হোম গদ্য অজিন মাস্টারের চেলা

অজিন মাস্টারের চেলা

অজিন মাস্টারের চেলা
299
0

– মাথার ভেতর বস্তাপচা ধারণাগুলো তো ডিম ফাটা সাপের বাচ্চার মতো কিলবিল করেছ! যা, ভালো করে মাথা ধুয়ে আয় আগে। তারপর কথা।

কথা শুনে চোখ চলে গেল সামনের আর এক জাড়া চােখের দিকে। এই নাকি মামার অজিন মাস্টার! মানুষের চোখ থেকে যে এরকম একটা সৃষ্টিছাড়া আলো বেরােতে পারে, ধারণা ছিল না। মনে হলো, যেন আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি থেকে মগজের শিরা-উপশিরা অবধি সব দেখতে পাচ্ছে চোখ দুটো। ফটক ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই দূর থেকে নজরটা আবছা টের পেয়েছিলাম। সামনের বারান্দার বাঁ-দিক ক’রে একটা ইজিচেয়ারে আধোশোয়া মানুষটা। বয়স ভােলা বাঝা যায় না। এতটা পথ উজিয়ে এসে এমন একজোড়া চােখের সামনে পড়তে হবে, কে জানত।

রাস্তাটা কি কম! আর ট্রেনেও তেমনি ভিড়। আগের গাড়িটা নাকি বাতিল। তাই দু’দুটো গাড়ির ভিড় এসে জড়ো হয়েছে এক গাড়িতে। নেহাত ট্রেন প্লাটফর্মে ঢোকার আগেই স্টেশন এসে পড়া গিয়েছিল। পেছনের দিকের একটা কামরায় লাফিয়ে উঠে জানালার ধারের জায়গাটা তাই পাওয়া গেল কোনোমতে।

– দরকার মতাে সামনের দিকটাকে পেছন আর পেছনের দিকটাকে সামনে করে নিতে জানতে হয় রে লুমুম্বা। চিন্তাকে কি একবগগা চলতে দিলে চলে! ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিস কেন? এখেনে আসার সময় ট্রেনে ওঠার বেলায় কী করলি—ভিড় এড়াতে পেছনের দিকের একটা কামরায় উঠলি না? আর নামার সময়, তখন তাে দিব্যি নেমে এলি সামনের দিক দিয়ে। কী করে এলি? যা যা, শিগগির মাথা ধুয়ে আয়।

বারবার বলে কী লােকটা! খামােখা এখন মাথা ধুতে যাব কেন? না-হয় বয়স্ক মানুষ, তাই বলে চেনা নেই শােনা নেই, এরকম তুই-তােকারি! তাছাড়া আমার নামও কস্মিন কালে লুমুম্বা নয়। ঠাট্টা করছে নাকি! কিন্তু ট্রেনের কথাটা জানল কী করে। উফ, যা ভিড় ছিল। একটা করে স্টেশন আসছে আর পিলপিল করে লােক উঠছে। আর তেমনি নাগাড়ে হরেক রকমের হকার। পেয়ারা থেকে টর্চ, গামছা থেকে গজা—কী নেই? তারপর আবার নমুনা বিলি—হজমি গুলি, কায়ুম চূর্ণ, ব্যথা সারানাের আরক, দাঁতের পােকার অব্যর্থ ওষুধ। মাথাটা এমন ধরে গিয়েছিল যে, ভিড় গলে গলে অদ্ভুত কায়দায় আরকওয়ালা যখন এগিয়ে এল, আপসেই মাথাটা বাড়িয়ে দিলাম। কপালের দু’পাশে দু’ফোঁটা লাগিয়ে এইসা রগড়ে দিল—আঃ! তারপর আরও দু’ফোঁটা নিয়ে চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে দিল। আয়েসের চোটে ঘুমিয়েই পড়লাম কি না কে জানে।

কোত্থেকে যেন একটা টিকটিকি ডেকে উঠল। হাঁচি-কাশি-টিকটিকি আমি অবশ্য তেমন মানি না। কিন্তু বেলা তাে আসলেই পড়ে এল। আরেকটু আগে বেরােলেই হতো। সত্যিই তাে, এখন ফিরব কিভাবে!

– ও, ফেরার চিন্তা নিয়েই তাহলে এসিচিস। তা ভালাে।

মানুষটা কি কথা পড়তে পারেন নাকি! তাকিয়ে দেখি, চোখ থেকে আবার সেই আলােটা বেরােচ্ছে। ইট-বাঁধানাে ফালিটা দিয়ে পায়ে পায়ে ততক্ষণে চলে এসেছি বারান্দার কাছে। চারধাপ সিঁড়ি যেখানে শুরু হয়েছে, তার দুদিকে দুটো বেঁটেখাটো পান্থপাদপ। দুটো গাছের পাতার মাথা ঠেকে গিয়ে খানিকটা ইংরেজি w-হরফের চেহারা নিয়েছে। ঘাসেঢাকা চত্বরের চারদিকে নানারকম ফুলের গাছ। বড় গাছও কয়েকটা। সীমানার পাঁচিলের গায়ে সার দিয়ে লাগানাে সুপারি আর পাম। আমি এখন বারান্দার ঠিক নিচে ঘাসের ওপর। পিছনে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানাে একটা বর্গক্ষেত্রে মতন জায়গায় টিউকল বসানাে। আর সামনে বারান্দায় পুরনাে দিনের লম্বা হাতলওয়ালা ইজিচেয়ার। একটা হাতলে দুটো পাতলা বই, চশমার খাপ, নস্যির ডিবে। আধশােয়া অবস্থা থেকে মাস্টার যেন একটু নড়ে বসলেন। পায়ের কাছে গুঁড়ি মেরে বসে আছে একটা কুচকুচে কালাে বেড়াল। বােধ হয় আমার পায়ের শব্দে একবার তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করল। চোখ দুটো অসহ্য সবুজ।

– ফেরার কথা যখন ভাবচিস, ফিরে যা। এলি কেন? গােয়েন্দাগিরি কত্তে, না কি আজকালকার ওই সখের সাংবাদিকতা! ওই কী যেন, অনলাইন ফিচার নামাতে? যা যা ভাগ। এখেনে কিছু নেই।

– কিন্তু স্যর, বাগনানের সােহরাব মল্লিক…

– কী বললি, সােহরাব? সােহরাবকে চিনিস তুই!

টিকটিকিটা আবার ডেকে উঠল। কাকে যেন খেঁকিয়ে উঠলেন মাস্টার—আপনি থামবেন মি. খাস্তগির? আপনার দেশের বাড়ি না চিটাগং! সূর্য সেনের এলাকার লােক। তবু স্বভাব থেকে খােচরগিরিটা গেল না।

খেঁকানি শুনে বেড়ালটা একবার ডেকে উঠল—মিউ।

সােহরাব মামার ভাগ্নে শিবলি আমাদের বন্ধু। শিবলি তাে ব্যাঙ্গালােরে বিশাল এক চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। মামার সাথে আমাদেরই যত আড্ডা। তাঁর গল্পের ভাঁড়ার শেষ হবার নয়। অ্যালকেমি থেকে ডাকিনীবিদ্যা, হেকিমি থেকে তন্ত্র—এসব নিয়ে যাদের নাড়াঘাঁটা, এমন কত মানুষকে যে চেনেন মামা। এদিকে নিজে কিন্তু সত্তরের জেলখাটা পাব্লিক। মামাকে যদি জিজ্ঞেস করি—মামা, এসব ভূত-প্রেত তন্ত্র-মন্ত্র কি সত্যি? হাে হাে করে হাসবেন শুধু। বলবেন—জীবনে আনন্দটাই সব, বুঝলি। এই যে এসব কাহিনি শুনে তাের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, এই মজাটা কি ফেলনা? যা। একবার অজিন মাস্টারের কাছ থেকে ঘুরে আয়। মজা পাবি।

মামার পাল্লায় পড়ে আমারও কেমন একটা নেশার মতাে ধরে গেছে। সময় সুযােগ পেলেই বেরিয়ে পড়ি—আজ পাথরচাপড়ি, কাল গােরভাঙা। বেশির ভাগই ফক্কিকারি। কেউ কেউ অবশ্য জানে, কিন্তু কিছুতেই কিছু ভাঙতে চায় না। ভাঙবেই বা কেন? এসব কি আর শখ-শৌখিনতার ব্যাপার। রক্ত জল করে সাধনা করা সব জিনিশ। একবার তাে এক জঙ্গলের নির্জন মন্দিরের ভৈরবীকে দেখে যা ভয় পেয়েছিলাম। আমার কী দোষ! ভয় দেখালে ভয় পাব না? আরে, জঙ্গলের ভেতর চলে গেছি একা একা। অনেকটা ভেতরে গিয়ে দেখি এক ভাঙাচোরা মন্দির। মন্দিরটাকে ঘিরে বিশাল বটগাছের শত শত ঝুরি নেমে এসেছে মাটির বুকে। কোনোটা আবার শূন্যে ঝুলছে। আমি তাে উঁকিঝুঁকি মারছি কোথাও কোনো বিগ্রহ আছে কি না দেখার জন্য। হঠাৎ পেছন দিকের একটা ঝুরির আড়াল থেকে খিল খিল করে হেসে উঠল কে। ঘুরে তাকিয়ে দেখি, মাথায় জটা, কপালে বিশাল লাল টিপ, হাতে ত্রিশূল, ভরযুবতী এক ভৈরবী। গাছের পাতার আলাে পড়ে চোখ দুটো কেমন সবুজ দেখাচ্ছে। চোখ দুটোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, আর সে দুটো যেন কাছে টেনে নিচ্ছে আমায়। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় বুকের এক দিকের আঁচল খসে গেল ভৈরবীর। পুরুষ্ট এক স্তন। আমি স্তব্ধ। গলা শুকিয়ে কাঠ। শুনি, সে বলছে—কাছে আয়। বলেই খপ করে আমার একটা কবজি ধরে এক হেঁচকা টান। তারপর ত্রিশূলের ডগা দিয়ে বুকের অন্যদিকের আঁচলটা সরাতেই দেখি সেখানে চামড়া মাংস কিছু নেই, শুধু পাঁজরের হাড়। আর আকাশবাতাস কাঁপানাে খল খল হাসি।

