হোম গদ্য ‘অদৃশ্য আলোর চোখ’ দৃশ্যমান গল্প-জীবনের পাঠোপলব্ধি

‘অদৃশ্য আলোর চোখ’ দৃশ্যমান গল্প-জীবনের পাঠোপলব্ধি

‘অদৃশ্য আলোর চোখ’ দৃশ্যমান গল্প-জীবনের পাঠোপলব্ধি
407
0

অদৃশ্য আলোর চোখ কবি ও কথাসাহিত্যিক মহ্‌সীন চৌধুরী জয়-এর ১ম গল্পগ্রন্থ। পাঁচ বছর পূর্বে উনার প্রকাশিত উপন্যাস সমাপ্তির যতিচিহ্ন পড়ে এতটা মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, ব্যক্তিক পর্যায়ে লেখকের সাথে একটা সুসম্পর্ক গড়ে তুলি। সেই ধারাবাহিক সম্পর্ক আমাদেরকে যৌথ ‘শিল্প ও সাহিত্য’ সাধনার পথে অনেকটা এগিয়ে নেয়। যদিও আমি পড়াশোনার দায় দেখিয়ে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে গেছি কিছুদিন পরেই কিন্তু মহ্সীন চৌধুরী জয় লিখে চলেছেন একাগ্র মগ্নতায়—আপন ভুবনে একাকী পথচলায়। ঘরমুখো এ মানুষটির বন্ধু খুব কম এটাও লক্ষ করেছি, তবে তিনি আমাকে হতাশ করেন নি—সময় দিয়েছেন, সময় অতিক্রমে দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ককে সৌন্দর্যে উপনীত করেছেন।


লেখকের গল্পের শরীর কী সুন্দর! নান্দনিক! ঢেউয়ের মতো বিরামহীন ছুটে চলে অক্ষরের পর অক্ষর।


আমি সাহিত্য সাধনায় পূর্ণ মনোযোগী হতে না পারলেও উনার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গল্প, কবিতা পড়ার সময় ঠিক সময়-মতোই করে নিতাম। সেই ধারাবাহিক পাঠে অদৃশ্য আলোর চোখ গল্পগ্রন্থের সব গল্প আগেই পড়ে ফেলছি। গল্পগুলোর আবেদন আমাকে ভেতর থেকে টেনেছে—ভাবিয়েছে—ভালোলাগা বোধে আপ্লুত করেছে—গল্পের পাঠকথন লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এ গ্রন্থ প্রকাশের কথা শুনে আমি সত্যিই খুব আনন্দিত। কারণ আমাদের সম্পর্কটাই এমন যে, একজনের আনন্দ অন্যজনের হৃদয় স্পর্শ না করে পারে না।

উনার লেখা প্রতিটি গল্পের পৃথিবী কী অদ্ভুত-রকমভাবে জীবন-বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনপ্রবাহের মনোমুগ্ধকর এক চিত্র যেন। কাগজে কাগজে ভাঁজ করা সমাজ-সভ্যতার মিশ্রিত বিবরণ। সহজ সরল ও সাবলীল ভাষায় খচিত তার পরাবাস্তব চিন্তা, বাস্তবতার ভেতরেও অন্যরকম এক বাস্তবতার সাক্ষর। উনার গল্পে প্রেম আছে, পরিণয় আছে, প্রগল্‌ভের নির্লজ্জ চরিত্র আছে, পাপে নিমজ্জন ব্যক্তি আছে, প্রগতির ধবজাধারী আছে, প্রায়শ্চিত্তের সুস্থ প্রাণও আছে। গল্প বলার প্রয়োজনে, উনার লেখনীতে জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতি এবং আপাদমস্তক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে প্রাঞ্জলতায়।

উনার গল্প বলার ঢং দেখে আমি অভিভূত। লেখকের গল্পের শরীর কী সুন্দর! নান্দনিক! ঢেউয়ের মতো বিরামহীন ছুটে চলে অক্ষরের পর অক্ষর। ‘অনুরণন’ গল্পে দেখি উনি শব্দ নিয়ে কী রকম নান্দনিক খেলায় মেতে ওঠেন। শব্দকে শিকার করেন। শব্দের মোহে ধ্যানী হন। ‘অনুরণন’ গল্প থেকে কয়েকটা লাইন আপনাদের জন্য—

