হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৪

আমার একলা পথের সাথি : ৪

আমার একলা পথের সাথি : ৪
8
0

পর্ব- ৩

পর্ব- ৪

যা কিছুই করি না কেন, দিবানিশি আমি লেখার চিন্তাতেই বিভোর থাকতাম। যদিও এসবই অতিরঞ্জিত শোনাবে! তবুও বলছি, আমার অবস্থা এমন ছিল যে, কলম হাতের কাছে না পেলে আমি হয়তো বাঁশের কঞ্চি কেটেই লিখতে শুরু করতাম। কিংবা সন্ধ্যামালতি ফুলের নির্যাসকে কালি বানিয়ে লেখার আঞ্জাম করতাম। কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমিক জয়চন্দ্র যেভাবে কালিকলম কোনোকিছুই হাতের কাছে না-পেয়ে সন্ধ্যামালতি ফুলের রস দিয়ে লিখেছিল তার শেষ প্রণয়গাথা। বেগবান ফুলেশ্বরী নদীর পাশে নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে থাকা সেই বদ্ধ-মন্দিরের দরজায় চন্দ্রাবতীকে ‘আড়াই অক্ষরের চিঠি’ লিখে রেখে গিয়েছিল!

সাক্ষী হইও ইজল গাছ নদীর কূলে বাসা
তোমার কাছে কইয়া গেলাম মনের যত আশা 
আড়াই অক্ষরের চিঠি গাছের ভাষায় 
লিখে রাখি হাড় খুলে পুরোনো কপাটে 
সন্ধ্যামালতীর ফুলে শেষ কবিতায় 
মন্দিরের বোবা ভাষা রাত ঢেকে যায়

না, জয়চন্দ্রের মতো ফুলফল থেকে নির্যাস না নিলেও আমার লেখার সরঞ্জামাদি চুপি চুপি গুছিয়ে রাখতে হতো। এই সঙ্গোপনের প্রয়োজনও ছিল। এক দৈত্যপুরীর কেউ আমার অতি সংবেদনশীলতা বুঝতে পারবে, সেরকম কোনো সম্ভাবনা একেবারেই ছিল না। অবশ্য আমি তা আশাও করতাম না।


আমি বেশ ‘সাংবাদিক’ ‘সাংবাদিক’ ভাবসাব নিয়ে একটা ইন্টারভিউ করে ফেললাম। আমার আনন্দ আর দেখে কে?


আমি তক্কে তক্কেই থাকতাম, কোথায় কোন ভালো পত্রিকায় লেখা পাঠানো যায়? কী কী নতুন বিষয় নিয়ে লেখা যায়? ‘পাঠক ফোরামে’ নিয়মিত লিখছিলাম যদিও। ওইটুকু পাতাতে বড় কোনো লেখার স্কোপ কারোরই ছিল না। তখন ফোরামের মতো ‘মেলার’ পাতারও রমরমা অবস্থা। সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরীর মুখে হাসিটি লেগেই থাকত। তার কোঁকড়ানো বাবরি চুলে হাওয়া খেলে যেত আর গলায় ছিল মিষ্টি সুর। তখনও তিনি কোনো গানের অ্যালবাম বের করেন নি। সদ্য তরুণ, যুবকের দলকে দেখতাম সঞ্জীবদার পিছু পিছু ঘুরছে। সঞ্জীবদা আমাকেও বলতেন তার পাতায় লেখা দেবার জন্য। ‘মেলা’ ছিল পাঁচমিশালি একটা পাতা। তাতে নানান কিছুই ছাপা হতো। এর মাঝে একটা ফিচার ছিল বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে। আমার এই বিষয়ে আগ্রহ ছিল। আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু চিরকালই মানুষ। আমি মানুষকেই ভালোবেসেছি।

ভাবছিলাম কোন পেশার মানুষকে নিয়ে লিখলে লেখাটায় আলাদা ব্যঞ্জনা আসবে? আমাদের বাড়ির সামনের প্রশস্ত রাস্তায় নানান পেশার মানুষ হাঁকডাক করতে করতে নিত্য আসা-যাওয়া করে। ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়ালে দিব্যি তাদের নাগাল পাওয়া যায়। আমি একদিন এক ‘চাবিওয়ালাকে’ ডাক দিলাম। এই চাবিওয়ালারা ডুপ্লিকেট চাবি বানাতে পারে, কারো চাবি হারিয়ে গেলে বা ঘরের ভেতরে চাবি রেখে তালা লক করে ফেললে এই চাবিওয়ালাদের ছাড়া কিছুতেই নিস্তার নাই। তো আমি বেশ ‘সাংবাদিক’ ‘সাংবাদিক’ ভাবসাব নিয়ে একটা ইন্টারভিউ করে ফেললাম। আমার আনন্দ আর দেখে কে? এক চাবিওয়ালার ইন্টারভিউ নিয়ে আমি যেন বিরাট কিছু করে ফেলেছি। সঞ্জীবদার হাতে ‘ঝুনঝুন এক চাবিওয়ালা’ শিরোনামে লেখাটা তুলে দিলাম।

