হোম গদ্য অন্যের পৃষ্ঠায় জীবনযাপন

অন্যের পৃষ্ঠায় জীবনযাপন

অন্যের পৃষ্ঠায় জীবনযাপন
862
0

ভূমিকা : 


আমরা এক জীবনে অনেকগুলো জীবনযাপন করি। সমান্তরালভাবে চলতে থাকে সংসারজীবন, কর্মজীবন, বইয়ের জগতে ভ্রমণের জীবন, অধুনা ভার্চুয়াল জীবন ইত্যাদি। বই পড়তে পড়তে মানুষ একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল জীবন কিংবা জগৎ পেয়ে যায়। এই জীবনটি দেশ কালের ঊর্ধ্বে—ত্রিকালস্পর্শী ও আন্তর্জাতিক (হয়তোবা মহাজাগতিকও)। জীবনের আসল গল্পগুলো গড়ে দেয়ার পিছনেও এই সমান্তরাল জীবন কিংবা জগৎটি প্রভাবক হিশেবে কাজ করে। আমাদের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কেটে যায় অন্যদের লিখিত পৃষ্ঠায় ঘুরে বেড়াবার আনন্দে কিংবা স্বপ্নে। অন্যদের পৃষ্ঠায় ভর করে এগিয়ে  যাবে এই সামান্য স্মৃতিকথা।  


বইয়ের গন্ধ :


ছোটবেলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু ছিল ‘আলিস্কো বিস্কিট’ আর ‘গল্পের বই’। এই জীবনে যত বই পড়বার কথা ছিল, তত বই আমার পড়া হয় নি, তেমনি ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞায় বিস্কিট জাতীয় খাবারও কমিয়ে দিতে হয়েছে। তবে স্মৃতিরানি যথেষ্ট প্রতারণা করলেও অনেক বই পাঠের কথাই বেশ মনে করতে পারি। কিছু কিছু বই পাঠের পর ইদানীং পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার অভ্যাসও হয়েছে। সেই সব স্মৃতি আর পাঠ প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়েই এ যাত্রা।


গল্পগুচ্ছ  আর গীতবিতান পড়তে শুরু করেছিলাম, যদিও আজও তা পড়া শেষ করতে পারি নি।


ছোটবেলায় বাসায় যে বইগুলো ছিল তার অধিকাংশই বাবা-মার বিয়ের ‘প্রীতি উপহার’—অধুনালুপ্ত সেকালের নভেল। আর লঞ্চ-স্টিমার যাত্রা বা রেলযাত্রায় বাবা কিনতেন আশুতোষ-নিমাই-ফাল্গুনীর চিতা বহ্নিমান কিংবা প্রিয় বান্ধবী। সে সব বই নাড়াচাড়া করতে করতে হয়তোবা পড়ে ফেলতাম আমি সি আই এর এজেন্ট নামের কোনো বই। আর প্রীতি উপহারের সেই তাক থেকে প্রথম পড়তে চেষ্টা করেছিলাম নজরুল কাব্য সঞ্চয়ন নামের বেগুনি রঙের কাপড়ে বাঁধাই করা নজরুলের বাছাই কবিতাই বই। ক্লাশ টু-থ্রিতে তো আর ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘ ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই’ কিংবা ‘ বিদ্রোহী’র মতো কবিতা নীরবে পাঠ করার সংযম অর্জিত হয় নি; সরব পাঠ শুনে বাসায় বেড়াতে আসা প্রতিবেশিনীরা মাকে বলতেন, “এইসব হার্ড কবিতা পড়ে তো ছেলের ব্রেন নষ্ট হয়ে যাবে আপা!” হায়, মা যদি সেদিন তাদের কথা শুনতেন!

একবার মা গেছেন এক সামাজিক অনুষ্ঠানে; ফিরতে দেরি দেখে বাবা নকশী কাঁথার মাঠ খুলে কিছুটা সরাসরি পড়ে আর কিছু বা গল্পের মতো বলে আমাকে জাগিয়ে রেখেছিলেন রাতের আহার পর্যন্ত, আর সেই থেকে রুপাই—সাজুর কাহিনি হৃদয়—কাদায় রোপিত হয়ে গেল।

আমার নিজের সম্পত্তি ছিল গুটিকয়—একটা রূপকথার সংকলন আর ড : হাসান জামানের ছয়টা বর্গাকৃতি রঙিন শিশুতোষ বইয়ের সেট (চার খলিফার জীবনী, ঈদ আর রমজান নিয়ে সচিত্র বই)। পাশাপাশি বন্ধুর বাসা থেকে পড়েছি বাঙ্গালীর হাসির গল্প‘র দুই খণ্ড। ছুটিতে ফুফার বাসায় বেড়াতে গেলে ফুফাত ভাইদের রাশান বইয়ের বিশাল সংগ্রহ ঘাঁটাঘাঁটি করেও বেশ কিছু বই শিশুতোষ বই পড়া হয়েছিল। আর বড়দের বইগুলো দেখে রোমাঞ্চিত হতাম।

আজ এই অবসরে দুঃখিনী মায়ের কান্না’র কথাও বলে ফেলি। ক্লাসে সিক্স পর্যন্ত পড়েছি গ্রামের স্কুলে। একদিন মাস্টার আফাজউদ্দিন নামে এক তরুণ আমাদের ক্লাসে ক্লাসে এসে গল্প শোনালেন; আমাদের মাঝে বিক্রি করলেন দুঃখিনী মায়ের কান্না নামের নভেল। কাহিনি পড়ে কেঁদেছিলাম কিনা আজ আর মনে নেই কিন্তু সেটাই ছিল জলজ্যান্ত একজন লেখককে সামনাসামনি দেখা। সে সময় আমাদের স্কুলের মাঠের সাজানো প্যান্ডেলে একদিন সৈয়দ আলী আহসানও এসেছিলেন সরকারি পরিচয়ে, তার আসল পরিচয় জানা ছিল না সেদিন।

বইয়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ক্লাশ সেভেনে উঠে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়ে পেয়ে গেলাম অবিশ্বাস্য এক লাইব্রেরি! কিন্তু বড্ড আফসোস, এই লেখার প্রথম লাইনটি আবারও বলতে হচ্ছে —সেখানে যত বই ছিল তার এক শতাংশও যদি পড়ে আসতে পারতাম!

পুনশ্চ : বিস্কিটের জন্য শোচনা আরও বেশি!


প্রথম ঈদসংখ্যা :


কিছু কিছু রূপকথা আর মহাপুরুষদের দু চারটা জীবনীতে ঘুরপাক খেতে খেতে একদিন ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় দৈনিক বাংলায় চোখে পড়ল ‘বিচিত্রা ঈদসংখ্যা ১৯৭৮’-এর বিজ্ঞাপন, এক এক দিন এক এক জন লেখককে হাইলাইট করে বিজ্ঞাপন হতো। ছোট থেকেই বাসায় দৈনিক বাংলা পত্রিকা দেখে আসছি আর সপ্তাহান্তে বিচিত্রা, যখন দৈনিক বাংলার দাম ৪০ বা ৬০ পয়সা আর ‘ভারতে বিমান ডাকে ৮০ পয়সা’! বিজ্ঞাপন দেখে মায়ের মাধ্যমে বাবার কাছে আবদার করতে হকারের কাছ থেকে পেয়ে গেলাম জীবনের প্রথম ঈদসংখ্যা! স্বপ্নের সেই সূচি থেকে মনে আছে—মির্জা আবদুল হাই এর ফিরে চলো, সৈয়দ হকের নিষিদ্ধ লোবান, মাহমুদুল হকের নিরাপদ তন্দ্রা ইত্যাদি—এ সব উপন্যাসের কিছুটা হয়তো পড়েছিলাম, কিছুটা হয়তো অলঙ্করণ দেখে বুঝে নিয়েছিলাম, তবে নামগুলো তখন থেকেই মনে গেঁথে আছে; এমনকি রনবীর আঁকা প্রচ্ছদ ছিল ‘উডকাটের লে আউট’ (একটা পাখির ছবি ছিল সম্ভবত)—এই উডকাটের লে আউট বস্তুটা কী তাও মনকে ভাবিয়েছে কম না। সেই ঈদসংখ্যা থেকে কাজী আনোয়ার হোসেনের উপন্যাসিকা (গিন্নী?) পড়েছিলাম, যার প্রথম লাইনটা এখনো মনে পড়ে—‘মনটা বিষিয়ে উঠল তরিকুল্লার’। এই তরিকুল্লা ধানমন্ডি লেকে মাছ ধরতে গিয়ে জলদেবতার অভিশাপে আর পানি পান করতে পারত না, তার গায়ে বৃষ্টি লাগত না ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছিল বেচারা! একই সময়ে কোথা থেকে হাতে এল সৌরজগ‌তের প্রচ্ছদ আঁকা হুমায়ূন আহমেদের তোমাদের জন্যে ভালোবাসা, বইয়ের পোস্তানীর কাগজে জনৈক আফজাল লাল সাইনপেন দিয়ে লিখেছিল, ‘মা, তোমার কাছে আমি ঋণী’। কাজীদা আর হুমায়ূন আহমেদের এই দুটোর লেখা আমাকে ভাবিয়েছে, সায়েন্স ফিকশন নামে যে আলাদা জাতের লেখা আছে তা মহামতি ফিহার কাছ থেকে জানলাম।