ভাবি, আমার কবিজীবন শব্দের উপলব্ধিতে কিরকম বর্ণময় হয়ে উঠেছে! চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া প্রকৃতিতে ঝিঁঝিঁ পোকা দেখেছি আর কয়টা? কিন্তু ওদের ডাক কী এক মন্ত্রমুগ্ধের আবহ তৈরি করে। মধ্যরাতে বিছানা ছেড়ে সেই শব্দের সাথে শুয়ে থাকি মাঠের উপর। ব্যাঙের ডাক শুনি। বাতাসের সাথে বটপাতার যুদ্ধে শনশন শব্দে ঘুম চলে আসে। দিনের আলোয় বিস্তৃত মাঠের মাঝখানে বাচ্চারা খেলাধুলা করে আর বাঁশির সুরে মেতে ওঠে মাঠের প্রতিটি ঘাস। এই সুর-শব্দে আমার ভেতর কেমন এক মায়ার জগৎ তৈরি হয়।

ছেলেবেলায় বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছিলাম, শব্দ এক ধরনের শক্তি। ওই পর্যন্তই—কোনোদিনও শব্দ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করি নি। কিন্তু “অনুরণন” গল্প পড়ে আমি অনেকটা সময় নিশ্চুপ হয়েছিলাম। কী গভীর তার আত্মোপলব্ধি! যেন শব্দই ঠিক করে আমাদের জীবনবোধদয়।

গ্রন্থের নাম অদৃশ্য আলোর চোখ হলেও গল্পগুলো অদৃশ্য নয়, দৃশ্যমান আলোর পিণ্ড হয়ে পাঠকের চোখের তারায় খেলা করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

মানুষকুকুর গল্প থেকে কয়েক লাইন :

কুকুর হয়ে কামালের কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হয়েছে। কামাল ছাড়া পেয়ে ছুটতে লাগল। পেছন ফিরে তাকাবার সময় আর নেই। এ ভূমি অত্যাচারীদের দখলে। অকৃতজ্ঞদের দখলে। দিপু, জামানের মতো কিছু মানুষ ছাড়া এ ভূমিতে শুধু স্বার্থের সম্পর্ক। রক্তের আত্মীয়ও রক্ত চুষে খায়। জঙ্গলে যেতে হবে। যেখানে মানুষ নেই। কামালের বিশ্বাস বন্য পশুরা ওকে ঠিক গ্রহণ করবে। কামালকুকুর মুক্ত—ও জঙ্গলে খুঁজে নিবে বাসযোগ্য পৃথিবীর ঠিকানা।


মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের গল্প পড়ে ভেতরে সে-রকম উপলব্ধি তৈরি হয়। নিজের সাথে পরিচিত হতে পারি। জীবন-বাস্তবতার দুর্জ্ঞেয় দর্পণে বেশে ‍ওঠে আমার-আমির শৈল্পিক-বোধ।


এ গল্পের মধ্যে কুকুরের চোখ দিয়ে উনি মানুষের জীবনকে মূল্যায়ন করেছেন। মানুষের নীচতা তুলে ধরেছেন। স্বার্থের জন্য মানুষ কতটা নীচে নামতে পারে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন পাঠককে। আবার কিছু মানুষ যে সত্যিকার অর্থেই মানুষ তাও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উনি গল্প লেখাকে গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি। গল্পকে চরম বাস্তবতার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সেই গল্পের বাস্তবে যেয়ে পাঠক অস্থির হয়ে উঠবে গল্পের শেষ পর্যন্ত পৌঁছার তাগিদে।

‘রক্ত’ গল্পে আমরা দেখতে পাই, ধর্ষক বাবার অনৈতিক কাজকে মানতে না পেরে ছেলে আপন যৌনাঙ্গ কর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ ও নিজ-শরীরের রক্তকে অস্বীকার করতে পারে না। ওর মনের মধ্যে ভয় উঁকি দেয়, বিভ্রম বাসা বাধে। বাবার পথে কি চলে যাবে ওর মানবপ্রকৃতি? ‘রক্ত’ গল্পের কয়েক লাইন—

রুমের এক কোণে চাকু হাতে বসে আছে ও। সাথে ওষুধের বোতল। যৌনাঙ্গটা কেটে ফেলবে গোড়া থেকে। তারপর মলম লাগিয়ে দিবে। ওর যৌনাঙ্গ একটা সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াচ্ছে—যত অন্যায় মূল থেকে উপড়ে ফেলে, ভালো কাজ হিশেবে ওষুধ দেওয়া। এখন অভির মাথা ঠান্ডা আছে। যৌনকাতর কোনো চিন্তাও মাথায় কাজ করছে না। যৌনাঙ্গটা এখন ন্যাতানো, নরম একটা আঙুলের মতো নুয়ে আছে। এরকম থাকতেই কেটে ফেলবে। 

‘রক্ত’ গল্পটি পড়ার পর মনে হলো চার্লস ডিকেন্স যথার্থই বলেছিলেন :

শিশুর প্রকাশের মাধ্যম অনেক। তার ভাষার প্রয়োজন হয় না।

যদিও গল্পে ছেলেটি যথেষ্ট বড় কিন্তু তার শিশুসুলভ মানসিকতাই ছিল চাল-চলনে। তার বাবার অপকর্মে হঠাৎ-ই যেন মস্তিষ্কে বংশের-ধারা বিষয়টি আতঙ্কিত হয়ে ফুটে ওঠে। যা এ সমাজের চরম বাস্তবতা বলে আমার মনে হয়।

উনার সর্বশেষ গল্প ‘জীবন সায়াহ্নে’-তে দেখি ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে শেষ সময়টা সবার সুখের হয় না। তাই বলে জীবন নির্দয়-শরীর হয়ে দাঁড়াবে আশি পার করা এক বৃদ্ধের অদৃষ্টে। এ গল্পের শুরুতেই লেখক আমাদের চমকে দেয়—

বিছানার চারদিকে ঝাঁক বেধে বসা অন্ধকারে শুয়ে আছি। অথর্ব জীবনের পাশে অন্ধকার সাক্ষী হিশেবে মন্দ নয়। আলো? বাহ্যিক আলো জীবনকে আর কতটুকু আশান্বিত করবে? প্রকৃতার্থে আলো এখন ভয়েরই নাম। ঝলসে দেয় আমার চোখ। পোড়া শরীরে অস্থিরতা জাগায়। তাই ‘মন আর প্রাণ’ উজার করে প্রার্থনায় রত হয়ে অন্ধকারে মিশে যাই। বাস্তবে চলে প্রতীক্ষা। এক জীবন অতিক্রমের প্রতীক্ষা। জীবন স্বপ্নহীন, আশাহীন—শূন্যতায় ঘেরা জীবনের চতুর্দিক। বেঁচে থাকার দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত প্রাণ শেষ যাত্রার পথে পা বাড়াতে চায় নিরুদ্বেগে, নির্দ্বিধায়।

এ পাঠতৃপ্তিকে নিছক প্রোপাগান্ডা ভাববেন না, এ আমার প্রতীতির সত্য উচ্চারণ। তাই নির্দ্বিধায় বলতে চাই, এই গ্রন্থে প্রাপ্তি আছে নিশ্চিত। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা, মহ্‌সীন চৌধুরী জয় বোধের জায়গায় আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছেন। জ্ঞানের পিতা সক্রেটিস বলেছিলেন :

নিজেকে জানো।

জন্মের পরে সক্রেটিসকে চিনি নি কিন্তু নিজেকে চিনতে শুরু করি। বিশ্বাস করি, নিজেকে চেনার মধ্যেই মানুষের পরম পাওয়া লুকিয়ে থাকে। মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের গল্প পড়ে ভেতরে সে-রকম উপলব্ধি তৈরি হয়। নিজের সাথে পরিচিত হতে পারি। জীবন-বাস্তবতার দুর্জ্ঞেয় দর্পণে বেশে ‍ওঠে আমার-আমির শৈল্পিক-বোধ।


বইটা হাতে তুলে নিন। সমুদ্র-স্নানের মতো সিক্ত হবেন। অনুভূতির সাঁতার শেষ হবে না। ভালোলাগা বোধে শরীর, মন শীতল হবে।


জীবনানন্দ বলেছিলেন :

পৃথিবীতে;
আমরা জেগেছি—তবু জাগাতে পারি নি;
আলো ছিল—প্রদীপের বেষ্টনী নেই;
কাজ ছিল—শুরু হল না তো;

আসলে অনেক কাজ বাকি পরে আছে আমাদের। মহ্‌সীন চৌধুরী জয় শুরু করেছে নান্দনিক পথচলা। শুরুটায় চমক ছিল—আজও তার চমকপ্রদ সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে। বইটা হাতে তুলে নিন। সমুদ্র-স্নানের মতো সিক্ত হবেন। অনুভূতির সাঁতার শেষ হবে না। ভালোলাগা বোধে শরীর, মন শীতল হবে।


অদৃশ্য আলোর চোখ বইটি প্রকাশ করেছে ‘অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি’। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন মির্জা মুজাহিদ। পাঠকথন লিখেছেন শ্রদ্ধেয় সারওয়ার চৌধুরী। ৯টি গল্পসমৃদ্ধ এ গ্রন্থটি পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান স্টল নং ৩৩১ এবং লিটল ম্যাগ প্রাঙ্গন ‘বনপাংশুল’-এ।

মোহাম্মদ রায়হান খান

জন্ম ১ আগস্ট, ১৯৮৭; ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।
শিক্ষা জীবনে দেলপাড়া হাই স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে এমবিএ করছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-এ। কর্মজীবনে ‘ঢাকা ইপিজেড’-এর একটি ব্রিটিশ কোম্পানিতে কর্মরত আছেন।

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : khanrayhan41@yahoo.com