হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ২

আমার একলা পথের সাথি : ২

আমার একলা পথের সাথি : ২
0

১ম পর্ব

২য় পর্ব

‘ভোরের কাগজ পাঠক ফোরাম’-এর বি.স. (বিভাগীয় সম্পাদক) গিয়াস আহমেদ অতিশয় ভালো মানুষ। আমোদ-প্রবণ। সে অত্যন্ত মেধাবীও বটে! আমার ভালো লাগল গিয়াসের সিমপ্লিসিটি। কোনো ভানভণিতার ধার সে ধারে না, যা বলার স্পষ্ট বলে দেয়। আর মানুষের জন্য তাঁর অপরিসীম মায়া-মমতা—যা আমাকে সত্যি সত্যিই মুগ্ধ করল বৈকি! আমি তাঁর প্রেমনদীতে ধপাস করে পড়তে পড়তে কাছাড় ধরে দাঁড়িয়ে গেলাম! [তখন অবশ্য আমাদের তুমুল প্রেমের বয়স ছিল। আর গিয়াসও আমার প্রায় সমবয়সী ছিল] বলা চলে প্রেম-বুলেট একেবারে বাম কানের পাশ দিয়ে চলে গেল!


আর একটা কথা না বললেই নয়, গিয়াসের সবকিছুতেই কেমন যেন ‘কৃষ্ণভাব’ ছিল। তার এই ‘কৃষ্ণভাব’ নিয়ে সে কোনো লুকোছাপা করত না।


এর কারণও ছিল, আমি আদতে পুরুষ দেখলেই বা কখনো কোনো পুরুষের প্রতি মুগ্ধ হলেও তার প্রেমে হুটহাট পড়তে পারি নাই কোনোদিনই। পুরুষ দেখা মাত্রই কেন জানি আমার চিন্তাতে প্রেমট্রেম আসতই না। মনে হতো সে-ও আমার মতো একজন মানুষ শুধুমাত্র! পুরুষ বলে আলাদা করে দেখার মনোভাব আমার মাঝে ছিলই না। তাছাড়া চিরকালই আমি সেইরকম চুজি ও সিলেক্টিভ! আমার সবকিছুর মতো প্রেমের ব্যাপারেও আমি বাজে রকমের খুঁতখুঁতে। ফলে গিয়াসের সাথে আমার প্রেমট্রেম হলো না ঠিকই, কিন্তু নিবিড় বন্ধুত্ব হলো। গিয়াসেরও আমার প্রতি প্রেম হলো নাকি প্রেমভাব হলো ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে সে চিরকালই বড় দরদি ছিল আমার প্রতি। গিয়াসের সাহিত্য বিষয়ে জানাশোনাটাও ভালো ছিল। আর একটা কথা না বললেই নয়, গিয়াসের সবকিছুতেই কেমন যেন ‘কৃষ্ণভাব’ ছিল। তার এই ‘কৃষ্ণভাব’ নিয়ে সে কোনো লুকোছাপা করত না। বরং আমাকে হরহামেশাই তার একমাত্র রাধাসহ গোপিনীকুলের কিসসা কাহিনি শুনতে হতো। অবশ্য ওইসব ছিল শুধুই ‘ফান’, নিছক মজা করার জন্যই কিছু বলা, সিরিয়াস কিছুই নয়। গিয়াসের সেইসব গল্প আমাদের আড্ডায়ও ওপেনলি চলত। যার অধিকাংশ ছিল হাস্যরসে ভরপুর। তখন ফোরামে যারা আসত তাদের বেশিরভাগই আড্ডা-আনন্দ-উল্লাস করার জন্যই আসত। সিরিয়াস-সাহিত্য করবে মানে ‘নিঃসাড় অন্ধকারে’ ঝাঁপ দেবে এরকম মোটো তখনো তেমন কারো মাঝে দেখি নি। বা তা থাকলেও আমার নজর এড়িয়ে গিয়ে থাকবে। প্রায় সবারই হালকা চালের লেখার দিকে ঝোঁক ছিল। তবে মনে মনে লেখক হবার বাসনা সবারই হয়তো কম-বেশি থাকতে পারে। এদের মাঝে দুই/চারজন মেধাবী লেখক যে ছিল না তা নয়।  তারা পরে অন্য ক্ষেত্রে খুবই সফল হয়েছে। লেখালেখিতেও কেউ কেউ তার নিজের সিগনেচার রাখতে পেরেছে।

