হোম কবিতা ব্যথিত কোরাস

ব্যথিত কোরাস

ব্যথিত কোরাস
345
0

১.

বেদনা বেদনা বলে ঝরে গেল বুকের বোতাম।

থোকা থোকা ছড়ানোছিটানো ঘ্রাণ শুঁকে
আমি কিছু ফুলের খবর নিতে এসে দেখি
সজ্জিত বাগানে বিষাদ,
কোনো ফুল নেই,
চারিদিকে হাহাকার ব্যথিত কোরাস।
মানুষেরা ইদানীং দানবের মতো তাড়া করে
আহত কুকুর যেন ঘেউ করে ওঠে,
চিৎকার দেয় ঠিক উন্মাদ জল্লাদ সুরে।
চারিদিকে হুইস্‌ল ব্যস্ত চাকার ঘর্ঘর,
মুখে মুখে ভাঁজে ভাঁজে অস্থির ক্রোধ
কারোর কণ্ঠনালি চেপে ধরবার সাধ নিয়ে হর্ন চেপে ধরা এক ঘৃণার অসুখ!
কে যে কার থেকে বড়
কে খাবে কে খাবে না যে তাই মনে মনে জপ করা,

মাছের বাজারে বড় মাছ কেনা বেড়েছে ব্যাপক!
আহত হরিণী যেন, আমাদের এই যে সময়;
চোখে ব্যথা মুমূর্ষু কাতরতা,
তবু মৃত্যু নেই
করুণা জোটে না তার ভাগে!
‘নার্স নার্স…’ ডাকি তবু একবার ভালোবেসে বিষাক্ত ঘুম পুরে দেয় না শিরায়।
জেগে থেকে থেকে ঘেয়ো কুকুরের মতো আমাদের দিনকাল লেজ নাড়ে,
লেজের দোহাই দিয়ে বেঁচে থাকে বেঁচে থাকা আরো;
ফসল শূন্য মাঠে কেবল তারকা নামে রাতে,
সেই তারা বন্দির লোভে আমাদের শিকার শিকার খেলা শেষ হয় না তো।

জল শুধু মজে ওঠে
পচে ওঠে জিহ্বার ঘ্রাণ,
টের পাই ঊর্ধ্বতনের লোভ; ঘৃণা করে তবু শুতে যাই।
তাই কি নিজেকে ক্ষমা করাবার সকল সাহস শেষ?
বেঁচে থাকি ঘেয়ো হয়ে লেজ নেড়ে নিজেকে নিয়েই?

ফুলগুলো গিয়েছে কোথায়?
কারা এসে লুফে নিল আমাদের জীবনের সুর?
আমরা দোহাই দেবো কার?
আঙুলের ছাপে লেখা আছে, আমিই আমার ফুল নষ্টের দিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেছি,
চুপ থেকে লুট হতে দেখেছি বাগান;
শব্দও করি নি কখনো।

তাই কি এখনো রোজ ঘর্ঘর শুনি?
চারিদিকে ব্যথিত কোরাস!
আমাদের পতনের শোকে কাফনের গান, নীলমণি লতায় এখন ঘৃণার তুমুল মর্মর।


২.

ছাইরঙা সকাল দেখেই
মনে হলো বৃষ্টির গান হবে
হলো না আমার আর ঘুমোবার সাধ
আকাশে দুচোখ রেখে সেই ভোর থেকে
ছাতা হাতে হেঁটে গেছি অঝোরে তুমুল
ফেরাবার কেউ কি কোথাও নেই আজ
আমি সেই ভোর থেকে বৃষ্টি বৃষ্টি করে চিৎকার দিয়ে সারাবাড়ি মাথায় তুলেছি
তবু কেন
আমাকে থামাতে কেউ জাগে নাই
নাকি আজ সকলেই ব্যক্তির ভাঁজে মজ্জুম হয়ে আছে খুব
মরে গেছে খরগোশ অনুভূতি
শ্রুতিতে কঠিন সীসা ঢেলে আমাদের হৃদয়ের সব গান থমকে দিয়েছে
সবাই এখন শুধু ঘড়ি মেপে কথা বলি
অফিসের পর মুঠোফোনে আবার অফিস করি
বেদনাকে টিস্যুর ভেতর চেপে ফেলে দেই
বেঁচে থাকাটাই বনসাই প্রকল্প যেন
ছেঁটেকেটে গুনোর ভেতরে নিজেকে জড়াই
সফল সুস্থ বলে নিজেকে বিক্রি করি প্রহরে প্রহরে ছবি তুলে

আমাকে কেন যে কেউ ভালোবেসে ডাক দিয়ে ফেরাবে সবুজে।


৩.

চন্দন পেন্সিলে আঁকা হয়েছিল যেই মুখ
যেখানে এখন শুধু মাছিদের ক্রন্দন
পোকাদের ফিসফাস।
আকাশের নিচে এক ব্যথিত লম্বা ঘুম টেনে
বিদায় জানিয়ে যিনি চলে যেতে সম্মত
সেই মুখ আমাকে ভীষণ এক বর্ষার গল্প শুনিয়ে বলেছিল,
‘একবার সব নীল করে আমরাও ঘন মেঘ ঝরাব তুমুল’
তার রাত্রিতে আজ ঝিঙুরের গান
সময় ঝিমিয়ে গেলে
নাকফুল খসে পড়ে নক্ষত্রের মতো আচানক
তাই আজ মাটির পাঁজরে আমাদের নষ্ট বীজের নামে ফুল এঁকে এঁকে
ভরে দেই,
একদিন ফুল ছিল বলে গাছে গাছে প্রদীপ রাখি নি

এখন পুষ্পহীন রোদে ছুরি দিয়ে ফুল আঁকি পাটল মাটিতে।


৪.

