হোম কবিতা সন্ধ্যাদেশের ঠিকানা

সন্ধ্যাদেশের ঠিকানা

সন্ধ্যাদেশের ঠিকানা
0

সন্ধ্যাদেশের ঠিকানা

অসময়ে ডানা মুড়ে আছি কতজন
কতজন নেমে গেছি শৈলকূপে একা
কতজন সন্ধ্যা দেশে খুঁজেছি ঠিকানা?
উৎস থেকে সোজা ওঠে কত তরুগাছ
নদীটার ছায়া ভাসে কতজনের গায়
কতজন ভিজেছে সে নদীর ছায়ায়?

একজন কুয়া খোঁড়ে চরের বালিতে
হাওয়ার দাগে দাগে হাল বয় নীলে
রোদের বয়ন থেকে ধুনে আনে সোনা
তাকে কি বিমনা করে পাখিওড়া ছায়া?

সময়ের খাঁজে চুমুকে চুমুকে যত জল ওঠে
ততটা সে লেখে, আর সেঁকো বিষে ভরে যায় বুক—
অক্ষরে সেলাই করা কানকোর ক্ষত।
ব্যথার দোয়াতে ডোবাতে তাদের কলমের নিব—
ফর্সা ভোরে পবিত্র পাখির মতো কবিতারা আসে।

এইমাত্র বহরের থেকে ছুটে গেল যে ঘোড়াটা
গা ভরা জোনাকি নিয়ে তার ছবি আঁকে আর জন
জলের ভঙ্গিমা পেতে এ সুড়ঙ্গে সেও আছে জ্বলে নিভে।
অন্ধ সে তো, বোঝে না পর্বত আর প্রান্তরের ধার
ভাঙা আয়নার কুচিগাঁথা তার ঘর—
আলোর বল্লম এসে বেঁধে তার বুকে কোনাচে রেখায়
‘এ আমার আলোদাঁড়’, বলে সে বসে নিজের আয়নার ভেতর একা,
ঝালরের মতো মেলে দিয়ে শাড়ির আঁচল
মুছে নিতে চায় কার বুকের নিহিত জল?
তাকে কাটে স্বপ্নের করাত, গড়িয়ে পড়ে কবিতার কষ
উড়ে যায় দুপুরের রোদে, জোনাকি পাখায় ভীষণ কাতর।

আরো নিচে আছে আরো এক কবি
জলের জাজিমে আছে শবাসনে ভেসে,
কথার সুরমা গলে গলে পড়ে তার চোখে।
তার অক্ষরেরা কাঠ থেকে ঝরা তুষ
তার লেখা দূরত্বের আবছায়া হাত,
তার চোখে কালো কান্নার কিউব,
তার ক্ষতের ভেতর খুলে যায় কূপ।

কিন্তু সে এক নতুন কবিতার যন্ত্রণায় থরথর
প্রলয়ের শেষে তার চাই সোনার বাছুর আর নতুন ঈশ্বর
সাবেক পৃথিবী শেষ হয়ে গেলে সে আবার শুদ্ধ করে মন,
আর কোনো গ্রহ নেই জেনে সে তাকিয়ে আছে,
ভাষার ওপারে খোলা চোখে—আঁধারমানিকে ভেসে।

নতুন এক কবিতা লিখবে বলে,
আবার সে দিচ্ছে নির্জন কুয়ার জলে ডুব।
ধুয়ে নিয়ে পুরনো অক্ষর আর বোবা রূহের পাথর,
আবার জন্মাবে বলে নিচ্ছে ভঙ্গি আর ভ্রূণের আকার—
স্তম্ভিত চিৎকারে কেঁদে উঠবে বলে
শ্বাস টানছে শ্বাস টানছে শ্বাস টানছে…


স্মৃতির তসবিদানা

ধরো কিচ্ছু হয় নি কোথাও,
তোমার শাড়ির কুঁচি আমিই গোছাচ্ছি হাতে;
আমাদের কক্ষপথে জাগে নি বিরহ—শনির বলয়।
ভাটার স্মরণে সরা সবটুকু জল ফেরত এসেছে আবার জোয়ারে,
আঁচল-ব্লাউজ আর ব্রা’র হুকে আমার আঙুল দিচ্ছে পিনে অভ্যস্ত গাঁথন;
রজতরেখা নদীটা দেখতে এসেছি যেন ধরো একসাথে;
একা সাঁতরে চলেছ তুমি—আমার করছে ভয়
সব যেন আগের মতোই একমুখী আঙুলের জুয়া।
ধরো আবরার ছেলেটার মাথা গোল মরিচের মতো পিষে যায় নি রাস্তায়,
পলকের বাবা কাজল সন্ধ্যায় ঠিকঠাক বাড়ি এসে বসেছে সোফায়;
গুম লোকেরাও একে একে ফিরে এসে বসেছে বউয়ের সঙ্গে নাস্তায়—
‘কাউকে বলিস না, কাল রাতে গেছিলাম শুভাড্যায়—বন্ধুদের গাড্ডায়।’
ধরো বেশি কিছু না মোটেই—কুমিল্লার মেয়ে তনু চাকরি করছে কোনো পত্রিকায়,
গান করে আর প্রেমিকের সঙ্গে মান করে বাড়ি ফিরছে রাত আটটায়;
ঘুমের শিথানে তার মুখে জেগে আছে নীল শুশুকের হাসি।
ধরো বেশি কিছু নয়, তোমার চোখের তলে মন দেখে মেঘনার সোঁতায়;
আমি হয়ে গেছি শাদা রক্তের বৈরালি মাছ
ধরো, আমার পীতাভ শার্ট জেগে থেকে সঙ্গ দিচ্ছে তোমার দেরাজে,
দুজনের ঘ্রাণ নাক ঘষাঘষি করছে একই বিছানার ঢালে।
আমাদের মেয়েগুলি কোঁকড়া চুলের ভাইটাকে নিয়ে টিভিতে দেখছে বিড়াল কাহিনি।
ধরো কিচ্ছু হয় নি বিকালে—রাতে আর বোবায় ধরছে না আমাকে,
স্মৃতির তসবি–ছেঁড়া দানাগুলো কুড়াতে কুড়াতে হাঁপিয়ে যাচ্ছ না তুমি একা ঘরে;
ধরো কোনোদিন দেখা হলে মনেই হবে না,
কোনো দুর্ঘটনে আমরা দুজন একসঙ্গে মরে গেছি!


বেনামা বিষ

কত না আলগা বায়ুটানে চলে যায় তুলা শিমুলের থেকে
নিজেরই অবয়ব চিড়ে ছেড়ে দেয় বৃক্ষ তার তুলোট বিশ্বাস,
বাতাসে ভাসন্ত তিতিল বসন ওই রেশমপুঞ্জের নাম নাই।
নদীর নামে ভেজে না আর কোনো মানুষের মন,
স্মরণের নাম খুঁজে বলো নদীভাঙা মানুষের কীবা লাভ?
স্বপ্নে হারিয়ে বয়স কেউ করে না তো আয়ুর তালাশ।

কী হারাল তাহা বলি নি বিধায় কোনো খোঁজা নাই,
পাগল–মস্তান লোক বলতে কি পারে তার কীসের অসুখ?
আমি জানি ক্ষয়রোগ—মানুষ এখন আর চায় না মানুষ;
বাসনা কেবলি চায় বাসনা করুক বাসনাকে চিরভোগ।
নিজ থেকে শ্রীকে তুলে তাই নিজস্বী সাজায় নাগর মানুষ;
এ ওর প্রাণের মধ্যে ডুব দিয়ে খোঁজে না তো তমোহা পাথর।
গল্প থেকে সব নাম মুছে দিতে হয় যাকে তার কথাগুলো
ভাঙা প্রাচীরের পড়ে থাকা ইট, ছাড়া-ছাড়া ছবি
মাঝরাতে খিল-ধরা অনামা ভয়ের নাম তাই বোবাধরা নয়।
যে ক্ষতি বেনামা, সেই বিস্বাদ–নিমের নাম বিরহিতা নয়

যার কোনো নাম নাই তা-ই দুরারোগ্য ভয়

আর মাটি মিশে যায় মাটির নেহায়,
লোহার নেহাইয়ে মাথা খোঁড়ে লোহা,
বায়ুর আঙুল করে চুলে মিহি ইলিবিলি—
যাকে রাখা আর গেল না কোথাও; সে তো আমি নয়।
সে হয় শোক কিংবা নিরাক-পড়া নয়ানজুলি।

রোদের চন্দন মুছে নেয়া পাখিটার তাই কোনো নাম নাই,
পরিযায়ী পাখিদের গান নাই, শুধু ডানার ঝাপট—
                                      পদচিহ্ন জমে নেই ভোরে।
হাওয়া-কলে ধরা যে লোক, বাতাসের কাছে তার কীবা অভিযোগ?

আয়ুচোঁয়া জলে রচিত গ্রন্থের প্রথম পাতাটা তাই থেকে যাবে ফাঁকা;
যেই ঘাটে ভেসে আসে কলার মান্দাস, সেই ঘাটে আমিও ঘুমাব একা।