হোম কবিতা সুপ্ত অগ্নিগিরি

সুপ্ত অগ্নিগিরি

সুপ্ত অগ্নিগিরি
597
0

❑❑

নিজের একান্ত সুরের অনুসন্ধানে একটি মেঘ তার খেচর-জীবন ঘষে ঘষে জ্বালিয়ে রাখে আলো, দিন মাস বছর। একান্ত আবেগ জ্বেলে বাসনার রুন্দ্রমূলে নিবিড় অনুশীলন হাওয়া পাখায় ছড়িয়ে দেয় মসৃণ ঘোড়ার পেলব কেশর, অপার্থিব হ্রেষা ধ্বনি। কালিগঙ্গার জলা হাওয়া বয়ে যায় সান্দ্র-ভালোবাসায় মন্দ্রিত উপকূলে। আহা দুর্ভাগা মেঘবলয়! দিনের মণিজ্বলা চোখের রেটিনার উপকূল ঘেঁষে যে অরণ্যানী তার ভাঁজে ভাঁজে কি লুকিয়েছে সেই সুর সেই একান্ত আপনার গান? রাতের পরতে পরতে বাজে হাওয়া-কলের গান, তারাদের ভজন সংগীত, নির্বিকার কুয়াশারা চেয়ে চেয়ে দ্যাখে সুর-সন্ধানী মেঘের নীরব অশ্রুপাত।


❑❑

সাহারা পেরিয়ে ভিজছে প্রিয় শহর মোহন বৃষ্টিতে আর আমি আটকে আছি হর্নবিল-গোধূলির মাতাল আড্ডায়। স্বপ্নের রুপালি চূড়ায় আজ আহাজারি করে বিষণ্নতার জল-মন্দির। বিজলি-উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত তোমার রসালো ঠোটের ওম শুষে আমি চাই দুরূহ নির্বাণ। সুপ্ত অগ্নিগিরি লুকিয়ে আছে অদৃশ্য হিম সন্ধ্যার করুণ বক্ষ জুড়ে অথচ হাওয়া-রথে গড়িয়ে চলে বাসনার পুলক-পরাগ।

জন্মান্ধ ঘোলা জলমহালে সাঁতরে বেড়ায় রাতকানা আজিব জলা-মীন ও নীল নিউরন। ভোতা ও বন্ধ্যা করোটি গলিত জল-ঘড়ির বাড়ানো জিহবায় পিঁপড়ে কামড়ে বিপদজনক ঝুলে।চলতি হাওয়া গুমোট হেতাল-দুপুরে স্তব্ধতার অনুবাদ করে হিজল শাখায়, জলডুগি রং মরে ফিকে হয় চোখের তারায়। আধগড়া বিভ্রান্ত মূর্তি পড়ে থাকে করুণ মন্দিরে নিভে আসা আলোর শিখায়। এ কি তবে হলো আজ সঙ্গম ঋতুর মৃত বনে? কাম্য নয় কাম্য নয় চির দুঃখী সরোবরে।


❑❑

গাছেদের পল্লব ঝাঁকাতেই তোমার শাড়ির আঁচল ভরে গেল লাস্যময়ী সবুজের অনুপম আলপনায়—অন্তরীক্ষে নীল ধোয়ায় উড্ডীন ম্যাজিক ব্যারেল। স্বপ্নের সীমান্তে নীলগিরি আর হাওয়াকলে গাঙচিলের গান—তোমার উপান্তে আমার অদৃশ্য কামনারা দূরাগত ক্লান্তির ধূসর চোখ অথচ নির্লিপ্ত ইচ্ছেরা গুমরে মরে তোমার অধরের প্রাগৈতিহাসিক আভার দুর্মর লালিমায়—তারা পতঙ্গহৃদয়।

মধ্যদিনের কড়া রোদের তেজ গোধূলিতে ম্রিয়মাণ হলে কনে দেখা আলোয় তুমি উড়ে উড়ে সাতমুখী বিলের শাপলার জৌলুস পাড় হও অলীক পাখায়—আমি দিনান্তের বিষণ্ন পাতায় এঁকে দেই ভালোবাসার করুণ আবির; নির্বাক তুমি অপলক মায়াবী নয়নে।


❑❑

ঘণ্টা বেজে গেছে ছেড়ে গেছে ট্রেন ম্লান হয়ে আসছে শববাহী অ্যাম্বুলেন্সের লালচে করুণ চোখ যেন দেদার মদ্যপানে রক্তচক্ষু—বাজে তার একটানা কান্নার বিওগল। মিইয়ে আসা রক্তনুনের ঘ্রাণ ও তার উচ্ছ্বাস আজ অন্ধ আবেগী দৈন্য। একদা তেজস্বী অথচ আজ ভাটিমুখী ঘোটক—গতিতে মন্দনের সুর বাজে করুণ সুরে।

বরফের নাভিচেরা লেন্সে সূর্যের জৌলুস সাঁতরে ওঠে চোখের উপকূলে হিমাঙ্কের অস্থির সময়ে। ডিজিট খুলে উলটে পড়ে রেটিনার প্রেম জ্যোৎস্নার সৌরভে—দেহে তার মিলন আনন্দের বিড়াল গর্জন। বয়সী দীর্ঘদৃষ্টিতে প্লাস ডায়প্টার দিলে রামের সুমতি স্পষ্ট ধরা দেয় উত্তল লেন্সের মোহন অক্ষরে। আমরা তবে ঘ্রাণ নেই চল্লিশ সাল আগের বাবুগো সান বাঁধানো দিঘির সবুজ শ্যাওলার নেতানো যৌবনের।

