হোম গদ্য অ্যাসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের নেকড়ে, আমাদের ঢাকার কুকুর আর একজ্যুপেরির শিয়াল

অ্যাসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের নেকড়ে, আমাদের ঢাকার কুকুর আর একজ্যুপেরির শিয়াল

অ্যাসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের নেকড়ে, আমাদের ঢাকার কুকুর আর একজ্যুপেরির শিয়াল
66
0

গুবিও নগর

ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। ইতালির গুবিও একটা শান্ত ছোট্ট মফস্বল শহর। শান্তিপূর্ণ জীবন নাগরিকদের। বেশ কয়েক বছর আগে গুবিওর সাথে স্পলোতোর একটা যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধ অমীমাংসিতভাবে থেমেছে। পরস্পরের সাথে শত্রুতা বজায় থাকলেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এখন। দুই নগরীর জনগণ পরস্পরকে ভালো না বাসলেও তারা আপাতত আর সরাসারি যুদ্ধ চায় না। নগরপিতা যুদ্ধের ক্ষতি বুঝতে পেরেছে। পুরোটা শহর উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। বিরাট একটা নগরদ্বার আছে, পাহারাও আছে। কে যাচ্ছে কে আসছে তার হিসাব রাখছে রক্ষীরা। সকলেই সকলকে চেনে প্রায়। এই তোরণের বাইরে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। উর্বব ভূমি ছড়িয়ে আছে। একটু দূরেই ঘন বন। কাঠ ও পশু চারণের জন্য বনে যেতে হয় নগরীর কিছু লোকদের প্রায় প্রায়। তেমন বড় কোনো ঘটনা শহরে নেই বললেই চলে। একই রকমভাবে দিন কাটছিল নাগরবাসীর।

কিন্তু হঠাৎ করেই একটা উটকো ঝামেলা এসে গেল। এমন ঘটনা এখানে আগে ঘটে নি। সহসা বনের ধারে রাখালরা যে ভেড়া নিয়ে যায় চরাতে তাতে নেকড়ের হানা পড়ল। পরপর দুদিন একই ঘটনা ঘটল। নেকড়েরা সাধারণত বনের গভীরে থাকে—লোকালয়ের কাছে আসে না। ভেড়ার পালে নেহড়ের হানা গুবিও লোকের কাছে খুবই নতুন। কেউই অতীতে এমন দেখছে বলে মনে করতে পারে না। শহরের প্রবীণ ব্যক্তি শুধু বলেছে বহু বছর আগে একটা ভেড়া বনের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিল। তার পরিত্যক্ত হাড়গোড় দেখে তারা বুঝতে পেরেছিল যে ভেড়াটি নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়েছে। এছাড়া তেমন কিছু আগে ঘটে নি। ঘটনা এখানেই থামল না। তৃতীয় দুই ভাই ভেড়ার পাল নিয়ে গিয়েছে মাঠে। একটা বিশাল সাইজের নেকড়ে ভেড়ার পালে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এক ভাই বড় একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেল নেকড়েটির দিকে। ভেড়া ছেড়ে নেকড়েটি ওই  রাখালকে আক্রমণ করে বসল। এই দৃশ্য দেখে অপরজনও নেকড়ের দিতে তরোয়াল নিয়ে এগিয়ে গেল। ভাগ্য তাদের সহায় হলো না। তিনিও পেরে উঠলেন না। তারও মৃত্য হলো নেকড়ের হাতে। সন্ধ্যায়  ভেড়াগুলো বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু দুই ভাই ফেরে নি। তখন তার পরিবার ও নগরীর অন্যান্যরা মশাল জ্বালিয়ে তাদের খুঁজতে বের হলো। তারা মৃত দুই ভাইকে পেল বনের কিনারায়। স্পষ্ট থাকা গলা বরাবর দাঁতের কামড় দেখে তাদের বুঝতে আর বাকি রইল না। তাদের পরিবারসহ অন্যান্য নাগনিকরা নগর পিতার কাছে এর প্রতিকার চাইল। মেয়র সভা ডাকলেন। সভায় সাব্যস্ত হলো আগামীকাল তিনজন প্রশিক্ষিত সৈন্য বনে গিয়ে নেকড়েকে বধ করবে। আর নেকড়ে যাতে শহরে ঢুকতে না পারে তার জন্য নগরদ্বার বন্ধ থাকবে। সৈনিকরা সফল হয়ে ফেরার পর নগরদ্বার খুলে দেওয়া হবে।


তিনি যে জীবন বেছে নিয়েছেন তা হলো প্রেমের জীবন। তিনি মনে করেন সকল কিছুর ভেতর দিয়ে ঈশ্বর প্রকাশিত।


পরদিন তিনজন সৈনিক বনের ভেতর প্রবেশ করল। তারা নেকড়ে খুঁজতে লাগল। সহসা তারা দেখতে পেল ঘাসের আড়ালে একটা নেকড়ে বসে আছে। সৈনিকটি তার বর্শা ছুড়ল। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। নেকড়েটি ঝাঁপিয়ে পড়ল সৈনিকদের উপর। ইয়া বড় এক নেকড়ে। দ্বিতীয় সৈন্যটি সহসা ক্ষিপ্র আক্রমণ দেখে একটু দিশেহারা। সে ভেবেছিল নেকড়েটি পালাবে। তখন পেছন থেকে বর্শাবিদ্ধ করবে। কিন্তু প্রথম সৈনিকের নাজুক অবস্থা দেখে সেও নেকড়েটির দিকে তরোয়াল হাতে এগিয়ে গেল। তরোয়াল চালাল। কিন্তু সে তরোয়াল চালাল ডানে। পাশ কাটিয়ে তার টুটি চেপে ধরল। তৃতীয় সৈন্য হতচকিত হয়ে গেল। হাত থেকে তার বর্শা পড়ে গেলে। নেকড়েটি তাকে এক পলক দেখল। তারপর বনের ভেতর দৌড়ে পালিয়ে গেল। সে প্রাণপণে নগরীর দিকে ছুটল। সে নেকড়ের যে বর্ণনা দিল তাতে বনে পুনরায় লোকপাঠনো সমীচীন মনে হলো না। বিকল্প কী?

