হোম কবিতা সম্পর্কের তাঁবু

সম্পর্কের তাঁবু

সম্পর্কের তাঁবু
933
0

লিখতে লিখতে মনে হয়
না-লেখা জীবনটাই আসল; যা-কিছু
ঊষর, কখনো
                শস্যযোগ্য নয়,
ফলিত আগুন করে
তার চারপাশে বসি, তাপ নেই;
শীতার্ত যেভাবে রোজ আগুন পোহায়।
তবুও যাপন সত্য, সত্য এই
                      দুপুরের নরম বাতাস।
আমগাছে অনেক মুকুল।
আসন্ন ফলের দিকে চেয়ে আছে রোদ;
ওপারে মানুষ; মাছ ধরার জালটা
         যেন খুলে-রাখা ব্রা; পুকুর
রমণীসুলভ; মৌন জলের ওপর
স্তন্যময় নিভৃতি ঝুলছে।

আকুল একটা নদী মৃত ঢেউসহ
নিজের ভিতরে নিয়ে আমি কি ঝুলছি?
ভাবছি মুন্নির
             পরম বিদীর্ণ ছোটকাল?
তার শরীরের জলপঙ্‌ক্তি
আমাকে প্রথম কবিতার কথা বলে।
বলে, সূর্যোদয়
প্রথম শরীরে এলে
                    বিদ্ধ হও অগ্নির সঙ্কেতে।
নিসর্গ নৃপতি নয়, পাখি নয় যোগ্য পুরোহিত।
মানুষ নির্মম ভালোবাসাময়; অধিক তিমির।
একদিন ডুব দিয়ে
                 মুন্নি
চিমটি কেটেছে পায়ে; আর আমি স্পর্শবোধে
তরঙ্গশাসিত জলে ভেসে গেছি প্রথম প্রথম।
মাঝে মধ্যে ভেবেছি, শরীরে
                          কবুল পড়াতে হয়;
গোপন আয়াতগুলো ভেঙে ভেঙে
ধনুক-শরীরে হতে হয়
                      টান টান তিরের আলিফ।
তখন অবোধ প্রেম
কেবল যাতনাবাহী; ভঙ্গুর, অবাধ্য।
                     দেহপাঠে সে অন্ধ হাফেজ।

প্রান্তরের রক্তিম পলাশ
মুন্নির শরীরে আমি ফোটাতে পারি নি।
কখনো যৌবন খুব মোহময় হলে
উদ্ধত সাহস লাগে ফতুর হবার।
সে চেয়েছে লুণ্ঠন, জবরদস্ত ডাকাতের হাতে
            শুধু খুন হতে হতে জীবন্ত উদ্ধার।
আমি দরবেশ;
অন্তরে আগুন রেখে মায়ার প্রকোপ
গড়িয়ে দিয়েছি তার দিকে।
নিরুপায় মনের ওপর
কখনো আদর ঘনীভূত হলে
রূপবাণী হলে
সিনেমা দেখেছি চুপি চুপি
             আমরা দু’জন।
যাতে সে আমাকে ভালোবাসে
শরীরে শাপলা-ফোটা
            গোপন জলের ধ্যানে ধ্যানে।
ফুলের সোহাগভরা প্রেমাঞ্জলি
বসন্তে বাড়িয়ে রাখে
                     আমার দিকেই।
‘সুলতানা ডাকু!’
আহা, আমাদের পলায়নে
সেই সাদাকালো ছায়াছবি
দুরন্ত বিভ্রম ছুঁয়ে থাকা
মুন্নির অতীত; আর আমার আত্মার
             পরমার্থ, যেন বর্তমান।
নায়িকার
ঘোড়ার খুরের সঙ্গে
             ধুলোর সংগ্রাম দেখে দেখে
মুন্নি কি বিপ্লব করে গেছে?
গুমোট হলের মধ্যে
অন্ধকারে রেখে গেছে
             স্পর্শের ঝুলন্ত আখরোট?

না! না! মনে করতে পারি না।

শুধু জানি,
অনেক প্লাবন নিয়ে ফিরেছি সেদিন।
কেবল ভাসি নি; সূর্য, সন্ধ্যা আর পাখির প্রপাত
              বিষণ্ন বিকেল গিলে যেভাবে মিলায়
নীরব রাত্রির ঘুমে ঘুমে একাকার
সেই ঘুম, সেই বন্ধ্যাকৃত যৌবনের
শরাঘাতে অচেতন ছিলাম বলেই
বুঝি নি, চূড়ায় উঠে লগ্ন পেতে
আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে; লগ্ন
                কারোর আসে না বারবার।

