হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৭

আমার একলা পথের সাথি : ৭

আমার একলা পথের সাথি : ৭
157
0

পর্ব-৬


পর্ব-৭

আমার কাছে ‘কবিতা’ হয়ে উঠল গহিন বনভূমিতে মাটির খোঁড়লে লুকিয়ে থাকা শশকের মতন। যার দেখা পাওয়াই ভারি মুশকিল। কালেভদ্রে যদিও তার দেখা মেলে—কিন্তু তা একেবারে বিদ্যুৎ-চমকের মতো! পলকে দেখা দিয়ে পলকেই মিলিয়ে যাওয়া যার স্বভাব। অথবা কবিতাকে আমি জানলাম, দক্ষ ডুবুরির নিপুণ ড্রাইভে সমুদ্দুরের একেবারে তলদেশে থেকে শুক্তি তুলে আনার মতো করে—ওই শুক্তির খোলস ছাড়াতে পারলে যে মুক্তোর দেখা মেলে—তাহাই ‘কবিতা’!

‘Poetry is a journal of the sea animal living on land, wanting to fly in the air. Poetry is a search for syllables to shoot at the barriers of the unknown and the unknowable. Poetry is a phantom script telling how rainbows are made and why they go away.’  [Carl Sandburg, The Atlantic, March 1923]

বা কোনো ঘুমেরদেশে বেড়াতে গিয়ে এমন এক অনুভব—যেন চারপাশের অদৃশ্য-জল আচানক ফুলেফেঁপে, অচেনা স্পর্শ দিয়ে আমাকে বিহ্বল করে তুলছে!


‘প্রথম আলো’ নারীলেখকদের নিয়ে ‘চাটুকারিতার’ নামে আদতে তার সাড়ে-সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়।


এইরকম নানা বিভ্রমে পতিত থেকেও আমার কবিতা লেখার কসরত চলতেই থাকে। সেইসব কবিতার দুই-একটা সাহিত্য পত্রিকা ‘শৈলীতে’ ছাপাও হয়ে যায়।

আজ আর তেমন স্পষ্ট করে মনে নাই, ‘অমর একুশে বইমেলা’ নাকি ‘ঢাকা বইমেলায়’— পাঠে-চেনা, কিন্তু অবয়বে-অচেনা কবিদের সঙ্গে আমার হরহামেশাই দেখা-সাক্ষাৎ ঘটতে থাকে।

এঁদের মাঝে কবি ও সাহিত্য সম্পাদক নাসির আহমেদও ছিলেন।

নাসির ভাই জানতে চান আমি লিখি কিনা? পরে বলেন—

আমার পাতায় লেখা পাঠিয়েন।

আমি বলি—

পাঠালে কী হবে? আপনি তো সেসব ছিঁড়ে ফেলে দেবেন বা কোনোদিনই ছাপবেন না।

নাসির ভাই হেসে বলেন—শোনেন, আমার ব্রেন শয়তানের চাইতেও শার্প! আপনি কোনোদিন আমার পাতায় লেখা পাঠান নি। পাঠালে আমার স্পষ্টতই মনে থাকার কথা।

নাসির ভাইয়ের কথা শুনে চুপ করে থাকি। কারণ আমি তখন পর্যন্ত সত্যিই কোনোদিন ‘জনকণ্ঠে’ আমার কোনো লেখাই পাঠাই নি।

নাসিরভাই তার যথারীতি ভদ্র ও মার্জিত কায়দায় ফের বললেন—

আর আমি বা অন্য কেউ যদি আপনার লেখা ফেলে দেয় বা ছিঁড়েই ফেলে তাতে এত মনঃক্ষুণ্ণ কেন হোন? আপনার জেদ নাই? আপনিও জেদ করুন, যেন কোনো একদিন আপনিও অন্যদের একশটা লেখা ছিঁড়ে ফেলে দিতে পারেন বা বাতিল করতে পারেন।

শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার পাশে দাঁড়ানো আমার পার্টনার গোঁফের তলা দিয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। [নাসির ভাইয়ের এই অনুপ্রেরণা ও পরবর্তীতে কবি আবু হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের উৎসাহে আমি লিটল ম্যাগ ‘ধূলিচিত্র’ সম্পাদনা করেছিলাম]

তার দিন-দুয়েক পরে আমি ‘জনকণ্ঠের’ সাহিত্য পাতার ঠিকানায় একটা কি দুইটা কবিতা ডাকযোগে পাঠিয়ে দেই। কয়েকদিন অপেক্ষার পরে ব্যাকুল হয়ে ‘জনকণ্ঠে’ ফোন করি। নাসির ভাই ফোন ধরে যা বললেন তাতে আমি আরও বিচলিত বোধ করি। নাসির ভাই বললেন, পাপড়ি রহমানের কবিতা নিয়ে ভ্যানগগের ‘সানফ্লাওয়ার’ ছবির রঙা কোনো খাম উনার হাতে পৌঁছায় নি। আমি ভাবতে থাকি—না পৌঁছানোর কারণ কী?