রাতে সভা বসল আবার। দুই ঘণ্টার আলোচনা হলো। শেষে সভায় সিদ্ধান্ত হলো তাদের এই বিপদ থেকে শুধু মাত্র উদ্ধার করতে পারে অ্যাসিসির সেন্ট ফ্র্যান্সিস।

তার খোঁজে পরদিন দুইজন লোকে ছুটে গেলে সূর্য ওঠার সাথে সাথে।


সেন্ট ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি

অ্যাসিসির চার্চের বাগানে একটা জলপাই গাছের নিচে ইজি চেয়ারে বসে আছেন একজন যাজক। সৌম্য তার চেহারা। চোখে মুখে ঐশ্বরিক বিভা লেগে আছে। তিনি অভুক্ত আছেন আজ। এই নিয়মই তিনি পালন করেন। দুঃখের ভেতর দিয়ে ঈশ্বরের প্রেমকে খুঁজে দেখেন তিনি। চোখ বন্ধ করে তার অতীত জীবনের স্মৃতি হাতড়ে চলেছেন আজ। হাঠাৎ তার মনে পড়ে গেল তার বাবা তাকে বেজমেন্টে বন্দি করে রেখেছিল। তার বাবা অ্যাসিসির বড় কাপড় ব্যবসায়ী ছিল। যাজকের প্রথম জীবন ভোগ বিলাসেই কেটেছে । বাবার ব্যবসায় সামান্য সহযোগিতা করেছেন মাঝে মাঝে। সহসা একদিন ধর্মযুদ্ধের ডাক এল। তিনি ধর্মযুদ্ধে চলে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন বীরের বেশে দেশে ফিরবেন। কিন্তু বুঝতে দেরি হলো না যে যুদ্ধ তার পথ না। তিনি যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন। তার বাবা এক বছর পর মুক্তিপণের টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। কিন্তু ছেলে ফেরার পর তিনি দেখলেন তার পুত্র বদলে গিয়েছে। অন্য এক মানুষ সে। সে পরিবার ত্যাগ করে যাজকের জীবন বেছে নিতে চান। তার বাবার এতে মত ছিল না। তার ইচ্ছা ছিল ছেলে বাবার ব্যবসার হাল ধরুক। ফলে কিছুদিন তাকে বেসমেন্টে আটকা থাকতে হয়। তিনি যে জীবন বেছে নিয়েছেন তা হলো প্রেমের জীবন। তিনি মনে করেন সকল কিছুর ভেতর দিয়ে ঈশ্বর প্রকাশিত। ফলে, দুনিয়ার সব কিছুকেই তিনি গভীরভাবে ভালোবাসেন। কুষ্ঠরোগী থেকে বনের হিংস্র নেকড়ে, মাছ, খরগোশ কিছুই তার ভালোবাসার বাইরে না। তার এই ভালোবাসার ভাষার প্রতি বনের পশুও সাড়া দিতে পারত।

সাত পাঁচ ভাবছেন জলপাই গাছের নিচে বসে জগদ্বিখ্যাত ক্যাথলিক ভিক্ষু, ধর্মপ্রচারক, অ্যাসিসির যাজক সেন্ট ফ্রান্সিস। তিনিই চার্চকে ভোগ বিলাসরে পথ থেকে উদ্ধার করে আরো বেশি মানবিক হওয়ার জন্য এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন যা সারা খ্রিষ্টান দুনিয়ায় দীর্ঘদিন মান্য করা হয়। তিনি ফ্রান্সিসকান ধারার জনক। এই ধারা মতে যাজকদের ব্যক্তিগত কোনো সম্পত্তি থাকতে পারবে না। তারা ধর্ম উপদেশ দান করবে নগরে, গ্রামে। এর বিনিময়ে যা ভিক্ষা হিসাবে পাবে তাই দিয়ে জীবন যাপন করবে। তারা দরিদ্র ও নিপীড়িতের সেবা করবে। ঈশ্বরের বিপুল দুনিয়ায় কোনো পশুপাখিও এই ভালোবাসা থেকে বাদ পড়বে না।

তিনি পশুপাখির ভাষা বুঝতে পারেন। তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। এর মধ্যে তরুণ ভিক্ষু এসে খবর দিল দুজন লোক এসেছে তার সাথে দেখা করার জন্য গুবিও থেকে। তিনি তরুণ ভিক্ষুকে তাদের সেখানে নিয়ে আসতে বলনেন।

সেন্ট ফ্রান্সিস সব শোনার পর ঠিক করলেন ভোর বেলা সূর্য ওঠার সাথে সাথে তিনি গুবিও রওনা দিবেন।


