হোম কবিতা সমূহ দৃশ্যের জাদু

সমূহ দৃশ্যের জাদু

সমূহ দৃশ্যের জাদু
2.83K
0

এক

রাস্তায় হাতশুকনো খালি পায়ে একজন ভিখেরি হাঁটছিল, মন্থর ও নোংরা। ভিখেরি-দৃশ্যের পাশে বসে আছে লালজিহ্বা রোঁয়া-ওঠা কুকুর। কুকুরের জিহ্বা থেকে ঝরে পড়ছে মাংসলোভী লালা; বাম পাছায় ঘিনঘিনে ক্ষত; ক্ষত থেকে লোভ; ক্ষতকে কেন্দ্রে রেখে চক্রপাকে ঘুরছে, মধুমুখী মাছি।

এইভাবে যতক্ষণ দেখা গেল ভিখেরির হেঁটে যাবার ছবি, আলোতে ভেসে থাকল, লোভ ও খাদ্যচক্রের দৃশ্য।

 


দুই

তোমাকে দেখার আগে আমার নিকট তুমি অস্তিত্বশূন্য। যথার্থ উদাহরণে বলা সম্ভব, পরাগায়নের পূর্বে দৃশ্যমান ফুল অস্তিত্বসংকটে অদৃশ্য। ধরে নাও, তোমাকে দেখার দৃশ্য স্মৃতি থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছে। এখন আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছে অদৃশ্য, অস্তিত্বহীন।

পার্লার থেকে ছাড়পত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে ত্বক ও ভ্রু, চোখ ও চুল। করিডোর দিয়ে পরিচয়হীন হেঁটে আসছ তুমি, অস্তিত্বশূন্য।

 


তিন

দাঁড়িয়ে রয়েছি তিনতলার ছাদে। সূর্য দূরবীক্ষণ চোখে পর্যবেক্ষণ করছে দৃশ্য ও ছায়া। একটি মাত্র চড়ুই উড়ছে এ ছাদ থেকে পাশের ছাদে। পাশের ছাদে জিনাত সুলতানার শরীরে চড়ুইয়ের ছায়া কাঁপছে। চড়ুই উড়ছে।

তিনতলার নিচে কাগজ কুড়োতে এসে রোদশিকারি মেয়েটি চড়ুইয়ের ছায়া খুঁজছে। পিছে পিছে হেঁটে আসছে দেড় ডজন মোরগ-মুরগি হাতে আমিষ বিক্রেতা; শহুরে ফেরিওয়ালা হাঁটছে, হাঁক ছাড়ছে কড়কড়ে রোদে।

এইমাত্র পাশের ছাদে একুশ বছরের জিনাত সুলতানা উড়ন্ত চড়ুইয়ের ছায়া লুকিয়ে রাখল, জামার ভেতর।

সূর্য, দূরবীক্ষণ চোখে পঁয়ষট্টি ডিগ্রি কোণ থেকে দেখছে জিনাত সুলতানার জামার নিচে চড়ুইয়ের ছায়া ও কোমলতা।

 


চার

এইমাত্র একজোড়া চাঁদ ঝাঁপ দিল গ্রামীণ নদে। দুজন চাঁদের ভেতর একজন চাঁদের ছায়া, রহস্যমুখর, জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। চাঁদের ছায়ার খানিকটা চুরি করে ঘরের মাচায়, বাকিটুকু তালগাছের বিশাল ডানাওয়ালা পাতার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছি।

চাঁদের ছায়ার নিচে শুয়ে আছে মাছ ও মুরগি, ধান ও আলু; হাট থেকে কিনে আনা বলদ ও গাভি; বৈশাখে বিয়ে হওয়া বর ও কনে।

বুঝতে পারছি না ভবিষ্যৎ; ছোট থেকে শুনে আসছি, চাঁদেও কলঙ্ক আছে।

 


পাঁচ

গোলাঘরে ঢুকতেই ভৌতিক বাদুর চক্রাকারে হাওয়ায় ও শূন্যে উড়তে শুরু করল। শুকনো ধানের গন্ধ, তীব্র ও সর্পিল। গোলাঘরের মাথায় সাদা বক; আকাশে ভুবনচিল; গোয়ালঘর থেকে তীরবিদ্ধ গোচিৎকার ছুটে যাচ্ছে মাঠের দিকে। এইসব, এইসব কিসের ইশারা; বুঝতে পারছি না।