এর দু বছর পর আশি দিনে বিশ্ব ভ্রমণ দিয়ে শুরু করে একের পর এক সেবা প্রকাশনী থেকে বের হওয়া জুলভার্নের  অনুবাদগুলো (রহস্যের দ্বীপ, বেগমের রত্নভাণ্ডার, মরুশহর) পড়ে ফেললাম গোগ্রাসে। আমার মনে হতো, প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে মাসুদ রানা পড়ার অধিকার জন্মে না, সে আগ্রহও অবশ্য একটা সময় পর্যন্ত জাগে নি। চোখের সামনে মাসুদ রানা আর কুয়াশা বিনিময় হতো ক্লা‌শের ফাঁকে, দু একটা কুয়াশা পড়েছিলাম, মাসুদ রানা প্রথম পড়ি ক্লাস নাইনে নানাবাড়ি গিয়ে হাতের কাছে পেয়ে; পড়েছিলাম নিষিদ্ধ আনন্দে! ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর পড়েছিলাম নিরাপদ কারাগার আর পাশের কামরা—আমাকে খুব বেশি টানে নি (কিংবা টে‌নে‌ছে কিন্তু ‘বাঁধ‌নে জড়ায়‌ নি’!) বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের এই ২৭ বছর বয়স্ক মহানায়ক! অন্যদিকে একই সাথে হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে  আর শঙ্খনীল কারাগার পড়ে ফেললাম এই অবকাশে। ৮৪’র দিকে তিনি দেশে ফেরার পর একের পর এক বই প্রকাশ হচ্ছিল, আর বিচিত্রার গ্রন্থ আলোচনার সূত্র ধরে সোজা বাংলাবাজারে গিয়ে জোগাড় করে আনতাম অন্যদিন, সৌরভ, একা একা কিংবা শ্যামল ছায়া। এ সময়ে আমি নসাসের আজীবন সদস্যও হয়ে যাই (সদস্য নম্বর ১৩)।

এই সময়ে গল্পগুচ্ছ  আর গীতবিতান পড়তে শুরু করেছিলাম, যদিও আজও তা পড়া শেষ করতে পারি নি। আমার ছোট খালা মনে করলেন এই ছুটিতে পড়ার জন্য বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম-ই যথার্থ হবে। বইয়ের আকৃতি দেখে দমে গেলেও শেষ করেছিলাম; শেষ করে মনে হয়েছিল বইয়ের পাতা থেকে নায়ক বের হয়ে আমার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদ পড়ে মনে হয়েছিল—আমিও একদিন লিখতে পারব! মোটা বইয়ের প্রতি একটা ভীতি এখনও আছে; অনেক সময় মোটা বই সংগ্রহ করে রাখলেও পড়া শুরু করতে দুই থেকে পাঁচ বছরও লেগে যাচ্ছে! এই সময়ে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীনের ছোটগল্পের বই শালবনের রাজা, নলখাগড়ার সাপ এ সব বই পড়ে তার ছোটগল্পের শেষের নাটকীয়তাটুকু গল্পের জন্যে বেশি জরুরি নাকি হুমায়ূনের এক ধরনের শেষহীনতাই বেশি দরকারি—মাঝে মাঝে এইসবও ভাবতাম। এই ম্যাট্রিক পরীক্ষার ছুটিতে আমার পর্যটকের চোখে মান্ধাতা গগলস নামক কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি হতে থাকলেও পদাবলী গোষ্ঠীর একটা কবিতা সংকলন ছাড়া আধুনিক কবিদের কবিতার কোনো বই তখন পর্যন্ত পড়ি নি বা সংগ্রহে ছিল না (ব্যতিক্রম—শামসুর রাহমানের কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি, প্রাইজ পাওয়া বই)। সেই সঙ্কলনটি হারিয়ে গেলেও মুদ্রিত পৃষ্ঠাগুলো স্মৃতিতে আছে। শামসুর রাহমানের দুঃসময়ে মুখোমুখি, টেলেমেকাস, সিকদার আমিনুল হকের সুলতা জানে, রফিক আজাদের ভালোবাসার সংজ্ঞা আর চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, মুহম্মদ নুরুল হুদার আমরা তামাটে জাতি, আসাদ চৌধুরীর পেঁয়াজ আমার ননদী, হাবিবুল্লাহ সিরাজির হর্ষবর্ধনের হাতি, এ ছাড়াও মনে পড়ছে সাইয়িদ আতিকুল্লাহ আর হায়াত সাইফের কবিতাও ছিল। সেই বইয়ের কিছু কিছু কবিতার কিছু কিছু লাইন আমাকে টানতে থাকে। শামসুর রাহমানের ‘বাচ্চু’টা কে তা তখন নিশ্চিত করে জানতাম না, কিন্তু ‘স্মৃতির শহর’-এর সুবাদে ‘ছেচল্লিশ মাহুতটুলীর খোলা ছাদ’ কী সেটা চিনতাম। আর বাচ্চুকে একবার ‘তুই’ একবার ‘তুমি’ সম্বোধন করে ক‌বি তা‌কে চলে যেতে বলছেন সেই মাহুতটুলিতেই, সেটা এক ধরনের রহস্য সৃষ্টি করেছিল।

সেই ছুটিতে ট্রেনে করে দাদার বাড়ি যাচ্ছিলাম, পথে দেবদাস পড়া হয়ে যায়, তখন দেবদাস পড়ার প্রেরণা ছিল বুলবুল অভিনীত সদ্য মুক্তি পাওয়া বাংলা সিনেমা। ট্রেন ভ্রমণে পড়ছিলাম বলেই মনে হয় দেবদাসের বেদনার সমকক্ষতা অনুভব করতে পেরেছিলাম। এই যে ‘সমকক্ষতা অনুভব করা’র কথা বললাম, এটা অনেক বছর আগে সৈয়দ হকের বই থেকে পাওয়া শব্দবন্ধ, যা আমার নি‌জের ভাণ্ডা‌রেই ঢু‌কে গে‌ছে ক‌বে!

মাঝে মাঝে ভাবি, আমার বই পড়ার রুচিটা চিরকালই অদ্ভুত। ফটিকচাঁদ কিংবা বাড়ি থেকে পালিয়ে না ধরে আমি ধরতাম শাহরিয়ারের অ্যাডভেঞ্চার! তবে ক্লাস টেনে সত্যজিৎ রায়ের যখন ছোট ছিলাম আর রয়েল বেঙ্গল রহস্য পড়তে পড়তে আর এক দিগন্তের খোঁজ পেয়েছিলাম।


শহীদ খুরশিদ লাইব্রেরি :


সেই যে ক্লাস সেভেনে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়ে ছুঁতে পেরেছিলাম ‘শহীদ খুরশিদ স্মৃতি পাঠাগার’ নামের বিশাল এক স্বপ্নকে, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে সেই লাইব্রেরির স্মৃতি লিখতে গিয়ে পাশ কাটাতে হলো, নিজেকে বোকা বোকা লাগছিল, কেননা লেখা শুরু করবার আগে ভেবেছিলাম স্মৃতিগুলো অবিকল উদ্ধার করে আনতে পারব; আর আদতে কিছু বইয়ের নাম ছাড়া কিংবা কিছু মলাটের স্মৃতি ছাড়া অন্য কোনো কিছুই মনে পড়ছিল না—পাঠস্মৃতি তো একেবারেই না।

শহীদ খুরশিদ আলী মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন, তার নামেই লাইব্রেরি। লাইব্রেরি থেকে আমরা বই ইস্যু করতে পারতাম, কিন্তু সব বই নয়; কিছু কিছু বই লাইব্রেরিতে বসেই পড়তে হতো। মনে হয়, একসাথে একটি করে বই ইস্যু করা যেত। তো, একবার ইস্যু করলাম বই পড়া ভারী মজা—বইটা আমাদের আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের জন্য দরকারি বই ছিল; সম্ভবত হরফের বিবর্তন, আলতামিরা গুহার গুহাচিত্র—এ সব বিষয় নোট করবার জন্য ইস্যু করেছিলাম। বইটা ক্লাস এইটের এক সিনিয়র ভাই (সাজ্জাদ ভাই) দেখে ‘নেক্সট’ নিলেন, মানে, আমার পড়া হলে তাকে দিতে হবে। আমি আমার কাজ শেষ করে বইটা জমা দিয়ে ইস্যু করে ফিরলাম ইশপ’স ফেবলস কিংবা শাহরিয়ারের অ্যাডভেঞ্চার। পরে সেই সিনিয়র ভাই যখন জানলেন আমি তাকে ডজ দিয়ে বইটা জমা দিয়ে দিয়েছি, আমাকে জেরা টেরা করেছিলেন দু জন মিলে—সাজ্জাদ ভাই আর রাসেল ভাই (তার মানে, রাসেল ভাইও হয়তো বইটার ‘নেক্সটের নেক্সট ছিলেন), মৃদু কোনো একটা শাস্তিও দিয়েছিলেন মনে হয়। আমি ইচ্ছে করেই ভুলে যাওয়ার ভান করে বইটা জমা দিয়ে দিয়েছিলাম, কেননা জমা দিলে আরেকটা বই পাওয়া যাবে, অন্যদিকে সিনিয়র ভাইদের হাতে হাতে বই ঘুরতে থাকলে তো আমার ভবিষ্যৎটাই ঝরঝরে হয়ে যাবে!


একটা মাত্র বইয়ের (লা মিজারেবল) ভেতরে আমি বিশ্বটাকে উন্মোচিত হতে দেখছিলাম; বইটা পড়ে রাতারাতি আমি যেন বড় হয়ে গেলাম।