না, কিছুই আসে না পূর্বের আভা নিয়ে।
সকাল দুপুর রাত্রি
                যেন অব্যাহত সময়ের
                        বিভিন্ন শরীর।
পোশাক বদল করে
কখনো সামনে আসে, কখনো মিলায়।
সূর্য কি ঘুমন্ত বড়ি? আকাশ বিছানা তার
                             নীলের শয্যায়?
রোদ তার জীবন্ত নিঃশ্বাস?
কেবল ছড়িয়ে পড়ে
চাতুর্য লুকিয়ে থাকা
                  পৃথিবীর দুই গালে
                          চুমু খেতে খেতে?
চুমোর প্রসঙ্গে
সবুজ ঘাসের দিকে ঝুঁকে-পড়া
একটা গোলাপ মনে পড়ে।
সেই মর্মঘাতী
                 অনন্য গোলাপ
ঘাসের সামান্য ঠোঁট ছুঁতে গিয়ে
অধীর প্রচেষ্টাগুলো
ছড়িয়ে দিয়েছে ডালে; যেন
নিপুণ মায়ার দিকে
পৃথিবীর উদভ্রান্ত বিকাশ দোল খায়;
                বাতাসে বাতাসে নড়ে।
কত স্বপ্ন, অনঙ্গ আলোর তারা, পাখির পালক
                  আর মগ্ন পোকার সঙ্গম
                        ঝিঁঝিঁর সঙ্গীতে
বিশ্বস্ত মাটির বুকে আস্তানা গেড়েছে;
শুধু ওই পরাস্ত গোলাপ
মানে শাম্মী, মানে
                  সেই এক পলক মেয়েটি
আমার অপক্ক যৌবনের
                  প্রথম বিপদ
নিস্তেজ পাপড়ি হয়ে
ঝরে গেছে; আজ শূন্য ডালের বিপন্ন
কাঁটায় তাকেই রক্তময় হতে দেখি।
নাকি আমি চুম্বন সঙ্কটে পরাভূত
নিজে কণ্টকিত মুখ ঢেকে ঢেকে
         কেবল বলতে চাই, আহা!
আমার বুকের মধ্যে ঘাসের সঞ্চার
                 তাকে দিতে পারি নাই!
বেদনার বিশীর্ণ রাস্তায়
একটা বিড়াল হয়ে সে কি
                         মিউ মিউ করে?

শাম্মী সেই স্বর্গ-পারিজাত
ঝরে পড়বার আগে
যাকে কেউ পায় না; পেয়েছি আমি, স্বপ্নে।
সেদিন মালঞ্চ হলে
শুধু ‘প্রাণ সজনী’ সিনেমা দেখে
শাম্মীর সাব্যস্ত মুখ মনে পড়েছিল।
নিকটস্থ একটা সকাল
দৃশ্যের সুবর্ণ চারুঘাতে
যেভাবে ভাঙতে থাকে
                    লাল পোকাদের
বিব্রত নিখিল, সেই মতো
             ভাঙতে ভাঙতে
ঘুমের বন্দরে আমি
জাহাজ টাঙিয়ে দিই; জাহাজ তো নয়,
        কামতীর্থের বাগান; সেখানে অস্থির
ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে।
আমি কি জাহাজ? শাম্মী জল?
উত্তাল তরঙ্গ যার নিজস্ব গৌরব?
শাম্মী কিন্তু
            আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
পর্যুদস্ত আনন্দের সাক্ষাতে সেদিন
ধৃত মাগুরের লম্ফঝম্ফ
প্রথম শরীরে আসে; জলশব্দ
                   যেন এক দহন-ঘুঙুুর!
শিথিল নোঙর খুঁজে খুঁজে
সুতীব্র আকাশ আর সাদা বলাকার
আসন্ন বিশ্রাম একাকার করে দিয়ে
যেন আমি শাম্মীতে ঠেকেছি।
সমুদ্র-সঙ্কেতে
সেই তো প্রথম অবগাহন আমার!
আমার ডুবুরি মন সাঁতারে সাঁতারে
দূরে ভেসে গেছে…
                    শুধু স্বপ্নে! শুধু স্বপ্নে!