ফুলগুলো আহত হয়েছে শুনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আজো কাঁদি!
কাঁটাচামচের ফাঁদে কয়েকটি চুম্বন বন্দি করেই টের পাই
এখনো বালকবেলা ফিরে পেতে রাজি,
বালিকার ঘামের গন্ধ টান দেয় পরানের খুঁট ধরে,
আমি তাই চন্দ্রগ্রস্তের মতন এখনো নিয়ম করে ঘুরি
তার চারিদিক ঘিরে লাটিমের মতো এ জীবন,

যুদ্ধশেষের দিন নিহত প্রজাপতির ডানা দেখেছে আমার চোখ পিঁপড়ের ঠোঁটে লুট হতে

অধুনা তোমার চোখে তুমুল বিষাদ,
কেবল ছিন্ন হতে দেখি আর উন্মূল হতে দিকেদিকে
পতনকামী পুষ্প যেন সকল হৃদয়
ভেতরে সবাই আজ বহুগামী প্রতিভার কৃষি করে ফসল ফলায়
উচ্চফলনশীল ফলে কেন জানি স্থির স্বাদ নেই,
ক্ষয় হলে চুপ করে থাকি
ক্ষুরের শব্দে কান পাতি,
প্রেমিকবাহিনী এলে এ রাজ্যে সন্তান জন্মাবে খুব।

পরিচয়পত্রের খোঁজে দাঁড়িয়ে একটি শিশু যুদ্ধের শেষে,
আমি তার হাতে কোন ফুল দেবো?
জপের মালায় চাঁদ সূর্যও ডুবে গেল
আমার অপেক্ষা নিভে শূন্য হলো না মন্দির।

কুলুঙ্গিতে অন্ধকার যুবতীর চিহ্নের মতো থিত হয়ে থাকে
কাঁপে শুধু আঙুলের নদী ,
উন্মাদ প্রেমিকেরা কবে এসে পোড়াবে নগরী?


৫.

সারারাত প্রহরীর বাঁশি
জানায় জ্যান্ত আছে সচেতন সব অনুভূতি।
ক্ষুধা আছে বলে টের পাই চাকরিটা প্রয়োজন খুব,
মুড়ি খেতে খেতে ভাবি;
মালিকপক্ষ হোক শুয়োরের বাচ্চা তবুও আমি তো মানুষ!
আপাতত বিদ্রোহ থাক, চাকরিতে ইস্তেফা দেয়া চলবে না!
তবু মুড়ি শেষ হলে শিরায় আবার লাফ দেয় বিশ্বাস,
করোটিতে টঙ্কার জাগে, সব ছারখার করে আমার এ শূন্য যাপন!
কার ধনে কে যে করে পোদ্দারি জানা নেই তাই যক্ষ হয়েই সুখী
সকল রাষ্ট্রে সব মহাজন রাজার দালাল।
আমিও কি যক্ষ তোমার ভালোবাসা?
তুমি সাড়া দাও যাকে আমি তাকে ঘৃণা করি
টাকশালে আমার মুণ্ডু যদি ছাপা হয় সফেদ কাগজে জলছাপে,
তাতে কার বাল ছেঁড়া?
ফ্রাঙ্কলিন, তুই কি আমার মতো ভালোবেসে পারবি নিজেকে ছাই ভস্ম বানাতে?
টাকা হলে,
আমাদের বেদনার অবসান হবে!
হৃদয়ের কারবারে এই যদি হয় পরিণতি;
যদি হয়, সেইখানে ভালোবাসা বহু আগে ডুব দিয়ে জেগে ওঠে নাই।

ফ্রাঙ্কলিন, তুই তবে জিতে গেলি তোর সাথে; মুমূর্ষু আমি শুধু ভালোবেসে ফতুর হচ্ছি প্রতিদিন।

সমস্ত রাত্রির বুকে একজন প্রহরীর ছায়া পায়চারি করে,
সিটি মেরে জানায় জ্যান্ত আছে;
তাজা আছে নির্ঘুম চোখ,
বেতনের টাকাগুলো তালা আর চাবিতে ঘুমায়
তোমার ভেতর যেন আমি।

এইসব নিয়ে সংসার, ঘুম, ঘৃণা, কামনার রসকষ সেঁচে, হাততালি দিতে দিতে…
আমরা তলিয়ে যাই,
যেতে যেতে দেখি এক জোছনায়; তোমার নাভির খাদে বেদনার জমাট আঁধার।

তাই দেখে
আমি,
চাঁদ হতে উড়ে যাই, ঝরা পালকের মতো।

রোমেল রহমান

কবি।
জন্ম ১১ নভেম্বর; ১৯৮৭, খুলনা।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—
বিনিদ্র ক্যারাভান [২০১৫, অনন্যা]

ই-মেইল : romelabc@gmail.com

Latest posts by রোমেল রহমান (see all)