আমিনুল খুব দ্রুত পড়তে পারত, সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা সম্ভার ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়ার মতো করে পড়তে দেখেছি ওকে; আমি তিন থেকে চার লাইন পড়তে না পড়তেই ওর সেই পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যেত! ধীর গতিতে পড়ার জন্য কত বই না পড়ে সারেন্ডার করে গেছি! ওর কাছ থেকে মুজতবা আলীর বই নিয়ে দেখেছি—বেড়াতে বেড়াতে, লিখতে লিখতে, গড়াতে গড়াতে সৈয়দ মুজতবা আলী চলে যাচ্ছেন কাহিনির শাখা-প্রশাখায়, জলে-ডাঙায়, ডালে-পাতায়, শিরা- উপশিরায়। আধা পৃষ্ঠা, এক পৃষ্ঠা অন্যতর রসে খেই হারিয়ে আবার ফিরে পাচ্ছেন সম্বিৎ; লিখছেন—‘সে কথা আরেকদিন হবে’, আর ফিরে যাচ্ছেন কাহিনির সুতো ধরতে! জিয়াউদ্দিন পড়ত ক্ষুধার্তের মতো! কতদিন দেখেছি উপুড় হয়ে পড়ে আছে অবধূত, কালকূট কিংবা জরাসন্ধ নিয়ে। আর আমি ভেবেছি, লেখকদের নাম এরকম অদ্ভুত রকমের হয় কেন! ওই জরাসন্ধের বই আবার দোতলা থেকে রিজওয়ান এসে নিয়ে যেত। আমাদের কলেজ লাইব্রেরিতে খায়ের তরফদারের নামটা খোদাই করে রেখে আসতে পারলে ভালো হতো। ফ্রি টাইম শুরু হয়ে গেলে ও সবার আগে দৌড়ে লাইব্রেরিতে চলে যেত, নানারকমের বই থেকে নোট নিত (পৌর বিজ্ঞান সম্পর্কে ভ্যাটেল কী বলেছিলেন ইত্যাদি); একটু এক্সক্লুসিভ কিছু নিজের খাতায় টুকে নিতে পারলে কোনো কোনো বই আবার ভিন্ন আলমিরার বইগুলোর পিছনে লুকিয়েও রেখে আসত। এমনিতে সে তার অবসর সময় কাটাতে ভালোবাসত ডেল কার্নেগির বড় যদি হতে চান জাতীয় বইপত্র পড়ে। আমরা ডা : লুতফর রহমানের নীতিকথাগুলো (উন্নত জীবন, মহৎ জীবন) অবশ্যপাঠ্য হওয়াতে এমনিতেই জেরবার, কে আবার আরও বড় হতে চায়, যেখানে বড় হবার জন্য হাতে আমাদের অনেক সময়! শাহিন ছিল সেবা প্রকাশনীর একনিষ্ঠ পাঠক। ওর কাছে সেবার প্রতিটি বই-ই থাকত, রানা থেকে শুরু করে অনুবাদ, ওয়েস্টার্ন—স-অ-ব! আমি যদি ওর কাছ থেকে ধার করে কিছু কিছু বই পড়ে রাখতাম তাহলে আমার বাঙলাটা নিশ্চিতভাবে আরও ঝরঝরে হতে পারত!

জসীমউদ্‌দীনের ঠাকুর বাড়ির আঙিনায় পড়বার কথা মনে পড়ে। ছুটির দুপুরে চাদর মুড়ি দিয়ে কবির সাথে সাথে সেকালের জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির আতিথেয়তা নিয়েছি; এত সহজ সরল ভাষায় লেখা সে বইয়ের মর্ম সেদিন বুঝতে পারি নি। অনেক বছর পর কবির ‘জীবনকথা’ পড়তে গিয়ে তার সহজ জাদুকরি ভাষার স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল। আমার প্রতারিত স্মৃতি থেকে কোনোভাবেই একটা বই পড়ার স্মৃতি মুছে যায় নি, সেটা হচ্ছে ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবল। আমার মনে হয়েছিল, এই একটা মাত্র বইয়ের (লা মিজারেবল) ভেতরে আমি বিশ্বটাকে উন্মোচিত হতে দেখছিলাম; বইটা পড়ে রাতারাতি আমি যেন বড় হয়ে গেলাম।

গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য হ‌চ্ছে, আমা‌দের সাহিত্যের শিক্ষক র‌ফিক কায়সার স্যা‌র সেই সত্ত‌রের দশ‌কের শে‌ষের দি‌কেই তার কমলপুরাণ গ্র‌ন্থের জন্য খ্যাতিমান হ‌য়ে‌ছি‌লেন আর তার আরেকটা খ্যা‌তি ছিল হুমায়ূন আহ‌মে‌দের শঙ্খনীল কারাগা‌র —এ বই‌য়ের প্র‌বে‌শিকায় তার অমর সেই পঙ্‌ক্তি দু‌টো, “‌দি‌তে পা‌রো এনে এক‌ শ ফানুস/ আজন্ম সলজ্জ সাধ/ এক দিন আকা‌শে কিছু ফানুস ওড়াই।” দুটো বই-ই লাইব্রেরিতে ছিল, কিন্তু সেই কমলপুরাণ সেই বয়সেও নাড়াচাড়া করেছি, এই বয়সে সংগ্রহ করে রাখলেও বিষয়বস্তুর গভীরে আর প্রবেশ করতে পারলাম কই!

সেই লাইব্রেরি সমৃদ্ধ ছিল এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকাতে, চিত্রশিল্পের ছয় খণ্ডের বিরল এনসাইক্লোপেডিয়াতে, বিশ্ব সাহিত্যের বাংলা অনুবাদে (যেমন, মপাশাঁ পড়েছি আমি, ডন কুইক্সটের মিনি ভার্সন পড়েছি)। জনৈক তোসাদ্দেক লোহানি সম্পাদিত প্রতিদিন গাছ থেকে একটা করে সোনার আপেল খোয়া যাওয়ার রূপকথা ছেড়ে এসে আনমনা এনসাইক্লোপেডিয়ার পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমরা যেন বিশাল এক রূপকথার রাজত্বে পৌঁছে যেতাম!


অবাক জলপান :


মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের হাসপাতাল প্রাঙ্গণটি নিবিড় নিসর্গের মাঝে, ২০১১ এমনকি ২০১৬’র পুনর্মিলনীতে গিয়ে আমাদের ব্যাচের দু রাতের ডেরা ছিল হাসপাতালটি। দুটো-চারটে বই সাথে নিয়ে চার-পাঁচ দিন রোগবালাইয়ের সাথে বোঝাপড়া করবার একটা চমৎকার জায়গা। ক্লাস এইটের শুরুতে একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম এখানে কর্ণপ্রদাহে। এক সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনি একাদশ শ্রেণির তানভীর হাসান পাতা ভাই দস্তয়েভস্কির বঞ্চিত লাঞ্ছিত বুকের ওপর ভাঁজ করে রেখে পাশের বেডে শোয়া, বেশ কিছু ঘুমের বড়ি খেয়ে সদ্য আত্মহত্যার ভয় দেখানো এক বড় ভাইকে জীবনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জীবনের জয়গান শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতির চাহিদা অনুসারে আমি আবারও ঘুমের ভান করে কথোপকথনটি শুনছিলাম আর ভাবছিলাম মহান লেখকের বই কিভাবে আর দশটা ক্যাডেটের চেয়ে ওই ভাইয়াটিকে চমৎকার যুক্তি প্রয়োগ করতে আর জীবনদর্শন শিখিয়েছে। কিন্তু শহিদ খুরশিদ পাঠাগারের মহান লেখকদের বইয়ের তাকে হাত রাখবার আগেই ১৯৮৪ তে আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ চত্বরে।

ক্লাস এইটে আমাদের দ্রুত পঠন ছিল বুদ্ধদেব বসুর আমার ছেলেবেলা। সবুজ আর কালোর অনাড়ম্বর মলাটের বইটির প্রথম বাক্য ‘আমি জ‌ন্মে‌ছিলাম কুমিল্লায়’—সেই যে বইটির প্রতি একটা একাত্মতা এনে দিল, কবির দাদুর সাথে নোয়াখালি শহর ঘুরে বেড়ানো, শহরের নদীভাঙনের স্মৃতি, তখনকার বনেদি পরিবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘মহিলারা ডাবের জলে পা ধোন’—এইসব টুকরো টুকরো পাঠস্মৃতি আজও মনে পড়ে। এক একটা নতুন, ভালো বই শিশু-কিশোরদের জন্য এক একটা সুজলা সুফলা মহাদেশের মতো।

যা বলছিলাম, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় একদিন আমাদের অধ্যক্ষ লুতফুল হায়দার চৌধুরী স্যার, রফি, মতিন, সম্ভবত জিয়াউদ্দিন হায়দার আর আমাকে পাঠালেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে। ওখানে পৌঁছার আগে কিছুই জানা ছিল না। হাজির হয়ে দেখি আমাদের চারজনকে আর বদরুন্নেসা কলেজের চারজন ছাত্রীকে ডাকা হয়েছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার কথা বললেন, নির্ধারিত কোনো বিষয়ে না; পাশে ছিলেন আহমাদ মাযহার ভাই। সায়ীদ স্যার এক পর্যায়ে বলছিলেন, “চল্লিশ কোনো বয়সই না”। কী প্রসঙ্গে বলেছিলেন তা আর এই উত্তর-চল্লিশে আমার মনে নাই। আমি কথাটা খুব মানতে পারি নি, কেননা চল্লিশ বছর বয়সী বাবাকে দেখেছি, শিক্ষকদেরকে দেখেছি—সবাই তো আমাদের অনেক বড় আর গুরুজন! তাদের চল্লিশে উপনীত হওয়াটা কোনো ঘটনাই না! স্যারের দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে (আমরাও কী আলাপে যোগ দিয়েছিলাম নাকি শুধুই শ্রোতা ছিলাম তা আর মনে নাই; ছেলেরা মেয়েদের সাথে কোনো বাক্যবিনিময়ও করি নি—মনে আছে) মাযহার ভাই আমাদের সবাইকে এক কপি করে কৃষণ চন্দরের গাদ্দার দিলেন এবং বলছিলেন গাদ্দার পাঠের কিছু সুখস্মৃতি। বুঝিয়ে দিলেন, আমাদেরকে বইটি পড়ে পরের বুধবার দুপুরের পর এসে এই বই নিয়ে আলোচনা করতে হবে, আর সেদিন আমরা আরও একটি বই পাব। মন দিয়েই পড়েছিলাম, কিন্তু বই শেষ করে পরের সপ্তাহে এসে আলোচনায় অংশ নেয়ার সাহস হলো না। এর পরের সপ্তাহে গিয়ে পেলাম সুকুমার রায়ের সমগ্র শিশু সাহিত্য, লাল প্রচ্ছদে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা হ-য-ব-র-ল’র বিড়াল মশাই! এই বইটি পড়তে পড়তে আমিও লিখে ফেলেছিলাম একটা হযবরল—জাতীয় লেখা, আর ‘অবাক জলপান’ নাটিকায় নিজেই নানা ভূমিকায় অভিনয় করে ক্যাসেটে বন্দিও করেছিলাম। এদিকে, আমাদের অধ্যক্ষ স্যার সাহিত্যানুরাগী মানুষ হলেও আমাদের কলেজ কর্তৃপক্ষ সহপাঠ্যক্রমিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ছেলেরা কলেজের বাইরে এত ব্যস্ত হয়ে যাবে সেটা চান নি। এই ভাবে আমাদের পাঠচক্রের বরফ গলবার আগেই পুনর্বরফের নিয়তি দেখতে হলো। সেই থেকে সুকুমার রায়ের বইটি আমার হাতেই রয়ে গেছে। 


