হোম কবিতা শত শত আমার কবরের চিহ্ন নাই

শত শত আমার কবরের চিহ্ন নাই

শত শত আমার কবরের চিহ্ন নাই
420
0

১.
ঘুম থেকে উঠেছি
সিঁড়ি বেয়ে
নাস্তা করলাম
পাখিদের ভোর
দরজা খুলে দেখি
বিশ বছর আগের সকাল
অবিকল; আমাকে দেখে
যেন অনড় অটল।
সকাল আমাকে পর্যবেক্ষণ করে
তাই ঘড়িতে আটটা-দশটা
তুমুল ঝগড়া।
নতুন বই নতুন প্রচ্ছদ হাসছেন

তালব্য শ এর মতন,
চড়ুইপাখির হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস—
“সূর্য তোমাদের আকাশে
আসবে
বারো ঘণ্টা পর”।

২.
কেন ঘুম থেকে উঠলাম সিঁড়ি বেয়ে?
ঘুম পরতে পরতে নামে ওঠে
ভালোবাসা স্তরে স্তরে
সাজানো যেমন—
চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক
যার যার ভালোবাসা তার তার।

ফুলপরির শরীরে ও স্বপ্নে
অচিন ফুলের ঘ্রাণ;
ওর সকাল সন্ধ্যার শুভাশিস
পৃথিবীর রাত্রির ভিতর
প্রেমেরই মহফিল।
সূর্য আর সমুদ্রের বিরহের মাঝখানে
মেঘদল মেটামরফোসিস, ফোটে
তার যৌবন জৌলুস।

৩.
তার রুহের রোশনি
ভ্রমণ করতে
কে ডাকে আমাকে তার কক্ষপথে?
আমি দলামচা ছুড়ে ফেলা
কাগজ টুকরা যেন,
নীরবেই
তার ঘ্রাণ গ্রাভিটির ভিতর
কী কী পাঠ্য পুস্তক আছে
ভাবতে থাকি।
আমিও কি পুস্তক নই?
আমিও কি ভাষার অক্ষর নই?
আমাকে দিয়ে কি
ভাব প্রকাশ হচ্ছে না?
আমি কথা না বললেও কি
চুপচাপ আমার ভাব সম্প্রসারণ হয় না?

৪.
আমি দূর্বাঘাসের ফলা পড়ি
বনভূমির বহুজাতিক মিলমিশ পড়ি।
সন্ধ্যায় পাখিরা ঘরে ফেরার পর
আমি কুসুমকলি নদীপারের
নৈঃশব্দ্য পড়ি।
তুমি কি আমার চোখের ঋষিতা
দেখে আনমনা হও পাখির মা?
সাগরের সন্ধ্যার সাথে
ঢেউয়ের হাসিখুশির সাথে
সারাক্ষণ কথা বলতে বলতে
ভাবতে থাকো কি—

কিভাবে মগ্ন মন্দ্র আকাঙ্ক্ষা ফোটে
বৃক্ষের শাখায়?

৫.
যে-নৈঃশব্দ্য পড়ি দৃশ্যের
ঘুম থেকে ওঠে
তার কিছু রোপণ করি
ভালোবাসার ভিতর।

মাটি পড়ি,
তাই ভালোবাসা পড়তে পারি
সতেজ সরস নৈঃশব্দ্যের গাছতলে
বিছরা-ভরা মায়া,
যে-গাছের সাবলীল উৎফুল্ল স্তনে
বহু দূর হতে ছুটে আসা দীপ্তক চিতা
সেজদা করে।
যে-দেহ দুধ-নেয়ামতের আধার
সেখানে যুক্তিসংগত স্তন ফোটে,
সে-দেহ নুরের গল্পগুচ্ছ
সে-দেহে ধরে দেহের অধিক
ঐহিক মায়াফুল।

৬.
ঘাসফুল দোলে
ঔষধি ‘আগাছা’ সব অবাক!
কানাকানি করে।
তারা অপলক দেখে
ভক্তি-আপ্লুত চিতার অনুভূতি।
ঔষধি গাছ তারা
জঞ্জাল—আগাছা না।
শুভ্র মেঘ, যে-মেঘ থেকে বৃষ্টি নামে না
তবু দরকারি শূন্যতা
অনর্থকও জরুরি উইন্ডো
সদর্থক—প্রাসঙ্গিক—ধনাত্মক।

৭.
দূরে একটি একা গুল্মঝোপ
মনে হলো পতঞ্জলি মুনি
যোগাসনে, গম্ভীর।
বনাঞ্চলে বহু ঘুরেছি কৈশোরে,
ঘুমের আগে ও পরে
পাতার মর্মর ধ্বনিতে এখনও
খুঁজি জগতের যথার্থদর্শী।

