হোম কবিতা যজ্ঞযাত্রা ও আশ্চর্য গন্ডোলা

যজ্ঞযাত্রা ও আশ্চর্য গন্ডোলা

যজ্ঞযাত্রা ও আশ্চর্য গন্ডোলা
678
0

১.
উপত্যকায় প্রবেশের মুখেই একটি নদী দেখলাম
আঁকাবাঁকা, ছিপছিপে আর নীল
লোকে একে বিপাশা নামে ডাকে

মনে হলো
পৃথিবীর সকল নারীরই প্রকৃত নাম বিপাশা।

২.
সারিবদ্ধ পনি পর্যটকসমেত উঠছে বরফের পাহাড়ে
আমাদের পনি-দুটোও পাশাপাশি হাঁটছে সোনমার্গের দিকে
এর আগে আমরা দেখেছি থাজিওয়াস তুষারনদী
তারও একটু পাশে জোজিলা পাস
এটাই কাশ্মীর ও লাদাখকে যুক্ত করেছে

এত এত অশ্ব আর অশ্বারোহী
মনে হচ্ছিল এটা যজ্ঞযাত্রা নয়তো?

হবে না কেন? সোনমার্গের বরফ-পাহাড়ের চূড়ায়
যখন আমরা পৌঁছাই আমাদের ঠোঁট ফেটে চৌচির
আর শুভ্রতার পরিবর্তে তুষার রক্তরঞ্জিত হয়ে আছে

আমাদের গাইড যে-তরুণ, লম্বা-শীর্ণ দেহ তার
বলল, এ-সবই আমাদের রক্ত জমাট বেঁধেছে।

৩.
একটাই রহস্য পৃথিবীতে
ঝিলমের তীরে কেন এত দেওদার সারি?
ঝিলমের স্রোতখানি সত্যি তবে বাঁকা?

এই নদী ঝিলম,
এটা কাশ্মীরের হৃদয়

মনে মনে ভাবি
কত ফোঁটা রক্ত সেঁচে ঝিলম আজ
উপত্যকার হৃদয়ে পরিণত হয়েছে!

৪.
ঝিলম আমাকে দিয়েছে অপার্থিব আনন্দ
ঝিলম আমাকে দিয়েছে অপার্থিব বেদনা

ঝিলমের স্রোতে আঙুল রেখে আমি
অনুভব করেছি মানুষের কান্নার উষ্ণতা

ঝিলমই আমাকে শিখিয়েছে
অশ্রু আর রক্তের স্বাদ কেন একইরকম হয়।

৫.
মানুষ বাসা-ছাড়া পাখি!
খোদ রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি ছিল
ঝিলমের বোটে বসে এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।

অনেক দিন বাদে আরেক সন্ধ্যায়
আমরা যখন উপগত ঝিলমের পাড়ে,
আকাশে ছিল না ঝঞ্ঝামদরসে-মত্ত বলাকার পাখা
তবু অকারণ প্রশ্ন জাগে মনে,
মানুষ তবে বাসা-হারা পাখি? শূন্য থেকে শূন্যে!

৬.
আমরা যখন সিন্ধুনদীর পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালাম
তখন দুপুর,
আমাদের অতিক্রম করল একদঙ্গল ভেড়া
আমরা তাদের আদর করলাম
আর খেতে দিলাম কিছু সস্তা ফল
তারপর আমরা প্রবেশ করলাম
সিন্ধুর গোপন অস্তিত্বে

উপত্যকার মানুষ একে প্রেম নামে ডাকে।

৭.
কাশ্মীরি নারীদের চোখ এক-একটি একে-৪৭

আমি যতবার তাকিয়েছি
গুলিবিদ্ধ ও ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছি!

৮.
শালিমার গার্ডেনে যত গোলাপ
তাতে লেখা আছে উপত্যকার হৃদয়ের ইতিহাস!

