হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৯

আমার একলা পথের সাথি : ৯

আমার একলা পথের সাথি : ৯
323
0

পর্ব- ৮


পর্ব-৯

বিভূরঞ্জন সরকার সম্পাদিত ‘চলতিপত্র’ নামে একটা বেশ ভালো মানের সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরোত তখন। আমি ওই পত্রিকাতেও লিখতাম। চলতিপত্রের ‘ঈদসংখ্যায়’ আমার একটা গল্প ছাপা হলো ‘চন্দন কাঠে চিতার গন্ধ’ নামে। অবশ্য নামটা আমি ধার করেছিলাম কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন থেকে। এই যে চারদিকে এত এত গল্প লিখছিলাম, তবুও আমার ‘কবি’ হওয়ার বাঞ্ছার মৃত্যু হয় নাই! মৃত্যু হচ্ছিল না কিছুতেই। এর মাঝে হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ নামে বাংলা একাডেমি থেকে লেখালেখি বিষয়ক কোর্স করার বিজ্ঞাপন। ছয়মাস মেয়াদি এই কোর্সে  প্রতি মাসে ভাতা দেয়া হবে তিন হাজার টাকা করে। ততদিনে আমি মা হয়েছি ও সংসার আমার কাছে ক্রমশ বলদের ঘানি টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো কষ্টকর ও একঘেয়ে ঠেকছে। আমি ভেবে পাচ্ছি না, শুধুমাত্র রান্না-খাওয়া, বাচ্চা লালনপালন, ঘর গোছানো ও রূপচর্চার মাঝে একজন নারীর জীবন কী করে ব্যয়িত হতে পারে? আমার দিদিও তো ৪০/৫০ বছর সংসারে এইসব করেই মারা গেছেন। আমার আম্মাও করছেন, কিন্তু তাতে তাদের কী লাভ হয়েছে? তাছাড়া সংসারের যাবতীয় বোঝা আমি একাই টেনে চলেছি, যেন সব দায় আমার! আর কারো কোনো কিছুতেই দায় নাই, টান নাই—সকলের শুধু আরাম আয়েশ করে খাওয়া আর ঘুমানো, যেন তারা সারাক্ষণ অতিথি হয়েই আছে এখানে—এমন একটা অবস্থা!


আমার জীবনে যখনই নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিতে যা কিছুই করেছি, সেটাই আমাকে প্রভূত সাফল্য দিয়েছে।


জীবনে একবারই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ফেল মেরে সেই যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, আমি আর ওইদিকে ফিরে যাই নাই। এদিকে বাড়ির কাছে দুই/একটা প্রাইভেট কলেজে চাকরি-প্রার্থী হিসেবে রিটেন-ভাইভা পরীক্ষা দিয়ে ফার্স্ট হয়েও জয়েন করি নাই। কারণ কেউ কেউ অফার দিয়েছে বিনা বেতনে এক বছর পড়ানোর জন্য। বাড়ির কাছের এক কলেজের কনফার্মেশন-লেটার পেয়েছি জয়েনিং তারিখের সাতদিন পরে। ডাকবিভাগের গড়িমসিতে আমার ভাগ্যের এই শনির দশা! যিনি পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছেন তিনি ওই কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করে ফেলেছেন।

এদিকে আমার বাড়ির পরিবেশও আমার একদম অনুকূলে নয়। আমাকে সামান্যতম সাপোর্ট দেবে এমন কোনো মানুষ আমার আশেপাশে নাই—যার উষ্ণতায় আমি নির্ভয়ে বাচ্চাদের রেখে দূরে কোথাও চাকরির চেষ্টা করতে পারি। আমার অত্যন্ত রক্ষণশীল আব্বা-আম্মাও চাইতেন না যে আমি চাকরি করি। তাঁদের চিন্তা আমি বাসার বাইরে থাকলে আমার বাচ্চা দুইটা হয়তো মরেই যাবে। ফলে আমি সাফল্যের পথে এক পা এগুলে তাঁরা আমাকে টেনে এনে যত্ন করে একেবারে কবরে শুইয়ে দিয়েছেন। আর আমিও অগ্রজদের সব কথাই শিরধার্য  মনে করে তাঁদের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করেছি। এগুলোই ছিল আমার জীবনের চরমতম ভুল। যার মাশুল আমাকে আজ অব্দি টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে!

