হোম গদ্য আমার একলা পথের সাথি : ৩

আমার একলা পথের সাথি : ৩

আমার একলা পথের সাথি : ৩
380
0
২য় পর্ব

পর্ব- ৩

ভোরের কাগজ ‘পাঠক ফোরাম’, পরবর্তীতে প্রথম আলোর ‘বন্ধুসভার’ যত অনুষ্ঠান বা যা কিছু হতো, সবই আমাদের নিজেদের টাকাপয়সায় হতো। একেবারে যে বেকার ছেলেটি, সেও কিছু না কিছু চাঁদা দিতে চাইত। সেসব অনুষ্ঠানের জন্য পত্রিকাওয়ালারা এক টাকাও স্পন্সর করত না। আজ অবাক হয়ে ভাবি, এতগুলি মানুষ একটা পত্রিকার জন্য, পত্রিকার প্রচার ও প্রসারের জন্য খামাখাই এতকিছু করে গিয়েছে! বিনিময়ে তারা কিছুই পায় নাই। এমনকি তারা কিছু চায়ও নাই। তারা চাক বা না-চাক পত্রিকাওয়ালারাদের উচিত ছিল এইসব নিবেদিত-প্রাণ মানুষগুলিকে কিছু না কিছু দিয়ে সম্মানিত করা। বা তাদের জন্য সামান্য কিছু করা। সেটা তো তারা করেই নাই, উল্টা একধরনের তাচ্ছিল্য ছিল ফোরামের লোকজনের প্রতি। যেন তারা জাতিতে নমঃশূদ্র, কিংবা বাপে-খেদানো, মায়ে তাড়ানো অভুক্ত লোকজন। পত্রিকাওয়ালাদের ব্রাহ্মণ সমাজের সামনে তাদের হাঁটু গেড়ে বসে থাকাই সমীচীন।


আমি ধীরে ধীরে ওইসব অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমাকে যেখানে সম্মান দেয়া হবে না, আমি সেখানে কোনো অবস্থাতেই যাব না।


‘পাঠক ফোরামের’ লোকজনদের যে আদতে নমঃশূদ্র হিসেবে দেখা হয়, সেটা টের পাওয়া যেত যখন পাঁচ তারকা হোটেলগুলিতে হাউসের অনুষ্ঠানাদি হতো। সেখানে যেতে পারলে কেউ কেউ বর্তে যেত। আর হাউসের কর্মীরা (কেউ কেউ) এমন ভাব করত, যেন এদের জাতে তুলে দেয়া হলো। সেসব অনুষ্ঠানে রথী-মহারথীদের পানাহার হয়ে যাওয়ার পর ফোরামবাহিনীর ডাক পড়ত। যেন তারা উচ্ছিষ্ট খেতে পাঁচ তারকায় হাজির হয়েছে। একবার স্যুভেনির হিসেবে প্রথম আলোর লোগো আঁকা মগ না কী ছাইছাতু দেয়া হলো। সম্পাদক মতিউর রহমানকে দেখলাম নিজে দাঁড়িয়ে ব্যারিকেড দিচ্ছে, যাতে ফোরামের কেউ সেখানে আগেভাগে যেতে না পারে। আমি আমার পার্টনারকে (হাফিজ) বললাম, চল এখান থকে চলে যাই। আমার পার্টনার চুপচাপ মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইল। পরে আমি ধীরে ধীরে ওইসব অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমাকে যেখানে সম্মান দেয়া হবে না, আমি সেখানে কোনো অবস্থাতেই যাব না।

বাপে খেদানো, মায়ে তাড়ানোরা যাক, যার খুশি যাক আমার তাতে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি দেখার মতো বা সহ্য করার মতো শীতল রক্ত আমার নয়।

ফোরামে যারা ছিল বা  লিখত তারা মোটামুটি সবাই অশিক্ষিত ও হাভাতে ঘরের লোকজন এমনই ভাবনা হয়তো ছিল পত্রিকাওয়ালাদের। আদতে তা নয়। যারা পাঠক ফোরামের সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা কমবেশি মেধাবী ছিল। কেউ কেউ যথেষ্ট অবস্থাপন্ন ঘরের ছিল। গিয়াস আহমদের কর্ডিয়াল বিহেভিয়ারের জন্য অনেকেই ফোরামের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকত। পরবর্তীতেও দেখেছি ‘ফোরাম লেখক নমঃশূদ্র পাপড়ি রহমান’ এমন লেখক হইল! কেমনে কী?!

