হোম কবিতা মোহাম্মাদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

মোহাম্মাদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

মোহাম্মাদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
3.69K
0
হুজাইফা মাহমুদকে

এখানে কতদিন হিংসায়
গভীর ঢালুপারে নদীটির
জমেছে নীলাক্ষি কুয়াশায়
আমরা শুনি রাত মায়াবীর
আলো ও ছায়াময় নিয়রের
খেলেছে স্বেদবীজ সন্ধ্যায়
চোখের বুলবুলি উড়ে ফের
বসেছে মগডালে, নীলিমায়
ফলের ত্বকধোয়া আলো আর
ধানের দুধভরা রাত্রিতে
দিঘিতে কতদূর জোছনার
বাজছে বিউগল সরণীতে—

তবুও বালিহাঁস ঠোঁটে তার
রোদের সায়োনারা মারে ঝিম
পাথরে বাতাসের মাছরাঙা
নিভৃতে আকাশের নিচে দিন—

ডাকছি তোমাকেই, হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

ফসল চক জুড়ে, বিকালের
আলোয় মুছে গেছে আয়ুরেখা
পাতাই পথ ছিল অন্ধের
ভূয়সী ইতিহাস, হাওয়ালেখা
ছুঁয়েছে সময়ের যোনিমুখ—
শস্য-উড্ডীন এই মাঠে
তারায় অশ্বেরা উন্মুখ
একাকী মহুয়ার আলো চাটে
সময় শুয়ে আছে যেন কুঁজ
যেন সে পাহাড়ের সানুতল
এ গান বিষণ্ন বহুভুজ
শরীরে ভাঙনের হাওয়াকল

এশিয়া বুদবুদ অনায়াসে
মজ্জা পচে গেছে বাতাসের
কণ্ঠে নীল হয় ইয়োরোপ
দুনিয়া এইখানে কী মলিন—

ভাঙছে শূন্যতা হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

তুমি কি আসবে না এই খেতে
যেখানে বৃষ্টি ও পৃথিবীর
কাদায় শুয়ে মেঘ-সঙ্কেতে
মাটিতে ভিজে যায় আশরীর
বটের কষ ভরা এই বাঁক
যেখানে একা পাখি মরে যায়
যেখানে পানিকাউরের ঝাঁক
বিলের স্বেদ ফেলে হতাশায়
কোথাও ওড়ে ঘ্রাণ মৃত্যুর
ফাঁদের বিবমীষা, নোনা ঢাল
ভাবছে সে মরণ কতদূর
কোথায় সতীর্থ, সে বিকাল—!

তাদের তনুভরা কালো রঙ
হঠাৎ ছুড়ে দেয় ভরা চাঁদে
তুষার ঝরে যায় বাঙ্ময়ে
মহা সে সময়ের মেলানিন—

ডাকছে বহুকাল, হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

অশোক-পাতাটির স্বেদ হিম
দুঠোঁটে মেখে নিয়ে সন্ধেরা
শনের আর্দ্রতা, ভেজে ডিম
ডানায় উড়ে আসে ঘরফেরা
যেন সে কিষানির কবুতর
রঙের ধনু হয়ে উড়ে যেত
সুগোল নেমে এসে তারপর
জীবন এইখানে সমবেত
তাদের কথা ভাসে হু হু রাতে
অতীতকাল সেই ঘননীল
কাঁপছে তিরতির আঙিনাতে
মেঘের আলো ঘেঁষে গাঙচিল

একদা গোধূলির নাইলনে
কোথাও ঝুলে আছে হারিকেন
টুপছে নিভু নিভু আলো তার
সূর্য ডুব যায় ধুলালীন—

ডাকছি দিনশেষে হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

সাক্ষ্য গাঙপাড়ে কুঁজা গাছ
সাক্ষ্য ডাহুকের চোখা ঠোঁট
সাক্ষ্য শিশুদের গোল জিভে
মায়ের দুধ ভরা কালো বোঁট
সাক্ষ্য মাধুডাঙা নদীতীর
সাক্ষ্য সজনার ঋজু ফুল
সাক্ষ্য মায়াঢেউ শঙ্খের
মহররম মাসে দুলদুল
সাক্ষ্য দারুচিনি গাছটির
সাক্ষ্য চেলামাছ দওজোড়া
সাক্ষ্য হরিণের চরটিতে
একলা বেঁধে রাখা কাবু ঘোড়া—

কখনো মুদি সেই দোকানীর
পণ্য বেচবার ফাঁকে ফাঁকে
দেখার চোখ নিয়ে কী স্থির
ভালোও বেসেছিল হিংসাকে
অথবা গুল্মেরা দেবে ঋণ
হাওয়া ও মেশিনের ন্যুব্জতা
আকাশে ছড়িয়েছে সারাদিন
যেন এ কারাগার: সফলতা—
মৃতের পৌরুষ ভাবে চোখে
ব্যাকুল জাহাজির নৌপথ
ডুবছে সৈকতে, মীনলোকে
ভাসছে কতদূর দ্বৈরথ—!