আমরা যখন গার্ডেনে যাই
একটি গোলাপ আমাকে বলেছে,
গত গ্রীষ্মে যে-মেয়েটি বারামুল্লা নগর থেকে
অপহৃত হয়েছিল সেই তো আমি

দ্যাখো, আমার ঠোঁটের রং নিয়েই আমি ফুটেছি।

৯.
আরেকটা বসরাই গোলাপ আমাকে
কাছে যেতে ইঙ্গিত করল,
বলল, দ্যাখো আমার রং
তোমার মুলুকে এমন রঙের কাউকে পাবে না।

জানো তো ওরা আমাকে গণকবরে চাপা দিয়েছিল
আমি কিন্তু ঠিকই ফিরে এসেছি।

১০.
তোমার চোখের রং যেমন
ঠিক আমার প্রেমিকটির তেমন ছিল
কিন্তু জানো একদিন রাতে জওয়ানরা তাকে তুলে নিল

আমি ছুটে গেলাম ক্যাম্পে
আর ওরা কয়েকজন মিলে আমাকে…

আমার রক্তের রং নিয়েই আমি
বাগানের এক কোণে জেগে আছি

বাদামি চোখ নিয়ে সে একদিন
আসতেও তো পারে!

১১.
আমি একটি কালো গোলাপের কাছে গেলাম
তার পাপড়িগুলো ছিল গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের
কিন্তু কী অদ্ভুত মায়াবী

সে বলল, মনে আছে তোমার কারগিলের কথা?

ওই যে কারগিল-যুদ্ধ? একটা বোমা আমাদের
বসতভিটা পুড়িয়ে দিয়েছিল
আর আমি আমার মাকে জড়িয়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিলাম
তাই আমি কালোরূপ ধারণ করেছি,

আমায় তোমার মনে ধরেছে?

১২.
আমরা স্টেট ব্যাংকে গেলাম,
কিছু ডলার ভাঙাতে হবে

কাউন্টারে এক তরুণী বসে আছে
মুখ নেকাবে ঢাকা
কিন্তু চোখদুটিতে গোলাপ আর শিশা পুড়ছে!

ব্যাংকিং শেষ হলো
ইচ্ছে হলো কথা বলি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে
পাসপোর্টে রুপি চালান করতে করতে একটু হাসলাম
—এক্সকিউজ মি?
—ইয়েস, স্যার!
—আপনি কি কাশ্মীরের স্থানীয় অধিবাসী?
—ফরচুনেটলি অর আন-ফরচুনেটলি, স্যার!

তারপর সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

১৩.
ডাল লেকের ওধারে বিপণি-বিতানের
এক বৃদ্ধ দোকানির সঙ্গে খাতির হয়ে গেল
তিনি আমাদের দুজনকে পছন্দ করলেন
আমরা তার দোকানের একপাশে বসতাম

জানালেন বয়স ৮৩
মুখ তার আগুনে-পোড়া, বলিরেখায় ভরা
দৃষ্টিটাও কঠোর
একদিন আমি বললাম, এটা তো ভূস্বর্গই

তিনি হাসলেন, কিছুক্ষণ পরে বললেন
দোজখে আছি! বাঁচার আর ইচ্ছে করে না।

১৪.
সেই দোকানি আমাদের কিছু শীতবস্ত্র ভাড়া দিলেন
আমরা তাতেই ভ্রমণকালটা কাবার করলাম

ফেরার আগের দিন আমরা কাপড় ফেরত দিতে গেলাম
ভাড়ার টাকাটাও পরিশোধ করতে হবে

তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন
আমি সবার সঙ্গে সওদা করি না
কাপড়গুলো বরং নিয়ে যাও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে

তিনি চোখ মুছলেন।

১৫.
আপনি আমাদের দেশে আসুন একবার
আমাদের বাড়িতেই থাকবেন।
দোকানিকে দাওয়াত দিলেন আমার স্ত্রী

যেতে দিলে তো? তাও তোমাদের মুসলমানের দ্যাশ!
বুঝলে, এই জীবনে কোথাও যাওয়া হলো না

তারপর নীরব।

তোমরা বরং আরো একবার এসো
এবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
ততদিনে হয়তো ওরা আমাদের হত্যা করেই ফেলবে।

১৬.
জীবনে প্রথম গন্ডোলায় চড়ি গুলমার্গে
ক্যাবল-কার যখন বরফ পাহাড়ের চূড়ায়
আমি প্রথম উপলব্ধি করি,
পৃথিবীটা হচ্ছে একটা শিশুতীর্থ