এই যে ভাই, আরেকটু চেপে বসুন না। তাহলে এখানে আরেক জন একটু দাঁড়াতে পারে। ট্রেনের ভিড় থেকে বলে উঠল কেউ। উফ, কী বিশ্রী একটা স্বপ্ন যে দেখলাম! কেন দেখলাম কে জানে? যাচ্ছি একটা শুভ কাজে। সােহরাব মামা পই পই করে বলে দিয়েছেন—দ্যাখ, কিছুতে মাথা গরম করবি না। তাই মাস্টারের অত মুখঝামটা খাবার পরেও মামার নামটা করাতে যেন কাজ হল।

– সােহরাব বলেছে আমার কথা? তা, কেমন আছে সে মক্কেল?

ওঃহাে, মামার চিঠিটার কথা তাে ভুলেই গিয়েছিলাম। জিনসের হিপ পকেট থেকে ভাঁজ করা খামটা বার করতেই কোথা থেকে হুস করে একটা কাক এসে ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে সােজা গিয়ে বসল সামনের নিমগাছের ডালে। আমি তাে অপ্রস্তুত।

– নিমাই, হচ্ছেটা কী? কাকে যেন বকা লাগালেন মাস্টার। কাকটা কী মনে করে মাস্টারের পায়ের কাছে খামটা ফেলে আবার উড়ে গিয়ে বসল নিমগাছের ডালে। পড়ন্ত রােদের আলােয় ঝিকিয়ে উঠল তার কালাে ডানা।

ইতিমধ্যে খাম ছিঁড়ে চিঠি বার করে চোখে চশমা লাগিয়ে পড়তে লেগেছেন মাস্টার। পড়তে পড়তে খুক খুক করে একটা হাসি। বেশি জোরে নয়, আবার তেমন চাপতে চাওয়াও নয়। সে-হাসির মানেটা যে খুব ধরতে পারলাম, তা নয়। শুধু মনে পড়ল, সােহরাব মামাও যেন চিঠিটা লেখার সময় মুচকি মুচকি হাসছিলেন।

বােধ হয় আমিও একটু হাসি হাসি কৌতূহলী মুখে মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। চিঠিটা পড়ে, এক টিপ নস্যি নিয়ে, ভুরু নাচিয়ে বললেন—দেখলে হবে, খরচা আছে। সাথে সাথে মনে পড়ল, মামা বলেছিলেন বটে, দক্ষিণাটা ও কিন্তু চেয়েই নেয়।

বিনা বাক্যে পার্স থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নােট বার করে সিঁড়ির ধাপে পা দিতেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন তিনি—সিঁড়িতেই রাখ, সিঁড়িতেই রাখ। মাথাভর্তি হাবিজাবি জ্ঞানগম্যি নিয়ে এ- বারান্দায় পা রাখা যায় না লুমুম্বা। যা যা, আগে মাথা ধুয়ে আয়। ওরে ও জগাই মাধাই, কলাগাছের মতাে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? দে বেটার মাথা ধুইয়ে।

কিছু বােঝার আগেই কোত্থেকে দুটো মুশকো মতাে লােক এসে দুদিক থেকে চেপে ধরল আমায়। তারপর টেনে নিয়ে গেল সেই টিউকলতলায়। দেখি, ইজিচেয়ার থেকে উঠে অজিন মাস্টার এসে দাঁড়িয়েছেন বারান্দার ঠিক মাঝখানে। তাঁর পায়ের কাছে কালাে বেড়ালটাও যেন লেজ ফুলিয়ে মজা দেখছে। নিচে নেমে গেছে চার ধাপ সিঁড়ি। দুইধারে দুই থাম। কিন্তু পান্থপাদপ? পান্থপাদপ দুটো গেল কই?

ভাবতে ভাবতে এক মুশকো আমার মাথাটা ধরল কলের নিচে। আর, আরেক মুশকো চাপ দিতে থাকল হাতলে। ঝর ঝর করে জল ঝরে পড়তে থাকল মাথায়। জল যাতে না ছিটকোয়, তাই একটা ঢাউস পলিথিনের গামলা রাখা কলের নিচে। মাথাধোয়া জল গামলায় এসে পড়তেই, চমকে গেলাম—এমন নীলচে-সবুজ রঙ আসছে কোথা থেকে! এ যে আমারই মাথাধোয়া জল। মাথা থেকে রঙ বেরােচ্ছে। কে দিল এত রঙ!

হা হা করে হেসে উঠলেন মাস্টার—এতদিনের সব বস্তাপচা ধারণা। মাথাভর্তি সব গিজগিজ করছিল। যাক, বেরল কিছুটা। ধাে, ধাে, ভালাে করে ধাে। আরও খানিকটা জল ঢালার পর আবার নির্দেশ—নে, নে, অনেক হয়েছে। এবার মাথা মােছ। এখনও অনেক কাজ বাকি। এখনই তাে ঠাণ্ডা লাগালে চলবে না। মাথাটাথা মুছে এবার এই বারান্দায় এসে বস।

তােয়ালে একটা হাতের কাছেই তারে ঝুলছিল। মাথা মুছতে মুছতে দেখি, কখন যেন সেই মুশকো মতাে লােকদুটো কেটে পড়েছে। তােয়ালেটা তারে রেখে, আঙুল দিয়ে ভিজে চুলগুলাে দুরস্ত করতে করতে বারান্দার দিকে এগােই। চারধাপ সিঁড়ির শেষটায় পা দিতেই মাথায় ঠেকল পান্থপাদপের পাতা। আরে, এই তাে গাছ দুটো। দুই থামের নিচে দুই গাছ। কী দেখতে যে কী দেখলাম তখন!


এত ভিড়ভাট্টা এত হৈহট্টগােলের মধ্যেও কিছু মানুষ বিন্দাস ঘুমিয়ে যাচ্ছে নাক ডেকে। ওদিকে কয়েক জন চেঁচাচ্ছে রেল। দপ্তরের অবহেলা নিয়ে—এই লাইনেই সবচে কম ট্রেন। অন্য লাইনে যান, তবু ভদ্রভাবে যাতায়াত করতে পারবেন। এদিকে ২ জনের সিটে ৪ জন বসে হাতের ওপর রুমাল রেখে তাস খেলে যাচ্ছে কজন। ছােট ছােট শরবতি লেবু ৪ পিস করে কেটে নুন ছড়িয়ে কাগজের টুকরােয় দিয়ে গেল মিষ্টিহাসি মানুষটা। পাশের বউটা তার বাচ্চাটাকে খাওয়াতে চাইছে। বাচ্চাটা তার কোলের তুলতুলে স্পঞ্জের বেড়ালটাকে খাওয়াতে চাইছে। বেড়াল কি শরবতি লেবু খায়! সামনের ভদ্রলােক জানালার দিকে যতটা পারেন ঝুঁকে পড়ে খবর কাগজটা ভাঁজ করে পড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার কপালের ওপর এসে পড়েছে তন্ত্রসম্রাট জটিল শাস্ত্রীর ছবি। মাত্র ৩ ঘণ্টায় কামাক্ষ্যাতন্ত্রে মায়াবী বশীকরণ। ব্যর্থ প্রেম, বিদ্যা, ব্যবসা, দাম্পত্যকলহ, শত্রুদমন সহ যেকোনো সমস্যার সমাধানে সিদ্ধহস্ত। ডাকযােগেও প্রতিকার। বিনামূল্যে তন্ত্ৰদীক্ষা দেওয়া হয়। ধুস, টেলিফোন নংটা কেন যে পড়া যাচ্ছে না! নিচে ম্যানড্রেকের বউ, বগলকাটা বুককাটা জামা পড়ে কাকে যেন বলছে—ধন্যবাদ জাদুঅধ্যক্ষ শ্বশুরমশাই। ম্যানড্রেকের বউয়ের নামটা যেন কী! তার চুলটা আবার হলুদ রঙের। এ কী, বেড়ালটা শরবতি লেবু খেয়ে নিল। বাচ্চাটার কী হাসি। আমার মাথায় খুবসে রঙ দিচ্ছে ম্যানড্রেকের বউ। আজ দোল নাকি! বাচ্চাটা হাসছে। বগলকাটা বুককাটা জামায় আমিও দেব নাকি অল্প একটু রঙ? বাচ্চাটা হাসছে। বলছে, মেয়েটা মােটেই ম্যানড্রেকের বউ নয়। ও হলো গিয়ে জাদুকরী অ্যালিনা, ম্যানড্রেককে পটাতে না পেরে, খালি ফাঁসাতে চায়। উরিব্বাস, ওই বাচ্চা বলে কী! বেড়ালটা আমার দিকে কটমট করে তাকাল। চোখদুটো সবুজ। গায়ের রঙ কুচকুচে কালাে।

বেড়ালটা অনেক ক্ষণ নেই। কিন্তু আমার মাথার রঙটা এল কোত্থেকে?

