হোম গদ্য আগামী দিনের কবিতা

আগামী দিনের কবিতা

আগামী দিনের কবিতা
886
0

শুন শুন সুন্দরি হিত উপদেশ।
হাম শিখাওব বচন বিশেষ ॥

—এই বলে বাঙালি বিদ্যাপতি রাধাকে কামকলা শেখাতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। বেশ কিছু উপদেশ দেবার পর শেষে এসে বলছেন :

ভনহি বিদ্যাপতি কি বোলব হাম।
আপহি গুরু হই শিখায়ব কাম ॥

মানে, আমি আর কী বলব, কামই স্বয়ং গুরু হয়ে তোমাকে শিক্ষা দেবে। লক্ষণীয়, এখানে বাৎসায়নের বিরুদ্ধে একটা হুংকার আছে। প্রত্যাখ্যান আছে শাস্ত্রের বিরুদ্ধে। কবিতা সম্পর্কে প্রায় একই কথা বলা যায়। কবিতা কোনো ক্যানোনিকাল ব্যাপার নয়। যে-কেউ যে-কোনোভাবে কবিতা লিখবেন এবং ভবিষ্যৎ কবিতার পথ হয়তোবা তারই প্রভাবলয়ে এসে নির্ধারিত বা রচিত হবে। প্রভাব তৈরি করতে পারাটাই হলো আশল কর্তব্য। সেদিক বিবেচনায় সমকালীন কবিতার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। অর্থাৎ, পাঠক রুচিগতভাবে কোথায় অবস্থান করছেন, কবিতার উৎসারণ কোন দিকে—এইসব মৌন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়ানো।

সম্প্রতি ‘লোক’-সম্পাদকের মারফত হাতে এল পঞ্চাশ জন তরুণের কবিতা-ভাবনাসহ কিছু কবিতা বা কবিতাগুচ্ছ। এসব পড়ে, সাম্প্রতিক নয় শুধু, আগামী দিনের কবিতা নিয়ে আবছা একটা ধারণা তৈরি হয় মনের মধ্যে। তাকে ঠিক অবধারণ বলা যায় না। বলা যেতে পারে অবভাস।

আগামী দিনের কবিতা বলছি এই কারণে যে, এই তরুণেরাই সামনের দিনগুলিতে নতুন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও প্রত্যয়দীপ্ত হাতে নিজ ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা দেবেন। নিশ্চিতভাবে বদলেও যাবেন অনেকখানি। তবু ভবিষ্যতের জিন-মানচিত্র এইসব রচনার প্রেক্ষিতে আঁকবার চেষ্টা অমূলক নয়।

আগামী দিনের কবিতা সম্পর্কে কিছু বলবার আগে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছাবার একটা ধারাবাহিক বিন্যাস উপস্থাপন করা দরকার। মানে, ধান ভানতে একটু শিবের গীত গাইতেই হচ্ছে।


বাংলাদেশে বাংলা কবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল ঘটে গেছে আশির দশকে। সে বদল ঘটে চলেছে এবং তা এমন অব্যবহিত যে তাকে দশকের বিভাজনে শনাক্ত করা মুশকিল। একই দশকের মধ্যে বিকল্প-অনুকল্প কয়েকটি ধারা তৈরি হয়। আমাদের বিবেচ্য কোন ধারাটি নতুনের ইশারা নিয়ে হাজির।

যেমন আশির দশকের অনেক কবিকে আমরা পাব, যারা সত্তরের শববাহী, ছদ্মবেশী আঞ্জুমানে মফিদুল। আবার যাদের কবিতা দিয়ে আমরা দিঙ্‌নির্ণয় করতে চাই, তার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নব্বইয়ে। ঠিক একইভাবে নব্বই এসে ধরা দিল শূন্যে।

এভাবেই চলছে। সে প্রসঙ্গ থাক। আগে ফয়সালা করে নেয়া যাক আশির দশকে কবিতার বাঁকবদলটা আশলে কেমন। বুলেট আকারে কথাগুলো সাজিয়ে নিলে দেখতে পাই :

১. প্রগল্‌ভতার বিরুদ্ধে বাকসংহতি
২. একরৈখিকতার পাল্টা বহুরৈখিকতা
৩. স্লোগানভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে মনন-নির্ভরতা
৪. অশ্রু-উদ্‌গত আবেগের পরিপন্থি ব্যাসকূট ও কটাক্ষ