গুবিওর বনে নেকড়ের দেখা

নগরীতে সেন্ট ফ্রান্সিস যখন পৌঁছালেন তখন দুপুর হয় হয়। নগরীর সিংহদ্বার একবার খুলল, আবার বন্ধ হয়ে গেল তারা ভেতরে প্রবেশের পর। দুপুরে তিনি সাধারণত কিছু খান না। তিনি সরাসরি চলে গেলেন নগরভবনে। তার জন্য নগর পিতাসহ অন্যান্য গণ্যমান্য, জ্ঞানীগুণীদের প্রতিনিধিরা অপেক্ষা করছিল। নগর পিতা সব বিস্তারিত বললেন। যে পরিবারগুলো তাদের সজন হারিয়েছে তাদের জন্য প্রার্থনা করতে বললেন ঈশ্বরের কাছে যেন তারা এই শোক সহ্য করতে পারে। সৈন্যদের মধ্যে একজন তার আপন খালাত ভাই। এই সব আলোচনার পর শুরু হলো আসল কথা। নগরীর লোকরা কী চায় সেন্টের কাছে। তাদের আশা হয় তিনি নেকড়ে মেরে ফেলবেন বশে এনে অথবা তাদের শত্রু-নগর স্পলোতোতে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের শায়েস্তা করবেন।

সেন্ট ফ্রান্সিস তাদের সব কথা শুনলেন । কিছু বলনেন না। সকলকে নিয়ে প্রার্থণা করলেন।

এর পরদিন সকালে ফ্রান্সিস বনের ভেতর প্রবেশ করলেন। গাছের আড়াল থেকে তাকে খুব আস্তে আস্তে পর্যবেক্ষণ করেছে নেকড়ে। ধীরে ধীরে সে ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। তার সীমার মধ্যে এলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। নেকড়ে সেন্টকে শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নেকড়ের সীমানার ভেতর ঢুকে পড়েছেন তিনি। নেকড়ে লাফ দিবে দিবে।

এই মুহূর্তে নেকড়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল তার। তিনি নেকড়ের সাথে সংযোগ অনুভব করলেন। এই হিংস্র প্রাণীর উদ্দেশ্য বুঝতে তার খুব বেশি অসুবিধা হলো না। তিনি তার ক্রস দেখালেন নেকড়েকে। বলল, ‘ভাই নেকড়ে, কাছে আসো। আমি তোমাকে আঘাত করতে আসি নি। আসো আমরা কথা বলি।’ নেকড়ে হঠাৎ‌ থেমে গেল। তার মুখ থেকে যে হিংস্র ডাক বের হচ্ছিল তা থেমে গেল। সে ধীর পায়ে ফ্রান্সিসের কাছে এসে বসল। সেও অনেক কথা বলতে চায়। অনেক কথা জমে আছে তার মনে।

সে নেকড়েকে প্রশ্ন করল, ‘ব্রাদার উলফ, তোমার জন্য সারা নগরীর মানুষের জীবন থেমে গিয়েছে। কয়েকটা পরিবার তাদের সজন হারিয়েছে। তুমি কেন এমন করছ। তাদের পোষা জীব-জন্তুই বা কেন ধরে খাচ্ছ?’

নেকড়ে বলতে শুরু করল, ‘সত্যি আমি চাই না ওদের পশু ধরে খেয়ে। আমি হরিণ বা খরগোশ পছন্দ করি। ভেড়া আমার একদমই পছন্দ না। কিন্তু আমি নিরুপায়। এই দেখো আমার বাম পায়ের কাছে একটা ক্ষত। হরিণ ধরতে গিয়ে চোট লেগেছিল। অন্যদের ক্ষত সেরে যায়। আমারটা সারে নি। আমি আর খুব ভালো মতো দৌড়াতে পারি না। আমার দলকে সাহায্য করতে পারি না। তারা আমাকে দল থেকে বের করে দিয়েছে। ফলে, আমি লোকালয়ের কাছে চলে এসেছি। যে সকল গৃহপালিত পশু জোরে দৌড়াতে পারে না আমি তাদের ধরে খাই। এছাড়া আমার বাঁচার আর কোনো উপায় নাই। আমি বাঁচতে চাই।’

‘তবে তুমি কেন রাখাল আর সৈন্যদের মারলে? এমনকি ওদের মাংস পর্যন্ত তুমি খাও নি। কেন হত্যার জন্য হত্যা করলে?’

‘আমি আসলে ওদের মারতে চাই নি। ভেড়া আক্রমণ করার পর প্রথমে রাখাল আমাকে হত্যা করতে আসে। দ্বিতীয় জনও তাই। ফলে আত্মরক্ষার জন্য ওদেরকে হত্যা করি। ওদের হত্যা না করেল ওরা আমাকে হত্যা করত। সৈন্যরা আমাকে মারার জন্যই বনে এসছিল। বর্শা ছুড়েছিল। তরোয়াল নিয়ে ছুটে এসেছিল। ওদের দুজনকে আমি হত্যা করি। তৃতীয়জন অস্ত্র ফেলে দিলে আমি তাকে কিছু না বলে বনের ভেতর পালিয়ে যাই। আমি শুধু খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমি নগরীর কারো ক্ষতি চাই না।’

ফ্রান্সিস দেখল, নেকড়ে নিজের খাদ্যের প্রয়োজন মেটানো ও শুধু মাত্র বাঁচার জন্য ইচ্ছার বাইরে কিছু কাজ করেছে। তার গুবিও মানুষের দুঃখ বোঝার কথা না। যেমন মানুষগুলো নেকড়েকে বুঝতে পারছে না। সে মানুষ ও পশু উভয়ের দুঃখ বুঝতে পারলেন। এখন তিনি কী করবেন। দারুণ সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলেন। এমন একটা উপায় বের করতে হবে যাতে নেকড়েটা খেতে পায়, আবার নগরীর মানুষও সুখে থাকে। দুই পক্ষকে এমন প্রস্তাবনা দিতে হবে যাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সেন্ট ধ্যানে বসলেন। একঘণ্টা প্রার্থণা করলেন। এরপর নেকড়েকে বলল তোমার হাত রাখো আমার হাতে। নেকড়ে তাই করল। দুজনের ভেতর গভীর আস্থা স্থাপিত হলো।

তিনি নেকড়েকে বললেন, ‘চল আমার সাথে। আমরা নগরীতে যাব।’

নেকড়ে ভয় ও বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘ওদের পশু আমি হত্যা করেছি। স্বজনদের মেরেছি। আমি নগরীতে গেলে সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলবে। দয়া করে আপনি আমাকে এ কথা বলবেন না। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু ওদের না। আপনি অন্য উপায় দিন আমাকে। আপনি যা বলবেন আমি তাই শুনব।’

খুব শীতল গলায় সে বলল, ‘আমার সাথে চল। এটাই কল্যাণ বয়ে আনবে সকলের।’

নেকড়ে কথা বাড়াল না। সে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। সে এই মানুষটির উপর পূর্ণ আস্থা রাখল। সে জানে, তিনি তার ক্ষতি করার লোক না।


তিনি এই নেকড়ের নাম দিলেন, ভাই নেকড়ে। একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। কেউ কারো ক্ষতি করবে না।


বিকালে ফ্রান্সিস ফিরল। তার পিছনে সেই বিশাল আকৃতির নেকড়ে। সবাই ভয় পেয়ে গেল। একে না মেরে বা শত্রুদের দেশে না পাঠিয়ে সে এটাকে আমাদের নগরীতে নিয়ে এল। তবে সবার বিশ্বাস আছে তার উপর যে তিনি যা করবেন তা সকলের উপকারের জন্যই করবেন।

সেন্ট ফ্রান্সিস সব কথা খুলে বলল। তিনি বললেন শুধু মাত্র ক্ষুধার জন্য, বাঁচার জন্য সে এ কাজ করেছে। সমাধান হলো তোমরা একে রোজ খেতে দিবে। সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু নগর পিতা ফ্রান্সিসকে বলেন তিনি একা কথা বলতে চান তার সাথে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে। তিনি কথা বলতে রাজি হলেন। সকলকে বলে গেলেন কোনোভাবেই যেন এই নেকেড়ের ক্ষতি না করা হয়। তিনি আলোচনা করেই ফিরবেন এখনই। সেন্টের কথা অমান্য করার লোক ছিল না গুবিওতে।

নগরপিতা বললেন, ‘দেখুন এই নেকড়ে কিছু পরিবারের আত্মীয়দের মেরে ফেলেছে। তারা এটাকে মানবে কিভাবে? তারা কিছুতেই মেনে নিবে না। তারা প্রতিশোধ নিতে চায়। জনগণ এর মৃত্যু চায়। অথবা স্পলোতোতে পাঠিয়ে দিতে চায়। সকলে মানলেও এই পরিবারগুলো কিছুতেই মানবে না।’

সেন্ট এই পরিবারগুলোর সাথে কথা বলতে চাইলেন। তাদের সাথে ঘণ্টাখানিক কথা বলা হলো। তাদের মানানো দুরূহ কাজ। তাদের মন নেকড়ের প্রতি ঘৃণায় পরিপূর্ণ। পারে তো এখনই শেষ করে দেয় তাকে। ফ্রান্সিসও এই পরিবারগুলোর সাথে কেঁদে ফেলনেন। তাদের মন নরম হলো। তিনি তাদের বলল, নেকড়ে আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ক্ষমা পরম ধর্ম। তারা তাকে ক্ষমা করে দিল। তিনি এই নেকড়ের নাম দিলেন, ভাই নেকড়ে। একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। কেউ কারো ক্ষতি করবে না। নগরীর সবাই এটা মেনেও নিল।

প্রায় দুই বছর ভাই নেকড়ে, ব্রাদার উলফ গুবিওতে বেঁচে ছিল। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর শোকের ছায়া নেমেছিল শহর জুড়ে। একে অন্যের অংশ হয়ে উঠেছিল তারা। সবাই সবার কথা রেখেছিল।


ঢাকা শহরের কুকুর রক্ষা বা নিধন

বিখ্যাত ক্যাথলিক সাধু ফ্রান্সিসের নানা গল্প প্রচলিত আছে। অনেকেই এটা জানেন। নতুন কোনো গল্প না। এর মধ্যে নেকড়ের গল্পটা খুবই বিখ্যাত। সারা দুনিয়ার মানুষ ও সকল পশুপাখির প্রতি তার দায়িত্বপূর্ণ প্রেমের নিদর্শন এই গল্প। ইন্টারনেটে বা ইউটিউবে তার নামে সার্চ দিলে তাকে নিয়ে এমন অনেক গল্প পেয়ে যাবেন যা আমাদের প্রেম ও পারস্পরিক সহযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করবে। মূল গল্পটাকে ঠিক রেখে আমি নিজের মতো একটু ফিকশনের চাল লিখেছি। মানুষের প্রথম নীতি শিক্ষার শুরু হয় গল্প দিয়ে। গল্পই আসলে সভ্যতা তৈরি করেছে। যে সমাজের গল্প, উপকথা, মিথ বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও বহু মানুষে বিস্তৃত, সে-সমাজের সামাজিক মূলধন বেশি। মানুষে মানুষে সংযুক্ততা বেশি। এই আলোচনা থাক।  ত্রয়োদশ শতাব্দীর গল্প রেখে আসেন সমকালীন ঢাকার বাস্তবতায় প্রবেশ করি।

আমাদের অবস্থাও গল্পের গুবিও নগরী থেকেও শোচনীয়?