অচিন পৃথিবী, অচিন প্রসঙ্গ সব
মনগড়া চেনা জানা সবখানে,
সব-সব দেখে দেখে ঘুমে যাই
জেগে উঠি সিঁড়ি বেয়ে।
প্রবাসে একা একা সংসারের
ঘ্রাণ মর্ম বিক্রি করি
সংসারের মানুষ নাকি আমি
বিরহপীড়িত পাখির গান শুনি।
কখনো ঘরে ফিরে দেখি
বাতাসে তৈরি ঘর আমার আবাস,
এক টুকরো সময় দিয়ে
বানানো বিছানায়
এয়ারগানের শুট খাওয়া ঘুঘু
ডানাভাঙা, আহত, পড়ে থাকি।

৮.
একদিন বাঘের হিংস্রতার সাথে কুস্তি;
বাঘ বুঝল, আমি পাইথন সাপ।
তার ধড় ফেটে লাভা উদ্‌গিরণের উপক্রম
কিন্তু কোনো হারজিত ছাড়া
পরস্পর ছাড়াছাড়ি হলো।
সেইদিনই আমি একটি সন্ধ্যা ফুঁড়ে
স্বচ্ছন্দে উড়ে উড়ে
পার হই কুসুমকলি নদী,
স্বচ্ছ সুন্দর এই নদীর কপালে
চন্দ্র সূর্যের আলো ঝিকমিক করে।
তার প্রশস্ত বুকে
অটো ডাউনলোড হয়
উপলব্ধি ও উৎসাহের উৎপ্রেক্ষা;
উড়ে যেতে যেতে দেখি আমাকে
দেখা যায় তার স্বচ্ছ বুকে
কুসুমকলির মুখে।

৯.
পাতাবাহারের চিত্রল ভাষায় একদিন
আমাকে বলেছিল কুসুমকলি—
“তুমিই হরিণের কস্তুরি
তুমিই স্নায়ুশক্তিবর্ধক আম্বর
তুমিই জলভরা দিঘির কান্তি
তোমাকে ঘিরে থাকে
বৃক্ষ ও গানের পাখির ভালোবাসা,
উড়তে না পারা উটপাখি
তোমাকে দেখে অবাক হয়”।
আমি বলেছিলাম—
“তুমি বিস্ময়কর এক নদী,
বয়ে চলো আর ঘ্রাণ ছড়াও, হৃদয়ের।
অলৌকিক মায়ার ঘ্রাণ
আর আশ্চর্য হই, নদী তুমি
কিভাবে সুপারনোভার
শক্তি বিকিরণ করো!”

একদিন বলেছিল—
“আমিই ফুলপরি”।
বললাম, “একের মধ্যে বহু আর
বহু মিলে এক, অভিন্ন অদ্ভুত।”
ফুলপরি হাসে আর বলে—
“গাছে গাছে পথের ফিকির
পথে পথে পথের জিকির
পথের খাবার হয় মানুষ
মানুষের ভিড়”।
আমি বলি—
“মানুষ গানের পাখি
মানুষ হিংস্র সাপ বিচ্ছু
মানুষ ছায়াবৃক্ষ
মানুষ চেয়ার টেবিল আলমিরা
মানুষ বাজারের থলে
মানুষ বাতিঘর, বৃষ্টি রৌদ্র জোছনা”।

১০.
ঘুম থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে
আমি পুনরায়
বুঝতে চেষ্টা করি—
আগুনের প্রসঙ্গ থেকে
আমি আসলে কী কী 
শীতকালীন স্নেহ খুঁজতে চাই?
শীতকালে কুসুমকলি
হিমালয়কে প্রশ্ন করতে পারে
প্রশ্ন যোগ প্রশ্ন সমান উত্তর
বানাতে পারে।
অনেকেই দেখে শীত বসন্তে
ফুলপরি রূপ ধারণ করে
কুসুমকলি নদীটি উড়তে পারে
পরিব্রাজক হয়।
একটি ছোট্ট খরস্রোতা নদী
সময়খণ্ডকে মোচড় দিয়ে
মন্দ্র নিশিতে ফুলপরি হয়,
চলন বিলের শ্যামল কান্তিতে চুমু খায়
আকাশের দিকে চেয়ে
পর্যটক হিউয়েন সাঙের সাথে
কথা বলে;
হাকালুকি হাওড়ে, বজরায়
চান্নি রাতে আমাকে বলে—
“তুমি ঋষি
ভালোবাসি রেশম পোকার আট তৈরির মতন, তোমাকে।
আট চক্কর ঘুরি প্রতিদিন তোমার ভিতর;
জানি
আট বেহেশত তৈরি অনর্থক না।”
আমি ফুলপরির হাসিতে
কণাধর্ম না তরঙ্গধর্ম
দ্বৈততা ফুটতে দেখি।

