হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৬

আমার একলা পথের সাথি : ৬

আমার একলা পথের সাথি : ৬
26
0

পর্ব- ৫


পর্ব- ৬

‘ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামের’ মিটিং শেষে আমি একদিন বেশ সঙ্কোচ নিয়ে সাজ্জাদ ভাইকে বললাম—

সাজ্জাদ ভাই, আপনার সাথে একদিন বসতে চাই। বসা দরকার ।

সাজ্জাদ ভাই প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বললেন—

ঠিক আছে বসা যাবে। কবে বসতে চান?

সাজ্জাদ ভাইয়ের কণ্ঠে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। ‘হামবড়াভাব’ ছিল না। তিনি ছিলেন যথারীতি নম্র ও আন্তরিক । সেই রকম আন্তরিক, যাতে একজন নবিশ কিছু শিখতে চাইলে তাঁর কাছ থেকে নির্ভয়ে শিখতে পারে।


কবিতা পড়তে পড়তে আমার মনের জমাট মেঘ উড়ে যায়। নিজেকে তখন সদ্য বৃষ্টি-ঝরা-আকাশের মতো মনে হয়।


খানিক বাদে স্মিত হেসে বললেন—

আমি তো ব্যস্ত থাকি, আপনি কোনো একদিন বিকেলের দিকে চলে আসেন।

আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলাম।

এর দিন কয়েক বাদে আমার পার্টনারকে বললাম, এই যে ভোরের কাগজে যেতে হবে কিন্তু। আমি সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে আজ বসব। পার্টনার ভাবলেশহীনভাবে গোঁফ পাকাতে লাগল। আমি ফের যখন বললাম যেতে হবে, তখন সে বলল—

রেডি হও।

আমি একটু  অবাকই হলাম! এক লিটার তৈল খরচ না-করতেই এই বান্দা আজ রাজি হয়ে গেল?

তখন খুব সম্ভবত বাদলার-দিন। সাজ্জাদ ভাই টাইম দিয়েছিলেন বিকেল চারটা।

ভোরের কাগজ
৫০, লিংক রোড, মাংলামটরের চারতলা।

ভয় ও সঙ্কোচ নিয়ে বসলাম সাজ্জাদ ভাইয়ের মুখোমুখি। যথারীতি তাঁর কন্ঠে আন্তরিকতা ও অভয়।

শুরু হলো গুরু-শিষ্যার পাঠ দান ও গ্রহণের শিক্ষাকাল।

সাজ্জাদ ভাইয়ের সেদিন বলা প্রতিটা কথা আমি বেদ-বাক্য হিসেবে নিয়েছিলাম। আলাপের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর বলা প্রতিটা উপদেশ আমার নোটপ্যাডে টুকে রাখছিলাম।

সাহিত্যের কোনোকিছুই না-জেনে-বুঝে প্রায় সকলেই কবিতা লিখে ইশকুল-কলেজের খাতা ভরিয়ে ফেলে। আমিও আমজনতার কাতারেই ছিলাম। মনে সুপ্ত আশা একদিন ‘চন্দ্রাবতী’ হব। নিজের মাঝে যত ‘ভাবের আবেশ’ সবই সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে যাব।

সাজ্জাদ ভাই বললেন, জীবনানন্দ দাশকে বাইবেলের মতো করে রোজ পড়তে হবে। শুনে আমি যেন সামান্য আশার আলো দেখতে পেলাম। কারণ আমার বয়স যখন মাত্র পনেরো, দশম শ্রেণির ছাত্রী—আমি তখন জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র বইটা কিনেছিলাম। রনেশ দাশ গুপ্তের সম্পাদনা। পরিবর্ধিত ৪র্থ সংস্করণ, আষাঢ়, ১৩৮১সন।

আব্বা আমাকে ইশকুলে আসা-যাওয়ার জন্য সব সময়ই ডাবল টাকা দিতেন। ইশকুলে বন্ধুদের সাথে হল্লা করে, টিফিন খেয়েও কিছু টাকা আমার প্রতি হপ্তাতেই জমে যেত। আর সেই জমানো টাকায় আউট বই কেনার স্বভাব আমার তখনই গড়ে উঠেছিল। আমাদের ইশকুলের গেট-লাগোয়া ছিল তিন-চারটা বুকস্টোর। ইশকুল ছুটির পরে আমি ওইসব স্টোর থেকে অনায়াসে বই কিনে নিতে পারতাম। এমনকি আমারে কোনো রাস্তাও ক্রস করতে হতো না বুকস্টোরগুলিতে যাওয়ার জন্য।

সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা শুনে ফের আমার ‘চন্দ্রাবতী’ হওয়ার আশা প্রলম্বিত হতে শুরু করল। আশার প্রদীপ মনে মনে দপ করে খানিকটা জ্বলেও উঠল। কারণ আমি একটা বই-ই শিথানে-পৈথানে রাখি। আমার মন বেচাল হলেই এই বই আমাকে সাহারা দেয়। শান্তি দেয়। মেডিটেশনের কাজ করে। আজও আমি ডিপ্রেসড হলে কবিতার মাঝেই আশ্রয় খুঁজে ফিরি। আমার মন-পছন্দ কবিতা পড়ে রাত ভোর করে দেই। কবিতা পড়তে পড়তে আমার মনের জমাট মেঘ উড়ে যায়। নিজেকে তখন সদ্য বৃষ্টি-ঝরা-আকাশের মতো মনে হয়।

আমার ভালো লাগতে শুরু করল এই ভেবে, সাজ্জাদ ভাই যে বইটাকে ‘বাইবেল জ্ঞান’ করতে বলেছেন সে বইটা আমি বহু আগে থেকেই নিয়মিত পড়ি। আরেকটা বইয়ের কথা তিনি বললেন, সেটাও আমার পড়া আছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য, গল্পের কলকব্জা’।

সাজ্জাদ ভাই আরও কিছু বইয়ের নাম বললেন, আমি সেসব বইয়ের নাম নোটপ্যাডে যত্ন করে টুকে নিলাম। এর মাঝে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’, ‘শঙ্খ ঘোষের ছন্দের বারান্দা’সহ আরও কিছু বই।


পাপড়ি, ‘সাময়িকী পাতার’ জন্য আপনে কবিতা দিয়েন। কিন্তু একটা শর্ত, প্রথম কবিতাটা কিন্তু নিখুঁত-ছন্দে হতে হবে।


কবিতার ছন্দ নিয়েও সাজ্জাদ ভাই আমাকে ছোটখাটো একটা লেকচার দিয়ে ফেললেন। সরল রেখা ধরে চলে যাওয়া, ঢেউয়ের মতো গড়িয়ে যাওয়া আর জিগজ্যাগ গতিতে বয়ে চলা ছন্দের নানান ক্রিটিক্যাল বিষয়গুলি আমি অনার্স বা এমএ ক্লাসের টিচারদের কাছ থেকেও বেশকিছু শিখেছিলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের কাছ থেকে আমি সেসব ফের নতুন করে শুনলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের বলার ভঙ্গিমা অ্যাট্রাকটিভ হওয়াতে মনে হলো আমি যেন নতুন কিছুই শুনছি! নতুন কোনো ছন্দ আমার চারপাশে বেজে চলেছে!

আমাদের গুরু-শিষ্যার সেশন শেষ হলো। আমি চলে আসার প্রাক্কালে সাজ্জাদ ভাই বললেন—

পাপড়ি, ‘সাময়িকী পাতার’ জন্য আপনে কবিতা দিয়েন। কিন্তু একটা শর্ত, প্রথম কবিতাটা কিন্তু নিখুঁত-ছন্দে হতে হবে। পরে আপনি ছন্দ মানুন বা নাই মানুন। বা ছন্দ ভেঙেই ফেলুন, তাতে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু আমার পাতার জন্য প্রথম কবিতা কিন্তু নিখুঁত-ছন্দে হতে হবে।

বেশ একটা বাউন্ডারিতে ফেলে দিলেন আমায় তিনি! তার মানে আমাকে ছন্দে ভালো করে হাত পাকাতে হবে। ছন্দ ভালো করে জেনে-বুঝে নিয়ে কবিতা লিখতে হবে।

পরদিনই আমার পার্টনারকে যথেষ্ট অয়েলিং করে পাঠালাম আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলিতে। বললাম, ভাইরে আমার এই কয়টা বই খুবই জরুরি। লাগবেই, লাগবে। প্লিজ, একটু এনে দিবা?

(আমি আমার পার্টনারের কাছে কোনোদিন শাড়ি-গয়নার জন্য আবদার করি নি। বা কিছুই প্রায় চাই নি, নিইও নি। এমনকি টাকাপয়সাও না।  শুধু চেয়েছি আমার দরকারি বইগুলি যেন সে আমায় কিনে দেয়। দরকারি বইগুলি যেন সে আমায় এনে দেয় বা বইকেনার টাকাটা যেন অন্তত দেয়। আমি ফুলটাইম চাকরি করি নি বলে চিরকালের বেকার। আমি অবশ্য লেখালেখির বাইরে অন্যকিছু করতেও চাই নি)

পার্টনার বই এনে দিলে শুরু হলো আমার নিভৃত-পাঠ। কবিতা লেখা আর ছিঁড়ে ফেলা। ছিঁড়ে ফেলে আবার লেখা! আর ছন্দের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে নিশি ভোর করে দেয়া।

এই যে এত পাতার পর পাতা লিখে লিখে ছিঁড়ে ফেলে দেয়া, রাতের পর রাত জেগে ছন্দকে আয়ত্ত করার সাধনা করে যাওয়া—আমি ওসবে ক্লান্ত হই নি, ক্লান্ত হয়েছি কবিতা লিখে। লিখেই মনে হয়েছে—এইগুলা একদম ছাইপাঁশ! কিচ্ছু হয় নাই এইগুলা।