ধাতুর শীত জুড়ে চলে যায়
নীরবে ট্রেনভরা হুইসেল
কাছিম শুয়ে আছে রোদপাশে
বাতাসে আলোছায়া কাঁপে ক্ষীণ—!

আত্মজীবনীতে এসো আজ
রাহমাতাললিল আলামিন—

যখন বনতলে দুটো চাঁদ
পাতার নদী ঝরে একাকিনী
বিষাদ এইখানে সারারাত
ছোট সে খাঁড়িটিও দুঃখিনী
স্রোতের মায়াঢেউয়ে মহিষেরা
রাতের ডুবোলীন জলাশয়ে
শুনছে দূরাগত অন্ধেরা
ঘোড়াকে ডেকে ওঠে সংশয়ে
তাদের খুর লেগে আলো ক্ষয়ে
হাওয়ায় পাক খায় সরলতা
আলোর যোনিমুখ সুর হয়ে
বেরিয়ে আসে গান, শূন্যতা—

দূরের খাঁড়িটিও বহমান
সাঁতারে আধোডোবা মহিষের
হাওয়ার অশ্রুতে কিশোরেরা
শুনছে অশরীরী কালো দিন—

তোমাকে ডাকে তারা, হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

এখানে জীবনের বিবমিষা
খিন্ন আহ্লাদে কতদিন
শুনেছে নিখিলের বহু তৃষা
যুদ্ধ ভালোবেসে সীমাহীন
এশিয়া ইয়োরোপ আফ্রিকা
ব্যথায় ঘুমিয়েছে শূককীট
ফসলে মায়াবীর বিভীষিকা
সারাটা হাওয়া জুড়ে মর্বিড
মাথার খুলি ঘোরে সবিনয়ে
অন্ধকার এসে কত কাল
অক্ষিকোটরের ফুটা হয়ে
দেখছে চাঁদ সুইসাইডাল—

মৃত্যু টুপটাপ ঝরে যায়
অন্ধ এস্রাজে দিনমান
কোথাও বোধ নেই হাওয়াতেও
আলোর গন্ধতে কেরোসিন—

তোমাকে ডাকতেছে, হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

আত্মহত্যার এইসব
অনেক আয়োজন এইখানে
সূর্যে হেঁটে গেছে হাওয়ামব
অপার হিলিয়াম সন্ধানে
ভাঙছে জুলকারনাইনের
সিসার তরলিত বিস্ময়
সময় ফুরিয়েছে দেয়ালের
উড়ছে শ্বাপদের কনভয়—
তবুও ফসলের সরণীতে
শান্ত পাকুড়ের ছায়াতীর
নদীর পাড়ঘেঁষা মসজিদে
তুমি সে নীরবতা মায়াবীর

কৃষির ঘাম চুয়ে শস্যতা
দুপুরে শিউলির ঝরা বুকে
ভাতের দানা ঘুম ফেলে গেছে
ঝাউয়ের বনানীতে যে কামিন—

তোমাকে ডাকে তারা, হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

সাক্ষ্য শালিকের ফাটা ডিম
সাক্ষ্য জঙ ধরা এঁটো তালা
সাক্ষ্য কাপড়ের শত ভাঁজে
মায়ের তুলে রাখা হাতবালা
সাক্ষ্য দওপাড়ে বটগাছ
সাক্ষ্য মাতামহী, যত শ্লোক
সাক্ষ্য ঘাসবনে বেঁধে রাখা
গাভিন গরুটির দুই চোখ
সাক্ষ্য বাতাসের জোড়া মোষ
সাক্ষ্য আসরের মোনাজাত
সাক্ষ্য কবরের নিমফুলে
ছড়িয়ে থাকা মাটি, তৃণখাত
সাক্ষ্য দুবলার চরে কাশ
সাক্ষ্য বতুয়ার ঘন রঙ
সাক্ষ্য মসজিদে ঘড়িটির
পুরনো ঘন্টার ঢং ঢং

কিছুই ফেরে নাই, ভেসে যায়
নদীতে শালবন, নির্বাণ
প্রতিধ্বনিময় এ হাওয়ায়
নৌকা বয়ে যায় দিনমান
তাদের দেশ যেন নীলিমায়
তাদের দেশ যেন লুব্ধকে
নদীর ফেনাভূমি বৃথা যায়
অধ্যুষিত জলে কার শোকে
নৌকা যায় ভেসে একা একা
দরজা খুলে ধরে হাওয়ামন
পাথরে প্যাপিরাসে কাল-লেখা
হঠাৎ ভেসে ওঠে তুঁতবন—

কোথাও ঝুলে আছে সারা পথ
ময়লা রবিবার একা তারে
হেমন্তের স্বেদ ডুবে যায়
সুতার কৃষকেরা মাকুহীন—

সে মাঝি, তুঁতবন ডাকতেছে
রাহমাতাললিল আলামিন—

এ মাঠ বহুকাল দণ্ডিত
এ নদী বহুকাল শাপে লীন
এখানে চারু নিশিথিনী মৃত
গুল্মশাসিতেরা মনোহীন
মোহাম্মাদ প্রিয় দরদিয়া
মগজে হো হো হাসে লাল ট্রেন
আগুনে পোড়া জিভে ডাকে হিয়া
বাতাসে শুয়ে আছে অহিফেন
আমার চিরব্যথা আত্মায়
চূর্ণ ক্রমাগত গম্বুজ
সমুদ্রের মদে দিন যায়
নিখিল বিশ্ব কি মহাপুঁজ—!

মোহাম্মাদ প্রিয়, দরদিয়া
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি
আমাকে তুলে নাও মারী থেকে
প্রতিধ্বনি থেকে উড্ডীন—

দরুদ বর্ষিত হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

কুয়াশাক্লান্ত এ ফ্যাসিবাদে
প্রেতের উড়ে যাওয়া সন্ধ্যায়
পালঙবনে কার পাখি কাঁদে
গোধূলি বেজে ছিল মনীষায়
ডিমের আধোভাঙা নীল সুর
বাতাসে, তৃণখেতে গোল হয়ে
পানির আলোছায়া যতদূর
সেখানে ঢেউলীন সংশয়ে
লাইট হাউজের ক্ষীণ আলো
পড়ছে রাত্রির ঘটনায়
হঠাৎ শুশুকের মিশকালো
শরীরে ডুবো চাঁদ মিশে যায়—

একটি মদ আসে ফেননিভ
সূর্য, বাতাসের মন্দিরে
ঝাউয়ের বন আর সৈকতে
রোদেরা কথা বলে ভূ-মুখিন

ডাকছে বালিয়াড়ি, ম্লান ঢেউ
রাহমাতাললিল আলামিন—

ভুবন চিলটির মিঠা ডাকে
সঘন হয়ে আসে এ দুপুর
তারার ঘ্রাণ ছুঁয়ে বিশাখাকে
বাজায় সারারাত সন্তুর
মৃতেরা কোনদিকে চলে যায়!
বনের সন্ধ্যায় থামে ঘোড়া—?
সূর্য-পারাপার নৌকায়
সে দেশ কতদূর, আনকোরা—!
সে দেশে বনেঘেরা তরমুজ
বাতাসে নীল মদ নহরের
উটের ক্রীড়াময় হাওয়া-কুঁজ
চলছে সারি সারি বণিকের

আমার আত্মা কি সেইসব
কুঁজের সঙ্কেত বঙ্কিম
পাহাড়ে আড়ালের ফাটা দাগে
বেগানা চাঁদ যেন প্যারাফিন

জ্বলছে বিস্ময়ে—হৃদয়ের
রাহমাতাললিল আলামিন—

কীর্ণ হয়ে আসে গোলাঘর
পরাঙ্মুখ রেলকলোনির
ছিন্ন টিকিটের মর্মর
আমরা শুনি নি কি ঝরা মিড়!
চন্দনের বনে রাজহাঁস
একলা ডেকে গেছে তনুমন
মিথুন-উদ্বাহু চারপাশ
উঠছে জেগে দূরে তুঁতবন
কাউকে মনে পড়ে দিনমান
শ্রাবণ-বৃষ্টিতে রেডিয়োয়
বাজছে সুরা আলে ইমরান
নিভৃত ঘুমিয়েছে মৃন্ময়

কাউকে মনে পড়ে এইখানে
অথবা দ্রুতগামী মর্মের
বিদায়গ্রস্ততা, অবসাদে
পাতার ঝরা পথে চিরদিন

মোহাম্মাদ, প্রিয় দরদিয়া
রাহমাতাললিল আলামিন

সাক্ষ্য দুপুরের মালিদও
সাক্ষ্য ঘুঘুভরা মেঠো তারা
সাক্ষ্য ভোরশীতে মায়ারোদ
নানির হাতে মাখা আস্বাদ
সাক্ষ্য কঞ্চিতে মাছরাঙা
সাক্ষ্য জেলেদের কালো গাও
সাক্ষ্য এক ডুবে ধরা মাছ
বাঁশের ফুলে ফোটা সন্ধ্যাও
সাক্ষ্য বেনেবউ পাখিটার
সাক্ষ্য হাতে বোনা ছোট ডালা
সাক্ষ্য বাতাসের রন্ধ্রতে
কাঁদছে হুসেনের কারবালা
সাক্ষ্য ভেড়াদের ঝুনঝুনি
সাক্ষ্য বন্ধুর কাছে ঋণ
মোহাম্মাদ, প্রিয় দরদিয়া
রাহমাতাললিল আলামিন—

হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আজিজুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই —

ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬]
ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [ভারতীয় সংস্করণ, বৈভাষিক, ২০১৮]
মীনগন্ধের তারা [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]
আনোখা নদী [কবিতা, তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৮]
এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে [কবিতা, ঢাকাপ্রকাশ, ২০১৮]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com
হাসান রোবায়েত