এছাড়া উৎপলের উৎকেন্দ্রিকতা, বিনয়ের বীক্ষণ ও প্রবচনমুখীনতা, জয়ের শব্দ-জেল্লা ও জয়োল্লাস, মৃদুলের ম্রিয়মাণ সন্ধ্যাভাষা—এসব অভিজ্ঞতা রাহমান-মাহমুদ-কাদরীর কাব্যভুবনকে অনেকখানি আচ্ছন্ন করেই জেগে উঠেছিল। এবং তৈরি করেছিল নতুন একটি সংকট। আশির প্রথা-বিরোধী কবিদের কাব্যপ্রচেষ্টায় বাংলাদেশের কবিতা হয়ে পড়ল অনেকখানি পশ্চিমবঙ্গের অনুগামী। এমনকি, এ ধারার বাইরে যারা ছিলেন, যারা চেয়েছিলেন আটপৌরে, ক্যাজুয়াল, র-নার্ভ আশ্রয়ী কবিতা লিখতে, প্যারাডক্সিকাল মনে হতে পারে, তবু, তারা অনেকখানি হাংরি-প্রভাবিত।

এর পাশাপাশি পশ্চিমের নানা শিল্প-অভিজ্ঞতা, বিশেষত পোস্টমডার্ন তত্ত্বের হুল্লোড় দেখা দেয় মধ্য আশির পর থেকে। শুরু হয় কেন্দ্রের শাসনকে অস্বীকার করার প্রাণান্ত-চেষ্টা। রাজনীতির ক্ষেত্রে এর কোনো প্রণোদনাই জাগে নি বটে, কিন্তু সাহিত্যে একটা প্রভাব পড়ে বেশ জাঁকালো হয়েই। বিশেষত কবিতায়। যাকে বলে সেন্ট্রাল থিম ভেঙে ফেলার অভিযান। কেন্দ্রের শাসনকে ভাঙার লড়াই চলছে আজও। এই ভাঙন দেখা দিয়েছে আঙ্গিক ও বিষয় উভয়ক্ষেত্রে।

সব দিক থেকেই ননলিনিয়ার হয়ে উঠতে চাইছে আজকের কবিতা। কবিতায় লিনিয়ারিটির ফাঁদ এড়াতে গিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের কবিরা প্রায়শই আশ্রয় নিয়েছেন ইমেজে। সে অর্থে ইমেজিস্ট কবিতার একটা নব-রূপায়ণ ঘটেছে। ইমেজগুলি সব ঐক্য-ভাবের সুতোয় গাঁথা নয়। কোলাজ ও কম্পোজিশন। একই সঙ্গে কোরাস এবং ক্যাওস।

একে ঠিক ফ্রাগমেন্টেশান বলা যাবে না। একটি বিশেষ ভাবও ফ্রাগমেন্টেড হয়ে আসতে পারে। চূর্ণিত, খণ্ডিত হয়ে ধরা দিতে পারে, আবার অখণ্ডরূপেও তাকে পাওয়া সম্ভব। বরং ‘পলায়নী চিত্রভাষ্য’ রচনার একটা কৃৎকৌশল বলে মনে হয়। অর্থাৎ একটি ভাবের প্রতিষ্ঠা হতে না হতে তার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া। ফলে এমনকি বৈপরীত্যের সূচনা করা কবিতার মধ্যে বা প্রান্তে এসে।

‘প্রতিষ্ঠা হতে না দেয়া’ এবং ‘কিছুই প্রতিষ্ঠা না করা’র প্রবণতাকেই আমি ‘পলায়নী চিত্রভাষ্য’ বলতে চাইছি। কথাটা হয়তো নঞর্থক শোনালো। কিন্তু তোতলামিপূর্ণ ভাষাতেও যদি একে ব্যাখ্যা করতে চাই তবে একটা সদর্থকতা খুঁজে বার করা অসম্ভব হবে না। বাইরের যে জগৎ—সদাচঞ্চল, অস্থির, অপস্রিয়মাণ, নশ্বরতাই যার ঈশ্বর—বস্তুর অস্তিত্ব পার হয়ে যদি তাকে ধরতে চাই, অর্থাৎ আকারের ভেতর দিয়ে নিরাকারে পৌঁছতে যদি চাই, তাহলে নিঃসন্দেহে চক্ষুষ্মানকে এক অদ্ভুত অব্যাখ্যেয় প্যানোরামার সামনে পড়তে হবে। এভাবে হয়তো বিশেষ একটা রূপের উন্মোচন ঘটে। স্বভাবতই সে রূপ স্থির নয়, তার অঙ্গ নাই, সে অনঙ্গ। ক্ষণে ক্ষণে রূপের বিভ্রম জাগায়। তাকে সম্বোধন করি যা বলে, হয়তো সে তা নয়। প্রপঞ্চমাত্র। এবং ক্ষণিকের জন্য হলেও তা চেতনা-সঞ্চার করে।

বৈশ্বিক পটভূমিতে এর একটা রাজনৈতিক দিক তো আছেই। ইতিহাসের অনেক আবর্তন-বিবর্তনের পর এই একুশ শতকে ধর্ম, দর্শন বা সমাজনীতির একটা ভঙ্গুর পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়েছি পুরনো শতাব্দীর কাতরতাসহ। কোনো কিছুরই ইউনিফায়েড অস্তিত্ব নাই আর। আমাদের চিন্তাপথের ধারে চারুবৃক্ষের ভগ্নডাল যেমন পড়ে আছে, হা করে আছে খানাখন্দও। কাউকে অনুসরণ করে কোথাও পৌঁছুতে আজ আর মন সরে না। এক বিষণ্ন উন্মার্গগামিতা, এক মধুর অর্থহীনতার সুর-যাপন ছাড়া কোনো বাক্যালাপ, কোনো প্রবচন নেই কারো জন্য। একটি ভাবনাকে উৎখাত করে দিচ্ছে আরেকটি ভাবনা এসে। কেউ যেন স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে, নৈরাজ্যের যে শৃঙ্খলা, তাকে আবিষ্কারের মন, আধুনিক যুক্তিসিদ্ধ মনের সঙ্গে একটা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গোপনে গোপনে।


এই কবিতাগুলিকে বাংলাদেশের কবিতা বলে চেনা যাচ্ছে খুব সহজেই।



ছাত্রবয়সে আমরা একটা সংগঠন করেছিলাম। নাম : পুনর্বাঁক। পুনর্বাক নয় কিন্তু। শাস্ত্রসিদ্ধ শব্দও নয়। তবু এর দ্বারা আমরা বোঝাতে চেয়েছিলাম ‘আবার বদলে যাওয়া’।

অতি-তরুণ ছেলেমেয়েদের কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে সেই রকম একটা পুনর্বাঁক ঘটছে। কিছুকাল আগে পর্যন্ত আমরা কবিতার ক্ষেত্রে অনর্থময়তার জয়গান গাইতাম। অনির্দেশ্যতাকেই আরাধ্য মানতাম। তাতে কোনো সারবস্তু থাক বা না থাক। ভাষাকে কোনো উপলব্ধির বাহন তো দূরের কথা, মাধ্যম হিসেবেও কবুল না করার প্রথা বেশ চালু ছিল।

এর ফলে, স্বীকার করতে দোষ নেই, কবিতার নামে বোধশূন্য শব্দক্রীড়ার চর্চা গত দুদশকে দারুণ পল্লবিত হয়ে উঠেছে। এতদিনে দেখতে পাচ্ছি, সেই পল্লবরাশি ঝরে পড়ছে—‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারই দলে’—এই গান গাইতে গাইতে।

নতুন যারা কবিতা লিখতে এসেছেন, তারা অনেক কিছু বলতে চান। বেশ স্পষ্টভাবেই। চমকে উঠতে হয় তাদের অনাড়ষ্ট প্রকাশভঙ্গি দেখে, তাদের উপলব্ধির ম্যাচিউরিটি আই মিন পরিপক্বতা দেখে। মানুষ সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে কিছু মৌলিক জিজ্ঞাসা নিয়ে বোঝাপড়া চলছে। কবিতায় উঠে আসছে খোলাখুলি কিছু উচ্চারণ, উদ্ধৃতিযোগ্য পঙ্‌ক্তি :

‘মানুষ যতটা বিধাতার তার চেয়ে বেশি সে দ্বিধার’ [অরিত্র আরিফ]। এই তরুণ কবি যৌবনের পাপবোধের ভেতর থেকেও খুঁজে বেড়ান নিজের সত্তাকে :

‘অপরূপ অগ্নিশিখায় প্রায়শ্চিত্তের রাজত্বে,/ যাকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়;
সেটাই মানুষ।’

অসহ্য বিরহ, দুর্বহ বিচ্ছেদভার যেভাবে উঠে এল অবিনাশের কবিতায়, এমন আপাত অশুভ কামনার আড়ালে তীব্র বাসনার উদগিরণ দেখি নি সাম্প্রতিক কবিতায়—

‘এভাবে চলে গেলে বারবার,/ আর ভালো লাগে না আমার,
তার চেয়ে তুমি মৃত্যুমুখী হও,/ তোমাকে মৃত্যুশয্যায় দেখি!’

দৃষ্টি কাড়ল আদিত্য আনামের প্লেফুল রাইটিং—

‘ক্রোধের নয় বোধের দূরবীনে দেখা/ যায়
মগজের নিক্তি কোনদিকে ঝুলে গেলে/ খুলে যায় মৌলতালা।
ইতিকথা, নীতিকথা কিংবা/ ফাউকথা,
ভাবনার বাতি না জ্বাললে সবই/ এককথার আঁধার।’

‘আত্মহত্যা বিষয়ক জমিনি কিতাবগুলো/ পড়ে যেটা পেলাম
তা হলো/ জীবন একটা কদবেল গাছ।
আর বেলতলায় বোকারা একবারই যায়
চালাকরা বহুবার গিয়ে বহু বেল/ পেয়েছিল,
জগতের বাজারে তারা/ সেই/ বেল বেচে হয়েছিল ধনকুবের।’

আশিকুর রহমান লিখছেন সরাসরি কিছু কথা, প্রাত্যহিকতার বুলিনির্ভর—

‘পৃথিবীর/ প্রতিটা স্টনার/ আমার হোস্টেলের/ কথা/ জানে না।
আমার রুমে চলছে/ দেশাল/ গ্রীন/ আর পিনিকের উৎসব;
প্রতিটা রাতে/ এখানে/ (আপনি যদি খেতে ইচ্ছুক)/ চলে আসুন।
দুইটা গোল্ডলিফ/ চারটা হলিউড/ (পারলে!)
পারলে ছোট একটা ঠান্ডা,/ যদি/ আমার/ বন্ধুদের মতো
আপনারও প্যারা জাগে/ তো/ আসেন। সরল হই’

এই সরলতার পথ ধরেই এগিয়েছেন উদয়ন রাজিব। বলেছেন সরাসরি, রাখঢাকহীন—

‘আমার সাথে শোবে অপরূপা?
বহুকাল/ জেগে আছি/ বহু যন্ত্রণায়।’

নাদিরা জান্নাতের কবিতায় মনে হলো নারী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলি খুলে বলতে শুরু করেছে—আর কারো কাছে নয়, হয়তো নিজেরই কাছে। তাতে ধরা পড়ছে এতদিনের ধামাচাপা দেয়া সংকটগুলি—

‘শরীরে হঠাৎ বর্ষা!/ তলপেটে মোচড় দিচ্ছে ঋতুকাল।
মনে পড়ছে ইস্কুল ঘরে লাল রঙা রক্তের মিছিল।
স্যাঁতস্যাঁতে মেয়েবেলা পেরিয়ে নারী হওয়ার বাদলদিনে
একটা আশ্রয়ের ছাতা দরকার মনিশ।’

‘প্রেমের ক্ষেত্রে একটা প্রমোশন জরুরি।
যেহেতু আমি নারী সেহেতু নিয়ম মতো প্রতিরাতে
আমাকে বুক পেতে দিতে হয়।
আমার স্তনের পথ ধরে হেঁটে যায় প্রেমিক।
প্রেমিক হলেই পুরুষের চরিত্র বদলে যায়।