চলমান বৃক্ষ ও ‘৮৫র বইমেলা :


লাইব্রেরির কথা বলেছি, কিন্তু কেবলমাত্র একটা জড় লাইব্রেরি কি আর পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে! আমরা আমাদের বই পোকা শিক্ষকদেরকেও দেখতাম, মুজিবুর রহমান স্যার, শিকদার স্যার, তওফিক হোসেন স্যার কিংবা রফিক কায়সার স্যার ছিলেন চলমান গ্রন্থাগার! সব সময় হাতে কোন না কোন বই থাকত তাদের। আমার শুধু নজরুলের আঁকা সেই কার্টুনটা মনে ভাসত—বন উজাড়ের ফলে একটা পাখি তার ছানাকে নিয়ে হরিণের শিঙে বসে আছে—মা এক শিঙে, ছানা আরেক শিঙে; মনে হচ্ছে ওটাই এখন তাদের বাসা। মা তার ছানাকে বলছে, “হ্যাঁ বাছা, এটাই চলমান বৃক্ষ! চারপাশে এমন চলমান বৃক্ষের মতো চলমান সব লাইব্রেরি ঘুরে বেড়াতে দেখাও বই পড়ার অভ্যাস গড়তে সাহায্য করেছে। এই মুজিবুর রহমান স্যার সিভিকস পড়াতেন, ইংরেজিতেও তার উচ্চতর ডিগ্রি ছিল সম্ভবত। একবার ‘জাতীয় উন্নয়নে বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে শ্রমজীবীদের ভূমিকা বেশি’—এমন একটা বিতর্কে অংশ নেব বলে স্ক্রিপ্ট লিখে রিহার্সাল করতে গিয়ে দেখি হাউস মাস্টার স্যার মুজিবুর রহমান স্যারকে নিয়ে এসেছেন। আমি ঘামছিলাম, কেননা জর্জ এলিয়টের নামে যে উদ্ধৃতিটি আমার স্ক্রিপ্টে আছে, তা আসলে মনগড়া, ভুয়া! স্যার ঠিকই ধরে ফেললেন, রেফারেন্স চাইলেন। মুহম্মদ ছাদিক স্যার ইসলামিয়াত পড়াতেন, তিনি ছিলেন ট্রিপল এম এ; তখন অবশ্য এটা বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো যে তিনবার একই ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজনটাই বা কী! যা হোক, ক্যাডেটদের মধ্যে ছাদিক স্যারের একটা বেস্ট সেলার বই ছিল, নাম পৃথিবী ও সূর্য দুটোই ঘুরে : আল কুরআনের বাণী—কুরআনের আলোকে ব্যাখ্যা করা। এই বই পড়ে দুর্জন বড় ভাইরা বলতেন, কেবলমাত্র পৃথিবী আর সূর্যই না, বই পড়তে শুরু করলে পাঠকের মাথাও ঘুরে!

ওই বয়সে যত না বই পড়েছি তার চেয়ে মনে হয় বই দেখতাম বেশি, দেখতে ভালো লাগত। আবার, বড়দের বই, ছোটদের বই-এর ভেদরেখাটা কোথায় সেটা না বুঝে, কিংবা কখনো কখনো ‘বড়দের বই’য়ের সহজপ্রাপ্যতা কিংবা ছোটদের বইয়ের অপ্রাপ্যতার কারণে এমন কিছু বইও পড়েছি যা ওই বয়সে পড়ার কথা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটক এমন একটি বই। বাবা এক সময় নাটক থিয়েটারও করতেন। বাসায় ছিল, পড়ে ফেলেছিলাম এবং আলোড়িত হয়েছিলাম। বিসর্জনের ভূমিকায় একটা কথা ছিল—“আইনের লৌহছাঁচে কবিতা কভু না বাঁচে।” এই লাইনটা আমার কিশোরবেলার পাণ্ডুলিপির প্রবেশিকা পাতায় উদ্ধৃত করে রেখেছিলাম। এই অভ্যাস দেখেছি আমার ছোট মেয়ের মধ্যেও। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় তাকে দেখেছি মাহমুদুল হকের কালো বরফ পড়ছে!

ছোটবেলার ঈদসংখ্যা বাদ দিলে মাহমুদুল হক প্রথম পড়ি কলেজ জীবনে—‘জীবন আমার বোন’। চেনা পরিচিত পরিবেশে এমন ক্যাজুয়াল রচনারীতি ছিল অভাবনীয়। সাহিত্যে সাধারণত সেই জীবনকেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম যে জীবন আমি যাপন করি নি। উপন্যাসে ভাইবোনের খুনসুটি আর রঞ্জু চরিত্রটির অন্যমনস্কতা খুব টেনেছিল। একই সময়ে আবদুশ শাকুরের সহেনা চেতনা পড়ে ক্যাজুয়াল রচনারীতির সাথে গদ্যে এমন অনুপ্রাস আর ‘পান’ মিশিয়ে রস সৃষ্টি করা যায় সেটা তার কাছ থেকে দেখলাম। কলেজ জীবনে আরেকটা পছন্দের বই ছিল ই এম ফরস্টারের এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া; উপন্যাসটা সিনেমা হয়ে অস্কারের উৎসবে নাম করেছিল জেনে পড়তে বসা। আমার মুভিটা দেখা হয় নি, কিন্তু বই পড়তে পড়তে মুভিটা কল্পনা করে নিয়েছিলাম, ভিক্টর ব্যনার্জিকেও যেন-বা বইয়ের পাতায় দেখতে পাচ্ছিলাম! তিনটা বই-ই হারিয়ে গেছে আমার।


সে-এক স্বপ্নের জগৎ, সে-এক মায়ার জগৎ কিংবা সে-এক মতিভ্রমের জগৎ!


৮৪- ৮৫ তে একুশের বইমেলা আবিষ্কার করে ফেললাম। বিশেষ করে ৮৫’র বাঙলা একাডেমি বইমেলা আমার পাঠক জীবনে এক অনন্য ঘটনা। সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা; কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন রোজ বিকেলেই ঠিক গিয়ে মেলায় হাজির হতাম। কবি-লেখকদেরকে একটু দূর থেকে দেখতাম (এই জড়তা আর কাটে নি)। স্টলের বাইরে টেবিল পেতে মোহাম্মদ রফিকের কবিতার বই বিক্রি হচ্ছে কিংবা শহীদুজ্জামান ফিরোজও তার কালো মলাটের কবিতার বই আনন্দে না, বেদনায়ও না  নিয়ে বসে গেছেন টেবিলে কিংবা মাদুরে—এই সব দৃশ্য আমরা আর কোনোদিন দেখব না। একটা ঝোলা কাঁধে পোড় খাওয়া রাজনীতির মানুষ আবদুশ শহিদ তার কারা স্মৃতি বইটা ফেরি করে বিক্রি করতেন দেখেছি। আমাকেও একবার সেধেছিলেন একটা বই কেনার জন্যে, কিন্তু সে বইয়ের মর্ম কি তখন বুঝি! অনেক পরে শেখ রফিকের খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড বইটা হাতে এলে এই কমরেড সম্পর্কে জেনেছিলাম। কিংবা কালো ব্যানারে শাদা অক্ষরে  এখানে নির্মলেন্দু গুণকে পাওয়া’ যায় টাঙিয়ে কবি বসে আছেন পাণ্ডুলিপির স্টলে! হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি তার ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’র প্রচ্ছদ বাতিল করে  দিয়ে সম্ভবত প্রকাশককে বলছেন, “প্রচ্ছদ  শিল্পীর নাম হবে ফয়জুল কবির। তার করা ইতালীয় কাহিনি দ্য একসরসিস্টের অনুবাদ বেরিয়েছে ‘সেবা’ থেকে, অন্যদিকে গল্পটিকে নিজের মতো করে লিখে বের করলেন অন্য নাম দিয়ে, অন্য এক প্রকাশনী থেকে। ডানা প্রকাশনী থেকে সংগ্রহ করেছিলাম মুনতাসীর মামুনের ছোটগল্পের বই কড়া নাড়ার শব্দ কিংবা হায়াত হোসেনের নাফ নদীর তীরে। মুনতাসীর মামুন আমাকে অটোগ্রাফ দিতে দিতে আসাদ চৌধুরী এসে তাকে বলছেন, “বাউলদের নিয়ে কাজটা তো আর করলেন না!” ওদিকে তরুণ কবি ফরিদ কবির (যাকে তখন চিনি ছবি আর অটোগ্রাফসহ কবিদের হাতে লেখা কবিতা সঙ্কলনের সুবাদে, সম্পাদকও তিনি) সৈয়দ আল ফারুকের সাথে হাঁটতে হাঁটতে কী আনন্দে ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ এই এক কলি গেয়ে কোনো বৈকুণ্ঠে উড়ে যাচ্ছেন (পরে জেনেছি তার প্রথম কবিতার বই হৃৎপিণ্ডে রক্তপাত  বেরিয়েছিল সেবার), কিংবা ইকবাল আজিজকে কেউ বলছে মতিহার নিয়ে লেখা  আপনার এই কবিতাটা একদিন শ্রেষ্ঠ কবিতার বইতেও রাখবেন। জবাবে কবির মুখভঙ্গি কিছুটা আক্রমণাত্মক ছিল;  আমি কবিকে দেখছি ‘কবি দেখা’র মতো করে,  কিন্তু আমার বন্ধু আমিনুল বলছে, ‘এইটা কি কবির চেহারা!’ এই বইমেলায় কত গল্প উপন্যাস আর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধের বই মুখোশ ও মুখশ্রী কিংবা উপরকাঠামোর ভিতরেই সংগ্রহ করেছিলাম  তার সঠিক হিশেব নেই, কিন্তু শামসুর রাহমানের সম্ভাব্য সবগুলো বই-ই মেলা থেকে সংগ্রহ করেছিলাম মনে পড়ে; যেমন শিরোনাম মনে পড়ে না, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে, ইকারুসের আকাশ (সব্যসাচী প্রকাশনী) কিংবা টেবিলে আপেলগুলো হেসে ওঠে (আফজাল হোসেনের দুর্দান্ত প্রচ্ছদ)।