স্বপ্নস্থ বৃক্ষের নিচে
               স্মৃতির মর্মর আমি শুনি।
স্মৃতি-যে হাওয়ার কল। নাড়া দিলে বাতাস বেরোয়।
বাতাসে বাতাসে আমি শাম্মীকে বানাই।
মুন্নির পীতাভ্র দেহে নালা কেটে
                        মৌন স্রোত গড়িয়ে দিলেই
‘রূপবাণী’ হল ভেসে ওঠে মর্মার্থের আয়নায়।
আমাদের ছবি দেখা আর
                            নির্মল আতঙ্কগুলো
যেন স্পর্শডিঙা, সুদূরের গান
যেন নিরুদ্দেশ
পাখিটির থির থির ছায়া
আকাশ মেঘলা করে চলে গেছে দূরে;
উজান স্রোতের দিকে যেতে যেতে
শাম্মী
মালঞ্চ হলের দুঃখময়
বেদীতে যেমন ঢেউ হয়ে ফেরে,
         সময়ের বিজন নদীতে একা একা।
আহা, মর্মে-জাগা রেডিওটা এখনো বাজছে।
পনের মিনিট, মাত্র পনের মিনিট
বিজ্ঞাপনে শুধু ওই সিনেমা-সময়
                  রুপালি পর্দার কারুভাষে
জগৎ রাঙিয়ে দিয়ে নামের প্রভায়
আমাকে বলত,
শাম্মীর হৃদয়ে তুই উচ্ছিষ্ট খাবার।
পড়ে থাক। খুঁটে খুঁটে তুলে নেবে
       কখনো একান্ত ঠোঁটে তৃষ্ণার্ত মায়ায়।
মুন্নির শরীরে তুই গান;
মিলিত নৃত্যের কোলাহল।
সুরে সুরে বেজে ওঠ সক্রিয় মুদ্রায়
                   তাধিন তাধিন অনুরাগে।
লাল রঙ্গনের ঝরা-মুখ
পরিতাপসহ বুকে নিয়ে
কোথায় হারিয়ে গেল
সেই ছবিগুলো?
হলগুলো বাণিজ্যে উধাও?
জমাট শব্দের গুম গুম বিনোদন
হঠাৎ একাকী ঘরে প্রমোদ মিথ্যার কারাগার।

আমি খুঁজি অখণ্ড আলাপ।
অবশ আনন্দে ভরা
কুট কুট কথাগুলো; সিনেমা শুরুর
সামান্য আগেও যে-আলাপ
সরল মুদ্রণে ঝরে যেত বাদামের নরম খোসায়।
আমার কুয়াাশামন সেখানে জমতে চায়।
আমি যেন ভোর,
              চোরা দুপুরের স্বপ্ন আঁকি
মুন্নিকে মুঠোয় নিয়ে সিনেমা দেখার।
শাম্মী তো অতলগামী স্মৃতির কেচ্ছায়।
আমার জীবনে সে মর্নিং শো’র ব্ল্যাকের টিকিট।
নাচে গানে ভরপুর পরম সকাল।
বিশ্বস্ত বিকেল হাতে; পালাই! পালাই!

আমি আজ ‘রূপবাণী’ হল;
আমার হৃদয়ে এক ‘মালঞ্চ’ ঘনায়।

হৃদয় সিনেমা নয়, নিস্তব্ধ জিরাফ।
ভাষার অরণ্যে বাঁধা। সঞ্চারে উন্মুখ।
অবতীর্ণ সত্যের সামনে
রুপালি পর্দার ভুল ঝুমুর ঝুমুর
নাচের মুদ্রায় ঝরে পড়ে।
আমি নাচ নেই, ভুল নেই।
সত্য ও মিথ্যার এই আকীর্ণ বন্ধনে
জোছনা ঝরছে। চাঁদ সকল প্রাণের
একার সম্পদ। আমি বহুবার
                  সমাদৃত মোহের সময়
মুন্নির শরীরে বসে জোছনা গিলেছি।
শাম্মীর সুবর্ণ দেহে
নিজেই হয়েছি এক চাঁদের নগ্নতা।
তবু কোনো স্পর্শই উদ্দাম হতে পারে নি আমার।
তবে কি কল্পিত জলাধারে ঢিল ছুড়ে
নিজেকে ভোলাই?
মুন্নি কেউ নয় এই আমার প্রমিত
          যৌবনের পাখির ঠোকর?
শাম্মী নয় উদিত সূর্যের মহা তাপ
আমাকে পোড়ার?
মাঝে মধ্যে ভাবি
মিথ্যাও জলীয় মনে অবতীর্ণ ব্যাখ্যার প্রপাত।
তাতে হাত দিয়ে জেনে নিতে হয়
স্পর্শের সুড়ঙ্গ-সুর; তা না হলে
                  নিজেকে চেনার রঙ্গালয়ে
কোথায় দাঁড়াব আমি?
কোন পাখি, কোন গাছ, কোন নদী, সমুদ্রপ্রবর
কোন পশু, মরুর বালুকা ধ্বনি আমাকে বলবে
তাম্র তওবার শ্বেত বিন্দুতে তোমার
রূপসী বউকে দ্যাখো,
          শুয়ে আছে ঘোমটা ছাড়াই।
ওর নাম সত্য, ওর বেহায়া শরীর।
             স্পর্শ ওর নির্দয় আগুন?