সীমান্তে তখন গোলাগুলি চলছে
গতরাতে মারা গেছে আট পাকিস্তানি জওয়ান
আজ হয়তো মর্টার হামলা হবে
আমরা গন্ডোলায় চড়ে পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখছি।

১৭.
গুলমার্গের কাঠের বাড়িগুলো সুন্দর
বরফে আচ্ছাদিত বাড়িগুলোকে
পাখির বাসা বলেই মনে হয়,

এই পরম রমণীয় বাড়িগুলোই হয়তো
চারপাশের মানুষকে সহিংস করে তুলেছে।

১৮.
গুলমার্গ থেকে নামি এক বিকেল বেলায়
এসময়ে উপত্যকার সাধারণ দৃশ্য :
পাইনগাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে
রক্তের বৃষ্টি, আসলে লালরঙের রোদ

সূর্যকে খাঁচায় বন্দি করলে এমন দশা তো হবেই
সবিস্ময় তাকানো দেখে জনান্তিকে বলল কেউ।

১৯.
হামিদ শেখ বলেছিল অন্তত একটা রাত ডাল লেকে
হাউসবোট বা শিকারায় কাটাবেন

আমরা থেকেছিলাম মাঝারি আকারের বোটে
আমরা মানে আমরাই, দুজন
রাত গভীর হলে আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হতাম,
মনে হতো কাশ্মীর একটি অগ্নিগর্ভের নাম

আর আকাশে জরায়ু-আকৃতির নক্ষত্রমণ্ডল দেখতে পেতাম

সকালে মনে হতো এই জন্ম নিলাম।

 

Zafir Setu

জফির সেতু

জন্ম ২১ ডিসেম্বর, ১৯৭১; সিলেট। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর [চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]। পিএইচডি, সমাজভাষাবিজ্ঞান [জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়]।

পেশা : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
বহুবর্ণ রক্তবীজ (২০০৪); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
সহস্র ভোল্টের বাঘ (২০০৬); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
স্যানাটোরিয়াম (২০০৮); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
তাঁবুর নিচে দূতাবাস (২০১১); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
সিন্ধুদ্রাবিড়ের ঘোটকী (২০১২); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
জাতক ও দণ্ডকারণ্য (২০১৩); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
সুতো দিয়ে বানানো সূর্যেরা (২০১৪); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
Turtle has no wings (২০১৪); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
ময়ূর উজানে ভাসো (২০১৪); চৈতন্য, সিলেট
ডুমুরের গোপন ইশারা (২০১৪); চৈতন্য, সিলেট
প্রস্তরলিখিত (২০১৫); নাগরী, সিলেট
ইয়েস, ইউ ব্লাডি বাস্টার্ডস (২০১৫); ঘাস, সিলেট
আবারও শবর (২০১৬); নাগরী, সিলেট
এখন মৃগয়া (২০১৬); চৈতন্য, সিলেট
নির্বাচিত কবিতা (২০১৮); বেহুলা বাংলা, ঢাকা

উপন্যাস—
হিজলের রং লাল (২০১৬); বেহুলা বাংলা, ঢাকা

গল্প—
বাবেলের চূড়া (২০১৩); শুদ্ধস্বর, ঢাকা

প্রবন্ধ—
লোকপুরাণের বিনির্মাণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০০৯); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
কবিতার ইন্দ্রজাল (২০১৭); বেহুলা বাংলা, ঢাকা

গবেষণাগ্রন্থ—
সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের ইতিহাস! (২০১৮); নাগরী, সিলেট
তাম্রশাসনে শ্রীহট্ট (২০১৯); নাগরী, সিলেট

সম্পাদনা—
শ্রেষ্ঠ কবিতা \ দিলওয়ার (২০১১); শুদ্ধস্বর, ঢাকা
নন্দলাল শর্মা : ব্যক্তি ও মানস (২০১২); ঘাস, সিলেট
সিলেটি বিয়ের গীত (২০১৩); শুদ্ধস্বর, ঢাকা

সম্পাদিত পত্রিকা :
ছোটোকাগজ : সুরমস (২০১০-)
গোষ্ঠীপত্রিকা : কথাপরম্পরা (২০১১-)

ই-মেইল : zafirsetu@yahoo.com; zafirsetu@gmail.com
Zafir Setu