আজ সঞ্জীবদা প্রয়াত হয়েছেন এবং সত্যিকারেরই একজন গুণী মিউজিশিয়ান ছিলেন তিনি। আর তার অবর্তমানে হয়তো সেই পুরানো ঘটনা বলা সমীচীন হচ্ছে না। কিন্তু আমি যা বলছি তাতে মিথ্যার কণামাত্রও নাই। আর ওই ঘটনা আমাকে এতটাই হতচকিত করে দিয়েছিল যে, আজও আমি তা স্পষ্ট অনুভব করি।

সঞ্জীবদার হাতে লেখা তুলে দিয়ে আমি একেবারে নির্ভার। এত ‘মাইডিয়ার টাইপের’ এক ভদ্রলোক—তিনি নিশ্চয়ই দ্রুতও আমার লেখাটা ছেপে দিবেন। কিন্তু আমার লেখা কিছুতেই ছাপা না-হওয়াতে আমি বেশ অধৈর্য হয়ে উঠি। একদিন ভোরের কাগজে গেলে উনার সাথে দেখা হলে জানতে চাই—

সঞ্জীবদা আমার চাবিওয়ালার খবর কী?

উনি স্মিত হেসে বলেন—

এই লেখাটার সঙ্গে একটা ছবি গেলে ভালো হয়, আপনে একটা ছবি দিয়া যাইয়েন।

শুনে আমি একটু থমকাই। কারণ ওই ধরনের ফিচার তখন ছবি ছাড়াই র‍্যানডম ‘মেলার’ পাতায় ছাপা হয়। ছবি ছাড়া ছাপা হয় বলেই আমি গরজ করে ছবি তুলি নি।

আর ছবি তোলা কোনো সমস্যার কিছু নয়, আমার বাসায় ক্যামেরা আছে। আমারও ছবি তোলার শখ তীব্র, মানে ফটোগ্রাফার হিসেবে নয়, নিজের ছবি! নিজের ছবি দেখতে বা তুলতে সবারই আনন্দ হয়। কমবেশি নার্সিসিস্টিক সকলেই। আমি হয়তো একটু বেশি। তখন আমার আবার পার্টনার ইয়াসিকা চালায়। সেই আশির দশকের সামান্য কিছু আগে থেকেই সে একটা ইয়াসিকা প্রফেশনাল ক্যামেরার মালিক।


বজ্রাহতের মতো দেখলাম, আমার সেই লেখাটাই অন্যজনের নামে ছাপা হয়েছে!


কিন্তু আমি পড়ে গেলাম ফাঁপরে! ওই চাবিওয়ালাকে এখন আমি কোথায় খুঁজে পাব? প্রতিদিনের জনস্রোতে সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে কে জানে?

সঞ্জীবদা যদি আগেভাগেই বলে দিতেন—

পাপড়ি লেখার সঙ্গে কিন্তু ছবি দিতে হবে।

কিন্তু তিনি তেমন বলেন নাই! বললে আমি লেখা ও ছবি একসাথেই তাকে দিতাম।

আমি ছবি বিষয়ক জটিলতায় তব্দা খেয়ে বসে থাকি। ওই চাবিওয়ালাকে আমি খুঁজে পাব কই? পেলে না-হয় আমার পার্টনারের হাতেপায়ে ধরে একটা ছবি তুলিয়ে নিতাম। [পার্টনারকে আমার কোনো কাজ করে দিতে বললেই নানা গড়িমসি করত, যেন সে আমাকে উদ্ধার করে দিচ্ছে। আর এমন ভাব ও দুর্ব্যবহার করত যে আমার চোখে জল চলে আসত। তবুও তাকে আমার কিছু কাজ করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করতেই হতো। ছবি তুলে দেয়ার জন্য তো অবশ্যই। কারণ আমি লেন্স এডজাস্টেবল ক্যামেরা চালাতে জানি না। তখনও ডিজিটাল যুগ আসে নাই। ছবি তোলা এখনকার মতো এত ডালভাত হয়ে যায় নাই!]

সেসব দিনে আমি সকালে ঘুম থেকে জেগেই পত্রিকা খুলে বসতাম। দেশ-বিদেশের যাবতীয় খবর জানার পরে আমার দিন শুরু হতো।

যথারীতি সেদিনও উৎসুক হয়ে পেপার পড়ছি । ‘মেলার’ পাতাটা খুলতেই আমি একেবারে হকচকিয়ে গেলাম!  ‘ঝুনঝুন এক চাবিওয়ালা’ শিরোনামে ফিচার ছাপা হয়েছে। আমি হন্যে হয়ে খুঁজছি নিজের নাম, উঁহু, সারা পাতার কোথায় আমার নাম ছাপা নাই! বজ্রাহতের মতো দেখলাম, আমার সেই লেখাটাই অন্যজনের নামে ছাপা হয়েছে! [কার নামে ছাপা হয়েছিল, এখন তা আর মনে নাই] লেখার শিরোনাম থেকে প্রতিটা বাক্য আমার লেখা! শুধু বাড়তি সংযোজন বলতে একটা ছবি। চাবির গোছা ধরে এক অচেনা চাবিওয়ালা দন্ত বিকশিত করে দাঁড়িয়ে আছে!

আমি অত্যন্ত মর্মাহত হলাম ‘মেলার’ সম্পাদক সঞ্জীবদার এই কারসাজিতে। আজ ভাবি, আমি যদি পুরুষ হতাম তিনি ওই কাজটি করার আগে ভাবতেন, নিশ্চয়ই ভাবতেন। তাকে ভাবতেই হতো। পুরুষের সবল পেশির কথা তাকে ভাবতেই হতো!

গিয়াস আহমেদের সকাল শুরু হয় দুপুর বারোটা থেকে, জেনেও আমি গিয়াসকে ফোন করলাম। ফোনে বিস্তারিত বললাম। গিয়াস শুনে চুপ করে রইল। নিজের কলিগকে নিয়ে নেগেটিভ কথা বলার মানুষ গিয়াস নয়। আস্তে করে আমাকে বলল—

তুমি সঞ্জীবদাকে জিজ্ঞেস করো না, পাপড়ি।

পত্রিকা অফিসগুলির সকাল শুরু হয় দুপুর বারোটা থেকে। আমার সময় যেন আর যাচ্ছিল না। তখন তো মুঠোফোনও অ্যাভেইলেবল নয়। আমি দুপুর একটার দিকে ভোরের কাগজে ফোন করলাম। সঞ্জীবদাকে বললাম—

সঞ্জীবদা আমার লেখাটা অন্যের নামে ছেপে দিলেন?


‘ক্রেডিট হাইজ্যাকের’ এই দুনিয়ায় আমি বড়ই বেমানান। বড়ই অসহায় নাদান এক!


সঞ্জীবদা আমতা আমতা করে বললেন—

আপনেরে তো ছবি দিতে কইছিলাম। ছবি দেন নাই। আর ছবি ছাড়া এই ফিচার কেমনে ছাপি?

শুনে আমি চুপ করে রইলাম। হায় ছবি! এক ঝুনঝুনঝুন চাবিওয়ালার ছবি! প্রফেশনাল ক্যামেরা চালাতে না-পারার অক্ষমতায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম।

মনে হলো, আমি আদতে এই পৃথিবীতে কোনো কাজেরই উপযুক্ত নই। কোনো কাজই আমার দ্বারা হয়তো হবে না! একটা ছবির জন্য আমার আইডিয়া, আমার লেখা অন্যের নামে ছাপা হয়ে যায়?

ওইদিনের পর থেকে আমি আর কোনোদিন ‘মেলার’ পাতায় লেখা দেই নি। লেখার চেষ্টাও করি নি। আজ ভাবি, কোনোরকম কষ্ট না-করেই যার নামে লেখাটা ছাপা হয়েছিল, তার আনন্দ কতটুকু ছিল? অবশ্য এই টুকলিফাইংয়ের সমাজে আমার মতো ভোঁদাই কতজন আছে সেটাও ভেবে দেখার বিষয়! ‘ক্রেডিট হাইজ্যাকের’ এই দুনিয়ায় আমি বড়ই বেমানান। বড়ই অসহায় নাদান এক!

Did you want to see me broken?
Bowed head and lowered eyes?
Shoulders falling down like teardrops,
Weakened by soulful cries?… But still, like air, I’ll rise.

[Still I rise, Maya Angelou]

পর্ব- ৪

(8)