‘ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামের আড্ডায়’ প্রায় সব ধরনের মানুষের আসার সুযোগ ছিল। গাউছিয়া মার্কেটের কাপড়ের দোকানদার থেকে শুরু করে বুয়েটের, মেডিকেলের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও আসত। আসত বেকার, ছন্নছাড়া, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং উদ্দেশ্যপ্রবণরাও! প্রেম-ভিখারিরাও আসত। ব্যর্থ-প্রেমিক-প্রেমিকার সংখ্যাও নগণ্য ছিল না। আদতে গিয়াস ছিল বরাবরই লিবারেল টাইপের। সবকিছুকে সহজ ও শাদা চোখেই দেখত সে।

‘মেলা’ পাতার সম্পাদক ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। ‘সাহিত্য’ পাতার সম্পাদক ছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। আর আনিসুল হক সমস্ত ফিচার পাতার প্রধান এডিটর ছিলেন। মুন্নী সাহা ছোটদের পাতা ‘ইষ্টিকুটুম’-এর। আর কবির বকুল সিনেপাতা ‘বিনোদন’-এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। ‘অবসর’-এর বি.স. ছিলেন মুনির রানা। অত্যন্ত ভদ্র এবং সজ্জন একটি ছেলে। ছিলেন সদা প্রফুল্ল ও বিনয়ী কল্লোল মেহেদী। এঁদের সবার সঙ্গেই আমাদের রেগুলার দেখাসাক্ষাৎ ও সৌজন্য হাসি বিনিময় হতো। আনিসুল হকের ডাকনাম ‘মিটুন’, আমরা ডাকতাম মিটুনদা— তিনিও অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহারের মানুষ ছিলেন। মিটুনদা আমাদের মিটিংয়ে মাঝেসাঝেই এসে হাসিমুখে বসতেন। আর আমরা যখন ঢাকার বাইরে যেতাম, সঞ্জীবদা আমাদের সহযাত্রী হতেন।

পাঠক ফোরামের পাতা মূলত ছিল আমাদের হাতেখড়ির শ্লেটপেন্সিলের মতো। আমরা লিখতাম যার যা খুশি, যেমন খুশি—গিয়াসের মমতামাখা সম্পাদনায় সেসব খাদ্য বা অখাদ্য কাটাছেঁড়া হয়ে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেত।


সাহিত্যপত্রিকা ‘শৈলীতে’ যখন আমি সেই গল্প দেই, কুয়াত-উল-ইসলাম আমাকে সেই গল্প কমছে কম তিনবার রি-রাইট করিয়ে নিয়ে তবেই ছেপেছিলেন।