সে-এক স্বপ্নের জগৎ, সে-এক মায়ার জগৎ  :


শহিদ খুরশিদ লাইব্রেরি ফেলে এসে যে কলেজ লাইব্রেরিটা পেলাম, প্রথম দর্শনে সেটা আমার পছন্দ হলো না এবং সেটাই ছিল শেষ দর্শন। সেই লাইব্রেরিতে অকালপ্রয়াত চন্দনের নামে তার পরিবার থেকে একটি কর্নার করে দিয়েছিল।

এদিকে আমার ফেলে আসা বন্ধুরা শহিদ খুরশিদ লাইব্রেরির যৌবনকাল উপভোগ করছে। মামুন, মূর্তজা, হায়দার, সিদ্দিকীরা পাল্লা দিয়ে কবিতার বই পড়ত—নির্মলেন্দু গুণের নির্বাচিতা, হুমায়ুন আজাদের অলৌকিক ইস্টিমার, শামসুর রাহমানের সমুদয়, কাহলিল জিব্রান, জীবনানন্দ কাব্যসম্ভার, রফিক আজাদের চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া  কিংবা সুকান্ত সমগ্র। বাবুল ভাইকে জিব্রান পড়তে দেখেছিলাম; আমি ভাবতাম এইসব উচ্চমার্গের কবিতা পড়তে পড়তে একদিন তার মতিভ্রম হতে পারে! অনেক বছর পর আমাদের ছোট ভাই সিয়াম অনুবাদ করেছিল জিব্রানের রত্নভাণ্ডার। যা বলছিলাম, আমার বন্ধুরা তখন ক্রিকেট খেলার মাঠে দর্শক সারিতে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়ার পর্ব পেরিয়ে আসছে। মোস্তফা আমিনকে ক্রিকেট মাঠে বসে হুমায়ূন আহমেদের নিশিকাব্য পড়তে দেখেছি। আর জাহিদ খান যেহেতু নিজেই কবিতা লিখত, তার আর তেমন কবিতার বই পড়ার প্রয়োজন ছিল না। আমি সেদিন মাইকেলের বাড়ি গিয়ে মাইকেল ভাস্কর্যের সাথে ছবি তুলেছি, প্রবাস থেকে জাহিদ খান সেই ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আস্ত একটা ইংরেজি সনেট লিখে পাঠাল! পরে আমি হিশেব করে দেখেছিলাম, আমিও একই সমান্তরালে প্রায় একই পাঠ্যসূচিতেই ছিলাম কিন্তু তফাতটা এই যে ওদের সাথে পাঠ অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে পারি নি। আমি তখন আহমেদ রফির সাথে সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় শক্তির যেতে পারি কিন্তু কেন যাব বইয়ের আলোচনা পড়ে সরাসরি নসাসে গিয়ে সেই বই কিনে নিয়ে আসি, পড়ি সুনীলের কবিতা। আমার ফুফাত ভাই কবি মুহাম্মদ সামাদের বন্ধু, তিনি পড়তে বললেন একজন রাজনৈতিক নেতার ম্যানিফেস্টো। বলাকার সামনে থেকে একদিন পেয়ে গেছিলাম সস্তায়।

মনে পড়ছে, এক না-হওয়া বইয়ের কথা। কবিবন্ধু উবাইদুল্লার সাথে আমার অনেক পরিকল্পনা ছিল, স্বপ্ন ছিল। নাম ছাপানোর ছলে বার্ষিকীতে আলতামিরার গুহাচিত্র নিয়ে লিখেছিলাম যৌথভাবে, ইচ্ছে ছিল কোনো একদিন এক মলাটে কবিতার বই করব দুই বন্ধু মিলে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করছি, তখন সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যায়।

হায়দার, পার‌ভেজ আর মূর্তজারা কিন্তু বই পড়েই তৃপ্ত ছিল না, ওরা মার্ক টোয়েনের ধরনে লাইব্রেরি গড়ার কায়দায় ওই লাইব্রেরি থেকে সুবিধা মতো নিশিকুটুম্বের মতো বই সরিয়েও রাখত। জ্ঞান তৃষ্ণার অন্তত কমতি ছিল না। নিশিকুটুম্বের কথা এই বেলা বলা না হলে ভুলে যাব। একবার ট্রেনে মনোজ বসুর নিশিকুটুম্ব পড়তে পড়তে চাঁটগা পৌঁছলাম। আমার সিটের পিছনে একটা ডিম লাইট পড়েছিল, আশ্চর্য হয়ে পরে দেখলাম, আমি সেটা নিশিকুটুম্বের চোরের কায়দায় সরিয়ে ফেলেছিলাম! বা‌তিটা আসলে অকে‌জো ছিল! ঢাকাতে চিকিৎসার নাম করে এসে গুলিস্তান থেকে পুঁথি (রাস্তার কবিতা) কিনে নিয়ে যেত কেউ কেউ, সুর করে হল্লা করত অবসরে। ছোটবেলায় আমি ভূট্টোর ফাঁসির কবিতা’ (পুঁথি) পড়েছি।

মামুন একটা খতিয়ান দিয়েছিল, কবিতা পড়তে পড়তে ওদের কালজয়ী ক্লাসিকগুলোর সাথে পরিচয় ঘটে যায়; টলস্টয় আর দস্তয়েভস্কি পড়ে চারপাশটাকে চিনতে শেখে ওরা। মাসুদ রানা, কুয়াশা কিংবা বনহুর পড়ে পড়ে অভ্যস্ত একাকী পথ চলা থেকে বিশাল জীবনের বহুমাত্রিকতায় পা দিয়ে চোখ গেল ধাঁধিয়ে। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি থেকে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভলগা থেকে গঙ্গা হয়ে মতি নন্দীর ফুটবল পর্যন্ত দাবড়ে বেরিয়েছে শরীফ কিংবা আমিনুল। শহিদ খুরশিদ স্মৃতি লাইব্রেরির দুপুরগুলোতে আমার বন্ধুরা এইভাবে রূপান্তরিত হতে থাকে, বিহ্বল হতে থাকে।

ফজলু আতিক কিংবা খায়ের যখন পাঠ্যপুস্তকের উচ্চতর রেফারেন্স খুঁজত, মামুনের সাথে তখন বন্ধুত্ব হয়ে গেল এজরা পাউন্ড আর টি এস এলিয়েটের; বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদলেয়ারের ক্লেদজ কুসুম পড়ে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় ছেঁড়া জুতো পড়ে ফ্লানিউর হয়ে নাচা কিংবা ফুটপা‌তের চা‌য়ের কা‌পে চুমুক দি‌য়ে ইতিহা‌সের ক্য‌া‌ফে‌গু‌লোতে চ‌লে যাওয়া—সে-এক স্বপ্নের জগৎ, সে-এক মায়ার জগৎ কিংবা সে-এক মতিভ্রমের জগৎ!


বই ধার দিও না :


আমার মনে হচ্ছে ‘বই ধার দিও না’ নামে কোনো বইয়ের মলাট আমি দেখেছিলাম; কিন্তু পড়া হয় নি সে বই। বই ধার করে করে ফেরত না দিয়ে কেউ কেউ একটা আস্ত লাইব্রেরিও গড়ে ফেলে—এ কথা তো এখন কিংবদন্তি! (পরে একজন মনে করিয়ে দিয়েছেন এই নামে বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস আছে)।

সারাটা জীবন ধরেই বই ধার করে আসছি, ধার দিয়ে আসছি তার চেয়ে বেশি! ফলাফল হিশেবে কিছু বই আমার র‍্যাকে রয়ে গেলেও র‍্যাক থেকে প্রস্থান করেছে সিংহভাগ।

শৈশবে বই ধার পেতাম শাহীনদের কাছ থেকে। সে এক বীররসে ভেজানো কাহিনি! ওরা ছুটি হলে সিরাজগঞ্জ যাবার সময় ওদের লাইসেন্স করা বন্দুকটা আমাদের বাসায় রেখে যেত, সাথে শাহীন আর লিটন ভাইয়ের কিছু গল্পের বই (যেমন, বাঙালির হাসির গল্প, নেংটি ইঁদুরের গল্প, নীল পাতা) আমাকে ধার দিয়ে যেত। ছুটি শেষে ফেরার পথে বন্দুক আর বই একসাথে চলে যেত।

এই মাত্র আমার র‍্যাকটা রেকি করে এসে দেখলাম ধার করা বইয়ের মধ্যে বন্ধুবর রুমী আহমেদের কাছ থেকে ধার করা শক্তির ভাত নেই, পাথর রয়েছে নামক একটা কৃশকায় কবিতার বই ছাড়া আমার তেমন কোনো অর্জন অবশিষ্ট নাই ( শক্তির ভাষাতেই বলি—“লিখিও উহা ফেরত চাহ কীনা”)। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর জিললুর ভাইয়ের কাছ থেকে ধার করা মাহমুদুল হকের প্রতিদিন একটি রুমাল ফেরত দিয়ে এসেছিলাম তিনি যখন হাঁটুর অপারেশনের জটিলতা নিয়ে এক পাঁচ তারকা হাসপাতালের শয্যায় সমাসীন ছিলেন। সাথে শাহাদুজ্জামানের আমস্টারডামের ডায়েরি’টা ধার হিশেবে দিয়েছিলাম, সম্ভবত উনি সেটাকে উপহার-জ্ঞানে এস্তেমাল করেছেন!

ক্লাস টেনে সুকান্ত খুব টানত, এমন দিনে ‘সুকান্ত বিচিত্রা’ নামে একটা বর্ণাঢ্য, মনোরম বই দেখি ছোট খালুর বাসায়। ধার নিতে আর বিলম্ব করি নি, চোরাই মালের মতো রেখেও দিয়েছিলাম নিজের কাছে; কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। সেই বইয়ের সূত্র ধরে সুকান্ত আর তার বন্ধু অরুনের চিঠির ভাষায় প্রভাবিত হয়ে (যেমন প্রভূত আনন্দদায়কেষু, আশানুরুপেষু ইত্যাদি সম্বোধন) কবিবন্ধু উবাইদুল্লাহর সাথে পত্রালাপ করতাম। আরেক শিকদার বংশীয় খালুর বাসাভর্তি ছিল সিরাজ শিকদারের রচনাবলী;  ধার নিতে আগ্রহ পাই নি কখনো।

ময়মনসিংহের চাকরিজীবনে শ্বশুর সাহেবের কাছ থেকে বই ধার নিয়ে যেতাম, আবার ফেরত দিয়ে নতুন করে ধার নিতাম। এইভাবে পড়া হয়েছে টলস্টয়ের ‘পুনরুজ্জীবন’(রেজারেকশন), অবধূতের মরুতীর্থ হিংলাজ, সঞ্জীবচন্দ্রের পালামৌ, নজরুলের গল্প সংকলন,  মোরারজী দেশাইয়ের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে লেখা বই। সবগুলো বই-ই কঠিন সময়ের উত্তম সঙ্গী বলে বিবেচনা করি। আমার ভাগ্নী চৈতি–অর্চিদের সংগ্রহ থেকে পড়েছি শীর্ষেন্দুর কয়েকটা নভেলা, ‘বাদশাহ নামদার’-সহ হুমায়ূন আহমদের কিছু উপন্যাস। ওদের বাসায় বসে কৃশকায়গুলো শেষ করতাম আর ধার করে ফিরতাম গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম,  শাহীন আখতারের তালাশ কিংবা আনা কারেনিনা

বই ধার দেয়া-নেয়াটা অবশ্য বন্ধুদের সাথেই ঘটেছে বেশি। স্কুলজীবনে কারো কাছে বই ধার চাইতে সঙ্কোচ বোধ করতাম; কিন্তু যেদিন থেকে সেটা দেয়া-নেয়ায় উন্নীত হতে থাকল, তখন সঙ্কোচ গেল ঘুচে। কলেজ জীবনে বন্ধু সোহেলের কাছ থেকে ধার করে পড়েছি রফিক আজাদের কবিতা সংগ্রহ; সাফায়েতের সাথে কত বই বিনিময় হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। তবে ও আমাকে দেশ পত্রিকার সুবর্ণ জয়ন্তী কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ সঙ্কলনগুলো ধার দিতে পারে নি, কেননা বইগুলো ছিল ওর বোনের। জয় গোস্বামীর ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা বের হওয়ামাত্র তিতাসের বাসায় দেখে পড়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। ওর বাবা মমতাজ উদদীন আহমেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই বলে ধার না পাওয়ার বেদনা নিয়ে ফিরে আসছিলাম সেই ঈদের দিন—কিন্তু বন্ধু আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ঠিক দুদিনের জন্য ধার  দিয়েছিল। অবশ্য আমার একটা রাতই যথেষ্ট ছিল জয়ের নবধারাজলে স্নান সমাপন করতে!


কবিতার ক্লাস নিয়ে মশগুল হয়ে থাকলাম বেশ কিছুদিন। বইটা পড়ছি আর অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের খেলা খেলি, মূলত অক্ষরবৃত্ত। 


বই ধার দেয়ার ব্যাপারে আমি বেশ মুক্তহস্ত। কিন্তু যে সব বন্ধু বাসায় খুব কম আসত, কিংবা হঠাৎ করেই আসত, তাদের কেউ কোনো একটা বই পছন্দ করে ফেললে প্রমাদ গুনতাম, কিন্তু অবলীলায় ধার না দিয়েও পারতাম না। ভাবতাম আমি পড়ে যে আনন্দটা পেয়েছি, অন্যেরাও সেই আনন্দটুকু পাক—আড্ডায় যখন  বইটা  নিয়ে কথা উঠবে তখন তা হবে আরো আনন্দের! শঙ্কর আর হুমায়ূন আহমদের অনেক বই-ই সংগ্রহে ছিল, কিন্তু রয়ে গেছে কেবল জন অরণ্য আর অন্যদিন। কলেজ জীবনে ইমদাদুল হক মিলনের ও রাধা ও কৃষ্ণ নামের একটা বই ছিল হটকেক! টিভিতে ফরীদি-সুবর্ণা ওই কাহিনির নাটকে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। সেই বইতে এবং নাটকেও ডব্লু এইচ অডেনের সেই অমোঘ বাণীটি ছিল নায়কের মুখে—“উই শ্যাল লাভ ইচ আদার অর ডাই”—সেই বই ধার দিয়ে না হারিয়ে কী আর উপায় ছিল! আমি নিজেও বেশ প্রভাবিত হয়ে লিখেছিলাম— “ভালোবাসব দুজন মোরা/ বলবে সবে কেমন জোড়া!/ নয়তো দেবো গলায় ফাঁস/ দেখবে সবে যুগল লাশ!”

ধার করে পড়েছিলাম ভূমেন্দ্র গুহের আলেখ্য জীবনানন্দ। মেডিকেল কলেজের ছাত্র ভূমেন্দ্র গুহ ও তার বন্ধুদের ইচ্ছে ছিল জীবনানন্দ দাশের কাছ থেকে একটি কবিতা নিয়ে তাদের নতুন পত্রিকা ‘ময়ূখ’-এ প্রকাশ  করবেন। কবির সাক্ষাৎ পেলেও তার কঠিন খোলশ অতিক্রম করা কঠিন ছিল। দিনের পর দিন তারা সঙ্গী হলেন কবির বৈকালিক ভ্রমণে।  কবিকে তারা বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন যে তাকে সামনে রেখেই ময়ূখের যাত্রা শুরু হবে।  ভূমেনরা  রবার্ট ব্রুসের ধৈর্য নিয়ে কবির নৈকট্য লাভ করেন, নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হতে থাকে; কিন্তু সেই কবিতা আর পাওয়া হয় না। শেষাবধি কবি চলেই গেলেন। তখন জীবনানন্দের প্রকাশিত কবিতার সংখ্যা মাত্র ২৭০টি।  ভূমেন ও তার বন্ধুরা হাসপাতালে কবির জন্য অনেক খেটেছিলেন। শেষাবধি ময়ূখ বের হলো কবির স্মৃতি নিয়ে। কালক্রমে কবির পাণ্ডুলিপি বোঝাই ট্রাঙ্কগুলো পুনর্লিখন করে, সম্পাদনা করে  জনসমক্ষে আনার গৌরবময় কাজটিও ভূমেন্দ্র গুহেরই করা। বিখ্যাত এই ট্রাঙ্কগুলো নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিল। কে জানে কবির কী ইচ্ছে ছিল—তার  অপ্রকাশিত লেখাগুলো অপ্রকাশিতই থাকুক কিংবা পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়ুক তার মৃত্যুর পর! সেকালে গল্প উপন্যাসের অর্থমূল্য থাকলেও কবি যথেষ্ট অর্থকষ্টের মাঝেও লেখাগুলো লুকিয়েই রেখেছিলেন বলে কবির অভিপ্রায় নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। কবির ছিল অপ্রকাশিত ২০টি উপন্যাস আর ১২২ টি ছোটগল্প। আর সেই ২৭০টি কবিতা এখন প্রায় দশগুণ! কক্সবাজার সফরে গিয়ে বইটা কবি কালাম আজাদের কাছ থেকে ধার করে পড়েছিলাম হোটেলে শুয়ে-বসে। ফেরার দিন দুপুরবেলা একমাথা রোদ নিয়ে কবি গাড়ি যাবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল বইটা ফেরত নেয়ার জন্যে!

হোস্টেল জীবনে বই ধার দেয়ার ধারণাটা ছিল ভিন্ন। হোস্টেলের বন্ধু-অবন্ধু সকলের বইয়ের সংগ্রহ ছিল যৌথ খামারের মতো। একটা সমরেশ বা শীর্ষেন্দু লাইসিয়াম বা কারেন্ট বুক সেন্টার থেকে হোস্টেলে ঢুকবে, হাত আর রুম ঘুরতে ঘুরতে এক সময় লেডিজ হোস্টেলে যাবে, ফিরবে কী ফিরবে না জানা ছিল না! আমার ‘খেলারাম খেলে যা, যাও পাখি’, নিশি কুটুম্ব  ইত্যাকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ বন্ধুদের মারফত লেডিজ হোস্টেলে গিয়ে পথ হারিয়েছিল।


কবিতার ঘর ও বাহির :


তখন কলেজে উঠেছি, বাসা মনিপুরী পাড়ায়। কবিতা লিখি, মানে যথেষ্ট পরিমাণেই লিখছি তখন। আমার ছোট ভাই রুমিকে বাসায় এসে পড়াতেন আমাদের কলেজেরই দু বছরের সিনিয়র ভাই—আরিফ ভাই। বড় ভাই একদিন আমাকে ডেকে বললেন, “ছন্দ জানো (‘সাঁতার জানো বাবু?’)?” আমার বোধ হয় এমন শ্লাঘা ছিল যে আমি তো ছড়া লিখি না, রীতিমত গদ্যকবিতা লিখি! তিনি খুব সিরিয়াসলি বললেন, “নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ক্লাস বইটা আজকেই কিনে পড়তে শুরু কর। খুব সহজভাবে ছন্দ শিখিয়ে দেবেন তিনি। “সেই সাথে পরস্পর সম্পর্কহীন আরেকটা বইয়ের কথাও বললেন—ম্যাকিয়াভেলির ‘দা প্রিন্স’। সেটাও নিউ মার্কেট থেকে কিনে ফেলেছিলাম কিন্তু অনেকবার নাড়াচাড়া করেও দাঁত বসাতে পারি নি। আরিফ ভাই বলেছিলেন এই বই পড়েই জিয়াউর রহমান প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং রাজনীতির শীর্ষে উঠেছিলেন। আমি পরে এক সময় জেনেছিলাম আরিফ ভাইয়ের বাবা জিয়ার আমলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সামরিক কর্মকর্তাদের একজন। বড় ভাই এখন সরকারি উচ্চ পদে কাজ করেন বলে শুনেছি। একবার তার শংকরের মেসে গিয়ে উপহার পেয়েছিলাম ‘স্বননে’র একটি কপি।

কবিতার ক্লাস নিয়ে মশগুল হয়ে থাকলাম বেশ কিছুদিন। বইটা পড়ছি আর অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত আর মাত্রাবৃত্তের খেলা খেলি, মূলত অক্ষরবৃত্ত। এ সময় শামসুর রাহমানীয় ঘরানায় প্রচুর কবিতা লিখে পঁচাশি সালের হারুন ডায়েরি ভরে ফেলেছি, কেননা নীরেন চক্রবর্তী পাঠের সাথে রাহমান চর্চার কোনো বিরোধ ছিল না বরং ছিল ঘৃতাহুতি!