শীত আসার পূর্বেই মেঘের চোখে জল রোদনের সার্বিক দংশন যেন আলোক সন্ধানী পতঙ্গ মিলিত হয়েছে হারানো অভিযাত্রীর করুণ পকেটে। ইঁচড়েপাকা ঋতুর ফিরফিরে যৌনকেশ ঝরে কামনার নীল সৈকতে—রাত্রির বুকে তখন নক্ষত্রের গান, অযুত প্রাণের দীপাবলিতে কাঁপা শিখার প্রপাত।

সেই মাটির ঘ্রাণ, বিলের অন্তরে শাদা চিতলের অমিত প্রগলভ লাফ আমার সাথে ঘুমানোর স্বপ্ন দেখে স্বপ্নিল আকাশের বর্ণিল উচ্ছ্বাসে।

নিশ্বাস ঘন হলে কামনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে রূপ আঁকা হয় পাতার শিরায় তার রক্তরসের কালিতে লিখ আজ অজর কবিতা—প্রণয়ের জয় রাধে বৃন্দাবনে হরিণ হৃদয়ী। ভীরু হৃদয়ের যত গান গোপন কামনার ঘোরে তার সংকেত প্রেয়সীর গোপন বল্কলে।


❑❑

অনেক ময়লাপড়া ঘুনে খাওয়া পাতা উল্টালে তোমার দেহের রমণীয় প্রাচীন গন্ধ আমার কুড়ি বছরের কামনার চূড়া ধরে টানে। অনেক বৃষ্টিপাতের পরত খুলে পড়তে পড়তে তোমার মৃগনাভি সুকোমল রোমরাজির ঘুম জাগানিয়া রূপ আমার চোরাবালির কূলে কুলকুল বাজে। অন্ধচোখের পারদ বর্ণে ঝাঁঝাল আলোর বন্যা ব্যাবিলন নগরীর চিরায়ত প্রাণের আবেগে টিথোন্সা প্রণয়িনী দেবীর স্মিত হাসির দুর্বোধ্য ভাষা দুরূহ গাঙের ঢেউ ভাঙে।

যেন-বা প্রাণের ঢেউ উপচে পড়ে ভাটি গাঙের তোবড়ানো গালে অথচ আমিই কেবল ফি বছর বদলে বদলে ছি কুতকুত খেলার ধ্যান ভেঙে স্বাতী তারার অশ্রু খুঁড়ে আনি। নীরন্ধ্র কুঠরীর গান যেন-বা গুমরে মরে আবদ্ধ বাতাসের চোখে। তবু কেন এত আয়োজন, এত এত নক্ষত্র জ্বলে পুড়ে গেলে স্ফিংস চোখের বিস্ময় ঘোর আনে ভেনাসের স্তনের সুষমা—আঁখির তারায় নামে ইন্দ্রলোকের মায়া বিভ্রম।

ফি বছর খোলস ফেলে ফেলে পুনরায় হই জরাজীর্ণ যেন হোমারের ফেলে দেয়া তোবড়ানো একখানা আচকান, আর খড়ম একজোড়া। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর কিশলয়ের মুখে জমে কনফুসিয়াসের পরিণত বয়সের পাতলা একগাছা দাড়ি।

ফি বছর নৈঃশব্দ্যের সুতলি দলা নিংড়ে নিংড়ে কত না জন্ম দিলাম দীর্ঘশ্বাস, নদীর বক্ষচিরে খুঁড়ে আনা মানিক্যের শ্বাস ধূসর প্যাপিরাস নগরীর বিষণ্ন পাতায়। তোমাদের ধাঁধানো আলোর মাদকতা থেকে দূরে আমার বিবিক্ত দিবসেরা নিয়ম করে ঝরেছে দু’বেলা পতিত শুকনো পাতাদের ছন্নছাড়া বৈরাগী চোখের কিনারে বাজিয়ে বেহালার হাহাকার।

তবুও তো পাখি ওড়ে নীল পাখায় ধূসর আকাশে অথচ জানে না কেউ, জানবে না কোনোদিন বুড়ো পাখিরা কোথায় গিয়ে ইন্তেকাল ফরমায় আর বেহুলার শাড়ির পাড় ভেঙে কোন বিধবা তার গ্রীষ্মকাল পুড়ায় কার শীতল ধারায়। তবুও তো জেগে ওঠে শারদীয় পতঙ্গ—প্রদোষের গান নম্র বাতাসে; নিরন্তর সিটি বাজিয়ে চলে জীবনের গান—বেলা অবেলায় কামনার শিয়রে জাগিয়ে রাখে সর্বগ্রাসী অগ্নির করুণ হলুদ শিখা।

রেজা রাজা

জন্ম ১৮ এপ্রিল, ১৯৭০; সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ। বি.এসসি (অনার্স), এমএসসি. (পদার্থবিদ্যা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতাশিত গ্রন্থ—

মেঘলোকে শহর ভেসে যায় [কাব্য; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]
অন্তহীন স্বপ্নের কুহক [কাব্য; ছিন্নপত্র প্রকাশন, ২০১৭ ]
অনুবাদ গ্রন্থ : মিলান কুন্ডেরার গল্পগ্রন্থ‘Laughable Loves’ [গল্প; অগ্রদূত, ২০১৭]

ই-মেইল : rezaofphysicsdu@gmail.com

Latest posts by রেজা রাজা (see all)