হোম কবিতা ল্যাজারাস

ল্যাজারাস

ল্যাজারাস
836
0

“I am Lazarus, come from the dead,
Come back to tell you all, I shall tell you all”

 

আমি এক লোক—
আমার থেকেও ফেরারি অনেক পাখি
আমি এক লোক একক ভঙ্গিতে হাঁটি
সুরবহ শিরা অকুল অবধি…

আমার ভেতরে উত্থিত হয়েন আরো কিছু লোক।
তাদের শরীর থেকে ওড়ে বাষ্প আর কারখানার কালি।
যে বোবা সন্ধানে আমি জলরেখা ধরে হাঁটি,
ভোরবেলার ঝড়ে জাগি উপদ্রুত একা—
মহানিম পাখি;
সন্ধ্যার আগেই উড়ে যাব ভেবে,
চোখ বুজে আছি।

আমার ভেতর দিয়ে পথ করে বিবিধ মানুষ,
অট্টপরিহাস কেন তোলে তারা শরীরে আমার,
চরকিতে উঠায়ে প্রদক্ষিণ করে, ভুলে যায় কথা!
আমি কি বোঝাব স্রোতের তলার মিহি জটিলতা?

কাঠ ও পেরেক যতটা সম্পর্কে বাঁধা,
ততটা অটুট নয় প্রতিজ্ঞার দানা।
ছেঁড়া বৃন্তে ধীরে শাদা কষ জমে,
একমনে দেখেছি, গোলাকায় ফোঁটা
জমে থাকতে চায় পাতার শিরায়।
কিন্তু কাটামুখ খোলা রয়ে গেলে
ছেড়ে চলে যায় দেহের নির্যাস—
রক্তধারা কেন পিছু যে ফেরে না!

এমনতর কত কথা ভেবে ভেবে,
ঘুমাবার আগে আছে যাহা জড়ো করি রাতে:
মজ্জাহীন হাড়, ভেজা পদচ্ছাপ, অভিশাপ ভরা বাটি,
কপালে টিপ-লাগা ভাঙা আয়নার হাসি।
আমাকে দেখায় কোথায় কতটা ক্ষয়ে গেছি,
আমার শরীর থেকে ঝরে রাশি রাশি বালি।

বেগতিক আমি এক লোক,
ইঁদুরের মতো দাঁতে দাঁতে
প্রহরের রজ্জু কেটে চলি।
তুফানের মধ্যে ঢুকে পড়ে বৈমানিক।
আমার ভেতর দিয়ে পারাপার করে
নিবুনিবু ট্রেন, বিষপাখালির ঝড় আর কবুতর।
আমার পায়ের পথে জমে খাক
দিনমান করে আবছা কাটাকুটি,
একক ভঙ্গিতে হাঁটি আমি এক লোক।

আমার স্মৃতিরা সব পাখি,
ঝড়ের ঝাপট তুলে
একসাথে উড়াল দেয় রাতে।
আমি কি উন্মুখ প্রশাখা জড়ায়ে কোনোদিন
ফেরাই নি শরণার্থীদের?
বলি নি কি এই গাছে পাতাও বসতি!
ঝিল্লিময় মনে দিই নি কি সেলাইজোড়?

আমি জেগে থাকি মহল্লার মুয়াজ্জিন
জীবন বাহিত হয়ে গেছে যার
তার শেষ কিস্তির কাশি—
বুকের ওপরে জলছাদ পেটাচ্ছে কেউ,
তলপেটে ব্যথারা মোচড়ালো ঢেউ।
নিচতলায় হয়তো মরে গেছে কারো কেউ
আজ পুনরায় তার নামে কাঁদে তার বউ।
কান্নার সকল সুর কী রকম গেঁয়ো,
শান্তি শুধু স্তব্ধ পুকুরে না-ছোড়া ঢিল
উড়নপাক শেষে আবর্তন বন্ধ করে চিল।

জোয়ারের টানে খোলা চোখে ভাসি।
গত বরষায় আমি যাই নি উত্তরে,
সকল শোভার থেকে দূরে বসে বরং
কালো গীতা এক করেছি রচনা।

আমার ভেতর কত কত মৃত্যু বেঁচে থাকে
কত কত সহমৃত্যুর শিয়রে ধুনি জ্বেলে
উঠে আসি আমি—
কত কত পাপ ব’লে মরে যায় শিখর।
সন্দেহের কুষ্ঠরোগে আমি মরে গেছি পুনর্বার,
পুনর্বার এই হৃদয়ের ধূপ পুড়িয়ে নিজেই
স্বয়ম্বর শোকসভায় জ্বেলেছি কমলা আগর
লখিন্দরসম শুয়ে—দুঃখতোয়া বৃষ্টি লাগে গা’য়।
গোলাপজল-ছিটা লাগে গালে আর আমি জেগে উঠি।

স্মৃতি সামলে বাঁচে কোনো কোনো মানুষ।
কোনো কোনো পাখি মেঘে থাকে গছা,
গানের আবাদ মরে যায় কারো
কারোর কেবলই স্মৃতি; ভুলে যাবার উপায়।

‘আছি’ জেনে কারো বিদায়ের পরও
দুবলা মনে পড়ে নিত্যের নিঃশ্বাস
ভেতরে আমার সকল মৃত্যুরা বেঁচে থাক!
কখনো গুনগুন, কখনো অবশ ডানা স্থির
কখনো হঠাৎ পেরোতে পেরোতে বাঁক
বুকের ভেতর ডেকে ওঠে ট্রেন।
অপহৃত জীবনের তিখা চিৎকার!

 

[তমোহা পাথর পাণ্ডুলিপি থেকে]
ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]
বিস্মরণের চাবুক [আগামী, ২০১৮]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]
জীবনানন্দের মায়াবাস্তব [আগামী, ২০১৮]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : rotnopahar@gmail.com
ফারুক ওয়াসিফ