– আচ্ছা স্যর, ওই লোকদুটোই কায়দা করে আমার মাথায় রঙ দিয়ে দিল তাই না? তারপর মানুষ দুটো গেল কই?

– কে, জগাই-মাধাই? ওদের কি কাজের শেষ আছে? রঙ কিন্তু ওরা দেয় নি। ওরা রঙ পাবে কোথায়?

– তাহলে!

 – বললাম তাে, রাজ্যের পুরনাে জঞ্জাল মাথার ভেতর জড়াে হয়ে ছিল। অনেকখানি বেরিয়ে গেল ধুয়ে। দেখবি, মাথাটা এবার একটু হাল্কা লাগবে।

বারান্দায় এসে একটা মােড়ায় বসেছি এখন। মাস্টারের মুখােমুখি। তবু অনেকটা দূরে। পাশে আরও দু-তিনটে খালি মােড়া। একটা চা-খাবার চৌকি। মাস্টার ইজিচেয়ারে আধশােয়া। বেড়ালটা এখন আর পায়ের কাছে নেই। আকাশের আলাে বেশ পড়ে এসেছে। আর একটু পরেই মনে হয় সন্ধে নেমে আসবে। মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। যেন মাইক ছাড়াই খালি গলায় আজান দিচ্ছে কেউ, খুব কাছেই কোথাও। টিকটিকিটা আবার ডেকে উঠল টিক টিক করে।

মাথাটা সত্যিই একটু হাল্কা লাগছে এইকথা ভেবে যে, সত্যিকারের একটা কিছু অভিজ্ঞতা হতে চলেছে আজ। মাস্টার যেন বুঝতে পারলেন কথাটা—

– কী, হালকা লাগছে না মাথাটা?

– তা লাগছে। কিন্তু সেই বস্তাপচা ধারণাগুলাে কী সেটা তাে বলুন। ওই যেগুলাে অ্যাদ্দিন ধরে আমার মাথার ভেতরে পােরা ছিল। আর আপনার ওই টিউকলে মাথা ধুতেই নীলসবুজ রঙ হয়ে বেরিয়ে গেল।

– সে কী আর একটা-আধটা? বলে যাই তাহলে এক এক করে, শোন—
১. মানুষ মরলে ভূত হয়
২. মায়া না-কাটাতে পেরে ভূতেরা পুরনাে জায়গায় ঘুর ঘুর করে
৩. ভূতেরা অন্য মানুষের ওপর ভর করে
৪. ভূতেদের দিনের বেলা দেখা যায় না
৫. ভূতেরা নাকি সুরে কথা বলে
৬. ভূতেরা ঘাড় মটকায়
৭. গাছের ওপর লম্বা পা ঝুলিয়ে বসে লম্বা হাত বাড়িয়ে কাছাকাছি রান্নাঘর থেকে মাছ চুরি করে খায়
৮. কেউ কেউ রক্ত চুষে খায়। যার রক্ত চোষে, সেও আবার রক্তচোষা হয়ে যায়
৯. ভূতেরা পুরনাে গুপ্তধন পাহারা দেয়
এইরকম আর কী!

– বলেন কী! এসব যদি সত্যি না হয়, তাহলে মানুষে আর ভূতে তফাৎ কী?

– তফাৎ যে আছে সে কথাটাই বা কে বলল?

– নিজের চোখে যারা ভূত দেখেছে তারাই তো বলে এসব।

– ওরা কেউ ভূত দ্যাখে নি।

– তাহলে কি ভূত নেই?

– তুই কি নেই?

– আমি? আমি কেন থাকব না! এই তাে জলজ্যান্ত বসে আছি আপনার সামনে।

– ভূতেরাও ওইভাবেই আছে। তােরই মতাে। তুই হয়েই রয়েছে এদিক ওদিক।

– আমি হয়েই মানে? আমার মতাে সেজে কোনো ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে নাকি!

– তুই নিজেই যে তুই সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছিস না, কে বলতে পারে।

– কেন, আমি তাে আমিই।

– নিজেই নিজের সাক্ষী হলে কোনো মামলা টেকে! অন্য কোনও সাবুত রয়েছে?

– কেন আমার রেশন কার্ড, ভােটার আইডি, আদার কার্ড…

– হাসালি। অমন কত লক্ষ লক্ষ ভুতুড়ে কাগজ রয়েছে বাজারে। মাঝেমধ্যে ধরপাকড়ের খবর বেরােয় দেখিস না?

চুপ করে থাকি কিছুক্ষণ। তারপর বলি—আর কী প্রমাণ চান বলুন।

– ভূতেরাও ওই রকমই। তােরই মতাে অসহায়। রয়েছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। সেইজন্যই তাে তাের নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করি নি একবারও। তুই হলি গে লুমুম্বা।

বলে কী লােকটা! সত্যিই কি আমার কোনো প্রমাণ নেই? মনটা কেমন ভারি হয়ে গেল। সে কি ভূতেদের দুঃখে না নিজের দুঃখে, কে জানে! বােধ হয় সেটা টের পেয়েই মাস্টার গলা নরম করে বললেন—এত মন খারাপের কী আছে! প্রমাণটাই কি সব? তুইও আছিস, ভূতেরাও আছে। ব্যাপারটা হলো বিশ্বাসের। নিজের ওপর বিশ্বাস নেই নাকি তাের?

– কেন থাকবে না? কিন্তু আপনিই তাে বলছেন, আমি নাকি আমি নই!

– আরে বাবা, তুই তুই না হলেও একটা কিছু তাে বটিস। কোনো একটা অস্তিত্ব। ধর, একটা চন্দ্রমল্লিকা ফুল বা একটা তালগাছ বা একটা চিতল হরিণ বা সাদা রঙের একটা কাক।

– কাক আবার সাদা হয় নাকি!

– হয়, বরফের দেশে হয়। এখন ধর, তুই লুমুম্বা না হয়ে যদি একটা সাদা কাক হােস, কী আসবে যাবে?

– আমার তাে পুরােটাই যাবে, আসবে আর কী?

– আসতে পারে, বিরাট কিছু আসতে পারে। হয়তাে তাের একার না, এই বিশ্বসংসারের একটা বিরাট লাভ হলো।

– কী যে হেঁয়ালি করেন আপনি!

– কেন বাপু, হেঁয়ালির জগতে যখন মুখ বাড়িয়েছিলি মনে ছিল না? যখন আজ কামদেবপুর কাল কঙ্কালিতলা ঘুরে ঘুরে বেড়াস, সে কি মজা দেখার জন্য? এতটা পথ উজিয়ে এখানেই-বা এলি কেন? এখন হেঁয়ালি বলে পিছিয়ে গেলে চলবে!

– না না স্যর, রাগ করছেন কেন? আমি তাে শিখতেই চাই।

– এসব কি বইয়ের শুকনাে পড়া নাকি, যে দুটো বক্তিমে শুনেই শিখে যাবি! এসব জিনিশ নিজের জীবন দিয়ে টের পেতে হয়। এমনি এমনি কি আর সবকিছু ছেড়ে এই ধ্যাধধেড়ে গােবিন্দপুরে পড়ে আছি? একটা এসপার ওসপার না-দেখে ছাড়ার পাত্তর অজিন মাস্টার নয়। আর সে কাজে তােকেও আমার চাই। বুঝলি?

– আমি আপনার কাজে লাগব!

– না লাগলে কি আর এখেনে এসে পড়তিস? এই দ্যাখ, কথা বলতে বলতে কখন অন্ধকার হয়ে এল। দাঁড়া, সন্ধেতারা ওঠার আগে ঘড়ির কাঁটা ঘােরাই। ছেলেমেয়েগুলাের কাজের সময় হল তাে।