পুকুরঘাটে পড়ে আছে নাকফুল আর একপ্রস্থ ঋতুশ্রাব-ন্যাকড়া।

 


ছয়

অন্ধকার রাত। কোথাও বাতাস নেই। মৃতের খাটিয়া বাহকগণ হাঁটছেন কবরস্থান বরাবর। প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাকেও যেতে হচ্ছে গোর-আজাবের দেশে।

কবরস্থানের গাছে রাতের পাখি; নভোযানে নেমে আসছেন জিব্রাইল। জানাজা ও কবর শেষে মৃতের খাটিয়া-বাহকগণ ফিরে যাচ্ছেন লোকালয়ে।

লোকচক্ষুর অন্তরালে কবর থেকে নভোযানে উঠে এল লাশ। জিব্রাইলের সাথে চলে যাচ্ছে লাশ শূন্য ও মহাশূন্যে গণনাবিহীন গ্যালাক্সিপথ বরাবর।

সূর্যসভ্যতায় এইভাবে লাশ ও গতির ভেতর বেঁচে আছে মানুষ।

 

সাত

ঘোড়া দুটো ভিজতে ভিজতে বাজারে যাচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটার ছিল না; অফিসারেরা এইরকম বলাবলি করছিল। স্টিমারের রেলিঙে দাঁড়িয়ে নদীর জলে ভাসতে দেখা গেছে মানুষের বিষ্ঠা। ডোমেস্টিক ফ্লাইট দিগন্ত বরাবর না গিয়ে বিরামহীন নীলে ঢুকে যাচ্ছে। এইভাবে অজস্র অসঙ্গত দৃশ্যাবলি আমাকে টুকরো টুকরো শিশুস্মৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রেনের ভেতর যাত্রীগণ ব্যস্ত, অহেতুক কথা ও বিশ্রামে; আমি একা, প্রতিটি যাত্রীর মুখমণ্ডলে আমার শিশুকাল খুঁজছি।

 


আট

পাহাড়ি মেয়েগুলি চাপাতার গাছ জড়ো করে আগুন জ্বালিয়েছে। ওরা তিনজন সোনালি আগুন থেকে লাল রঙের তাপ সংগ্রহ করছে। ওদের শরীরের চামড়া ও পোশাক ফিকে-লাল ও তীব্র ডোরাকাটা। আগুনের আড়ালে ওদের মুখ আর চোখ থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি মদের রঙ, ফিকে-লাল ও তীব্র।

চা গাছের আড়ালে একজোড়া সবুজ সাপ পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে; তীব্র লাল জিহ্বা ও নিষ্পলক চোখ।

বুঝতে পারছি না আগুনের কাছে যাওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা।

 


নয়

দিগন্ত থেকে ছুটে আসা ঝাঁকবাঁধা রোদের জাদু; উজ্জ্বল গ্রীষ্ম; পাখির পাখার আলোড়নে ভেসে ভেসে উঠছে বাতাসমুদ্রা। কান পেতে আছি শূন্যে, বাতাসে ও দিগন্তে। দূরে শিশুসহ হাঁটছে গৃহী; গ্রাম্য, রোদে পোড়া এবং কুটিল-অভাবী। দৃশ্যটি গ্রাম্য রমণীর হেঁটে যাবার। দৃশ্য ঘিরে ঘাম ও ভারি গন্ধ; দুর্গন্ধের কোনো ছবি নেই; অদৃশ্য, অবয়বহীন। শিশুটি খালিপায়ে কুকুরবিষ্ঠায় পা রাখল; রমণী ভ্রুক্ষেপহীন। ওরা হাঁটছে এবং দৃশ্য ক্রমশ নিকটবর্তী।

টুরিস্ট বাস থেকে দেখছি আর পাশে বসা জলরঙ প্রেমিকাকে বলছি, কী অদ্ভুত শীতল আর রমণীয় দৃশ্য, প্রশান্ত গ্রাম ও নির্জনতা, সবুজ ও ছেঁড়া-মাঠ; জলাভূমি ও পালক-প্রসারিত সাদা বক।

আমি কতটা অসভ্য হলে পথে ও মাঠে লুকিয়ে থাকা এইসব অভাবদৃশ্যের ভেতর রোমান্টিক হয়ে উঠি।

(2832)

শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu