হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ১

আমার একলা পথের সাথি : ১

আমার একলা পথের সাথি : ১
0

পর্ব- ১

সাহিত্য করতে আসা মানে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়া। এমন তেমন অন্ধকার নয়, ঘোরঘুট্টি নিকষকালো অন্ধকার। একেবারে নিঃসাড় তমিস্রা! যে অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। তবুও অনেকেই এই অন্ধকারেই ঝাঁপ দেয়। না জেনে-বুঝেই দেয়! কিংবা জেনে-বুঝে! হয়তো সমুদ্রতটের বালিকণার ঢেউয়ের সাথে মিশে যাওয়ার শব্দ শোনার ইচ্ছায় তারা ঝাঁপ দেয়। অথবা মেঘেদের উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনার আকাঙ্ক্ষায়। সপ্ত স্তর গাঢ় অন্ধকারের মাঝে একেবারে ধূসর মেঘের মতন ঢুকে পড়বার আশায় ঝাঁপ দেয়। এমনও হতে পারে তারা হয়তো যা কিছু চির-অধরা সেসবই করায়ত্ত করার আশায় অন্ধকারের চোরাবালিতে পা রাখে।

I had a dream, which was not all a dream.
The bright sun was extinguish’d, and the stars
Did wander darkling in the eternal space,
Rayless, and pathless, and the icy earth
Swung blind and blackening in the moonless air;
Morn came and went—and came, and brought no day,

 (Darkness, Lord Byron)

এবং আমিও ঝাঁপ দিলাম। জেনে বা না-জেনে। বুঝে বা অবুঝের মতোই। ডানাহীন আমি নিঃসাড় তমিস্রায় চোখ বুঁজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অবশ্য ওই তুমুল অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে না পড়বার তেমন কোনো কারণও আমার ছিল না! প্রথম ও সর্বশেষ বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যখন ফেল মারলাম, ভাইবাবোর্ড থেকে বিফল মনোরথ ফেরত এসে ঝাঁপ দেবার জন্য আমি এই সাহিত্যের অন্ধকারকেই বেছে নিয়েছিলাম। আমি চাইলে অবশ্য অন্যকিছুকেও বেছে নিতে পারতাম, যেমন চব্বিশতলা বিল্ডিংয়ের খোলা ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া। বা নিদেনপক্ষে আমার বাড়ির শ্যাওলা-ধরা ও আপনজালা বটের পাতায় ছাওয়া চারতলার প্রাচীন ছাদটা থেকে নিচের পাকা রাস্তার ফাঁদে পড়া। অথবা একদিন ফার্মগেটের ওভারব্রিজের উপর থেকে খামাখাই ঝাঁপ দিলেও নির্ঘাত সংবাদ শিরোনাম হওয়া যেত। কিন্তু আমার যে তুমুল আঁধারেই মরিবার হলো সাধ, মানে অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়বার।

অথই অন্ধকার হাতড়েপাতড়ে দিক খুঁজে চলি আমি। আদতে কিছু একটা করতে চাই, হতে চাই। কী হতে চাই, কী করতে চাই—স্পষ্ট করে কিছুই জানি না, বুঝি না—তবে হতে যে চাই, এটা নিশ্চিত জানি। রবিঠাকুরের কিনু গোয়ালা নয়, হরিপদ কেরানি নয়, ঢাকাই শাড়ি পরা সেই সাধারণ মেয়ে নয়, বা মানিকবাবুর কুসুম নয়, কপিলা নয়, এমনকি হ্যামিলনের সেই জাদুকর বাঁশিওয়ালাও নয়—আমি কিনা ‘লেখক’ হতে চাই! কিন্তু আমার এই ইচ্ছেঘুড়ি যে হাওয়ার টানে গোত্তা খাবে সেরকম কিছুই আমার হাতে নাই। আমার হাতে নাই নাটাই, নাই মাঞ্জা দেয়া সুতা—কেবল ঘুড়িটা আছে। ভীষণরকম রঙ-ঝলমলে উজ্জ্বল এক ইচ্ছেঘুড়ি। কিন্তু তাকে কিভাবে হাওয়ার টানে ভেসে যেতে দিতে হয়, সে কসরত আমি জানি না। ফলে বহু যুগ আগের পরিত্যক্ত এক কুয়ার নিশ্ছিদ্র তমসায় আমি জবুথুবু হয়ে বসে থাকি। বসে থাকি। বসেই থাকি।