কবিতা লিখতে গেলে ছন্দ আয়ত্ত করা প্রয়োজন; প্রয়োজনমাফিক তা ব্যবহার করা যেতে পারে আবার নাও করা যেতে পারে। আবার কোনো কোনো কবিতাভাষ্য নির্দিষ্ট কোনো ছন্দকেই ডিমান্ড করে, অর্থাৎ বিষয়বস্তুই ফর্মকে চায়। অশিক্ষিত পটুত্ব হলে এই চাহিদা কিভাবে মেটাবেন কবি! তবে ছন্দের দোলায় বেশি দুলুনি হলে কখনো সখনো বক্তব্য প্রধান কবিতার বক্তব্য যায় হারিয়ে; পাঠক অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে রেলযাত্রীর মতো।

এর পরে আরো কবিতা বিষয়ক বই খুঁজি । একে একে শঙ্খ ঘোষের ছন্দের বারান্দা, নীরেন্দ্রনাথেরই (?) ‘কবিতার কী ও কেন’, সুভাষ মুখার্জির ‘কবিতার বোঝাপড়া’, পূর্ণেন্দু পত্রীর  ‘কবিতার ঘর ও বাহির’ ইত্যাদি বইগুলো পড়তে থাকি। ‘কবিতার ঘর ও বাহির’ বইতে বিশ্বকবিতার দিকপাল আর ব্যতিক্রমী প্রতিভাদের জীবনের এনেকডটস জানতে পারি- র‍্যাঁবো,  ভেরলেন, আপলিনের, এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, নেরুদা থেকে শুরু করে তরু দত্ত কিংবা বুদ্ধদেব বসু। “মৃত্যুর আগের দিন পড়ন্ত  আলোর দিকে তাকিয়ে কী ভেবেছিল সুকান্ত”—অরুন মিত্রের এই মর্মান্তিক প্রশ্ন নিয়েও আছে বিশদ কথা। এই বইতে পেয়েছি কবিতা সম্পর্কে নেরুদার ভাবনা, কীটসের প্রেম, মায়াকোভস্কির উন্মাদনাপূর্ন জীবনযাপন, ফ্রস্টের সাথে এজরা পাউন্ডের দেখা, রদাঁ, রিলকে সমাচার, র‍্যাঁবো আর ভেরলেনের পাগলামিপূর্ণ বন্ধুত্ব, আপলীনরের ক্যালাইডোস্কোপের মতো বিচিত্র জীবন; এ সব পড়তে পড়তে পৃথিবীর বড় বড় কবিরা খুব আপন হয়ে গেলেন।

ষাটের দশকে ‘কবিতা পরিচয়’ নামে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী একটা পত্রিকা বের করতেন—প্রতি সংখ্যায় কয়েকটি কবিতা নিয়ে কয়েকজন আলোচনা করতেন। পরের সংখ্যায় নতুন কবিতা ও আলোচনার পাশাপাশি আগের সংখ্যার আলোচনাগুলোরও ব্যবচ্ছেদ হতো। জীবনানন্দ দাশের ‘গোধূলিসন্ধির নৃত্য’ কবিতাটি নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলোচনার প্রেক্ষিতে পরের সংখ্যায় নরেশ গুহ সুনীলকে এমনভেবে ধুয়ে দিলেন যেন-বা সুনীল জীবনানন্দের ওই কবিতার আগামাথা কিছুই বুঝেন নি। মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় আর অরুনকুমার সরকারের পরের সংখ্যার সম্পূরক আলোচনায় জটিল এই কবিতাটির কিছু কিছু মানে বুঝতে পেরেছিলাম। এই বইটি চমকপ্রদ, এখনও প্রিয়। এই বইটিতে ২১ কবির ৪২ কবিতার ৭৪ টি আলোচনা আছে! বইটি সংগ্রহ করেছিলাম চট্টগ্রামের কারেন্ট বুক সেন্টার থেকে।

সে সময়ে আবু হেনা মোস্তফা কামালের কথা ও কবিতা বইটি হাতে আসে। কবিতার বই বা গদ্যের বই আলোচনার স্টাইলটা শিখতে পারি আর বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারাবাহিকতারও একটা ছবি দেখতে পাই এই বইটি থেকে।

কারেন্ট বুক থেকে আরও সংগ্রহ করেছিলাম দীপ্তি ত্রিপাঠির বহুল পরিচিত আধুনিক বাঙলা কাব্য পরিচয়—যে বইটা কিছুদিন আগ পর্যন্ত অনেক প্রথাগত আলোচক মানদণ্ড ধরে নিয়ে কাব্য আলোচনা করতেন। অবশ্য আমি বেশি প্রভাবিত হয়েছি অশ্রুকুমার  শিকদারের আধুনিক কবিতার দিগবলয় পড়ে; এই বই পড়ে তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবকে চিনতে পারি (জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী)। এদের মধ্যে অমিয় এমনকি বিষ্ণু দে’ও কাছে টানলেন না; সুধীন্দ্রনাথ আর বুদ্ধদেবের হাফ ডজন করে কবিতা বাঁধাই করে রাখবার মতো বলে মনে হল, আর জীবনানন্দ? তাকে এখনও খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করি; আমার জীবনানন্দকে, ‘কেউ যাহা জানে নাই কোনো এক বাণী’, কবে খুঁজে পাব কে জানে!


মননশীল পুরস্কার :


ক্লাস সিক্সে প্রথমবারের মতো বই পুরস্কার পাই, সেটা রাজাবাড়ি হাই স্কুলের বার্ষিক মিলাদের অনুষ্ঠানে নবীর জীবনীভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় পুরস্কার। বাবা আমাকে আট–দশ দিন ধরে ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ গজলটিও রেওয়াজ করিয়েছিলেন, কিন্তু আসলে হয়েছে কী—ছেলেবেলা থেকেই আমার গলা কর্কশ আর কণ্ঠেও নাই সুর—তা অবশ্য কখনোই মনে রাখতাম না। বলাই বাহুল্য গজল গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মন পাই নি, বিচারকদের তো নয়-ই। মাইকে যখন পুরস্কারের ঘোষণা হলো আমি তখন নতুন একটা আমি হয়ে গিয়েছিলাম, নিজেকে নিজেই চিনতে পারছিলাম না যেন। পায়ের নিচে মাধ্যাকর্ষণ ছিল না মনে হয়। প্রথম হয়েছিলেন ক্লাস নাইনের আজিজ। তার সাথে অনেক বছর পর চাকরিক্ষেত্রে দেখা। এই প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি যুগপৎ অবাক এবং কুণ্ঠিত। পুরস্কার হিশেবে পেয়েছিলাম হজরত উমর এর জীবনী। রুপালি মলাটের বইটা আমার পড়ার টেবিলে দর্শনীয়ভাবে সাজিয়ে রাখতাম, যে পড়ার টেবিলের গোপন দেরাজে ১৯৭৬ সাল থেকে নজরুল, জসীমউদ্‌দীন আর জয়নুলের পেপারকাটিং ছবির চারপাশে বকুল ফুলের মালা ছিল (সে বছরটাই ছিল তাদের জীবনের অন্তিম বছর)।

ক্যাডেট কলেজে অনেক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো, খেলাধুলা তো ছিলই। সাধারণত সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বই আর ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মেডেল আর ট্রফি পুরস্কার দেয়া হতো। সে সময় চিরায়ত বইয়ের পাশাপাশি সমকালীন সাহিত্যিকদের বইও পুরস্কার দেয়া হতো, দেশি বই দেখতাম বেশি (মনে পড়ছে ধবল জোছনা, দুই হাতে দুই আদিম পাথর কিংবা দূরত্ব —এই বইগুলো কেউ কেউ পুরস্কার পেয়েছিল)। দু চারটে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও না পেয়েছি ‘রুপালি’ বই না পেয়েছি সোনালি মেডেল। তবে বুঝিবা ক্ষুদে ওস্তাদ অপেক্ষা করছিল শেষ রাত্রির জন্য! এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য আমি বেশ কয়েকটা বই একসাথে পুরস্কার পেয়ে গেলাম। অঙ্কে কাঁচা ছিলাম বলে কখনই ভালো ফল করতে পারতাম না, কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষার আগে পাওয়া সময় কাজে লাগিয়ে টেস্ট পেপার ঘেটে-ঘুটে অঙ্কের জাহাজ হয়ে গেলাম, বাংলা-ইংরেজিতেও বেশ ভালো নম্বর পেলাম। সব মিলে অনেককেই পেছনে ফেলেছিলাম। পুরস্কার হিশেবে পেয়েছিলাম পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন (সৈয়দ আনোয়ার হোসেন), বিশ্ব জগতের পরিচয় (আবদুল হালিম), স্ল্যান (এ ই ভ্যান ভগট), নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস’ (সুভাষ মুখোপাধ্যায় কৃত সংক্ষেপিত সংস্করণ) আর ফাইনালি শামসুর রাহমানের কবিতার সঙ্গে গেরস্থালী


পুরস্কার হিশেবে বই নির্বাচন করা খুবই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। মননশীল বই নির্বাচনের জন্যে যোগ্য মানুষও দরকার।


পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন বইটা আমি খুব আগ্রহ আর আনন্দ নিয়ে পড়েছিলাম; সহজভাবে ধারাবাহিক ইতিহাসকে তুলে আনা হয়েছে। শামসুর রাহমানের কবিতার বইটি (কবিতার সঙ্গে গেরস্থালী) আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ‘নিজ বাসভূমে’ ছাড়া এই বইয়ের সাথে তুলনীয় শামসুর রাহমানের আর কোনো কবিতার বই আমি পাই নি। তবে যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে আর ইকারুসের আকাশ’ও আমার অন্যতম প্রিয় দুটি বই। বাঙালির ইতিহাস বইটা ছাড়া ছাড়া ভাবে পড়েছি। কখনো কাজে লাগাই নি। আমার বড় মেয়ের টেবিলে একদিন মূল বইটি দেখে চমকে উঠেছিলাম। সময় এত দ্রুত বয়ে যাচ্ছে!