এবং ‘প্রথম আলো’ এখনও আমাকে দুই চক্ষে দেখতে পারে না। আমার কোনো বই প্রকাশের সংবাদ তাদের পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় না। বা তাদের কোনো অনুষ্ঠানাদিতে আমাকে ভুলেও নেমন্তন্ন করে না। আর তাদের ‘বর্ষসেরা পুরস্কার প্রহসনে’ আমাকে ব্ল্যাক লিস্টেড করে একেবারে ‘সিলগালা’ মেরে রাখা হয়েছে। ২০০৮ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে যখন আমার বয়ন উপন্যাসটি বের হয় , ওই একবারই আমি প্রথম ও শেষবার পুরস্কার প্রতিযোগিতার জন্য বই জমা দিয়েছিলাম। মাওলা ব্রাদার্সের ঔনার আহমেদ মাহমুদুল হক অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন বয়ন বর্ষসেরা হতে যাচ্ছে। কিন্তু যখন হলো না, তিনি বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন—

কী চায় ওরা? কী চায়? আপনার বইকে পুরস্কার দিল না কেন? এই বইমেলায় বয়নের চাইতে আর কোনো বই ভালো ছিল?

আমি হেসে বলেছিলাম—

কেন যে দিল না তা তো আমি জানি না মাহমুদ ভাই। সেসব আপনারাই ভালো জানেন। আমি তো পুরস্কার পাওয়ার কোনো তরিকা জানি না।

২০১৯-এর বইমেলায় যখন বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে আমার উপন্যাস নদীধারা আবাসিক এলাকা বেরুল তখনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো।

বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের কর্মী লাজুক ছেলেটি বলল—

আপা, আপনার বই কিন্তু প্রথম আলোয় জমা দিয়েছিলাম, ওরা আপনাকে পুরস্কার দিল না।

আমি বললাম—

খামাখাই দিতে গেছ কেন? বইগুলা নষ্ট হলো।

ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল—

স্যার বলছেন আপনার বইটা সব পুরস্কারের জন্য জমা দিতে।


এই পৃথিবী গোল বিধায় ‘প্রথম আলোর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের’ সাথে আমাকে প্রায়ই হোঁচট খেতেই হয়।


এসব বলছি মানে এই নয় যে ‘বর্ষসেরা’ আমি পেতে চাই। একসময় চাইতাম, যখন আমার টাকা-পয়সার যথেষ্ট দরকার ছিল। পুরস্কারের টাকাগুলি পেলে আমার বাচ্চাদের হয়তো আরও খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্য দেয়া যেত। আর আমি পুরস্কার পেতে চাই নিছক টাকা-পয়সার জন্যই। টাকাগুলি পেলে বিশ্ব ভ্রমণে বের হতে পারব বলে। আমি আমার সমস্ত অপূর্ণ শখ নিজের টাকাতেই পূর্ণ করতে চাই।  কে না জানে টাকা হইল চৌদ্দ পুরুষের বাবা!