টিভি খুললেই চোখে পড়ছে জনকণ্ঠ, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, চলতিপত্র, মুক্তকণ্ঠ, লালসবুজ, যায় যায় দিন, শৈলী ইত্যাদির রমরমা বিজ্ঞাপন।


শহরজুড়ে তখন দৈনিক পত্রিকার ভীষণরকম ডামাডোল চলছে। দুই/চারটা নতুন পত্রিকা তাদের নব নব পাতা মেলে রোদ্দুরের আলোর দিকে হাত-পা বাড়াতে শুরু করেছে। তাদের বাড়ানো হাতের আঙুলগুলি আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সেই আঙুলগুলিতে ঝাঁপ দেবার আহ্বানও রয়েছে। তারা যেন ডানা মেলে অভয় দিয়ে বলছে—

‘কোথায় আছ সব তরুণ-তুর্কীর দল? চলে আসো হে আমাদের কর্মের দুনিয়ায়।’

টিভি খুললেই চোখে পড়ছে জনকণ্ঠ, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, চলতিপত্র, মুক্তকণ্ঠ, লালসবুজ, যায় যায় দিন, শৈলী ইত্যাদির রমরমা বিজ্ঞাপন। এসব দেখতে দেখতে আমিও বেশ সাহসী হয়ে উঠি। আর হলদেটে বা বাদামি খামে ভরে হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানের হাতে করে হররোজ পাঠাতে থাকি চিঠি। তখন হলুদ খামের চিঠিযুগ! ডাকপিয়নের কাঁধের কাঁঠালিচাঁপা রঙের ঝুলি ভরে থাকত আবিল ভেড়ার পেটের মতন! আর আমি আমার বহুকালের পুরাতন লেখাগুলিই নতুন পুষ্পের হলুদ রেণুতে মাখামাখি করে পাঠাতে থাকি জানা-অজানা ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায়।

অপেক্ষার প্রহরে ধূলির স্তূপ জমে ওঠে! ধুলো জমতে জমতে ক্রমে পাহাড় হয়ে ওঠে। আর আমার প্রহরগুলি সেই পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়!

আচানক একদিন দমকা হাওয়া ধেয়ে এলে সেই ধূলি-পাহাড় ভেঙে পড়ে। মুহূর্তে উধাও হয়ে যায় যাবতীয় আড়াল! আমার বলপয়েন্ট কলম কাগজের উপর তরতর করে লিখতে থাকে। লিখতে থাকে ‘লালসবুজের’ পাতায় উপসম্পাদকীয়, সম্পাদকীয় ও নানাবিধ ফিচার।

‘লালসবুজ’ পত্রিকা সবুজ বাতির সিগন্যাল দেবার কিছুদিন বাদেই ভোরের কাগজের ‘অন্যপক্ষ’, ‘মেলার’ পাতায় আমার বাদামি খামের ভেতর পুরে পাঠানো লেখাগুলি সযতনে ছাপা হয়ে যায়।

এইসব পত্রিকাতেই  ছাপার অক্ষরে নিজের নাম প্রথম দেখেছি তেমন কিন্তু নয়। শুরুয়াত তো হয়েছিল ঢের আগে, আমার বালিকাজীবনের নুড়ি কুড়ানোর দিনগুলিতেই।

অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়ার কঠিন সিদ্ধান্তের মরণকাঠিটি যখন হাতে তুলে নিয়েছিলাম, ঠিক তখনই টিভি-পর্দায় রমরমা বিজ্ঞাপনে দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলিও ভেসে চলেছে!

আমার সময় তখন আর আগের মতো অত ফ্রিকোয়েন্ট নাই। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি আউটবই পড়তে পারছিলাম না, বা বড়সড় লেখাগুলি প্রায় বাদ-ই দিতে হচ্ছিল—তখন দেখি ভোরের কাগজে পাঠকদের জন্য বরাদ্দকৃত একটি পাতা—‘পাঠক ফোরাম’! তাতে যে ফিচার চাওয়া হচ্ছে তার শব্দ সংখ্যা মাত্র একশত পঞ্চাশ! আমারে আর পায় কে? পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি শুরু হয়ে যায় শুধু লেখার হাতটা মকশো করার চেষ্টা। প্রতি হপ্তায় মাত্র একশত পঞ্চাশ শব্দ! একশত পঞ্চাশ!