সাংসারিক সমস্ত দায়িত্ব গাধার মতো টেনে নেবার পরে আমি এদিক-ওদিক থেকে চুরি করে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নিতাম। ওই চুরির সময়ের ভেতরেই পড়ালেখার কাজটা কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে যাচ্ছিলাম। যখন কেউ বাসায় থাকত না, তখন কাগজ-কলম নিয়ে পাগলের মতো লেখার জন্য বসে যেতাম। বাচ্চারা ইশকুল থেকে ফিরে এলে ওদের স্নান-আহার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তাম। আব্বা তখন প্রায়ই হাসপাতাল আর বাসা, বাসা আর হাসপাতাল করছে।

আমার ছোট দুই বাচ্চার সমস্যার কথা বিবেচনা করে ‘তরুণ লেখক প্রকল্পের’ প্রথম থেকে চতুর্থ ব্যাচের কোনোটাই ধরা গেল না, আমি প্রার্থী হলাম পঞ্চম ব্যাচের। তাও নাসির ভাই [ কবি ও সাহিত্য-সম্পাদক নাসির আহমেদ] বললেন বলে। আর আমি সাজ্জাদ ভাইয়ের [কবি ও সাহিত্য-সম্পাদক] সাথেও জেনেবুঝে নিলাম—এই প্রকল্পে আমি অংশগ্রহণ করব কী করব না! দুজনেই বললেন যান যান, কোনো অসুবিধা নাই। দেখবেন, দেখতে দেখতেই ছয় মাস চলে যাবে।

বাংলা একাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ কিন্তু লেখা শেখানোর কারখানা ছিল না। একথা তাঁরা শুরুতেই স্পষ্ট করেই বলে দিতেন। এই তরুণ লেখক প্রকল্পের শর্ত ছিল—যারা অ্যাপ্লাই করবে তাদের অবশ্যই লেখক হতে হবে। লেখক হলেই শুধু চলবে না, থাকতে হবে প্রকাশিত কবিতা-গল্প। কবিতা হলে অন্তত ১০টা। আর গল্প হলে ৫/৬ টা অবশ্যই। নতুবা কোনো প্রকাশিত গ্রন্থ থাকলেও তা প্রার্থীর যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

আমি ভয়ে ভয়ে অ্যাপ্লিকেশন করলাম। এই প্রকল্পের শিক্ষানবিশ হওয়া কোনো সহজ প্রক্রিয়া ছিল না। প্রথমত লেখক হিসেবে ফর্ম পূরণ করার পরে একাডেমি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে—কাকে কাকে ডাকা যায়? ডাকার পরেই সব ফাইনাল হয়ে গেল—ব্যাপারটা তেমন ছিল না। ডাকার পরে আছে আরও দুইটা বৈতরণী—রিটেন ও ভাইভা। কী যে রিটেন দিয়েছিলাম আজ আর তেমন করে মনে নাই। তবে এটা মনে আছে, একটা যে কোনো গ্রন্থের আলোচনা করতে বলা হয়েছিল। আমি আলোচনা করেছিলাম সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য ও গল্পের কলকব্জা’ বইটা নিয়ে। বাকি প্রশ্ন খুব সম্ভবত এমসিকিউ পদ্ধতিতে ছিল। দুরু দুরু বুকে ভাইভাও দিলাম। রেজাল্ট হওয়ার পরে ক্লাসে দেখি আমার ক্রমিক নাম্বার ‘চার’। [এই ক্রমিক নাম্বার রিটেন-ভাইভার রেজাল্ট অনুযায়ী ছিল নাকি ভর্তির সাথে রিলেটেড ছিল—আজ আর স্মরণ নাই]

আমি আমার জীবনে যখনই নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিতে যা কিছুই করেছি, সেটাই আমাকে প্রভূত সাফল্য দিয়েছে [শুধু নিজের ক্যাঁচরা বয়সের প্রণয় ও বিবাহের ভুল সিদ্ধান্তটি ছাড়া]। আর অন্যের কথা শুনে যা-কিছু করেছি, তা আমাকে অন্ধকার গহ্বরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। যে অন্ধকার থেকে উদ্ধার পেতে পেতে হয়তো অর্ধযুগ কেটে গিয়েছে।  আর অন্যের বুদ্ধি শোনার ক্ষতিপূরণ আমাকে করতে হয়েছে নিজের সুস্থতা বিনাশ করে। নিজের জীবনকে একেবারে ধূলিতে মিশিয়ে দিয়ে।


আমি বইয়ের স্তূপে ডুবে থেকে বিষে-উপচে-পড়া জীবনপাত্র থেকে পরিত্রাণ খুঁজছি।


আমি যদি এ জীবনে একটাও সঠিক সিদ্ধান্ত কিছু নিয়ে থাকি—তা ছিল বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থী হওয়া। এবং একাডেমিতে ক্লাস শুরু হতেই বুঝতে পারলাম কতটা ছোট্ট কূপের কতটুকু ক্ষুদ্র ব্যাঙ আমি বা আমরা!

আহা! কী সব দিন যে পাখির ডানায় ভর করে উড়ে এল! নাকি আমি নিজেই পাখি হয়ে উড়তে লাগলাম একেবারে নীলিমা অবধি! চল্লিশ জন শিক্ষার্থীর মাঝে মাত্র দশ জন নারী। বাকিরা সকলেই পুরুষ। নানা পেশার। নানা বয়সের, কেউ কেউ বেকার। কিন্তু মন সকলেরই মেঘের সঙ্গী!

আমি পুনরায় ছাত্র! [আমি আদতে চিরকালের ছাত্র, আজ অব্দি] পুনরায় আমার জলের ভাণ্ড, টিফিন বক্স আর সকাল আটটার ক্লাস!

আমি আজও ওই চল্লিশ জনের প্রতিটা মুখ স্পষ্ট যেন দেখতে পাই। সকলেই নবীন! [বয়সের বাধ্যবাধকতাও ছিল যে, বয়স পঁয়ত্রিশের এর বাইরে গেলেই আবেদনের জন্য বাতিল ছিল সে] সকলেই কাঁচা! যেন শরতের শিউলি ফুল। হালকা হিম বাতাসে ঝরে পড়েছে বেদীর সোপান তলে! সবার চোখে স্বপ্নের ঘোর। একদিন অনেক বড় লিখিয়ে হবে তারা! একদিন মাথার মুকুটে যুক্ত হবে সফল লেখকের সোনালি-পালক!

আমাদের চল্লিশ জনেরই ছিল চির বসন্তের দিন। সকাল আটটায় সরদার ফজলুল করিমের ক্লাস। সকাল দশটায় শামসুর রাহমানের। এভাবে প্রতিদিনই দূরলোকের নক্ষত্রদের কাছাকাছি যাওয়া। তাদের আলোর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা!

জ্ঞান-বৃক্ষদের সুশীতল ছায়ায় বসে বসে নিজেদের ক্ষুদ্রতা পরখ করে দেখা।

আর ফাঁক পেলেই বাংলা একাডেমির লাইব্রেরির চেয়ার দখল করে আমার পুরাতন অভ্যাসে ঢুকে পড়া। আমরা তখন ওই লাইব্রেরির সদস্য কার্ড পেয়েছি। আউট সাইডার হিসেবে নয়, আমরা লাইব্রেরির হকদার হিসেবেই ওই চেয়ারগুলোতে বসবার অধিকার পেয়েছি।

আমি বইয়ের স্তূপে ডুবে থেকে বিষে-উপচে-পড়া জীবনপাত্র থেকে পরিত্রাণ খুঁজছি। নিজের জীবনের সমস্ত ভাঙনগুলো ঢেকে রাখবার জন্য মুঠি মুঠি বালি তুলছি। কিন্তু আমার আঙুলের ফাঁক গলে সমস্ত বালি ঝুরঝুর করে ফের নিচে পড়ে যাচ্ছে।

লেখক প্রকল্পে আমাদের বয়সের গাছপাথর নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নাই। আমরা একে অন্যকে ‘তুমি’ করে বলছি। টংঘর থেকে কেনা চায়ের কাপে টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে ভিজিয়ে আয়েশ করে খাচ্ছি!

বাংলা একাডেমির ওই লেখক প্রকল্পের কোনোকিছুই ঘড়ির নিয়মের বাইরে যাওয়ার উপায় ছিল না। এমনিতেই আমি অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড লাইফ লিড করতাম বলে অসুবিধা বোধ করতাম না।

এত কড়াকড়ি ছিল যে, মাঝেমাঝেই আমরা ক্লাস ‘বাঙ’ মারতে চাইতাম। কিন্তু তা করারও উপায় ছিল না। প্রতি ক্লাসেই রোল কল করা হতো।


আজ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আজ পাপড়ি রহমানের মন খারাপ!


প্রতিদিন নিয়ম করে পূর্ব দিনের কাজের ফিরিস্তি একটা ফরমে লিখে জমা দিতে হতো। অনেকটা প্রতিদিনের জার্নাল লেখবার মতো। সেই লেখা নিজেদেরই পাঠ করে শোনাতে হতো। আমার ততদিনে দুই-একজন বন্ধু হয়েছে। আর আমি আমার স্বভাবসুলভ বাচালতায় বলে দিয়েছি—

যেদিন আকাশে মেঘ করবে, জানবে আমার অত্যন্ত মন খারাপ…

সেদিনও ক্লাসে গতদিনের কাজের ফিরস্তি লেখা জার্নালগুলো পড়া শুরু হয়েছে। ত্রিশ জনের একজন—কাজী মোহাম্মদ আলমগীর পড়তে শুরু করল—

আজ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। আজ পাপড়ি রহমানের মন খারাপ!

[খুব সিনেম্যাটিক বা ন্যাকা শোনালেও এসবই সত্য। জীবন কখনও কখনও সিনেমার চাইতেও ফ্যান্টাসিময় হয়ে উঠতে পারে!]


পর্ব- ১০

(323)