ত্রাণ-চাহিদার এই বিধৃত জগৎ
ব্যহত সূর্যের দিকে অন্য কোনো আগুন খুঁজছে।
তাই হানাহানি, তাই রক্তসংস্কৃতির
চাঁড়াল দেবতা ছাড়া
                     মানুষের কোনো নাম নেই;
পৃথিবী মুহূর্তকাল; সময়-মন্থনে
মানুষ বুদ্বুদ মাত্র। অথচ দাম্ভিক।
মাছি মারে, লঙ্ঘিত সীমায়
                 সে দেখে না পিঁপড়ের খুন;
পাখির হনন তার আনন্দ-অভ্যাস।
অনন্ত সুরের ছায়া লুপ্ত বলে
আজ হাহাকার; আজ বধির বৃক্ষের
নিচে ঠাঁই নাই; একা হতে হতে
                নিজের বিবরে ঢুকে গেলে
তরঙ্গবঞ্চিত নদী ডাকে
আমরা পারি না সাড়া দিতে।
মৃত্যুর নিজস্ব কড়িকাঠে
নিজের আগুন নিয়ে নিজেরা লুকাই।

আগুন কেবল আলো দেয় না, পোড়ায়।
যন্ত্রণার বেদিমূলে
ফুলচন্দনের ইতিহাস লিখে
লাস্যময় অনেক মানুষ মহিমায় জেগে থাকে।
আমি বিদিত সত্যকে
               আলোর সমান বুকে নিয়ে
সোনার আদলে একদিন
জেনেছি, জীবন তাম্রপাতে
খোদাই করেছে কেউ। ওখানে মুন্নির
                      নাম জন্মান্ধের দৃশ্যহীন
চোখের আলোর চেয়ে সমাদৃত নয়।
শাম্মীর স্মৃতির চোরাপথ
কাঁঠালতলির পাকা রাস্তায় সুরম্য
রোদের ঝিলিক নিয়ে
              দাঁড়াতে পারে না কোনোদিন।
দূরাগত নিরাময় সঙ্গে নিয়ে
যেভাবে দাঁড়ায় ‘নুসরাত ইউনানি দাওয়াখানা’।
এই মৃত্যুকবলিত সময়ের নিজস্ব ডেরায়
কিছু কিছু অনন্য মানুষ
নিকটস্থ জীবনের আনন্দযাত্রায়
ওইখানে বসে থাকে সারাদিন; হিজল গাছের
গোলাপি ফুলের তারা সবুজ পাতার
আকাশ বানিয়ে রাখে ওদের জন্যেই।
দপ্তরিবাড়ির খোলা মাঠে
নিরন্ন বংশের লেলিহান কান্না দুপুর গড়িয়ে
পড়ে; যেন দুপুর একটা তীব্র শঙ্কার দেয়াল।
আমাদের ভয়, আর মূর্খ জনতার দিকে
বিক্ষোভের সকল দরজা খোলা রেখে
তবুও দাঁড়িয়ে থাকে ‘আল হেরা নূরানি মাদ্রাসা’।
যেন তার আসমানি বুক
হাশরের দুর্ভোগ মাটিতে নিয়ে
আরোগ্য লাভের নীল সামিয়ানা টানিয়ে রেখেছে।
কিছু কবুতর
অনন্তের ভাষাময় নিজের ডানায়
উড়ে আসে। সময়-সঙ্কট খুঁটে খুঁটে খায়
                            মাদ্রাসার টিনের চালেই।
নম্র বালকেরা কলহাস্যময়; সবার মাথায়
গোল টুপি, সাদা সাদা অতন্দ্র বিশ্বাস।
নিহিত সত্তার দিকে ওরা খুব দাপিয়ে বেড়ায়
অবতীর্ণ সকল বিষাদ। যেন কিছুই হয় নি।
জীবন পরিধিমাত্র; বালকেরা পরিধির
আনন্দ-দোলক; প্রান্ত খোঁজে না কোথাও।
আমার ব্যথিত কল্পনায় ত্রস্ত খেয়াঘাট
ভেসে আসে; যেন আমি বিমূর্ত নৌকোয়
সবুজ শিষ্টাচারের নিসর্গ-ডাঙায়
পার হতে চাই; চাই পরিত্রাণ; কেন্দ্রীয় আলোর
অভিমুখে চাই শুধু প্রান্তহীন নিজের ঘূর্ণন।
জগৎ তাহলে ঘোর? মৃন্ময় স্টেশন?
দুর্লক্ষ্য বিশ্বাসে
সবাই গন্তব্য খোঁজে? জানে না কোথায়
তার ঘর, সত্যি বসবাস?


মূল পাতার লিংক : রস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

(933)

Kazi Nasir