আর আমি চাই না আমি যখন থুত্থুড়ে বুড়ি হয়ে যাব, তখন আমার জীবন্ত-কঙ্কাল কেউ টেনেহেচড়ে মঞ্চে উঠিয়ে তাকে পুরস্কৃত করুক। যাঁরা পুরস্কার দেন, তাঁদের বলছি—দয়া করে জীবন্ত-কঙ্কালদের পুরস্কৃত করে তাঁদের অসম্মান করবেন না। আমার চোখ জলে ভরে যায়, যখন দেখি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ কোনো সাধককে তাঁর কর্মের স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে! পুরস্কার মঞ্চে লোকজন তাঁকে ধরে ধরে উঠাচ্ছে! তাঁর হাঁটু ভেঙে আসছে হাঁটতে গিয়ে আর অশ্রুসজল চোখে তিনি কম্পিত হাতে পুরস্কার গ্রহণ করছেন!

এই পৃথিবী গোল বিধায় ‘প্রথম আলোর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের’ সাথে আমাকে প্রায়ই হোঁচট খেতেই হয়। তাদের হাউসের বাইরে ‘লিটফেস্টে’ বা ‘বাংলা একাডেমির’ কোনো  বড়সড় অনুষ্ঠানে তাদের কারো কারো সাথে আচানক দেখা হয়ে গেলে তারা দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দেয়। যেন আমাকে তারা কস্মিনকালেও দেখে নাই। চেনার তো প্রশ্নই আসে না। আমি বিনয়ের অবতার বলে আগে যেচে তাদের দেখে সালাম-আদাব দিতাম, এখন আমিও হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ সাহিত্যজগৎ কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এখানে যোগ্যতার বলেই টিকে থাকতে হয়। যদিও দলবাজি বা স্তুতিবাজি বা বন্ধুবাজি করে কিছু লেখককে উপরে টেনে তোলা হয়, (এই কাজটা প্রথম আলোই বেশি করেছে বা করে, করে একেবারে নির্লজ্জভাবে) কিন্তু কালের আকাশে তারা নক্ষত্র হয়ে জ্বলবে কিনা সে-প্রশ্নের উত্তর তাদের টেক্সট থেকেই পাওয়া যায়। মানে তাদের লেখাপত্র দেখে।

‘প্রথম আলোর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের’ অবস্থা এখন এমন যে, আমাকে গিলতেও পারে না, আবার উগরাতেও পারে না। এই সময়ে যাদের লেখক হিসেবে বেশ পরিচিতি আছে বা কেউ কেউ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়ে গেছেন—তাদের কেউ কেউ আমাকে দেখলেই উল্টা পথে হাঁটা দেয়। তাদের এই অবস্থা দেখে আমি হাসতে হাসতে মরে যাই। আহা! নমঃশূদ্রকে একই পথে হেঁটে যেতে দেখলে জাত-ব্রাহ্মণের গোস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক!

আমার শুধু এই ভেবে খারাপ লাগে, একটা পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়ানোর জন্য যেসব মানুষ নিজেদের পকেটের টাকাপয়সা দিয়ে বছরের পর বছর অনুষ্ঠান করে গেছে, অকাতরে নিজেদের শ্রম-ঘাম দিয়েছে, যে পত্রিকাকে নিজের পরিবার মনে করেছে—তাদের প্রতিদান কিভাবে দিল প্রথম আলো? বা কী দিয়ে দিল? কিছু সহজ-সরল-আন্তরিক মানুষকে ওই পত্রিকা শুধু ব্যবহার করেই গেল! বিনিময়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা? আর ওই বোকার দল ‘প্রথম আলো’ জন্মের প্রাক্কালে সারাদেশে নিজেদের সিগনেচার দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল, যাতে এটা বহু মানুষের কাগজ হয়ে দাঁড়ায়!

হায়! সেলুকাস! বড়ই বোকা এই দেশের জনগণ! কর্পোরেট পলিটিক্সের কাছে ধরা খাওয়া ‘পাঠক ফোরাম’, ‘বন্ধুসভার’ কোমলমতি ভোঁদড়ের দল!

গিয়াস আহমেদ নানান কায়দায়, নানান ঢঙে তার সম্পাদিত পাতাটি খুব যত্ন ও ভালোবাসা নিয়ে সাজাত। নতুন নতুন আইডিয়া ওই ‘কৃষ্ণভাবের’ মাথা থেকে হরহামেশাই বেরুত। আর ওইটুকু একটা পাতার হাজার হাজার ফ্যান—কিন্তু গিয়াস ঠিকই সামলে নিত। সে ‘আতকা সংখ্যা’ নামে একটা সংখ্যা করত। যা আমার কাছে খুবই রিচ মনে হতো। ‘আতকা সংখ্যার’ লেখাগুলি ছিল বিষয়ভিত্তিক। গিয়াস একই বিষয়ের লেখাগুলি জড়ো করে করে আমাদের অবাক করে দিয়ে এই সংখ্যা প্রকাশ করত। অদ্ভুত এক সম্পাদক ছিল সে! প্রায় কোনো লেখাই সে অছাপা রাখতে চাইত না। মানুষের প্রতি অত্যন্ত দরদ ও ভালোবাসা না-থাকলে এমনটি করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

‘পাঠক ফোরাম’ পাতায় গল্পসংখ্যাও হতো। একবার ওই সংখ্যায় আমার একটা গল্প ছাপা হলো। নামটা এখন আর মনে নাই। কারণ আমি তখন ‘কবি’ হবার দুঃস্বপ্ন দেখতাম। ‘কবিতার’ প্রতি বড় বেশি নতজানু ছিলাম। ফলে গল্পের নাম মনে রাখতে ভুলে গিয়েছি। গল্প ছাপার পরে দুই/চারজন আমাকে ফোন করে অভিনন্দিত করল। যারা করল তারা ছিল ফোরাম সদস্য।

কিন্তু একদিন আমার বাসার কফি কালারের টি অ্যান্ড টি ফোনটা টিংটিং করে বেজে উঠলে যিনি কথা বললেন তাঁকে আমি একদম চিনি না। নামও শুনি নি কোনোদিন।

যিনি ফোন করেছেন তিনি  ‘মনীশ রায়’।

খানিকটা সংকোচ নিয়ে বললেন—

পাপড়ি আমি মনীশ, মনীশ রায়।

ফোরামের পাতায় আপনার একটা অসাধারণ গল্প পড়লাম। আপনাকে অভিনন্দন জানাই।


আজ বহু বছর বাদে আমি তাঁর কথা লিখছি। তাঁর কথা আমি স্মরণ রেখেছি!


ফোনের রিসিভার ধরে আছি কানে, কিন্তু আমি দেখছি আমার হাতে ধরা রিসিভার তিরতির করে কাঁপছে ।

খানিক বাদে উনি বললেন—

আপনি হয়তো আমাকে চিনতে পারেননি, আমিও গল্প লিখি।

এই প্রথম কোনো গল্পলেখক আমাকে অভিনন্দিত করলেন!

যদিও ওটাই আমার লেখা প্রথম গল্প ছিল না। ইশকুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির বার্ষিকীগুলিতে এর আগেও আমি বহু গল্প লিখেছি।

কিন্তু একদম অচেনা একজন লেখক আমাকে ফোন করেছেন! আজ বহু বছর বাদে আমি তাঁর কথা লিখছি। তাঁর কথা আমি স্মরণ রেখেছি! পরবর্তীতে আমি খুঁজে খুঁজে মনীশদার গল্প পড়তাম। তিনিও অত্যন্ত ভালো গল্পকার ছিলেন। কিন্তু লিখতেন কম। প্রকাশ করতেন আরও কম!

অনেক পরে মনীশদার সাথে আমার দেখা হয়েছিল, খুব সম্ভবত ভোরের কাগজেই। ভীষণ গৌরবর্ণ, ছোটখাট মানুষটি সহাস্যে এগিয়ে এসে বলেছিলেন—

পাপড়ি, আমি মনীশ।

বলতেই আমি চিনেছিলাম। ‘রায়’ আর বলতে হয় নাই। কারণ আমিও ততদিনে তাঁর লেখাপত্রের সঙ্গে ভালো করেই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম।


পর্ব-৪

(380)