মানুষ অতি খতরনাক জীব। তারচে’ মনে হয় পশুপাখি গাছপালা ঢের ভালাে! কেন রে, কে আবার দাগা দিল তােকে? আমার কথা না। টিভিতে সিরিয়ার ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর পথঘাটের ছবিগুলাে দেখে কেমন লাগে বল? ওফ, মনে হয় একেকটা ভুতুড়ে শহরের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। গা ছমছম করে। তরতাজা শহরগুলােকে ক’দিনের ভেতর এরকম হাড়গাের ভাঙা কংকাল বানিয়ে ছেড়ে দিল। অথচ ওগুলাে তৈরি করতে কত শ’ বছর লেগেছিল কে জানে! ঝুলন্ত হাতল, সিটের কোণ, জানালার শিক ধরে দুলতে দুলতে দাঁড়িয়ে থাকা পুঞ্জ পুঞ্জ ভিড় থেকে ভেসে আসছে টুকরাে টুকরাে কথা। ধুনুরির তুলােধােনার শব্দের মতাে আওয়াজ ভাসছে সারা কামরায়। পাশের বাচ্চাটা হঠাৎ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল। ৫ মাস হয়ে গেল ছেলেটার কোনো হদিশ নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ারের ছেলে। পুলিশ কি চাইলে পারত না বের করতে? এত বড় দেশ, এত কোটি মানুষ, কে কোথায় গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। যদি খারাপ লােকের পাল্লায় পড়ে! কিডনি পাচার-টাচার কতরকম কিছু হয় আজকাল। আমাদের ছােটবেলায় ছিল ছেলেধরা আর নিশির ডাক। অনেকে নাকি ছােটদের ধরে ভেড়া বানিয়ে রাখত। ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ। সামনের ভদ্রলােকের ৮ ভাঁজ কাগজে এখন কর্কট : জ্যোতিষ ও রহস্যবিদ্যার চর্চায় অগ্রগতি। সিংহ : বন্ধুর অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করায় দূরত্ব। কন্যা : অপ্রিয় সত্যকথনে বিপত্তি। দুর্ঘটনায় রক্তপাত। আমার রাশিটা যেন কী! বাচ্চাটা চেঁচাচ্ছে। ওর মা কি আগে এরকম নাকঢাকা কালাে বােরখা পরে ছিল? আর কত চেপে বসব। জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাব যে এবার। বউটার চোখদুটোও ঢাকা থাকলে ভাল হতো। এমনভাবে তাকাল, আমি একটা ভেড়া হয়ে গেলাম। চিবিয়ে যেতে থাকলাম বােরখার একটা কোনা। বাচ্চাটা চুপ। এমন লােমওয়ালা ভেড়া দেখে নি তাে আগে। কান্নাটান্না ভুলে, আমার পিঠের কোঁকড়ানাে লােম ধরে টানাটানি করতে লাগল। ঠোঁট মুচড়ে মুচড়ে হাসছে বউটা। মঘা নক্ষত্র রাত্রি ২- ৫৮ পর্যন্ত। অমৃতযােগ রাত্রি ১২-৪৮ গতে ৩-০০ মধ্যে।

কাত্তিক মাসের দুপুরেই গলায় কম্ফর্টার জড়ানাে বুড়ােটা বলে উঠল—সময় ধরে কাজ করাটা কিন্তু কোনো কুঅভ্যেস নয়।

হঠাৎ কোথা থেকে এক দঙ্গল অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের চাকবাঁধা গলার আওয়াজে চমক ভাঙল। যেন কোনো একটা ইশকুল শুরুর আগে হেঁটে যাচ্ছি পাশের রাস্তা দিয়ে। আকাশের আলােটা কমতে কমতে কখন যেন একেবারে মিলিয়ে গেছে। সেটা ঠাহর করতে পারি নি। কারণ এর মধ্যে একফাঁকে জ্বলে উঠেছে কিছু টিমটিমে আলাে। টিমটিমে, তবে দেখতে কোনো অসুবিধে হয় না।

সেই আঁধারি আলােয় সামনের চত্বরটার দিকে তাকিয়ে তাে ভিরমি খাবার জোগাড়। সারা মাঠে কলকল করছে ১০ থেকে ২০ বছর বয়সী শতখানেক ছেলেমেয়ে। একদম ছােটগুলাের পরনে কারাতে শেখার পােশাক। তার ওপরের গুলাে ব্রতচারী আর রায়বেঁশে। কয়েকজন রণপা লাগিয়ে তৈরি। বড়গুলাে পরে আছে এনসিসির ধাঁচে কুচকাওয়াজ করার আধা-সামরিক পােশাক। সেই মুশকো লােকদুটো, জগাইমাধাই, বাঁশি ফুঁকতে ফুঁকতে কচিগুলােকে লাইন করিয়ে বাড়ির পেছন দিকে নিয়ে গেল, কারাতে শেখাতে। তার পেছনে ব্রতচারী আর রায়বেঁশের দল। তার পেছনে রণপা। কয়েকজন লম্বা লম্বা কাপ্তেন টাইপের লােক বড়দের দলটাকে কয়েক ভাগে ভাগ করে প্যারেড করানাের ব্যবস্থা করছে। একদম বড়গুলাের হাতে দেখি মােটা মােটা লাঠি। বন্দুকের কায়দায় বাগানাে। আর একটা ব্যাপার চোখে পড়ল। অত যে ফুল-ফলের ছােটবড় সব গাছ, দেখি বিলকুল উধাও। আম-কাঁঠাল-বেল-নিম-সজনে-সুপারি-পাম মায় সেই পান্থপাদপ দুটো পর্যন্ত—হাওয়া!

নিজের ইজিচেয়ারে এসে বসতে বসতে বেশ হাল্কা গলায় বলে ওঠেন অজিন মাস্টার—কী লুমুম্বাচাঁদ, একেবারে হতচকিত? এখুনি সিনেমার শুটিং শুরু হবে একটা। যা দেখছিস, এসব তারই প্রস্তুতি। সেজন্যেই তাে বললাম—সময় ধরে কাজ করাটা কোনো কুঅভ্যেস নয়। আর এই অন্ধকারটুকুই তো সময়। সূর্য ডুবলেই তাে সাথে সাথে অন্ধকার নামে না। খানিক অপেক্ষা করতে হয়। ভােরেও তাই। সূর্য ওঠার ঢের আগে থেকে আকাশ ফর্সা হতে থাকে। কাজেই সময় খুব কম।

– সিনেমার শুটিং হবে এই রাতের অন্ধকারে!

– উটকো লােকজন, খােচর পুলিশের চোখ এড়িয়ে কাজ করতে গেলে রাত ছাড়া উপায় কী, বল?

– তা, এতগুলাে মানুষ জোগাড় করলেন কোথেকে কখনই-বা এল এরা?

– সব এখেনেই ছিল। দিনের বেলা এরা সব কাল্পনিক রাশি হয়ে থাকে।

– কাল্পনিক রাশি!

– জানিস না? ইংরিজিতে যাদের বলে ইমাজিনারি নাম্বারস। একেকটি ছােট হাতের আই (i)।

– তার মানে আসলে অমন আই (i) বলে কিছু নেই? সেই জন্যেই তাে বলছেন কাল্পনিক।

– যাদের কল্পনাশক্তি কম, তাদের কাছে কাল্পনিক। একটা সংখ্যাকে, ধর ১-কে, যদি ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিই, তবেই পেয়ে যাব। আর যদি সেটাকে ওই একই দিকে আরও ৯০ ডিগ্রি ঘােরাই, তবে পাব মাইনাস এক (-১)। বল তাে, মােট কত ডিগ্রি ঘােরানাে হলো?

– ১৮০ডিগ্রি?

– রাইট। কেউ এতদিন ধরে যেকথা বলে এসেছে, আজ যদি তার পুরাে উলটো কথা বলে, তখন আমরা বলি না, লােকটা ১৮০ ডিগ্রি পালটি খেয়েছে!

– হ্যাঁ সে তাে বলিই।

– তার মানেটা কী দাঁড়াল বল তাে?

– কী আর, কোনো জিনিশকে ১৮০ ডিগ্রি ঘােরালে ঠিক তার উল্টোটা এসে হাজির হয়।

– ঠিক। অর্থাৎ ১ হয়ে যায় -১। তাহলে এটা যদি সত্যি হয়, মাঝখানের ওই আই (i)-টাও সত্যি। অর্থাৎ আই (i)-কে ২ বার গুণ করলেই মাইনাস এক (-১)।

– এই শেষ কথাটা কিন্তু ধরতে পারলাম না। ওই ১৮০ ডিগ্রি ঘােরালে ১ যে -১ হয়ে যায়, এইটা বুঝেছি।

– ব্যাস ব্যাস, ওইতেই হবে। কেবল এট্টা কথা মনে রাখিস, শুধু ঘােরালেই হবে না, কোন দিকে ঘােরাচ্ছিস, সেইটাই আসল।

– ও হ্যাঁ, ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে।

– ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে মানে সময়ের উল্টোদিকে। মানে, বর্তমান থেকে অতীতে। অতীত মানে কী?

– অতীত মানে, আগে।

– আগে তাে সবাই জানে। আর কী বলে? আগামীকে কী বলে?

– ভবিষ্যৎ।

– আর, তার উলটো?

– ভূত। ভূত।
– ব্যাস, সব শেখা হয়ে গেল, এবার চা খা।

– কোথায় শেখা হলো! আপনার সিনেমার ওই ছেলেমেয়েগুলাে, ওরা কি ভূত নাকি!

– বলব। সব বলব। আগে তাে চা খা।

নাম শুনেই চায়ের তেষ্টাটা হঠাৎ চাগাড় দিয়ে উঠল। খিদেও যেন পেয়েছে একটু একটু। ট্রেনে কি কিছু খেয়েছিলাম? ওই ভিড়ের মধ্যে কী করে খাব!

– কী, খিদে পেয়ে গেছে তাে? খিদের আর দোষ কী!

কোথায় বাগনান আর কোথায় এই ইব্রাহিমপুর। যাক্, ওই যে খাবার আর চা এসে গেছে।

মাথা নিচু করে পর্দা ঠেলে হাতে চায়ের ট্রেন নিয়ে যিনি ঢুকলেন, ট্রেনের সেই বাচ্চাটার মা না! সেই-রকমই আমুণ্ডপা কালাে বােরখায় মােড়া। দেখতে না পেলেও বুঝলাম, চোখ দুটো নিশ্চই খােলা। না-হলে আর টেবিলে চা-নাস্তা সাজিয়ে দিচ্ছিলেন কিভাবে। নীরবে এসে নীরবেই চলে গেলেন তিনি। তাঁর ছায়াটুকু অব্দি মিলিয়ে যাবার পর মাস্টার বললেন—ও হলো অ্যালিনা।

অ্যালিনা! অ্যালিনা যেন কার নাম? অ্যালিনা… অ্যালিনা… ওঃহাে, মনে পড়েছে, সে তাে জাদুকর ম্যানড্রেকের বউ। না না, বউ না, আর এক জাদুকরী। টিকটিকিটা এবার খুব জোরে ডেকে উঠল। টিকটিকি না তক্ষক? আছে কোথায় সেঁধিয়ে!