ফের পোস্ট করি। ফের একই জবাব আসে নাসির ভাইয়ের কাছ থেকে। আমি দ্বিধায় পড়ে যাই—নাসির ভাই কি আমার পোস্ট করা লেখা পেয়েও না-পাওয়ার ভান করছেন?

কিন্ত তাই-বা কী করে সম্ভব?

ইতোমধ্যে আমি তো বাংলা সাহিত্যের রাজধানী ঢাকার ভেতরেই লুকিয়ে থাকা কাদামাখা-নোংরা-পিচ্ছিল কিছু কানাগলির খবরা-খবর জেনে গিয়েছি। বিশেষ করে ‘নারীলেখকদের’ জন্য এই রাজধানীতে টালমাটাল অবস্থা! নতুন কোনো নারী লিখতে এলেই তাকে নিয়ে নানান টানাহেঁচড়া শুরু হয়ে যায়। প্রথমত [মেধা বা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও] ‘কবি বা সাহিত্যিকের কল্কে’ তাকে কেউ-ই প্রায় দিতেই চায় না। যদিও বা তার লেখার গুণেই তা দেয় বা দিতে বাধ্য হয়, তখন কোনো কোনো পত্রিকাওয়ালাদের মাঝে শুরু হয়ে যায় তাকে দলে টানার তীব্র প্রতিযোগিতা। এ ব্যাপারে ‘প্রথম আলোর’ ভূমিকা সর্বদাই শীর্ষে ছিল এবং আছেও। ‘প্রথম আলো’ নারীলেখকদের নিয়ে ‘চাটুকারিতার’ নামে আদতে তার সাড়ে-সর্বনাশ ঘটিয়ে দেয়। তাকে এতটাই মহান লেখকের সুউচ্চ আসন দেয় যে, পরে সে আর তেমন কিছুই লিখতে পারে না। বিশেষ করে তার ‘নিজের লেখাটি’! ‘তোষামোদের’ নামে, ‘বিজ্ঞাপনের’ নামে প্রথম আলো নারীদের আদতে ড্যামেজ করে দেয়। [অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ লেখকদের নিয়েও তারা এই কূটনীতি জারি রাখে!]


সাহিত্যের সবকিছু থেকেই আমি দীর্ঘ তিন/চার বছর বিচ্ছিন্ন ছিলাম। 


যাকে বলে অতি প্রশংসার ছলে তার আঙুলকে অবশ করে দেয়া—যাতে নিজের ‘মহান লেখকের সুপার ইগো’ ডিঙিয়ে সে নিজের যে লেখাটি লেখার কথা, তা লিখতেই না পারে। দুই-চারটা ‘ভালোগ্রন্থের’ ঢাকঢোল শুনে শুনেই সে বাদবাকি-জীবন পার করে দেয়। [ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, সর্বক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে বা আছে এবং থাকবেই]

আমার চিন্তার সূত্র আমি মেলাতে পারি না। নাসির ভাইকে কিছুতেই আমার ‘মিথ্যা বলার মানুষ’ মনে হয় নাই। ঝামেলাটা তাহলে কই লাগল? আমার সহসা মনে হয়, আমার নাম নিয়েই বিভ্রাট কিছু হয়ে থাকবে।

বড় চাচিমা কেন যে আমার নাম ‘পাপড়ি’ রেখেছিলেন! ‘পাপড়ি’ না-রেখে করিমন-জরিমন, আম্বিয়া বা সখিনা রাখলেই হয়তো ভালো হতো। অবশ্য ওইসব নামও যে আমাকে কোনো রক্ষাকবচ দিতে পারত তাও তো আমি হলপ করে বলতে পারছি নে!

যখনই কোথাও লেখা পাঠাতাম, খামের বাম দিকে আমার পুরো নাম-ঠিকানা লিখে ডাকবাক্সে ফেলতাম। হতে পারে অতি আগ্রহী কেউ ‘নারীর-চিঠি’ বা ‘নারীর-প্রেমপত্র’ ভেবে তা গায়েবুল্লাহ করে দিয়েছে!

আমি ফের নতুন খামে লেখা পুরে বাম পাশে নতুন করে লিখে দেই—‘প রহমান’।

এই ‘প’ তে পলাশ, পরাগ, পারিজাত, প্রসূন, পারুল, পাখি, প্রপাত, প্রপঞ্চ, পরি, প্রেমা, পাশা যা কিছুই হতে পারে, পাপড়ি যেন কভু সে না-হয়!

নাসির ভাইকে ফোন করলে এবার বলেন—

হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার কবিতা এইবার আমার হাতে এসেছে।

বলেই ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে হাসতে থাকেন।

সেইদিন থেকে আমি কোনোদিন কোনো খামের উপর আমার সম্পূর্ণ নাম লিখি নি। লিখে চলেছি—

‘প রহমান!’

আহা! আমার রক্ষাকবচ! আমার ‘প’-এর বিভ্রম!

সামনেই ছিল খুব সম্ভবত ‘বাংলা নববর্ষের’ স্পেশাল ইস্যু। আমাকে অবাক করে দিয়ে নাসির ভাই জনকণ্ঠের ফোর কালার সাহিত্য পাতার স্পেশাল ইস্যুতে আমার কবিতা ছেপে দিলেন!

পরবর্তীতে নাসির ভাই ও আমার পরিবারের মাঝে অত্যন্ত হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভাবিও ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহারের মানুষ। কিন্তু নাসির ভাইয়ের সাথে আমার এই পারিবারিক সম্পর্কের দ্রুতই ইতি ঘটাতে হয়েছিল। আব্বা মারা যাওয়ার পর  প্রচণ্ড মানসিক শূন্যতা ও শোকে আমি যখন মৃতপ্রায়—আমার বুকের ভেতর প্রতিদিন বরফের টুকরো ঝরে পড়ার টুসটুস শব্দ শুনতে শুনতে পাগল-দশায় পৌঁছেছি। আমার চারপাশে কোনো স্বজন নাই। কোনো সহায় নাই, সাহারা নাই। এমনকি আমাকে সান্ত্বনা দেবার একটা মানুষ পর্যন্ত পাশে নাই! এমত কূল নাই, কিনার নাই অবস্থায় থেকে থেকে আমি এক অচেনা-যুবকের এক হলুদ খামের আশায় দিনরাত এক করে দিচ্ছি এবং সেই অদেখা ‘পত্রবন্ধুকে’ কেন্দ্র করে ঘরের লোকের নানান কূটনীতি, প্রতিশোধ, নিজ-স্বার্থের-ধান্ধা ও অকথ্য-অপমানে চূর্ণবিচূর্ণ হতে হতে আমি প্রায় সকলের সাথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলাম। সাহিত্যের সবকিছু থেকেই আমি দীর্ঘ তিন/চার বছর বিচ্ছিন্ন ছিলাম। তখন আমার ইচ্ছেই করত না কিছু লিখতে বা কারো সাথেই যোগাযোগ রাখতে। নাসির ভাই ও ভাবির স্নেহ থেকেও তখনই আমি অকারণেই দূরে চলে এসেছিলাম।

আজ মনে পড়ছে, নাসির ভাইয়ের বাসায় গেলে কত যত্নেই না কত বই আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। কবিতার ছন্দ নিয়ে কত বিকেল-সন্ধ্যা আমাদের সাথে আলাপে রত হয়েছেন। আমার লেখা একটা কবিতাকে কতভাবেই না ‘শ্রী’ দিতে চেয়েছেন।

আমার একটা কবিতায় এরকম কিছু লাইন হয়তো ছিল—

মনটা যেন ভেজা-তামাকপাতা/ পানের সাথে পুরলে গালে/ নেশার মতো ঝিম!/ অস্পষ্ট অবসাদে/ যেমন করে দিনের শেষে/ কেশ ছড়িয়ে রাত্রি নামে/


কবিতা চায় একনায়কতন্ত্র! কবিতা কিছুতেই ‘সতীন’ সহ্য করতে পারে না!


এরকম কী কী যেন ছিল—আজ আর তেমন করে মনেও নাই! নাসির ভাই বলেছিলেন—

একদিন খুব ভালো কবিতা লিখবেন আপনি। একেবারে বর্ডারে আছেন।

কিন্তু আমি কবিতা লেখা একেবারে ছেড়ে দিলাম নাকি কবিতাই আমাকে চিরতরে ছেড়ে গেল! গ্রন্থমেলায় বা অন্য কোথাও নাসির ভাইয়ের সাথে দেখা হলে তবুও তিনি বলতেন—

পাপড়ি, কবিতাটা ছেড়ে দিলেন? একদম ছেড়ে দিলেন? আপনার কবিতার হাত কিন্তু অত্যন্ত ভালো ছিল।

শুনে আমি বলতাম—

আমার দ্বারা কবিতা হবে না নাসির ভাই। সে বড় কঠিন কম্ম!

আমার মাথার ভেতর তখন শিমুল তুলার মতো করে গদ্যফুল ফুটছে। আমি যে অনেক কথা বলতে চাই। আমি অনেক জীবনের গান গাইতে চাই। অনেক গল্পের ডানা মেলে দিয়ে উড়তে চাই।

আর এ কথাটি যে কোনো প্রকৃত-কবি মাত্রেই জানে—কবিতা চায় একনায়কতন্ত্র! কবিতা কিছুতেই ‘সতীন’ সহ্য করতে পারে না!

‘বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক কবিতার ক্ষেত্রে খুবই কম। কবিতা উৎসারিত হয় কিছু গভীরতর ব্যাপার থেকে, কবিতা বুদ্ধিমত্তার অতীত। এমন কি প্রজ্ঞাবোধের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে না।’

[হর্হে লুইস বর্হেস, সেভেন নাইটস, অনুবাদ: মনোজ চাকলাদার]

ফলে আজও যারা ‘প্রকৃত কবি’ তাদের দূর থেকেই আমি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। আর যারা ‘মাত্রাতিরিক্ত পানের’ পরেও অটল থাকেন ধীর সন্ন্যাসীর মতো—তাদের প্রতিও আমার অজস্র ‘প্রণাম’!

এই দুই-শ্রেণির মানুষ আমার কাছে চিরকালের জন্য ‘নমস্য!’


পর্ব-৮ আগামী বুধবার

(157)