এক বাদামি বিকেলে হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যান উল্টা পথে ঘুরে আসে। আর এসে দাঁড়ায় কিনা আমার বাড়িরই দ্বারে! কাঁধে তার সেই চিরপরিচিত কাঁঠালিচাঁপা রঙের ঝুলি। আমার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে হাতে তুলে দেয় ভ্যানগগের আঁকা ‘Wheatfield with crows’ ছবির রঙের একটা খাম—তাতে একশত টাকার কড়কড়ে প্রাইজবণ্ড! পাঠক ফিচার বিজয়ীর প্রথম পুরস্কার!


চিঠিতে যা হুমকি দেন আপনি! আপনার চিঠি মানেই হুমকি! আমি গিয়াস, গিয়াস আহমেদ।


এরপর থেকে ডাকপিয়ন ঘনঘনই এসে আমার ডোরবেল বাজিয়ে যায়। একদিন ডাকপিয়ন আসে একটা নেমতন্নপত্র হাতে করে। ভোরের কাগজের ঢাকার পাঠকদের নিয়ে ‘পাঠক ফোরাম ঢাকা কমিটি’ হবে—সেখানে আমি যেন অবশ্যই যাই। আমি যেন উপস্থিত থাকি সেই মিটিংয়ে। কিন্তু আমাকে ডাকলেই কি পাবে সকলে? কিংবা আমি চাইলেই কি যেতে পারি যে কোনো নিমন্ত্রণে? নাহ, একদমই তা পারি না। এখনও নারীরা কত কিছুই যে পারে না! নারীর পায়ে সোহাগ করে নূপুরের ছলে পরানো থাকে ডান্ডাবেরি! নূপুরের রিনিঝিনি মধুর শব্দের আড়ালে আদতে ডান্ডাবেরিই ঝনঝনিয়ে বেজে চলে!

দুরু দুরু বুকে তবুও আমি দুয়ারে প্রস্তুত রাখি গাড়ি। প্রস্তুত রাখি ঘোড়া আর গাড়োয়ান। আয়োজন করি আমার ‘অন্ধকার যাত্রার’!

৫০, লিঙ্করোড, বাংলামটরের মোজাইক সিঁড়ির খাড়া খাড়া ধাপগুলি শঙ্কিত পায়ে পেরিয়ে যাই। চারতলায় একটা বড়সড় রুমের সামান্য একটুখানি জায়গায় চেয়ার ফেলে বসে আছে কিছু মানুষ। তাদের কাউকেই আমি প্রায় চিনি না। সব অচেনা অথচ উজ্জ্বল মুখ! সেসব ঔজ্জ্বল্য সামনে রেখে একেবারে পেছনের সারির একটা চেয়ারে চুপ করে বসে থাকি আমি।

একটা চ্যাংড়া টাইপ লোককে দেখি ভাঙা স্বরে অনর্গল বকে যাচ্ছে। তার ভাঙা-বকুনি থামলে আমার কাছে এসে জানতে চায়—

আপনি কে জানি?

আমি পাপড়ি রহমান।

ও আপনিই পাপড়ি রহমান? চিঠিতে যা হুমকি দেন আপনি! আপনার চিঠি মানেই হুমকি! আমি গিয়াস, গিয়াস আহমেদ।

(কথা সত্য! কোনো হপ্তায় আমার লেখা ফিচার ছাপা না হলেই আমি বি.স.-কে লিখি পত্র—অ্যাই যে, আমার লেখা ছাপেন নি কেন, অ্যাঁ? )

আমি চমকে তাকাই। এ মা, ইনিই তাহলে বি.স.! মানে পাঠক ফোরাম পাতার বিভাগীয় সম্পাদক! ইনিই আমাকে এমন আন্তরিকভাবে নিমন্ত্রণ করেছেন?

আমি মনে মনে ভেবেছিলাম—ইয়া লম্বাচওড়া দৈত্যাকৃতির হবেন বি.স। কিন্তু কিসের কী? আমার ভাবনা একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে যায়!

আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা  অত্যন্ত স্মার্ট এক চ্যাংড়া। কিন্তু তাঁর আঁখিদ্বয় ভারি বুদ্ধিদীপ্ত! একই সঙ্গে সরল ও দারুণ রোম্যান্টিকও বটে!

২য় পর্ব