কাকে যেন বলে উঠলেন মাস্টার—হ্যাঁ হ্যাঁ মিঃ খাস্তগির। চায়ের তেষ্টা লেগেছে বুঝি। দাঁড়ান দাঁড়ান, ব্যবস্থা করছি।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দেয়ালের কাছে এসে দাঁড়ালেন মাস্টার। দেয়ালের গায়ে একটা ঘড়ির মতাে জিনিস। কালাে ফ্রেমের বৃত্তের মধ্যে একটা শাদা বৃত্ত। যেমন ঘড়িতে থাকে। কিন্তু তাতে কোনো সংখ্যা আঁকা নেই। আড়ে আর লম্বায় দুটো রেখা বৃত্তটাকে ৪ ভাগ করেছে। ঘড়ির ঠিক কেন্দ্রে যেখানে রেখাদুটো নিজেদের ছুঁয়েছে, সেখানে একটা ছােট্ট ছিদ্র। সেখান থেকে কাঁটার বদলে একটা ড্রাম বাজানাের কাঠির অর্ধেকটা লাগানাে। ঘড়ির মাথার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠিটাকে ঘণ্টার কাঁটা ভাবলে মনে হবে, ১২টা বেজেছে বুঝি। মাঝের গর্তে চাবি ঢুকিয়ে ঠিক এক পাক ঘােরালেন মাস্টার। ক্লিক করে একটা শব্দ হলো। দাঁড়িয়ে থাকা কাঠি ঘড়ির কাঁটার উলটো দিকে গড়িয়ে বাঁদিকের মাঝামাঝি এসে থমকাল। এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে বুঝি ৯টা বাজে।

একমনে এইসব কারসাজি দেখছি। পেছনে কখন এসে দাঁড়িয়েছেন লম্বাপানা পেটা চেহারার এক মানুষ।

– বসুন বসুন মিঃ খাস্তগির, চা খান।

মাস্টারের নির্দেশের জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন মানুষটা। একটা মােড়া টেনে বসলেন। মুখটা কেমন চেনা চেনা। টিভিতে দেখেছি কি? আমার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনাে হাসি দিলেন। তারপর একটা চায়ের পেয়ালা টেনে নিয়ে চুমুক দিলেন। বােধ হয় খেয়াল করেন নি, চা-টা ছিল যথেষ্ট গরম। মনে হলো জিভে একটু ছেঁকাই লাগল বেচারার। জিভ তালুতে ঠুকে একটু শব্দ করলেন। শােনাল যেন—টিক টিক।

ঠাট্টা না সহানুভূতি, না কি দুটোই মেশানাে গলায় অজিন মাস্টার বলে উঠলেন—আহা হা। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—আমাদের এই মিঃ খাস্তগিরকে যে সে লােক ভাবিস না কিন্তু। অনেক কিছু শেখার আছে এর কাছ থেকে। বুঝলি লুমুম্বা, সংখ্যার মধ্যে যেমন প্লাস (+) মাইনাস (-) আছে, মানুষের মধ্যেও সেরকম। হ্যাঁ-মার্কা আর না-মার্ক।

– এও কি সেই কাল্পনিক রাশির মতাে, কাল্পনিক মানুষ?

– আরে না না, কাল্পনিক কেন হবে! -১ ও তাে +১এর মতােই একটা বাস্তব রাশি, ইংরিজিতে যাকে বলে রিয়াল নাম্বার। এই না-মার্কা মানুষগুলােও সেরকম বাস্তব মানুষ। এরা সব আমাদের চারপাশেই রয়েছে। মানুষের ক্ষতি করার অসীম ক্ষমতা এদের। ভাবিস না এ শুধু আজকের ব্যাপার। এসব সেই আদিকাল থেকেই রয়েছে। চিরকাল এরাই হ্যাঁ-মার্কা মানুষদের ওপর রাজত্ব চালিয়ে এসেছে। যত রাজা গজা সেনাপতি মন্ত্রী কোটাল—সব একেকটি না-মার্কা মানুষ। বুদ্ধিজীবীগুলােও বেশির ভাগ তাই অবশ্য। আমাদের মি. খাস্তগিরও অমন একজন না-মার্কা মানুষ।

আমি একটু বাড়তি কৌতূহল নিয়ে মি. খাস্তগিরকে দেখি। মাস্টার বলে ওঠেন—একসময় উনি মাওবাদী দমন বিভাগের যৌথ বাহিনীর গােয়েন্দাপ্রধান ছিলেন। মূলত ওঁরই বুদ্ধিতে সেসব আপদ বিদেয় হয়েছে। এখন উনাদের যুদ্ধ ইসলামি জঙ্গিদের সাথে। সে ভালাে কথা। কিন্তু আমাদের বিপদ হচ্ছে, কেন জানি না উনার ধারণা হয়েছে, আমাদের এই ইউনিটে নাকি জঙ্গিদের ট্রেনিং চলছে। কাজেই আমাদেরও সাবধান হতে হলো। ওঁকে এখেনেই রেখে দিলাম।

– রেখে দিলেন মানে!

– ওই একটা টিকটিকি বানিয়ে। খাওয়া-দাওয়াটা আমাদের সাথেই করেন। বাকি সময় দেওয়ালের গায়ে।


সেই ছবিটার কথা মনে আছে? সেই যে রে, একটা কয়েদি নানা কৌশল করে এক হাজত থেকে বেরােচ্ছে, আবার আরেকটায় ঢুকে পড়ছে। নজরদারির এমন টাইট ব্যবস্থা! যা বলিছিস, আজকাল সব জায়গায় ক্যামেরা ফিট করা। তুই শালা অন্ধকারে এট্টু চুমু খাচ্ছিস, তারও ছবি উঠে যাচ্ছে। তেমনি পালটা ছবি বানানােটাও সহজ হয়ে গেছে, সেটাও বল। কিভাবে! আরে বাবা, এখন তাে তাের মােবাইল বা ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়েই একটা ছােট ছবি তুলে ফেলতে পারিস। এ কী, ছেলেগুলাে ছবি তুলতে আরম্ভ করল যে! হ্যাঁ মাসিমা, কী যেন বলছিলেন—কে যেন হারিয়ে গেছে? হারিয়ে গেছে, না কে কোথায় জাদুটোনা করে কিছু বানিয়ে রেখে দিয়েছে দেখুন। জাদুটোনা মানে কী রে—মগজ ধােলাই? আপনার কাগজে কী বলছে দাদু? আইসিস যা পারল, মাওবাদীরা সেটা পারল না কেন? কেন, প্রচণ্ডকে দ্যাখ। দু’দু’বার প্রধানমন্ত্রী। আরে দিদি, আপনার বাচ্চাটা কই! আমার আবার বাচ্চা কোথায়? এই তাে আমার বাচ্চা। বলে, আমার পিঠে গলায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল কালাে বােরখা পরা মেয়েটা। এই শটটা দারুণ হবে—কালাে বােরখার ওপর শাদা পায়রা। আরে পায়রা কই রে, এ যে কাক! শাদা কাক। এই শাদা কাকটাই তাইলে আমাদের সিনেমার হিরাে। হিপ হিপ হিরাে। টিকটিকিটা ডেকে উঠল—টিক টিক টিক।

অজিন মাস্টার কি তবে কোনো গােপন সন্ত্রাসবাদী দলের নেতা, না এক তন্ত্রসিদ্ধ কাপালিক? না কি কোনো ভিন গ্রহের প্রাণী, মানুষ সেজে এখানে রয়ে গেছে? চোখের সামনে একটা তাগড়াই মানুষকে এক্কেরে টিকটিকি বানিয়ে দিল!

– কী ভাবছিস লুমুম্বচন্দ্র?

মাস্টারের সূচলাে নজর আবার এসে পড়ল আমার চোখের ওপর। কী হবে এখন! ইনি তাে দেখলাম মনও পড়তে পারেন। ভয়ে জিভ জড়িয়ে গেল মুখের ভেতর। আমতা আমতা করে কী যে বললাম, নিজের কানেই তার কোনও মানে ফুটল না।

একটু যেন আনমনা গলায় মাস্টার বললেন—ধর, তাের সবকটা প্রশ্নের উত্তরই ‘হ্যাঁ’। যা যা তাের মনে এল, সবই আমি। হতেই তাে পারে। সেই যে, রবি ঠাকুরের একটা গানে আছে না—এই জনমে ঘটালে মাের জন্ম-জনমান্তর। জীবন তাে একটাই। তার ভেতরেই নানা রূপ ধরে যা করার করে ফেলতে হবে। এমন মানব জনম আর কি হবে? মন যা করবার তা কর এই ভবে…

মাস্টারের গলায় যে এত সুর আছে, কে জানত! গানটা শুনে আমার ভেতরে যে কী হল, হঠাৎ তার পায়ের কাছে গিয়ে মাথা হেঁট করে বলে ফেললাম—স্যর, আমার খুব ভয় করছে।

– এই, এইসব পায়ে হাত দেওয়া-ফেওয়া আমার একেবারে পছন্দ না। ওঠ ওঠ। সুস্থির হয়ে বস। বল এবার, কিসের ভয়?

– স্যর, আমাকে আপনি টিকটিকি বানিয়ে দেবেন না তাে?

– ওঃ, এই কথা! সবাইকে কি টিকটিকি বানালে চলে? যার যেমন কাজ, তেমন তার রূপ। আচ্ছা, তুই তখন জানতে চাইছিলি না, সিনেমার জন্য এতগুলাে ছেলেমেয়ে কোখেকে জোগাড় করলাম।

– হ্যাঁ, হঠাৎ অন্ধকার নামতেই কোথা থেকে হাজির হল ওরা!

– আচ্ছা, একটা ব্যাপার কি খেয়াল করেছিস—সন্ধে ইস্তক মাঠের মধ্যে যেসব ফুল আর গাছপালা দেখেছিলি, তার একটাও এখন নেই।

– খেয়াল করব না আবার! সব উধাও। এই সবই কি আপনার ম্যাজিক, না কি কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড?

– ওই ছেলেমেয়েগুলাে হলো বাস্তবিক। আর, ওদেরই কাল্পনিক অস্তিত্ব হলো ওইসব ডালিয়া চন্দ্রমল্লিকা গাঁদা ফুলের ঝাড়। ওইসব নানারকম গাছপালা।

– তার মানে, আপনি ওই ছেলেমেয়েগুলােকে গাছপালা আর মরশুমি ফুল বানিয়ে রেখে দিয়েছেন!

– তাছাড়া আর উপায় কী বল? আমাদের আখড়ার ওপর তাে ভালো নজর নেই কত্তাব্যক্তিদের। এতগুলাে তরতাজা ছেলেমেয়ের জীবন, দিনের বেলা ওদের একটু আড়ালে রাখতেই হয়।

– স্যর, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

– কী কথা?

– এখানে তাে কোনো বেআইনি কাজকর্ম চলে না। তাহলে এত লুকোচুরির কী আছে!

– আইন-বেআইন যে-লাইনেই চল, সন্দেহ করতে তাে বাধা নেই। বৃষ্টির জল ধরে রেখে চাষের মাঠে একটু সেঁচের চেষ্টা নিচ্ছিস, মারাে ডাণ্ডা। গরিবগুর্বো মানুষদের বিনি পয়সায় চিকিৎসার এই ব্যবস্থা করছিস, চলাে হাজত। কোথাও কারও স্বার্থে একচুল ঘা লাগলেই হাঁড়ি থেকে সাপ বেরিয়ে আসে। কোনদিকে যাবি?

– আপনি একা মানুষ। তার ওপর বয়স হয়েছে। এত বড় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে করবেনটা কী?

– বয়েস হলো মানুষের মনে, বুঝলি। তাছাড়া আমি একা কোথায়? রােজই কেউ না কেউ এসে যােগ দিচ্ছে আমাদের এই সিনেমার ইউনিটে। এই যেমন তুই আজ এলি।

– আমি? আমি এলাম মানে! আমি তাে যােগ দিতে আসি নি। এমনি এলাম ঘুরে বেড়িয়ে দেখে যেতে। আপনার কাছ থেকে যদি কিছু শেখা যায়, তাই এলাম। সােহরাব মামাও বললেন।

– আগেই বলেছি না, এলাম আর শিখে নিলাম—এমন হয় না। আর এখেনে যারা আসে, থেকে যেতেই আসে।

– থেকে যেতেই মানে! কত দিনের জন্য?

– ঢোকারই হিশেব থাকে রে লুমুম্বা, বেরনাের কোনো হিশেব রাখার নিয়ম এখেনে নেই। আর সােহরাবও সেটা জেনেই তােকে এখেনে পাঠিয়েছে।

– ও, আমি তাহলে এখন আপনার হাতে আটক! চিরকালের মতাে? কিন্তু আমার অপরাধটা কী? রহস্য ভালােবাসি, এটাই কি আমার অপরাধ?

– রহস্য ভালােবাসলে, রহস্যও তােকে জড়িয়ে ধরবে। এটাই তাে স্বাভাবিক। তবে আমি তােকে আটক করছি না। আজ তাে আর কোথাও ফিরতে পারবি না। রাত্তিরটা তাই এখেনে কাটাতেই হবে। রহস্য দেখতে এসেছিস, চোখ কান খুলে সবকিছু দ্যাখ। কাল সকালে, ইচ্ছেমতাে চলে যাস।

– স্যর, আপনি পায়ে পড়া পছন্দ করেন না, জানি। কিন্তু কী করব বলুন। মাথা কাজ করছে না। এই একটা রাত্তিরের জন্য আমায় মাপ করে দিন। দোহাই আপনার, খরগােশ-গিনিপিগ কিছু বানাবেন না, প্লিজ!

– ভেবেছিলাম, এই সিনেমাটার নায়কই হবি তুই।

– আমি হব নায়ক! আমি কোনোদিন কোনো নাটকের স্টেজেই নামি নি। পাড়ার ফাংশানে পর্যন্ত না। সেই আমি হব সিনেমার নায়ক! এটা অ্যাবসার্ড ব্যাপার।

– ও, আর গােটা সিনেমাটাই যদি অ্যাবসার্ড হয়?

– সিনেমা যেমনই হােক, পাত্রপাত্রীদের অভিনয় তো করতে হবে। তার ওপর যে নায়ক, তার তাে সবচে বড় ভূমিকা। আমার দ্বারা হয় নাকি কখনও?

– ভূমিকাটা বড়ই বটে। কিন্তু অভিনয় তেমন না-জানলেও চলবে। এ ছবিতে কেউই ঠিক সেভাবে অভিনয় করছে না। যার যেটা কাজ, সেটাই করে যাচ্ছে। কাজেই বানিয়ে বানিয়ে কিছু করার নেই।

– এই যে এতগুলাে চরিত্র দেখলাম, এরা সব নিজের কাজ করে যাবে আর তাতেই সিনেমার কাজও হয়ে যাবে! তার মানে ডকুমেন্টারি ছবি বলুন।

– হ্যাঁ, ডকুমেন্টারিও বলতে পারিস। তবে জীবনেরই ডকুমেন্ট। জীবনের এক মহাযজ্ঞ।

– তাহলে ঠিক অ্যাবসার্ড সিনেমা নয়।

– না, অ্যাবসার্ড মানে, কোনো চিত্রনাট্য নেই তাে। কোনো ক্যামেরাম্যানও নেই। এডিটরও নেই।

– ক্যামেরাম্যান নেই মানে! ক্যামেরা ছাড়া আবার ছবি তােলা যায় নাকি?

– ক্যামেরা আছে, মহাশূন্যে ফিট করা। সেখানকার বিশাল ক্যামেরায় সমস্ত ছবি উঠে যাচ্ছে। যে যা করছে, সব ছবি। এই যে আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন যে যার কারাতে-কুস্তি-ব্যায়াম-কুচকাওয়াজ সেরে মাঠের কাজে লেগেছে। হাঁস-মুরগির খামার, গরু- ছাগল-শুয়োরের খামার পরিচর্যা করছে কেউ। কেউ কেউ কাজ করছে ঘানিকলে। কেউ বুনছে তাঁত। ভেষজ লতাপাতা দিয়ে ওষুধ তৈরি করছে কেউ। সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলাে মুছে তকতকে করে রাখছে কেউ। তার থেকেই তাে আমাদের এখানে সব আলাে জ্বলে। কল ঘােরে। সেই আলােতেই দিনের বেলা করার সমস্ত কাজ করে ফেলা হচ্ছে গভীর রাতে। এটাই এই সিনেমাটার মজা।

– আপনারা একটা ছায়ার সাথে লুকোচুরি খেলছেন।

– ঠিক বলেছিস। গভীর কালাে একটা ছায়া। যেটা সারা পৃথিবীকে গিলে ফেলতে চাইছে, লুকিয়ে লুকিয়ে তাকেই ধরার ব্যবস্থা করছি।


বাজারে পাবেন না। ফুলকচি। ফুলকচি। ভিড়টা কি আগের থেকে একটু হালকা হলো? তাের পছন্দ না হলে তুই দেখিস না। বাজারে যা খাবে, তাই তাে বানাতে হবে। লসে তাে আর কেউ রান করতে পারে না। সে তাে ঠিকই। কিন্তু এই পছন্দ-অপছন্দের গজফিতেটা যে কোথাকার দর্জিঘরে বানানাে হয়, সেটাই ধত্তে পারলাম না। একটু জায়গা পেয়ে সামনের ভদ্রলােকের কাগজ এখন ৪ ভাঁজ। চোখের ওপর এসে পড়ছে জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলােয় দারুণ ডিল। গ্রেট ইন্ডিয়ান সেল। ফাস্ট আর অনটাইম ডেলিভারি। একটা অন্ধ মেয়ে ভােজপুরি টানে গান গাইতে গাইতে কামরার ওদিক থেকে এদিকে এসে আবার আর একদিকে চলে গেল—রামাইয়া কি দুলহন লুটত বাজার/ সুরপুর লুট নাগপুর লুট/ তিনলােক মচ হাহাকার। বােঝাে, দুলহনের লুটের ধাক্কায় তিন ভুবনে হাহাকার পড়ে গেছে গাে! তা মাসিমা, আপনার ভাগ্নের ব্যাপারে কী করছেন? কিছু তাে কত্তে বাকি রাখি নি বাবা। এই তাে আজ চলিচি ইব্রাহিমপুর। সেকেনে কে এক মাস্টার আচে। সে নাকি অব্যর্থ গণৎকার। ভালােমন্দ যাহােক একটা কিছু যদি জানা যায়। কী কাকু, কী খোঁজেন! আপনার আবার কী হারাল? পাশের বােরখা-পরা মেয়েটা নির্ঘাত একটা কিছু লুকোতে চেষ্টা করছে। ওর বাচ্চাটা গেল কই? আর বাচ্চার সেই স্পঞ্জের বেড়ালটা? অন্ধ মেয়েটা আবার এদিকে আসছে। গাইতে গাইতে—কহত কবির শুনাে ভাই সাধো, ইস ঠগিনী সে রহাে হােশিয়ার। হুঁশিয়ার তাে থাকতেই হবে।