আমার কবিতা অন্য কারো না কারো কবিতার মতো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি সেটা চাই-না। আমি চাই আমার কবিতা আমার মতোই হোক। গদ্য লিখতে এসে যেমন চেয়েছি, আমার গদ্য আমার মতোই হোক। আমার গদ্যের প্যাটার্ন যেন অন্য কারোর মতো না-হয়।

অথচ এখন কত সহজেই যে কেউ কত কিছুই না লিখে ফেলে! অন্যের মতো, অন্যদের মতো লিখে করে কত বড়সড় লেখকই না তারা বনে যান। পাঠকেরা ভাবে, আহা! এমন লেখক আমাদের এই তল্লাটে আর একটিও নাই।

ইদানীং আরেকটা বিষয় লক্ষ করছি—অন্য কারোর থিম কপি করে বা বক্তব্য ভেঙে বা ডেটাগুলি নিয়ে নিজের মতো করে কিছু একটা লিখে ফেলা। এ প্রসঙ্গে বলি—মাস কয়েক আগে যখন আবু সাঈদ স্যারের ‘শাড়ি’ নামক গদ্যটি নিয়ে চারপাশে সমালোচনার ‘আম্ফান’ বয়ে যায়, তখন একটা ওয়েবজিন আমাকে অনুরোধ করে ‘শাড়ি’ বিষয়ে কিছু লিখতে। আমি বহু খেটেখুটে একটা লেখা তাদের দেই। লেখাটা যখন প্রকাশিত হয় তখন দেখি আমার লেখার সঙ্গে আরও তিন ভগ্নির লেখাও ছাপা হয়েছে। আরে! এত ভারি আনন্দের সংবাদ! কিন্তু আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি, ওই তিন বহিনের মাঝে দুইজন আমার দেয়া ডেটা ধরে লিখেছে। আমি সূত্র দিয়ে লিখেছিলাম ‘ঠাকুরবাড়ি থেকে  জ্ঞানদা নন্দিনীই প্রথম আধুনিক শাড়ি পরার কায়দা রপ্ত করেন।’ আমি দেখি উক্ত দুই ভগ্নি একই কথা উল্লেখ করেছেন! একজন শুধু এই সূত্র ধার করেই পাশ কাটিয়ে অন্যদিকে টার্ন নিয়েছেন। কিন্তু আরেক জন হুবহু আমার সমস্ত লেখাটাই ‘আপন ঢঙে’ টুকলিফাইং করে গিয়েছেন। এমনকি আমার দিদির আদুল গায়ে শাড়ির আঁচল লুটিয়ে থাকার গল্পটিও তিনি ‘নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে’ করে গিয়েছেন। আমি এসব দেখে নিজের লেখাটার সমস্ত কষ্টের কথা চিন্তা করে সম্পাদকের সঙ্গে সিরিয়াস বাহাসে লিপ্ত হয়েছি। তাঁকে প্রশ্ন করেছি, সবার মাথা তাহলে একই কেন্দ্রবিন্দুতে চিন্তা করে অগ্রসর হয়? সবাই একই সঙ্গে একই ডেটা ধরে এগোয়?


শুধু এটুকুই চেয়েছি সারা জীবন, আমার লেখাটি যেন আমার মতোই হয়। তা গল্প বা কবিতা বা উপন্যাস বা মুক্তগদ্য যা-ই আমি লিখি না কেন?


অতি সজ্জন-সম্পাদক লজ্জিত ভঙ্গিতে আমাকে একটা ঘটনা বলে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন—

কাজী নজরুল ইসলামের একটা গানের খাতা চুরি গেল একবার। দিন কয়েক বাদে দেখা গেল কে একজন ওই গানগুলিতে সুর লাগিয়ে গেয়ে বেড়াচ্ছে। নজরুলকে তা জানাতেই তিনি নাকি বলেছিলেন—

নিতে দে, সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা জল নিলে সমুদ্রের কিই-বা তাতে যায়-আসে?

আমি নিজেকে অত বড় কিছু বা সমুদ্র বলে দাবি করছি না। বা নিজেকে বড়মাপের লেখক হিসেবে জাহির করতেও চাইছি না। হয়তো ধান ভানতে এই শীবের গীতের দরকারই ছিল না। তবুও বললাম, চারপাশে আকছার এসবই তো ঘটছে, নাকি?

আমি বলতে চেয়েছি, শুধু এটুকুই চেয়েছি সারা জীবন, আমার লেখাটি যেন আমার মতোই হয়। তা গল্প বা কবিতা বা উপন্যাস বা মুক্তগদ্য যা-ই আমি লিখি না কেন?

ছন্দ আমার বশ মানছিল না বা আমি ছন্দকে বশ মানাতে পারছিলাম না বিধায় সাজ্জাদ ভাইকে কোনো কবিতাই আমি দিচ্ছিলাম না। কোনোদিন দেই নি। আমি অপেক্ষা করেছি আমার লেখাটি একান্তভাবেই আমার মতো হয়ে ওঠার জন্য।


পর্ব- ৭

(26)