১১.
একদিন সন্ধ্যার যৌবন খুলে
ফুলপরি গিরিনির্ঝরের গান শোনে, একা।
শূন্যে দাঁড়ায়। বলে—
“এমন স্বননে ডুবে থেকে
এক জীবন যাক না।”
জলতরঙ্গ উতলা হয়
জলকণা পড়ে মানুষের অনুভব।
রাগে জ্বলা মানুষের সামনে রাখা
গ্লাসের পানিও নারাজ।
পাথর ও ফড়িংয়ের দীর্ঘশ্বাস
দেখে ফুলপরি বিষাদাক্রান্ত হয়।
তারপর সন্ধ্যা অস্ত যায়
পৃথিবীর একপাশে এক বড় বাটি
অন্ধকার কক্ষপথে দৌড়ে।
ফুলপরি যায় আপন নদীপারে
নিজের দিকে চেয়ে হর্ষ বিষাদ
ঝরায়।
মাঘের জোছনারাতে কুসুমকলি
নদী বয়ে যায়, শত শত জোনাক
সাক্ষী—
এ এক অন্য রকম বয়ে যাওয়া!
যতদূর দেখা যায়
নদীর পানি সব
একটি লম্বা এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো
চলে গেছে সাগরের দিকে;
সাগর সঙ্গমে অলৌকিক জল-ট্রেন।

১২.
আমি ঘুম থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওঠে
নাস্তা সেরে, ঘরের বাইরে গিয়ে
যখন পৃথিবীর পথে হাঁটতে গেলাম,
জানলাম, জনপদের মন-প্রাণ উতলা
রাখা কুসুমকলি নদী ভরাট,
ঔষধি গাছে ভরা এক
অবিশ্বাস্য বনাঞ্চল এখন সেখানে।
রদবদল দেখে প্রতি ইউক্টো সেকেন্ড।
সংগীতের কথা ও সুরের বিনুনি
মেয়াদোত্তীর্ণ।
টুকরো সময় ভাঁজ করে
আরেক টুকরো সময়।

১৩.
লিওনার্দো কোহেন একজন ছিলেন
জ্বলছেন, টু দি অ্যান্ড অব লাভ;
একটি চব্বিশ ঘণ্টার দিন
মহাশূন্যের দিকে
ছুড়ে ফেলল কেউ,
আমি রাত্রি উল্টাই পাল্টাই,
সমুদ্র ভরতে চেষ্টা করি অ্যাকুরিয়ামে
কথা বলি ঢেউয়ের সাথে,
কুসুমকলি ও ফুলপরি মিলে-যে ঢেউ
কণা দিয়ে ভাগ করি, তরঙ্গ দিয়েও করি,
ফয়সালা হয় না।

দেখি, দুর্বিন শাহের গান গায় পাখিরা…

১৪.
আমি ফুলপরি খুঁজি না
কুসুমকলি খুঁজি না
বসন্তকাল ধীরে ধীরে প্রবেশ করে
আমি শিমুল-ফাটা তুলা হই,
আউলা বাতাস আমাকে ওড়ায়
মানুষের বাড়ির ভেন্টিলেটর
পাখির বাসা ছুঁয়ে
ভালোবেসে আনমনা হওয়া
পথিকের মাথা ছুঁয়ে
টুকরো টুকরো আমি;
ছায়াবৃক্ষের পাতায় একটু লাগি
বাতাস আবার ওড়ায়,
এক টুকরো  আমি
মৌচাকে পড়ে মধু—একাকার।
বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে নামায়
টুকরো টুকরো আমি
মিশে যাই,
পিষে যায় গাড়ির চাকা
দ্রুত ছুটতে থাকা প্রাণীদের পা।
ছেঁড়া-ফাটা-টুকরা আমার দেহ হয়
মাটির পৃথিবীর শরীর;
চৌদিকে আমার শত শত
কবরের কোনো নাম-নিশানা থাকে না…

সারওয়ার চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও অনুবাদক। প্রাক্তন সিলেট প্রেসক্লাব সদস্য। প্রাক্তন সহকারী সম্পাদক দৈনিক জালালাবাদ। একুশ বছর ধরে ইউএই প্রবাসী।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; মূল : এলিফ সাফাক, চৈতন্য, ২০১৬]
সাক্ষাৎকার [অনুবাদ, পাওলো কোয়েলো, হারুকি মুরাকামি, থিক নাট হান]
সংগীতশিল্পী [অনুবাদ, মূল : কাজুও ইশিগুরো, চৈতন্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com