প্রথম দিকটা আমি খুব হুঁশিয়ারই ছিলাম। একে অচেনা জায়গা। তার ওপর একমাথা টেনশন। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তারপর এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। বুঝতে পারছি, সেই মাথা-মালিশওয়ালাটা চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে চালিয়ে আমার সব টেনশন দূর করে দিচ্ছে। ওর সেই আরকের ঝিমঝিমে গন্ধটা শরীরের অন্ধিসন্ধিতে সেঁধিয়ে আমার সব ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছে। মানুষটা এত কাছে এসে গেছে যে তার গরম নিশ্বাসটা এসে পড়ছে আমার চোখেমুখে। হঠাৎ আমার মাথাটা আলতাে করে ঝাঁকিয়ে দিল সে। আধােঘুমের মধ্যেই খানিক চোখ মেলে তাকালাম। এ কী! অন্ধকারের মধ্যে আরও অন্ধকার হয়ে মিশে থাকা একটা ছায়া। সেই ছায়ার ভেতর দিয়ে শুধু যেন এক জোড়া চোখের অস্পষ্ট আভাস। ভয়ে আমার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু তার আগেই একটা হাত এসে সজোরে চেপে ধরল আমার মুখ। জোরে চাপার কারণেই স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, সে এক নারীর হাত।

শেষ পর্যন্ত এই বিষকন্যার হাতে আমায় মেরে ফেলার ব্যবস্থা করলেন অজিন মাস্টার! অথচ তিনি কথা দিয়েছিলেন, আমার কোনো ক্ষতি করবেন না। এখন বুঝতে পারছি, ওঁর কথায় ভরসা করা আমার উচিত হয় নি। তবে ভরসা না করলেই-বা আমি কী করতে পারতাম? কোথায় পালাতাম এই রাত্তিরে! কিন্তু এখন? এখন কি হাল ছেড়ে দেব! মেয়েমানুষ তাে, একবার গায়ের জোর খাটিয়ে দেখি, এর হাত থেকে বাঁচতে পারি কি না। কিন্তু আমি নড়াচড়া করতে পারছি না কেন! হবে না কেন, এরা তাে সব অশরীরী। এতক্ষণে চোখদুটো অল্প অল্প দেখতে পাচ্ছি যেন। অন্ধকারের ভেতরে যেন ছড়িয়ে পড়ছে খুব হালকা একটা সবুজ আভা। সেই চোখের দিকে চেয়ে আকাশপাতাল আরও কত কী ভেবে চলেছি। হঠাৎ কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে সেই অশরীরিনি বলে উঠল—মিন্টু দা!

সেই ফ্যাসফেসে আওয়াজে আমার সারা শরীর বরফের চাঙরের মতাে ঠান্ডা হয়ে গেল। আমার ডাকনামটা পর্যন্ত জানে! এ নির্ঘাত নিশির ডাক। এখন সাড়া দিয়েছি কি আমার আত্মাটাকে খপাত করে ধরে একটা কৌটোর মধ্যে পুরে ফেলবে। ভেতর থেকে অজানতেই একটা গােঙানির শব্দ বেরিয়ে এল।

– মিন্টু দা, শব্দ করিস না। আমি পরী।

পরী? সব মেয়েই তো অল্পবিস্তর পরী। ইনি আবার কোন পরী! অনেক ডাকিনীও পরীর ছদ্মবেশে আসে। এও নির্ঘাত ওইরকম কিছু একটা হবে। আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তারপর রক্ত চুষে খাবে। কিন্তু মাস্টার যে বললেন—ওইসব ঘাড় মটকানাে, রক্তচোষা—সব বিলকুল বাজে বানানাে ব্যাপার। কিন্তু আমার সামনে জলজ্যান্ত যিনি এখন হাজির, তিনি তাহলে কে? তার মতলবটাই-বা কী!

এইসব এলেবেলে ভাবনার ভেতর যেন একটা বাতাসের স্পর্শ এসে লাগল। যেন তার চেয়েও কোমল কোনো স্বরে সেই ছায়ানারী আবার কানে কানে বলল—একদম আওয়াজ করিস না মিন্টু দা। এই যে তাের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু যদি এখান থেকে পালাতে চাস, চুপ করে আমার কথা শােন। শব্দ করলেই মাস্টারজি টের পেয়ে যাবে। আর, একবার টের পেলে, জানবি, এখানেই চিরকালের মতাে বন্দি।

আমি কেন বন্দি হতে যাব! সকাল হলেই বিদায় হব আমি। মাস্টারের সেরকমই ফরমান আছে আমার ওপর। তাহলে আমার চিন্তা কিসের? মড়ার মতাে শুয়ে শুয়েই ভেবে যাই এসব কথা। হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টানে আমাকে তুলে বসায় সেই মেয়ে। বলে—তুই কি সত্যিই আমায় চিনতে পারিস নি মিন্টু দা? সেই চালিধাউড়িয়া গ্রামের কথা একেবারে ভুলে গেলি?

– চালিধাউড়িয়া! শিবলির খালাম্মার বাড়ি। তুই সে-ই পরী?

– চুপ। এখানে কোনো কথা না। আগে শিগগির এঘর থেকে বেরাে। আমার পিছু পিছু আয়। একেবারে নিঃশব্দে।

বুঝতে পারছি না, এও কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড কি না। সে-ই পরী! শিবলির খালাতাে বােন। যার জন্য একসময় দিনের পর দিন পাগল হয়ে ছিলাম, রাতের পর রাত ঘুমােই নি। সেই পরী? কিছুই করার উপায় ছিল না সেসময়। আমি তখন পুণেতে কাপড় বােনা শিখছি। আর পরী যে কোথায়, কিছুই জানি না। না আছে ঠিকানা, না আছে মােবাইল নাম্বার। শিবলিও খড়াপুরে পড়াশুনাে নিয়ে ব্যস্ত। ওর ছুটি আর আমার ছুটি মেলে না। বছর দুয়েক পর যখন দেখা হয়েছিল, হাল্কা করে পেড়েছিলাম প্রসঙ্গটা। ও কি একটু এড়িয়ে গিয়েছিল! আজ আর মনে নেই ঠিক। সেই পরী কিনা এখানে! মনে হাজার প্রশ্ন ভিড় করে এলেও, এখন কথা বলা বারণ। চুপচাপ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটার পর একটা ঘর-বারান্দা আর সিঁড়ি পার হয়ে হয়ে পরীর পিছু পিছু চলেছি। ও যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কে জানে!

কিন্তু পরী অমন পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালাে বােরখায় ঢেকে রেখেছে কেন নিজেকে? এর আগে ওকে যখন দেখেছি—দু’বার দ্যাখা হয়েছিল ওর সাথে। প্রথমবার আমাদের মাধ্যমিকের পর। ও বােধ হয় তখন নাইনে পড়ে। তখন তাে আমি শিবলিদের বাড়িতেই পড়ে থাকতাম। এনুয়াল পরীক্ষার পর পরীও এসেছিল সেখানে। আর দ্বিতীয়বার, আমাদের উচ্চমাধ্যমিকের পর। আমি আর শিবলি সেবার গিয়েছিলাম চালিধাউড়িয়ায়। পরীরও তখন মাধ্যমিক শেষ। সেখানেই জীবনে কখনও কোনো মেয়েকে চুমু খাওয়া। পরী! আজও তােকে ভালােবাসি পরী। কিন্তু সেই সময় তো ও এমন বােরখা পরত না। আগে স্কার্ট, পরে সালােয়ার কামিজ, এই তাে ছিল ওর পােশাক। তাহলে?

অনেকগুলাে খিলান আর অলিন্দ পেরিয়ে এসে আরেকটা সিঁড়ি। আলাে না থাকলেও সমস্ত পথটা যেন পরীর পায়ে পায়ে মাপা। আর আমি ওকে অন্ধের মতাে অনুসরণ করে যাচ্ছি। জানি না, অন্ধরা তবে কিভাবে চলাফেরা করে। সিঁড়ির একটা ধাপের মুখে একটু হোঁচট খেলাম। একটু টলে পড়লাম পরীর দিকে। পায়ের বুড়াে আঙুলটায় একটু লেগেছে। পরী পেছন ফিরে আমার হাতটা ধরল। যেন কত দিনের চেনা সেই হাতের উষ্ণতা এসে ঢেউ তুলতে লাগল আমার হাতে। কিন্তু আমি খুব সন্তর্পণে ধরে থাকলাম ওর হাত। ঠিক যতটুকু নির্ভরতা দরকার, ততটুকু। পরী কি নিজেই আরও গভীর হয়ে এল! ফিসিফিস করে বলল—আমি কিন্তু তােকে একবার দেখেই চিনেছি মিন্টু দা।

– তুই দেখেছিলে আমায়?

– সেই যে, সন্ধের সময় তােদের চা দিয়ে এলাম।

– ও, সেই মহিলাই তুই! কিন্তু কী যেন একটা অদ্ভুত নাম বললেন মাস্টার?

– ওইটা একটা বাজে নাম। মাস্টারজির দেওয়া।

সিঁড়িটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর কটা ধাপই মাত্র বাকি। ক্ষীণ আলাের একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে ওপরে। আমাদের লম্বা নিশ্বাসের সাথে মিশে যাচ্ছে পরীর গলা।

– ওপরের ওই ঘরটা আগে মাস্টারজির ল্যাবরাটরি না মানমন্দির কী যেন ছিল। সিঁড়ির উল্টোদিকে মেঝে থেকে আলসে অব্দি কাচের শার্সি লাগানাে সার সার কয়েকটা জানালা। একদম ডানদিকে, একটা জানালা লাগানাে দরজা। দরজাটা দিয়ে বােধ হয় আগে দড়ির সিঁড়ি লাগানাে ছিল। এখন নেই। তবে, ওটা খুললেই আমগাছের শক্ত ডাল। তাছাড়া নতুন বুনন—ঘর তৈরি হচ্ছে বলে, ঠিক নিচে বালি রাখা আছে স্তূপ ক’রে। লাফ দিয়ে নামতে পারবি তাে?

– তা পারব। কিন্তু তার পর?

– নেমে, ডানদিক ঘেঁষে এগােলেই প্রথমে হাঁস-মুরগির খামার। তারপর গরু-ছাগলের। সবশেষে শুয়ােরের। তারপর আখড়ার এলাকা শেষ। কামিনী গাছের বেড়া আর বুকসমান কাঁটাতার দিয়ে তার সীমানা। এককোণে একটা ছােট্ট টিনের দরজা আছে। হয়তাে জরুরি কাজের জন্যে। তার তালাটা আমি আগেই ভেঙে রেখেছি। একবার বাইরে বেরোতে পারলেই মাস্টারজির জারিজুরি শেষ। উনার তন্ত্রমন্ত্র জাদুটোনার যত প্রভাব এই আখড়ার চৌহদ্দির ভেতর।

– কিন্তু তুই পালিয়ে যাবি কোথায়?

– কেন, তোর সাথে।

– তুই আমার সাথে যাবি! সত্যি বলছিস?

পরী আমার হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরল। আর দুটো ধাপ মাত্র বাকি। হঠাৎ নিচের দিকের অন্ধকার নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে কপালকুণ্ডলার কাপালিকের বজ্রকণ্ঠ ভেসে এল যেন—অ্যালিনা!

পরী লাফিয়ে এক ধাপ উঠে আমাকে প্রায় টেনে তুলে বলল—শিগগিরি আয়। মাস্টারজি টের পেয়ে গেছে।

ওপরটা খানিকটা লম্বা হলঘরের মতাে। কাচের জানালা দিয়ে দূরে দূরে জ্বলা টিমটিমে সােলার আলাের খানিক আভা এসে পড়ছে। এতক্ষণের অন্ধকারের পর, তাকেই মনে হচ্ছে বিরাট আলাে। পরী প্রায় দৌড়ে ডানদিকের বন্ধ দরজাটার সামনে গিয়ে ছিটকিনি খুলতে লাগল। ওপর নিচ মিলিয়ে গােটা চারেক ছিটকিনি। আমিও এসে হাত লাগালাম দ্রুত। এমন সময় সিঁড়ির পায়ের শব্দ হলঘরে পৌছল। আবার সেই বজ্রকণ্ঠ, এবার আরও জোরে—অ্যালিনা!

তাকিয়ে দেখি, একটা লম্বা সরু লাঠি ডান হাতে সােজা ক’রে ধরেছেন মাস্টার, সামনেটা যতদূর যায়। ঠিক যেভাবে আমরা রংমশাল জ্বালাই। আর সেই লাঠির মুখ থেকে রংমশালের মতােই একটা তীব্র বেগুনি আলাের রশ্মি গিয়ে পড়ল পরীর গায়ে।

কই গেল পরী? পরী ভ্যানিশ! সহসা কালাে রঙের একটা বেড়াল লাফ মেরে ঘরের অন্যদিকে চলে গেল। বেড়ালটার চোখদুটো অসহ্য সবুজ।


সাঁতার আমি জানতাম ঠিকই। তবে কোনো রকমে কাজচালানাে গােছের। সেবার তােদের ওখানে গিয়ে, শিবলি আর তাের পাল্লায় পড়ে, জীবনে প্রথম অত বড় পুকুর এপার-ওপার করলাম। হ্যাঁ, সাহস একটু বেড়েছিল বই কি। কিন্তু কোথায় সেই পুকুর, আর কোথায় এই সাত সমুদ্র গিলে ফেলা আকাশ। ভাসছি তাে ভাসছিই। পথের যেন কোনো শেষ নেই।

তবে সবকিছু যে এত সহজে হয়ে যাবে, সেকথা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি। না কি সমস্ত ব্যাপারটা স্বপ্নের মধ্যেই ঘটে চলেছে! নইলে তাের সাথে এতদিন বাদে দ্যাখা হয় কিভাবে?

আমি তাে ভেবেছিলাম, অজিন মাস্টার বুঝি আমায় ভস্মই করে ফেলবেন। বা, আরশােলা-চামচিকে কিছু একটা বানিয়ে ছাড়বেন। কিন্তু কথার দাম আছে ভদ্রলােকের। কিছুই না করে, আমায় সিধে ছেড়ে দিলেন। বললেন, আলাে ফুটলে যেন পেছনের ওই দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই। কিন্তু অদ্ভুত কাণ্ড, ছাড়া পাওয়ার কথা শুনে কোথায় তাঁকে দুটো কৃতজ্ঞতার কথা বলব, তা না, আমার গলা দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল—পরী।

শুনে, মাস্টারের চোখ মুখ দিয়ে কী যেন একটা ঢেউ বয়ে গেল। তার মধ্যে একটু কাঠখােট্টা ভাব আছে বটে, কিন্তু কোনো বিষ নেই। বরং যেন সামান্য স্নেহ ঝরে পড়ল তাঁর গলায়—কী, ছােটবেলার প্রেম উথলে উঠল?

তারপর প্রায় কিছু না ভেবে যেভাবে আমার পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক করে দিলেন, যে, মনে হলো, এতদিন পর তােকে দেখে আমার যে এমন একটা দশা হবে, তা উনি আগেভাগেই জানতেন। জেনেশুনেই কি সবকিছু ঘটতে দিলেন মাস্টার!

এখন আমি তাের কাছে ফিরে আসছি পরী। আমার ডানায় কোনো ক্লান্তি নেই। আমার বাঁ-পায়ে বাঁধা রয়েছে ছােট্ট একটা মাইক্রো-চিপস। প্রফেসর অস্ত্রোভিচের সারা জীবনের গবেষণার সারাৎসার। পরমাণু চুল্লির বিস্ফোরণে শের্নোবিল ধ্বংস হয়ে যাবার পর, ইউক্রেনের স্লাভুতিচ শহরে লুকিয়ে একা একা কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর সেই ৩০ বছরের কাজ অজিন মাস্টারের হাতে তুলে দিলেই আমার ছুটি। আমিই তাে তখন ওঁর সেই অ্যাবসার্ড সিনেমার নায়ক!

না কি ওঁর আখড়াতেই থেকে যাব আমরা? এতবড় একটা কর্মকাণ্ড শুরু হবে, আর আমরা তার থেকে দূরে থাকব? তার চেয়ে দিনের বেলা তুই থাকবি কালাে বেড়াল অ্যালিনা হয়ে আর আমি শাদা কাক লুমুম্বা। রাতে আমরা মানুষ। অজিন মাস্টারের চেলা। পৃথিবীর সমস্ত পরমাণু-অস্ত্র ধ্বংসের কাজ করে চলেছি চুপি চুপি। কোনো খাস্তগির মার্কা টিকটিকি আমাদের টিকিটাও ছুঁতে পারবে না।

আঃ, কী সুন্দর এই আকাশ। আর আরও সুন্দর ওই পৃথিবী। মেঘের নিচ দিয়ে জেগে উঠছে আঁকাবাঁকা নদী, উঁচুনিচু টিলা, সবুজ জঙ্গল আর ঊষর প্রান্তর আর সােনালি ফসলের ক্ষেত। খারাপও রয়েছে। ক্লান্ত ক্লান্ত সব গ্রাম। বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া সব শহর। ওইসব গ্রামের মুখে একদিন হাসি ফুটবে। ওইসব শহরের ভেঙে পড়া সেতু আর মিনার আবার সারানাে হবে। সব যুদ্ধ থেমে যাবে একদিন। আমি উড়ছি পরী। এই ভূতজন্ম ছেড়ে ভাবীজন্মের দিকে। যতদূর ছড়িয়ে দেওয়া যায়, ডানা ততদূর মেলে আমি উড়ছি। আমার কোনো ক্লান্তি নেই। আমি ফিরে আসছি। ফিরে আসছি পরী।

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]
কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬]
বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭]
রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭]
কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭]।
ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮]
বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]
খেয়া: এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭]
বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮]
সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮

নাটক—
হননমেরু [মঞ্চায়ন: ১৯৮৬]

অনুবাদ—
আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com