লক্ষ লক্ষ বেওয়ারিশ কুকুর বড় ক্ষতি করছে আমাদের। গুবিওর বনের হায়েনা যা যা ক্ষতি করেছিল আমাদের কুকুরগুলোর ক্ষতির পরমিাণ তার থেকে কম নয় মনে হয়। নগরের সকলে চাইছে হয় এদের মেরে ফেলো অথবা এই শহর থেকে দূরে সরিয়ে ফেলো। কোথায় সরিয়ে নিবে? আমাদের ঢাকার বাইরে শত্রুরাষ্ট্র স্পলোতো আছে? কুকুরগুলো এই শহরে সমস্যা তৈরি করছে, অন্য শহরে সমস্যা হবে না? আমাদের এসব ভাবার দরকার নাই। ঘন বসতির ঢাকায় কুকুরের জন্য যে পরিমাণ খাদ্য উৎপন্ন হয় অন্য জায়গায় তা হবে? এই কুকুরদের খাওয়ানোর জন্য কোনো বাজেটও তো নাই। বেওয়ারিশ কুকুরগুলো যে পরিমাণ ময়লা পরিষ্কার করে সেই পরিমাণ বর্জ্য ময়লা ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে কত খরচ হবে? বাজেট বাড়বে, আয় ইনকাম বাড়বে হয়তো কারো কারো।

এই কুকুর নিধন বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবনা আমার মতো সুনাগরিকদের। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমাদের রাষ্ট্রে কোনো অ্যাসিসির সেন্ট ফ্রান্সিস নাই যার কাছে আমরা যেতে পারি। যিনি আমাদের অন্তত এমন একটা পথ দেখাতে পারেন যেখানে হায়েনা ও গুবিওর লোক উভয়ের দুই কূল রক্ষা হয়। আমারা স্রেফ পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে নিয়েছি। বিচারে বসেছি। পরিসংখ্যান, তথ্য, উপাত্ত পেশ করেছি যা সকলই আন্তর্জাতিক। কোন দেশ কবে কত কুকুর মেরেছে, কিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছে, প্রতি বছর কুকুর হত্যায় বাজেট কত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের কারো কাছে দেশি কুকুরদের কোনো পরিসংখ্যান নাই। এরা আমাদের মতো ইনইফিসিয়েন্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঢাকায় কতটা অর্থনৈতিক আবদার রাখে তার হিসেব কই? আমাদের সবই অনুকরণে। সেন্ট ফ্রান্সিসের দারুণ ডিলেমা ছিল সকলের জন্য কল্যাণকর একটা কিছু দেওয়ার। কিন্তু কোনোভাবেই শত্রু রাষ্ট্রে কুকুর পাঠানো তার কোনো অপশনেই ছিল না। প্রাণ রক্ষা কিভাবে করা যায় তিনি সেটার একটা উপায় বের করছেন। দুনিয়া রক্ষারও প্রথম শ‍র্ত প্রাণ রক্ষা।

আমাদের অবস্থা শোচনীয় কেননা আমাদের কোনো সেন্ট নাই এই শহরে, আমাদের কারো উপরই কোনো বিশ্বাস নাই, আস্থা নাই। আমরা শুধু মেরে দিতে চাই একে অন্যকে।


ফকির মুক্ত কামাল আতাতুর্ক এভিন্যুউ, বিমান বন্দর রোড

ঢাকা থেকে কুকুর সরানোর অবচেতনাটা কী?

ঢাকা শহরের কিছু রাস্তা, এলাকা যে কারণে আমরা ফকির মুক্ত করেত চাই একই কারণে হয়তো কুকরও মুক্ত করতে চাই। ঢাকা শহরের রাস্তায় আমরা ফ‌কির গরিব দেখতে চাই না কারণ এগু‌লো আমাদের ধনিক সদ্য ধনিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বচ্ছলতার উপর নৈ‌তিক চাপ তৈ‌রি করে। আমরা এ‌সি গা‌ড়িতে বসা আর ওপাশে হাত-পাহীন ফ‌কির টাকা চাইছে এত আয় ইনকাম উন্নয়ন করার পরও। আমরা যে ফকির সরিয়ে দিতে চাই আমাদের রাস্তা ঘাট থেকে এটা যত না রাজনৈতিক ঘটনা, তার থেকে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। আমার মনে হয় এটা প্রতিটা মানুষের ভেতর এই সাইকি কাজ করে। আমরা মানুষ হিসাবে একটা নৈতিকতার দুনিয়ায় বড় হই। মানুষ নানা গল্প শুনে বড় হয়। সেই গল্পের নায়ক নৈতিক শক্তিতে বলবান, মহৎ‌। ফলে মানুষের মহত্ত্বের  প্রতি একটা লোভ থাকে। নিজেকে মহৎ‌ হিসাবে দেখতে চায়, দেখাতে চায়। আমরা অপরাধ করলেও সৎ‌ দেখাতে চাই নিজেকে। কেন? কেননা  আমরা একটা মোর‌্যাল ডিজায়ারের ভেতর বড় হই সামাজিকভাবে। আমরা অসৎ হলেও সততার অভিনয় করে আত্মাকে সান্ত্বনা দিই। আমাদের ইদানীংকার স্বাচ্ছন্দ্যের আশেপাশে গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে রাস্তায় ফকির দেখার নৈতিক চাপ নিতে রাজি না, নিজের ডিজায়ারটাকে পতিত হতে দিতে চাই না আমরা। এখন কেউ কেউ বলতে পারেন সমাজে বেশি গরিব ফকির থাকলে তো আমাদের নায়ক হতে সুবিধা হয়। হয় বটে! বাস্তবতা হলো মানুষ তা করতে চায় না। কেন চায় না তা অন্যত্র বলা যাবে। তবে মানুষের যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেখানে ব্যক্তির উপকার করা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার। আমি নিঃশেষে দান, অপরের কল্যাণ করে বড় হতে চাই না, তবে বড় দেখতে চাই নিজেকে। আমাদের সামনে যখন নিঃস্ব মানুষ এসে দাঁড়ায় তখনই আমরা আমাদের হিরো না হতে পারার বেদনা উপলব্ধি করি। কোনো অপরাধ না করেও অপরাধ বোধ কাজ করে, অস্বস্তি তৈরি হয়।

মানুষের যে কালচারাল ও রি‌লি‌জিয়ান ইভ্যালুশন, সেখানে আপ‌নি সরাস‌রি কাউকে ফ‌কির না বান‌ালেও ফ‌কির দেখা মাত্র একটা অপরাধবোধ কাজ করবে। আমরা ফকিরকে ভিক্ষা না দিলে ক্ষমা চাই কেন? দ্বিতীয়ত পকেটে টাকা থাকার পরও বলতে হচ্ছে টাকা নাই পকেটে। মাফ করো। শহরে ফ‌কির থাকা মানে নৈ‌তিকতার বিরাট একটা চাপ ক্ষমতাবানদের উপর। বিশ ত্রিশ বছর আগে সমাজে ফকিরদেরকে আধ্যাত্মিক মূল্য দেওয়া হতো। বাসায় ফকির আসার সাথে সাথে গেরস্থ কিছুটা পুণ্য অর্জন করত। আর এখন অপরাধবোধ কাজ করে। ফলে, অবচেতনে আমরা ফ‌কিরহীন রাস্তার ঘোষণা দিয়ে শা‌ন্তিময় সমাজ প্র‌তিষ্ঠা করতে চাই যেখানে প্রতিটা মানুষই হিরো। আমরা জানি হিরোরা কখনো একা বড় হয় না শুধুমাত্র নিজের উপকার করে। এটা জানি বলেই আমাদের অসীম দুঃখবোধ গরিব দেখে।

কুকু‌র হত্যা বা সরানোর প্রস্তাবনা ফ‌কির থেকে আলাদা কিছু না। সমাজের পথে পথে কুকুরগুলো ঠিক মতো না খেয়ে কাটাচ্ছে। বেশির ভাগই রোগা। বিদেশি যে কুকুরগুলো সিনেমায় আমরা দেখে থাকি, যেগুলো প্রতিপালন সন্মানজনক, সোস্যাল স্ট্যাটাস দেয় সেরকম না আমাদের কুকুরগুলো। মনের ভেতর পাপবোধ কাজ করে। পাপবোধ তো সুস্থ মানুষকে স্বাভাবিক আচরণ করতে দেয় না। অপরকে মেনে নিতে দেয় না।


তুমি যদি নিজের বিচার ঠিক মতো করতে পারো তবেই তুমি প্রজ্ঞাবান।


সমাজকে অতি আনন্দবাদী রূপে গড়ে তোলার জন্য প্রথমে আমরা ফ‌কির ধর‌ছি, এখন কুকুরে হাত দিয়েছি। সমাজে যেহেতু মানু‌ষ কুকুরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা উপলব্ধি করতে পারছে না। পরোক্ষ ভূমিকা পরিমাপের কোনো তথ্য উপাত্ত নাই। ইকো সিস্টেমের জটিল হিসাব লোকে বোঝে না বা তাদের না বুঝলেও চলে যাচ্ছে এবং চলছে। মানুষ সব সময় সোজা চিন্তা করতে চায়। ফলে শর্ট টার্ম লাভ লোকসানে তার আগ্রহ বেশি। ঢাকা শহরের কুকুর না থাকার পরোক্ষ কারণ ও লং টার্ম ক্ষতি আমরা বুঝতে রাজি না। ফলে, আজ কুকুর, কাল পাখি, এরপর গাছ, এরপর নির্দিষ্ট জাতি গোষ্ঠীর মানুষকে আমরা মেরে দিতে চাইব নানা শর্ট টার্ম হিসাব পত্র দিয়ে। এটা তো গণহত্যার প্রস্তুতি।

আমাদের অবস্থা শোচনীয়। আমাদের অবস্থা ত্রয়োদশ শতাব্দীর গুবিও থেকেও নাজুক। কেননা আমাদের কোনো সেন্ট নাই এই শহরে যাকে পশু থেকে মানুষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারে। আমাদের কারো উপরই কোনো বিশ্বাস নাই, আস্থা নাই। আমরা শুধু মেরে দিতে চাই একে অন্যকে।

এমন সহজ মানুষ কবে জন্ম দিবে এই শহর!


একজ্যুপেরির ছোট্ট রাজপুত্রের শিয়াল

ফরাসি লেখক অঁতোয়ান দ্য স্যাঁত্‌-একজ্যুপেরির ছোট্ট রাজপুত্রকে বহুল পঠিত বললে ভুল হবে মনে হয়।  এটা তারও অধিক কিছু মনে হয়। এই লেখা যারা পড়ছেন তাদের অনেকেরই এটা পড়া। সবারই জানা এই গল্প। তারপরও একটু মনে করিয়ে দিতে চাই। নিজের ভাষায় বলি গল্পটা সরাসরি অনুবাদ না করে।

ছোট্ট রাজপুত্র অদ্ভুত যে গ্রহের বাসিন্দা তার নাম গ্রহাণু বি-৬১২। সেই গ্রহে আছে একটা গোলাপ ফুল গাছ, দুটো আগ্নেয়গিরি যার একটা সচল আর একটা নিষ্ক্রিয়। সেখানেও দিন রাত্রি হয়। তবে তা আমাদের মতো না। হঠাৎ‌ একদিন রাজপুত্র নিজ গ্রহাণু থেকে অন্য গ্রহাণুতে ভ্রমণে বের হয়। প্রথমে তিনি যান এমন একটা গ্রহে যেখানে লোক একজনই। তিনিই তার দুনিয়ার নিঃসঙ্গ রাজা। তার কোনো প্রজা না থাকলেও তিনিই রাজা। কিছুটা আমাদের মতো আত্মকেন্দ্রিক মানুষের মতো।

“রাজা রাজপুত্রকে প্রথম দেখাকেই বলে, ‘ওহ, অবশেষে একটা প্রজা পেলাম।’

রাজপুত্র মনে মনে ভাবেন আমাকে দেখেই প্রজা ভাবলেন কিভাবে রাজ। রাজার দুনিয়া কতই না সরল। যাকে দেখবে তাকেই প্রজা নানিয়ে দিব।”

এ বিরাট সরলতাই বটে যে নিজেকে নিজ গ্রহের শ্রেষ্ঠ জীব ভেবে সকল থেকে নিজেকে আলদা করে নেওয়া।

রাজার সাথে তার নানা বিষয়ে কথা হয়। আত্মকেন্দ্রিক মানুষ অপরকে দ্রুতই ক্লান্ত করে দিতে পারে। রাজপুত্র এই রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে চাইল কেননা তার এখানে কিছুই করার নেই। রাজা তার এই প্রজাকে হারাতে চাইলেন না। ফলে, এমন এটা অফার তিনি রাজপুত্রকে দিলেন যেন সে তার রাজ্যেই স্থায়ী হয়।

“রাজা বলে, ‘তা হয় নাকি আবার! এখনই যাবে! তোমাকে আমি মন্ত্রী বানিয়ে দিব। থেকে যাও।’

‘কী মন্ত্রী?’ সে জানতে চাইল।

‘আইন মন্ত্রী, মনে করো।’

‘এখানে তো আর কোনো লোক নেই। কার বিচার করব?’

রাজা বলে উঠল, ‘তুমি নিজে নিজের বিচার করবে। জানো তো সেটাই সবচেয়ে কঠিনতম কাজ। তুমি যদি নিজের বিচার ঠিক মতো করতে পারো তবেই তুমি প্রজ্ঞাবান।’”

এইটাই আসল কথা। আমারা নিজের বিচার নিজে করেত পারি না। পারলেও সেই বিচারে নানা রকম পক্ষপাত থাকে। অপরের বিচারে আমরা অতি পটু।

এমনভাবে দেমাগি লোকে দুনিয়া, মাতালের দুনিয়া, ব্যাবসায়িকের দুনিয়া, বাতিওয়ালার দুনিয়া, ভূগোলবিদের দুনিয়া ঘোরার পর সে কোথাও স্থির হতে পারে না। অবশেষে সে দুনিয়ার মানুষ দেখবে বলে ঠিক করে। এসেই এক শিয়ালের সাথে দেখা হয়ে যায়।

“শিয়াল বলে, ‘গুড মর্নিং।’

‘তুমি তো ভারি সুন্দর।’ রাজপুত্র বলে, ‘কে তুমি?’

‘আমি শিয়াল।’

‘আমার মনে অনেক দুঃখ। চল আমারা খেলি।’

‘আমি তো তোমার পোষা না। আমরা খেলতে পারি না এই জন্য।’

রাজপুত্র এরপর জানতে চায়, ‘পোষ মানানো কী?’

শিয়াল বলে, ‘তুমি অন্য দেশের মনে হয়। দেখেই বুঝেছি। তা তুমি কি খুঁজছ এখানে?’

‘আমি মানুষ খুঁজি।’

শিয়াল বলে, ‘মানুষ সে অদ্ভুত জীব। বন্দুক রাখে, শিকার করে। ব্যাপারটা অসহ্য। আবার মুরগিও পোষে।’’

‘এই হলো মানুষ।’

‘পোষ মানানো কী?’

‘পোষ মানানো হলো নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন।’

‘কিভাবে পোষ মানায়?’

শিয়াল উত্তর দেয়, ‘অনেক ধৈর্য লাগে। প্রথমে তুমি দূরে গিয়ে বসবে। কোনো কথা বলবে না। আমি তোমাকে দেখব, তুমি আমাকে দেখবে। কোনো কথা বলব না আমারা। কথাই হলো দ্বন্দ্বের সূচনা। এরপর তুমি আমার কাছে আসবে একটু একটু করে। গা ঘেঁষে বসবে। আমরা বন্ধু হয়ে উঠব।’

বন্ধুত্ব হলো পারস্পরিক সহনশীলতা থেকে গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক স্থাপনের পর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য কথা বলা শুরু করতে হয়।

এই বইয়ের অনেকগুলো অনুবাদ আছে বাজারে। মানুষের বাইরের যে দুনিয়া আছে, তার বাইরের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সহজ সহায়ক পুস্তক এটি। এটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। আনন্দময়ী মজুমদারের একটা ভালো অনুবাদ আছে ছোট ও বড়দের উপযোগী। তার অনুবাদ থেকে কোট করি।

শিয়াল বলছে, ‘এই সত্য কথাগুলো মানুষ ভুলে গিয়েছে। কিন্তু তুমি যেন ভুলে যেয়ো না। একবার যাকে পোষ মানিয়েছ তার ভার সারা জীবন নিতে হবে। তোমার গোলাপের ভার তোমারই।’

‘আমার গোলাপের ভার আমার।’

কুকুর হলো দুনিয়ার আদিতম প্রাণী যে মানুষের পোষ মেনেছে। সভ্যতা যেখানে এসেছে সেখানে ঘোড়া, ধাতুর আবিষ্কার, বাষ্প ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ‌ থেকেও কুকুরের ভূমিকা বেশি। সে আমাদের বাঁচিয়েছে হিংস্র পশুর হাত থেকে রাতে ও দিনে। হয়তো নিজের জীবনও তাকে দিতে হয়েছে নিজ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ক্লান্ত শিকারি যখন শিকারের পিছে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত, বা অর্ধমৃত হয়ে ঝোপে আড়ালে লুকিয়ে গিয়েছে কুকুরই তখন শিকার খুঁজে বের করে দিয়েছে। আমরা নিজের প্রয়োজনে কুকুরকে পোষ মানিয়েছি। আমারাই শুধু কুকুরকে পোষ মানিয়েছি, তাকে রক্ষা করেছি এটা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা। এর ভিতর কোনো আত্মবিচার বোধ নাই। ‘তুমি নিজে নিজের বিচার করবে। জানো তো সেটাই সবচেয়ে কঠিনতম কাজ। তুমি যদি নিজের বিচার ঠিক মতো করতে পারো তবেই তুমি প্রজ্ঞাবান।’”


জীব মাত্রই স্বার্থপর। মানুষ, আপনারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্বার্থপর হয়ে উঠুন।


তবে শুধু এটা ভাবলেই চলবে না যে কুকুরকে আমরা পোষ মানিয়েছি শুধু। কুকুরও আমাদের পোষ মানিয়েছে। সে আমাদের পোষ মানিয়ে শিকার ধরিয়েছে। হিংস্র পশুর হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করছে। কারণ এই মানব প্রজাতি রক্ষা পেলে সে সহজেই খাবার পাবে। হিংস্র পশু আক্রমণে এলে মানুষকে সংকেত দিলে সে তার বর্শা, তির আর চিৎ‌কার নিয়ে গুহা থেকে বের হয়ে এসছে। কুকুরকে রক্ষা করেছে। তবে, কুকুরও কি আমাদের পোষ মানায় নি?

মানুষের পক্ষ থেকে এই ভার বর্জনের কোনো সুযোগ নাই। কুকুর যে আমাদের পোষ মানিয়েছে তা থেকেও তার ভার মুক্তির উপায় নাই। জগৎ‌ হলো মিথস্ক্রিয়ার যাত্রা। খণ্ডিতভাবে প্রকৃতিকে দেখলে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে সমগ্রের। মানুষ যদি কুকুরের মতো সকল কিছুর প্রত্যক্ষ উপকার-অপকার, প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রাণী ও বড় ত্যাগ করতে থাকে তবে আগামী দুনিয়ার না টেকার সম্ভাবনা বেশি। প্রাণ সংরক্ষণ করতে হবে। যারা পরিসংখ্যানের পাতা খুলে কুকুর নিধন করতে বা সীমিত পরিসরে সংরক্ষণ করতে চাচ্ছে তারা আসলে নেচারাল সিলেকশনকে অস্বীকার করতে চাইছে।

দুটো ঘটনা একবার চিন্তা করেন।

এক, আদিম মানুষ যদি বলত কুকুরের ডাক শুনে হিংস্র প্রাণীরা মানুষ কোথায় থাকে জেনে যায়। মাঝে মাঝে কামড় দেয়। কুকুর হটাও। তবে এই সভ্যতার ইমারত কোথায় যেত।

দুই, কুকুর যদি ভাবত মানুষের জন্য জীবন উৎ‌সর্গ করেতে হচ্ছে। দৌড় ঝাপ করতে হচ্ছে। চল এদের সঙ্গ ত্যাগ করে বনে চলে যাই। কুকুর অগণিত প্রাণীর মতো দুনিয়া থেকে নিশ্চিন্ন হয়ে যেত।

দুটো স্বার্থ সচেতন প্রাণী পরস্পরের কাছে এসেছে প্রাকৃতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ দৈবচয়নের ভিত্তিতে। সেখানে ঢাকা থেকে কুকুর তাড়ানো, সরানো, হত্যা করা বা বন্ধ্যাকরণ করা হলো আরো একটু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নিজের অস্তিত্ব বিপদপ্রস্ত করা।

জীব মাত্রই স্বার্থপর। মানুষ, আপনারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্বার্থপর হয়ে উঠুন। নেচারাল সিলেকশনকে বাস্তুচ্যুত করা স্বার্থপরতা না শুধু, এটা হঠকারিতা, স্টুপিডিটি বটে।।

পোষ মানানো মানে কী?

‘একবার যাকে পোষ মানিয়েছ তার ভার সারা জীবন নিতে হবে। তোমার গোলাপের ভার তোমারই।’

(66)