আমি চুপচাপ থাকি, রাজপথের মতো।
আমার বুকের ওপর হাঁটে আমার প্রেমিক, দৌড়ায়, মিছিল করে, স্লোগান দেয়,
মিটিং ডাকে, আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট ছুড়ে ফেলে আমার বুকের মাটিতে।

প্রেমের ক্ষেত্রে নারীর প্রমোশন জরুরি, এবং সেটা আজ এখন-ই।’

এই যে নিজেকে মেলে ধরা, এর কারণও নির্দেশ করছেন তরুণ কবিরা। নিশাত তাসনিম বলছেন—

‘ঝাপসা আয়না আপনি হাত দিয়ে মুছে দিতে ভালোবাসেন, কারণ—
নিজেকে নিজে অস্পষ্ট দেখতে, মানুষের খুব অস্বস্তি হয়।’

‘কেবলমাত্র গর্ভবতীরাই জগতে সবচেয়ে উদার।
যেহেতু তাদের দুটি হৃদয়—/ বুকে আর তলপেটে।’

নারীপুরুষের পারস্পরিকতার দ্বন্দ্বসংঘাত যাই থাকুক না কেন, প্রেম ও নির্ভরতার আকাঙ্ক্ষাও মানুষের চিরন্তন। কৃষ্ণ বলে কেউ থাকুক বা না-থাকুক, ‌’মানুষ কাউকে চায়’। তাই তার মধ্যে এক অনশ্বর রাধাভাব চির-জাগরূক। নিশাত এই বিষয়টাকে অভিনব এক মাত্রায় টেনে আনলেন, বিদ্যায়তনের নতুন অনুষঙ্গের মধ্যে হাজির করলেন এই ‘অবিদ্যা’ আর ‘অচেতন’কে—

‘আমি একজন জন্মগত পেন্সিল কম্পাস;
জ্যামিতি বক্সে পড়ে থাকি পঙ্গুর মতো।
তুমি বৃত্ত আঁকতে আসো,/ এরপর চলে যাও—
আমি তোমাকে ছাড়া দাঁড়াতে পারি না।
তুমি থাকলে ঘুরতে থাকি, তবুও
ভালো লাগে,/ মাথায় ঝিমুনি ধরে।
আমাকে গালাগাল করে—সব
কাঁটা কম্পাসের দল। ও পেন্সিল
আমাকে বিয়ে করবে?’

দৃষ্টান্তের তালিকা দীর্ঘ করে পাঠকদের আর ভারাক্রান্ত করতে চাই না। তবে বলা প্রয়োজন, আমি যে উদাহরণগুলি এখানে হাজির করেছি তা নিতান্তই আমার বক্তব্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। এমন নয় যে এগুলিই শ্রেষ্ঠ পঙ্‌ক্তি। বরং আরও অধিক কাব্যময়, নিবিড় অনুধ্যান অন্যত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আছে আরও বিচিত্র অনুসন্ধান ও লড়াই, ভাষার সঙ্গে বোঝাপড়া। যেমন—

‘জন্মে যে ভ্রমণ—এখানে শিশিরসিক্ত ভাষা
গহীনের দিকে যেতে যেতে দৃশ্যত অপার।
আয়ত্তহীন ব্রহ্মাণ্ডের সূত্র ধরে পরিপ্রেক্ষিত—
এই ভ্রমণ সতত পদক্ষেপ।

ক্রমশ আগামীর জন্য ছলনা ছেড়ে প্রকাশিত হয়।
নদীর ছায়া পড়ে—মন ও মগজে অনুতাপ,
হায় যাপন দাগ!
ফেটে উদিত হতে থাকে জন্মান্তর;
মানুষের যা কিছু অনুধাবনের বাহিরে
অবোধগম্য হাল ধরে,
নিথর তথা অমোঘ ভাষা বেয়ে বেয়ে পরম প্রার্থনার দিকে যায়…’ [আজিম পাটোয়ারি]

এদের রাজনৈতিক চেতনাও বেশ টনটনে। অন্তত পার্টিজান নয়। একটি নমুনা—কবিতার নাম ‘ডিভলব বাই দ্য ডিস্ট্রয়’—

চোখ নামিয়ে দ্যাখ, পদ্মার জল ঘোলা হয়ে যায়। উন্নয়নের জোয়ারে হাঙর উঠে আসে বালুকাবেলায়
আমরা আমাদের বসতি হারাই—বাসুমতি চরে। কলাপাতার বেড়া আর খড়ের ছাউনি খুলে
কাশবনের নাচ, জোছনাবিলাসে কংক্রিটের ছবি আঁকে। আমরা ভুলে যাই শুশুকনামা। ব-দ্বীপের কেউ ভালোবাসে!