গিয়াসের সাথে আমার অমলিন বন্ধুত্ব গড়ে উঠলেও সে আমাকে কোনোদিনই ‘এক্সট্রা খাতির’ করত না। মানে বি.স.-র পাতায় আমিই ঘনঘন ফিচারবিজয়ী হব এমন কোনো নিয়মনীতির বালাই আমাদের মাঝে ছিল না। গিয়াস বি.স. থাকাকালীন আমি দুই কি একবার মাত্র ফিচার প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়েছিলাম। বা পরবর্তীতে আমরা যখন তরুণ-লিখিয়ে হয়ে উঠছি তখনও সে কোনো সাহিত্যপাতায় আমার কোনো লেখা ছাপা হবার জন্য এগিয়ে দেয় নাই বা সাজ্জাদ ভাইকে (সাজ্জাদ শরিফ) কোনোদিন অনুরোধও করে নাই । কিন্তু গিয়াস এই কাজটি কয়েকজনের জন্য করেছিল। যেমন ওই সময়ের পাঠক ফোরামের জনপ্রিয় সদস্য সুমন্ত আসলাম ও মাইনুল এইচ সিরাজীর লেখা গিয়াস নিজ থেকেই সাজ্জাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল সাহিত্যপাতায় ছেপে দেবার জন্য। তখন একটা প্রথম সারির পত্রিকার সাহিত্যপাতায় লেখা ছাপা হওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। আর তা ছিল একজন তরুণ লিখিয়ের জন্য কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমি তারপরও গিয়াসের প্রতি প্রসন্নই ছিলাম। কারণ আমি তার বন্ধু বলে সে হয়তো এ কাজটি করা থেকে বিরত ছিল। বা আমার লেখা হয়তো তার কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য মনে হতো না। আমি যখন সিরিয়াসলি গল্প লিখতে শুরু করি, তখন গিয়াসের কাছে তা পড়ে দেখার জন্য কম্পিত বক্ষে দিয়েছিলাম। নানান ব্যস্ততা সত্ত্বেও গিয়াস গভীর যত্নে আমার দুই/একটা গল্প লালকালিতে কাটাছেঁড়া করে দিয়েছিল। কিন্তু বিধি বাম! গিয়াসের কাটাছেঁড়া সত্ত্বেও শেষরক্ষা কিছুই হয় নাই। সাহিত্যপত্রিকা ‘শৈলীতে’ যখন আমি সেই গল্প দেই, কুয়াত-উল-ইসলাম আমাকে সেই গল্প কমছে কম তিনবার রি-রাইট করিয়ে নিয়ে তবেই ছেপেছিলেন। আমিও নাকের জল, চোখের জল এক করতে করতে বারংবার রি-রাইট করে দিয়েছিলাম। তাও কাগজের উপর কলম চালিয়ে। এখনকার মতো ল্যাপটপ আর ট্যাবের কারবার শুরু হয় নাই! কাগজ-কলমে বার বার ড্রাফট করা ভীষণ কষ্টের কাজ ছিল বটে!

এখন বুঝি, আমার ছিল অসীম ধৈর্য। ছিল প্রচণ্ড অধ্যবসায়! আর ছিল নিশ্ছিদ্র আঁধারে ঝাঁপ দিয়ে পড়বার প্রবল তৃষ্ণা। আমি ছিলাম সেই সিসিফাস, যে সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে একটা ভারী পাথর ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠায়। কিন্তু সে-পাথর কিনা নিজের ভরেই মুহূর্তে পাহাড়ের তলদেশে নেমে আসে। সিসিফাস পরদিন ফের সেই পাথর ঠেলতে ঠেলতে চূড়ার দিকে নিয়ে যায়। ফের তা গড়িয়ে গড়িয়ে পাহাড়ের তলদেশে নেমে আসে। প্রতিদিন একটা ভারী পাথরকে পাহাড়-চূড়ায় ঠেলে নেয়ার জন্য সিসিফাসের মতো একাগ্র ধ্যান ও পরিশ্রম থাকা চাই। বারংবার ব্যর্থ হলেও এই ধ্যান ও পরিশ্রমের যেন ঘাটতি না-ঘটে! আমি তেমনটিই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।

আমার তখন বয়স ছিল অল্প, ফলে একটু কিছুতেই মন বড় জলসিঞ্চিত হয়ে উঠত!

দিবানিশি লেখার জন্য স্কোপ খুঁজে মরতাম। যেন যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন!

অমূল্য রতন পাওয়ার আশায় লিখতাম পাঠক ফোরামের পাতায়, অন্যপক্ষে। লিখতে চাইতাম মেলার পাতায়। চলতিপত্রে। লিখতাম পাঠকের কলামে। এবং অবধারিতভাবে ‘লিটলম্যাগে’।

ভাবতাম, লেখাই হোক সাধনা। জানতাম, লেখাতেই মিলিবে মুক্তি। এ জীবনের যত হলাহল অনিচ্ছাতেও পান করে চলেছি, তা উগরে দেয়া যাবে লেখার মাধ্যমেই। বিষে বিষে বিষক্ষয়ের বাসনায় ভারী পাথরটা ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়-চূড়ার দিকে ধাবিত হতাম! কিন্তু পাথর গড়িয়ে নেমে যেত পাহাড়ের সানুদেশে!

And I watered it in fears
Night and morning with my tears:
And I sunned it with smiles,
And with soft deceitful wiles.

[A Poison tree, William Blake]

তৃতীয় পর্ব