কলেজ জীবনেও বটতলায় গান শুনে ছবি আঁকা, নির্ধারিত বক্তৃতা, আর ক্লাশের ‘ভালো ছেলে’র পুরস্কার হিশেবে বই-ই পেয়েছিলাম, কিন্তু একটা বইয়ের নামও আজ আর মনে নেই।

পুরস্কার হিশেবে বই নির্বাচন করা খুবই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। মননশীল বই নির্বাচনের জন্যে যোগ্য মানুষও দরকার। শিশু-কিশোরদের কাছে এক একটা বই খুলে দিতে পারে এক একটা নতুন দিগন্ত। আমার ছোট মেয়েটাকে নিয়ে একবার বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণীতে গিয়েছিলাম রমনার বটমূলে। প্রায় চার হাজার ছাত্রছাত্রী বই পুরস্কার পেয়েছিল। আমার মেয়ে পেয়েছিল ফ্রান্সের রূপকথা। একটা বই পাবার জন্য মেয়ে ও তার বান্ধবীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা আর বাবার ক্যামেরা নিয়ে উৎসব —একমাত্র বই-ই পারে আনন্দের এমন উপলক্ষ্য গড়ে দিতে।

কিন্তু পুরস্কার দেয়ার ক্ষমতা যখন হাতে এল, আমি যখন একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিশবে সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতাম, তখন অপ্রতুল বাজেটের দোহাই দিয়ে ক্রেস্ট, মেমেন্টো ইত্যাদি পুরস্কার গছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আজ অনুতাপ করি, প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদেরকে কৃশকায় বই দিতে পারলেও আজ গর্ব করে লিখতে পারতাম যে, আমরা সে বছর চারশত কিংবা পাঁচশত বই পুরস্কার দিয়েছিলাম।


‘প্রীতি উপহার’ :


ছোটবেলায় যে বইয়ের সম্ভারের সাথে বেড়ে উঠছিলাম, তার সিংহভাগই ছিল বাবা-মায়ের বিয়েতে পাওয়া সে কালের ‘প্রীতি উপহার’। আজকাল তো বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিশেবে বই দেয়ার চল উঠেই গিয়েছে। সে বইগুলোর সব নাম মনে নাই তবে নজরুল কাব্য সঞ্চয়ন-এর কথা আগেও বলেছি, আজ বলা যাক ‘নজরুল পরিচিতি’র কথা। এই বইটিতে ষাটের দশকের নামী লেখকদের রেডিও পাকিস্তানে নজরুল বিষয়ক কথিকা গ্রন্থিত আছে। এই গ্রন্থের একটি ঐতিহাসিক মূল্য আছে; সে সময়ে নজরুলকে ইসলামী লেখক হিশেবে দেখানোর একটা সাধারণ প্রবণতা ছিল। আব্বাস উদ্দিনের লেখাটা পড়ে তার প্রত্যক্ষ স্মৃতিগুলো তো জেনেইছিলাম, আরও পেয়েছিলাম কয়েকটা নজরুলের গানের হদিস, পরবর্তীতে যে গানগুলো আমি রেকর্ড করে নিয়েছিলাম।বইটিতে নজরুলের অনেক ছবি আর বাংলা-উর্দু পাণ্ডুলিপির ছবিও ছিল। বইয়ের সেই ভাণ্ডারে ছিল বেশ কিছু উপন্যাস, যেগুলোর প্রচ্ছদে চড়া রঙে নায়ক-নায়িকার মুখ আঁকা ছিল, এর একটি বই দানের মর্যাদা । নজিবুর রহমান সাহিত্যরত্নের বিখ্যাত উপন্যাস আনোয়ারা তো ছিলই; কাকতালীয়ভাবে আমার কাকা ‘নুরুল ইসলাম’ও কাকি হিশেবে নিয়ে এলেন ‘আনোয়ারা বেগম’কে! তখন এই গ্রন্থের চরিত্র বাস্তবে চলে আসা মিলিয়ে নিতে হিমশিম খেয়েছিলাম।

এসএসসি পরীক্ষায় রেজাল্টের পর ছোটমামার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু কয়েকটা ইসলামি বই উপহার দিয়েছিলেন; একটা বইয়ের নাম তলোয়ারে নয়, উদারতায়। সে সময় এই বইয়ের প্রাসঙ্গিকতা ছিল না; আজ বড় প্রাসঙ্গিক। তবে যে বয়সে একটা বই উপহার পাওয়া মানে ছিল আসমানের চাঁদ হাতে পাওয়া, সে বয়সে তত বই পেয়েছিলাম বলে স্মৃতি সাক্ষ্য দেয় না।

কলেজ জীবনে টিবলু নামের এক বন্ধু প্রায়ই বাসায় আসত, সোবহানবাগে এক গণিত স্যারের বাসায় প্রাইভেটও পড়েছি এক সাথে। সেই টিবলু (কাজী আতিফ ইকবাল) যে দিন আমাকে ওর বাসায় নিয়ে গেল, ওর বাবা আমাকে নিজের অনুবাদ করা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বেগুনি রঙের প্রচ্ছদের প্লেগ (আলবেয়ার কামু) উপহার দিয়েছিলেন। বইটা নাই, অনুবাদকের নাম মনে করতে গিয়ে চুল ছিঁড়ছি।

কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব একবার ‘দিনরাত্রি’ নামে একটা প্রকাশনা সংস্থা শুরু করলেন। তার সাথে আমার যোগাযোগ শুরু  হয়েছিল ক্লাস টেন থেকে, কার্টুন করার সুবাদে। সেখান থেকে হুমায়ূন আহমেদের নৃপতি বা সম্রাট, মুহম্মদ জাফর ইকবালের আকাশ বাড়িয়ে দাও ইত্যাদি বেরিয়ে গেছে তখন। আমাকে তিনি উপহার দিয়েছিলেন তার বিমান প্রকৌশলী বন্ধু মহিবুল আলমের কবিতার বই এ কোন বৃষ্টি ঝরাও। সেই বইয়ের আদলেই আমার প্রথম কবিতার বইটির গেট আপ করা হয়েছিল।

হোস্টেল জীবনে বড় সারপ্রাইজ ছিল হাজার পরীক্ষা থাক কিংবা থাকুক মিটিং মিছিলের বা ভোটের রেষারেষি, কারু জন্মদিন থাকলে রাত বারোটার মাহেন্দ্রক্ষণে তার জন্যে কিছু একটা কাণ্ড-কীর্তি থাকবেই। একবার আমরা অগোছালো এক বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে একটা প্রদর্শনী আয়োজন করেছিলাম, বিভিন্ন ব্লকের ছাত্ররা সেই প্রদর্শনী দেখতে আসত। রাত বারোটার জন্মদিনে্র অনুষ্ঠানে কেউ কেউ হাজির হতো একটা বই নিয়ে, সাধারণত কবিতার বই কিংবা সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দু। আমিও জন্মদিনে বই উপহার পেয়েছি, কিন্তু সে সব বই আবার আমাদের যৌথ খামারের অংশ হয়ে যাওয়াতে আলাদাভাবে আর উল্লেখ করা মুশকিল। সেটা ছিল হুমায়ূন যুগের শুরু, তখন থেকেই আমি ছিলাম হুমায়ূনের নিবিষ্ট পাঠক। হুমায়ূনের টিভি নাটকের (বহুব্রীহি) বোকা ডাক্তার আফজাল হোসেনের চরিত্রটিকে সহ্য করতে না পেরে হোস্টেলবাসীরা রাতেই একটা প্রতিবাদ মিছিল করেছিল এবং পরদিন ক্যাম্পাসে হুমায়ূনের কুশ পুত্তলিকা দাহ করেছিল। সেই কুশ পুত্তলিকার মুখটি এলেবেলে বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে আমিই এঁকে দিয়েছিলাম। খবরটি পত্রিকায় আসে সচিত্র এবং হুমায়ূন সেই ছবি এলেবেলে‘র পরের সংস্করণে ছেপেছিলেন। কিছুদিন পর এক বৃষ্টিমুখর হরতালের দিনে হুমায়ূন এক অনুষ্ঠানে আমাদের ছাত্র সংসদে আসেন। আসামীরা সেদিন আত্মসমর্পণ করেছিলাম। সেদিন আমি হুমায়ূন আহমেদের সফরসঙ্গী কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিজের কবিতার বই উপহার দিয়েছিলাম।

সাফায়েতের বিয়েতে আমি বিক্রম শেঠের এ সুইট্যাবল বয়-সহ আরো তিনটা ইংরেজি বই উপহার দিয়েছিলাম। সে অনেক ইংরেজি নভেল পড়ত, ক্রিকেট বিষয়ক বই পড়ত। বইগুলো বাকিতে কিনেছিলাম চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের চারুপাঠ থেকে। আমার কারণেই কিনা কে জানে, চারুপাঠ উঠেই গেল!

আমি সবচেয়ে বেশি বই উপহার পেয়েছি কবিদের কাছ থেকে। কবিরা দিয়েছেন নিজেদেরই বই। সে সব বইয়ের বৃত্তান্ত লিখতে গেলে আস্ত একটা পর্বই লেখা হয়ে যাবে।

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

গল্প—
স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প [চৈতন্য, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com