দৃষ্টি যতদূর মনের পেখম ম্যালে—সেখানেই হ্যালিজন (হ্যালোজেন?) বর্ষা, ঝুলে (ঝুলিয়ে?) দ্যায় ইলেকট্রনিক শিশির।
সভ্যতায় হারিয়ে যাই, ভরা যৌবনে খরা আসে। তোমরা উল্লাস কর। পিপাসা বোঝ না,
জানো না তোমাদের হাসিতে তোমাদেরই মৃত্যু।  [মীর রবি]

একটু ফোঁড়ন কেটে রাখি, এ লেখায় আমি, ইনফ্যাক্ট, মিস্টিসিজম, অনির্বচনীয়তা এইসব আদি-ভৌতিক বিষয় নিয়ে আলাপ আপাতত মুলতুবি রাখতে চেয়েছি। দেখতে চেয়েছি কবিতার নিত্য শর্ত ও সৌন্দর্যের বাইরে কী নতুন অনুষঙ্গ ও মাত্রা যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের কবিতায়।

বলতে পারি একধরনের রিজেকশন আছে তাদের কবিতায়—সভ্যতার প্রতি, আদর্শের প্রতি, নিজেদের প্রতিও। অনাস্থার উল্লাস আছে, আশাভঙ্গের বিদ্রূপাকীর্ণ স্বীকৃতি আছে। তা-সব নিয়ে নতুন দিনের কবিতা গড়ে উঠছে আমাদের রাজনীতি-সমাজনীতির শঠো-নটো কৌতুকে, অন্তঃসারশূন্যতায় জায়মান, খটোমটো চৈতন্যসম্ভূত ভাষাবুদ্বুদে ফেটে পড়তে চাইছে—যেন একেকটি মুহূর্ত আছড়ে পড়ছে মুখোমুখি দুটি বাসের সংঘর্ষে।


খুবই আশার কথা যে, কবিতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের ভূখণ্ডের ওপর দাঁড়াতে পারছে। বলতে চাইছি, এই কবিতাগুলিকে বাংলাদেশের কবিতা বলে চেনা যাচ্ছে খুব সহজেই। আমাদের দৈনন্দিনতায় ভ্রাম্যমাণ চৈতন্যের ইশারা তার স্বভাব ও ভাষাভঙ্গি নিয়ে ধরা দিচ্ছে তরুণদের লেখার মধ্যে।

ছন্দকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞাপূর্বক বাক্যস্পন্দকে সম্বল করে গদ্যেই লেখা হচ্ছে কবিতা। উঁকি দিচ্ছে গল্প বা গল্পের ছদ্মাভাস, প্যারাবল। ম্যাক্সিম, অ্যাফোরিজমের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ। নব্বইয়ের কবিরা যেমন আঙ্গিকের পুনরুত্থান ভেবেছিলেন পয়ার, ত্রিপদী কিংবা পুথির নানা বাহ্যরূপ অনুসরণের ভেতর, তা পূর্ণত অবসিত এই সময়ে এসে। একেবারেই যে নেই তা কী করে বলি! আগেই বলেছি আঞ্জুমানে মফিদুলের কথা। মানে, শববহনের ঐতিহ্যিক দায়।

‘রাতের শরত এত যে সুইসাইডাল!’—মাহমুদ সিফাতের এই উচ্চারণটুকু দিয়েই শেষ হোক তবে আলোচনা। বিজয়া দশমী আজ। বাইরে চলছে এখন বিসর্জনের পালা। কবিতা ও জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলিও প্রতি মুহূর্তে পাল্টে যাক নব নব বিসর্জনের আয়োজনে। এই শুধু প্রত্যাশা।


অনিকেত শামীম সম্পাদিত ‘লোক’ পত্রিকা থেকে
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত ২০১৭]

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত ২০১৮]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর ২০০৮]

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব