হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৫

আমার একলা পথের সাথি : ৫

আমার একলা পথের সাথি : ৫
14
0

পর্ব-৪

পর্ব- ৫

I was ready to tell/ The story of my life/ But ripple of tears/ And agony of my heart/ Wouldn’t let it me/ I began to stutter/ Saying a word here and there/ And all along felt/ As tender as a crystal/ Ready to be shattered/ In this stormy sea/ We call life/ All the big ships/ Come apart/ Board by board/ How can I survive/ Riding a lonely/  Little boat/ With no oars/ And no arms/ My boat did finally break/ By the waves/ And I broke free/ As I tide myself/ To a single board/ Though the panic is gone/ I am now offended/ Why should be so helpless/ Rising with one wave/ And falling with the next.

[I was ready to tell, Jalaluddin Rumi]


আমরা যা-ই করতাম, প্রাণের টানেই করতাম। প্রাণের সাথে প্রাণ মেলাবার জন্য করতাম।


ভোরের কাগজ ‘পাঠক ফোরামের’ আড্ডাবাজি, হইচই মাস জুড়েই চলত। আমরা আনন্দ করে ঘুরতাম, খেতাম, মজা করতাম। মাঝেসাঝে লেখালেখি বিষয়ক ওয়ার্কশপও হতো। ‘লেখাজোকা’ নামে সেইসব ওয়ার্কশপে নবীন-প্রবীণ সকলের আসার এখতিয়ার ছিল। তখন এমন একটা সময় ছিল যে, সকলেই শিখতে চাইত। আমরা সকলেই শিখতাম, পড়তাম, জানতে চাইতাম। সবচাইতে বড় বিষয় ছিল, আমরা কোনো ধান্ধা নিয়ে কোনো কিছু করতাম না। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছুর জন্য এগুতাম না। আমরা যা-ই করতাম, প্রাণের টানেই করতাম। প্রাণের সাথে প্রাণ মেলাবার জন্য করতাম।

এর মাঝে গিয়াস’ ভোরের কাগজ’ ও ‘বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রের’ সাথে যৌথ উদ্যোগে ‘বই-আলোচনা’ শেখাবার জন্য, বই বিষয়ক নানান কর্মকাণ্ড করার জন্য ‘আলোর ইশকুল’ নামে একটা ইশকুল খুলল। ইশকুল খুলল মানে সেই অর্থে ‘ইশকুল খোলা’ নয়। সে-ইশকুল ছিল মাসে একটা নির্বাচিত বইয়ের নাম দিয়ে দেয়া, সেই বইয়ের আলোচনা লিখে যারা বিজয়ী হবে তাদের প্রথম তিনজনকে ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ থেকে পুরস্কার হিসেবে বই উপহার দেয়া। আর সে-বই মানে একটা কি দুইটা বই নয়,একেবারে মুটের মাথায় তুলে আনার মতো বই! যাকে বলে ‘ঝুড়ি ভরতি বই’!

আমার মনে আছে, প্রথমেই দেয়া হয়েছিল আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ বইটি। আর এসব এত বিস্তারিতভাবে মনে থাকার কারণ, আমিই প্রথম ‘আলোর ইশকুলের’ প্রথম বই ‘লালসালুর’ আলোচনা লিখে প্রথম হয়েছিলাম।

[নিজের জীবনের যে কোনো প্রথমই সকলের মনে থাকে, যেমন প্রথম প্রেম, প্রথম চুমু, প্রথম বিবাহ, প্রথম সিগারেট, প্রথম ব্রেক-আপ ইত্যাদি।]

সবকিছুই স্মুথ চলছিল, যেন কোনো নিস্তরঙ্গ নদী। বা পায়ে ঝুমঝুম নূপুর পরিহিত কোনো পাহাড়ি-ঝিরি! আপন বেগে বয়ে চলাই যার স্বভাব! নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলছে, কিন্তু তাতে কোনো ঝড়-বাতাস নাই! কোনো মেঘ-রোদের খেলা নাই। সবই তালেতালেই চলছিল, আমি কেন জানি কোনো কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার কিছুতেই স্বস্তি হচ্ছিল না। আমি যেন কিসের তালাশে রত ছিলাম?

দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি…!

এদিকে প্রতিদিনই লেখালেখির নতুন নতুন উইংস আমাদের কানের কাছে পাখসাট বাজিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ভোরের কাগজের লতিফ সিদ্দিকী নামক একজন সাংবাদিক ‘রোদ্দুর’ নামে অত্যন্ত ভালোমানের একটা ‘লিটল ম্যাগ’ সম্পাদনা করতেন। লতিফ ভাইয়ে ওই কাগজে আমি লিখেছিলাম। ‘রোদ্দুর’ বেশিদিন কন্টিনিউ হতে পারে নাই। কারণ অল্প কয়েদিনের ভেতর লতিফ ভাই ব্রেন-টিউমারে মৃত্যু বরণ করেন। আমি যেন এখনও তাঁকে দেখতে পাই। গৌর বর্ণের একহারা দেহের লাজুক মুখের মানুষটিকে! এ জগতের যত ভালোমানুষ, পরার্থপর-মানুষ তারা খামাখাই দুমদাম করে মরে যায়। তারা খামাখাই অন্যের কাছে মার খায়। আর খামাখাই অপমানিত হতে থাকে। আর দুষ্টেরা থাকে বহাল তবিয়তে! থাকে দুধে-ভাতে উৎপাত-বিহীন!


আরে আপনে এমন চেহারা আর ফিগার নিয়া কী-সব ফোরামটোরাম করেন! এইসব বেকার কাজকাম ছাড়েন।


সাংবাদিক ‘দন্ত স রওশন’ মানে সাইদুজ্জামান রওশন ভাই, তিনিও একটা ‘কবিতা মুঠোপত্র’ করতেন ‘আমলকী’ নামে। ভারি নয়নকাড়া ছিল ওই মুঠোপত্রটি। একেবারে হাতের মুঠিতে পুরে রেখে দেয়া যেত। আমলকী রঙের প্রচ্ছদের ভেতরে চারলাইনের কবিতা ছাপা হতো। কবিতা না বলে ‘ছড়া’ বলাই উত্তম বিবেচনা করি। ‘আমলকীর’ প্রতি সংখ্যাতেই লিখতাম আমি। তখন তো আমি মনে মনে ‘চন্দ্রাবতী’ হওয়ার বাসনা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কবিতার নামে ছাইপাঁশ লিখতে লিখতে ভাবি—একদিন নিশ্চয়ই আমি লিখে ফেলব ‘রামায়ণের’ মতো মহাকাব্য।

বলছিলাম, আমি যা-ই করছিলাম নিজেকে অপূর্ণ মনে হচ্ছিল। নিজেকে পানসে ও অপদার্থ মনে হচ্ছিল। আমি যা বা যেমন চাই, তেমনটি যেন হচ্ছিল না। ব্যাটে-বলে আমি যেন মেলাতেই পারছিলাম না!

…শুনিলাম আপন অন্তরে/ অসংখ্য পাখির সাথে/ দিনে রাতে/ এই বাসাছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে/ কোন পার হতে কোন পারে।/ ধ্বনিয়া উঠিছে শূন্য নিখিলের পাখার এ গানে—/ হেথা নয়, অন্য কোথা,  অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে!/

                                                                  [বলাকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

আমি যেন কোনো বাসাছাড়া-পাখি! আকাশময় কেবলই উড়ে বেড়াচ্ছি! উড়ে বেড়াচ্ছি! ঠাঁই খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি! নীড়ের সন্ধান আমার কিছুতেই মিলছে না!

কোনোকিছুতেই আমার মন না-লাগা দিনগুলোতে অন্যদের হাতছানি-ডানাছানি ছিল না তেমন নয়। আমার প্রতি খুব-করে ঝুঁকে-থাকা মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিল না। কিন্তু আমি ছিলাম ভীত খরগোশের মতো জড়োসড়ো। গৃহশান্তি বজায় রাখার জন্য বা নিজেকে সেফ জায়গায় রাখার জন্য আমি সর্বত্রই আমার পার্টনারকে সাথে নিয়ে যেতাম। এজন্য আমাকে প্রায় শত শত লিটার তেল খরচ করতে হতো। পার্টনারের কাছে মাছির মতো ভনভন করে বলতে হতো—

ভাই, আজকে কিন্তু অমুক জায়গায় যেতে হবে। ভাই, আমাকে কিন্তু যেতেই হবে বুঝলা?

পার্টনার গোঁফে তা দিয়ে আমার কথা না-শোনার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকত।

সর্বত্রই পার্টনারকে সাথে করে নিয়ে গেলেও ‘রক্ষাকবচ’ তেমন ভূমিকা পালন করতে পারত না।  ভোরের কাগজে গেলেই দুই-একজন বি.স. [বিভাগীয় সম্পাদক] আমাকে খোলাখুলিই বলতো—

আরে আপনে এমন চেহারা আর ফিগার নিয়া কী-সব ফোরামটোরাম করেন! এইসব বেকার কাজকাম ছাড়েন। কত কিছু করার আছে আপনের!

আমি এসব কথা শুনেও না বোঝার ভান করতাম। যেন তারা কী বলছে সেসবের কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বা তারা যেন আমার অচেনা কোনো ভাষায় কথা বলছে। তাদের কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবতাম, আমার যদি করার কিছু থেকেই থাকে, তা হলো ভালো লেখার চেষ্টা করা। অত্যন্ত ভালো কিছু লিখবার জন্য ধ্যানগ্রস্ত হওয়া। আমি তো আমার ‘ফিগার বা চেহারা’ বিকিকিনি করব না। আমার কাছে মানুষের এইসব ‘আউট-বিউটির’ নামমাত্র মূল্যও নাই। যেহেতু আমার কাছে ‘আউট-বিউটির’ কোনো মূল্য নাই, সেক্ষেত্রে আমি সেগুলা ‘ব্যবহারের’ কায়দাকানুন শিখে কী করব?


আমি ‘রাফ স্বভাবের’ মানুষদের একেবারে সহ্য করতে পারি না।


ভোরের কাগজে প্রায় অনেক লেখককেই আসতে দেখতাম। তখন অবশ্য আমি সকলকেই ভালো চিনতাম না। তরুণরাই বেশি আসত। এঁদের মাঝে আমি ব্রাত্য রাইসুকে ভালো চিনতাম তাঁর দাঁতের গঠনের জন্য। রাইসুর খুব সম্ভবত একটা বা দুইটা দাঁত অন্য দাঁতের উপর দিয়ে চলে গেছে। ব্রাত্য রাইসু আসত সাজ্জাদ ভাইয়ের কাছে। শীতকালে রাইসু গায়ে চাদর জড়িয়ে আসত। আমি দূর থেকে তাঁকে দেখতাম—সৌজন্য হাসি বিনিময় ছাড়া তেমন কথাবার্তা হতো না। রাইসুকেই শুধু গায়ে চাদর জড়িয়ে আসতে দেখতাম। আর কাউকে তেমন চাদর পরতে দেখি নি। রাইসু আম্মাদের-যুগের নারীদের মতো গায়ে ভালো করে চাদর জড়িয়ে আসত। তাঁর ওই চাদর পরার ভঙ্গিটি আমার কাছে অত্যন্ত মনোরম মনে হতো!

সাজ্জাদ ভাই [সাজ্জাদ শরিফ] ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত একজন মানুষ। পরবর্তীতে ফরিদ ভাইয়ের [কবি ফরিদ কবির] সঙ্গে যখন দেখা হয়, ফরিদ ভাইকেও আমার তেমনি মনে হয়েছে। এই দুই ভাইয়ের আচরণ এতটাই মিষ্টি আর আন্তরিক যে, তা বলার নয়। এরকম আচরণ সেইরকম পারিবারিক পরিবেশ ছাড়া রপ্ত করা প্রায় অসম্ভব । আমি ‘রাফ স্বভাবের’ মানুষদের একেবারে সহ্য করতে পারি না। এমনকি কেউ একটু জোরে কথা বললেই আমার মাথা ধরে যায়।

সবকিছু নিয়েই অস্থির আমি যখন অথই সমুদ্দুরে হাবুডুবু খাচ্ছি, তখন একদিন আমার পার্টনারকে বললাম—

ভাই, সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার একটু বসা দরকার।

শুনে পার্টনার আমার দিকে চোখ দুটো সরু করে তাকাল। তারপর বলল—

বসতে চাও, বসো।

পার্টনার আমার কথায় এত সহজেই সায় দিল! আমি নিশ্চিত জেনে গেলাম আমাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক লিটার তেল তাকে মালিশ দিতে হবে…!


পর্ব- ৬

(14)