
মিলিত হও, একটি ধর্মগ্রন্থ লেখ।
(প্রথম পত্র, বাঙালি নারীকে)

তোমাদের সাথে গেলে আমার কি যাওয়া হতো আর?
‘এখানে জ্যোৎস্না ভীষণ’ এমন কি মানে এই কথাটার
গেলে হয়তো মানে হতো, মানেহীন যাওয়া যত যত
জ্যোৎস্নায় সব তারা দূরগামী—আকাশে স্তব্ধ সেই ক্ষত

ডায়ালের ভিতর চোখ ফেলে দেখি
সময়ের দাগগুলি আঁটা
অবোধ শিশুর মতো একটা মধ্য নির্ণয় করে
একাএকা ঘুরছে ঘড়ির কাঁটা;
(কবিতাভবন)

খোকন লিখছেন বহুদিন। আরো বহুরাত্রি যাবে লিখনতাড়িত জাগরণের। তবুও কি বোঝা হলো? বুঝে ফেলেছি, চিনে ফেলেছির আত্মসন্ত্রাসে বেলা বয়ে যায়; বোঝা হয় না। আশির দশকে এসে বাংলা কবিতা কোন শিল্পের আরশে যেন যেতে চাইল। গা থেকে মুছে নিতে চাইল দেশজ রং, ভাষা থেকে লোকজ ঢং, বয়ান থেকে হারিয়ে যেতে চাইল কাহিনির আভাস। একদল বিশুদ্ধতাবাদী কবি কবিতাকে বিমূর্ত করতে গিয়ে ঐতিহ্যের সব পালক ছাঁটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। দিনের শেষে পাঠক জানতে চায়, লেখকের কী বলবার আছে। কোন দুঃখের পূজা তার সমাপ্ত হচ্ছেই না। সাধারণ পাঠকের অতি সাধারণ সেই জিজ্ঞাসা নিয়ে খোকনের কবিতা পড়া যায়। আলাদা করে কোনো চরণ তুলে আনার চেয়ে পুরো কবিতার মধ্যে একটা ছড়ানো দানা খুঁটে খুঁটে খাওয়া ভালো লাগে। জীবনটাও হয়তো ভাল লাগে যখন এই কবি বলেন—

জল যদিও কলুষ, স্নানে কলুষতা নেই
দূরে দূরে স্নানের ভাষা দূরে দূরে জীবনের শত আয়োজন
হে বেদনা আমি তোর ভাই হলে তুই যেন পৃথিবীর
রূপবতী বোন।

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]
বিস্মরণের চাবুক [আগামী, ২০১৮]
তমোহা পাথর [প্রথমা, ২০১৯]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]
জীবনানন্দের মায়াবাস্তব [আগামী, ২০১৮]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : rotnopahar@gmail.com