হোম কবিতা বেণীমাধব : ২

বেণীমাধব : ২

বেণীমাধব : ২
407
0

বেণীমাধব তার নিজের নাম ভুলে যায়।
বেণীমাধব তার বাবার নাম ভুলে যায়।
বেণীমাধব চিনতে পারে না তার মাকে।
বেণীমাধব ভুলে যায় তার পিতামহের নাম, তার প্রপিতামহ আর তাবৎ আত্মীয়স্বজনের নাম। বেণী ভুলে যায় রবীন্দ্রনাথের নাম। তার কিছুতে মনে পড়ে না আরণ্যক কে লিখেছেন আর ‘হাকলবেরি ফিন’-এর নায়কের নাম কী? বেণী ভুলে যায় সব লতা-গুল্মের নাম আর এ-কারণে তার খুব কষ্ট হতে থাকে। বেণীকে অদ্ভুত এক রোগে পেয়ে বসে, স্মৃতিভ্রংশ রোগ। বেণী নিজের বাড়ি চেনে না, ঘর-সংসার ছেড়ে সে পথে নামে, পথ থেকে মাঠে নামে, মাঠ থেকে দিগন্তের দিকে চলে যায়। বেণীকে কেউ দেখে, কেউ দেখে না। কেউ তাকে ডাকে, কেউ ডাকে না, কেউ তার অভাব অনুভব করে, কেউ তাকে ভুলে যায়। মানুষের অত সময় কোথায়?
মানুষ নিজের কর্মব্যস্ততার ভেতর ডুব দিতে থাকে।
মানুষ তার নিজের কবর খনন করে।
মানুষ নিরন্তর নিজেকে ফাঁকি দিয়ে চলে।
মানুষ নিজেকেই চেনে না কখনো।
মানুষ হাতে-হাতে পায় তার কর্মফল।
মানুষের সাধনা বৃথা যায় না কখনো।
মানুষ তার নিজের কাছে ঋণী থেকে যায়।
মানুষ তার সীমাবদ্ধতার সমান বড়।
মানুষ মানুষকে কল্যাণের রাস্তা দেখায়।
মানুষ নিজের কাছে মিথ্যা বলতে পারে না।
মানুষের আছে সত্য বলার অসীম ক্ষমতা।
মানুষের মতো অমানুষ আর হয় না।
মানুষের জীবন কেবলই বিফলে যেতে থাকে।
মানুষ কখনো গাছ হতে পারে না।
গাছও কখনো মানুষ হতে পারে না।
মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না।
মানুষকে একপ্রকার উপগ্রহ বলা যায় কি?
মানুষ মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে কিন্তু একটু পরেই আবার ভাবে, না-আসাটাই ভালো ছিল।
মানুষের আছে মিথ্যা বলার অনেক কৌশল।
মানুষ সত্যটা জেনেও বারবার মিথ্যা বলে যায়।
মানু্ষকে ভালোবাসা দাও।
মানুষকে নিঃসঙ্গ করো না।
মানুষের জীবন এক অনিঃশেষ ট্র্যাজেডি।
মানুষ এক বৃহৎ কমেডির অংশ।
মানুষে-মানুষে সদ্ভাব আর কি হবে কোনোদিন?
মানু্ষ কি ফিরে পাবে তার হারানো উদ্যান?
মানুষের মন শান্ত হবে কবে?
মানুষ কি জানে না কোথায় তার ফসলের মাঠ?
কেন মিছেমিছি মানুষ ছুঁতে চায় অত দূরের আকাশ?
মেঘের ঠিকানায় চিঠি পাঠানো অসম্ভব, একথা জেনেও মানুষ বারবার হাত ইশারা করে জিরাফ ডাকে কেন?
মানুষ বৃষ্টিকে ভালোবেসে কী পেয়েছে এতদিনে?
মসলার বাগানে মানুষ আর কত কিনতে যাবে জীবনের ঘ্রাণ?
মানুষ কি জানে সে ঠিক কী আর কাকে ভালোবাসে?
গভীর অসুখ নিয়ে মানুষ তবু এতদিন বেঁচে যায়? হায়।
মানুষকে তোমরা এত দুঃখ দিতে থাকো কেন?
মানুষ কি তোমার চিরকালের পর? অনাত্মীয় ঘোড়া?
মানুষের নামের শেষে তোমরা এত ‘না’ লিখে রেখেছ!
মানুষকে হ্যাঁ বললে কী ক্ষতি?
মানুষকে ছাড়া পৃথিবীর কোনো মুক্তি আছে কি?
মানুষের বাইরে আছে কি কোনো মহৎ মানু্ষ?
কোনো অমানুষকে তোমরা মানবের বাইরে ঠেলে দিতে পারবে?
মানুষের শক্তিকে অবহেলা করা যায় কি?
মানু্ষের স্বপ্ন কখনো পরাস্ত হয়েছে?
মানুষের সাথে পাখির তুলনায় কী প্রকার ভ্রান্তি উদ্ভব হয়?
যাকে মানুষ বলো, তাকে কেন অহেতু ঠেলে ফেলে দাও সর্বনাশের গর্তে?
মানু্ষকে টেনে তুললে বড় কোনো ক্ষতি আছে কি?
মানুষকে ভরসা দিলে কোনো সৌধ ভেঙে পড়ে না।
মানুষের কাছে গিয়ে শেষপর্যন্ত কী হারায় মানুষ?
বানর বা হনুমানের সাথে মানুষকে তুলনা করে কী আনন্দ তোমার?
মানুষের তুল্য মাধুরী আর আছে কোথাও?
মানুষের সমান পরশপাথর দেখেছ কখনো?
কোথায় গেলে পাবে তুমি প্রকৃত মানুষের দেখা?
মানুষের ভেতরটাকে কখনো ছুঁয়ে দেখেছ?
মানুষের আয়নায় একদিন মুখ রেখে দেখো।
মানুষের সমুখে কান্না করে দেখো একবার।
মানুষের কাছে বসে থাকো তুমি।
মানুষকে দূর থেকে কেমন লাগে দেখতে?
মানুষের ভালোবাসা অবাক করে না তোমাকে?
মানুষকে কাছে পেয়ে একবিন্দু শান্তি হয় না?

*

বেণীমাধব যখন কোনো প্রসঙ্গের দিকে তাকায়, তখন প্রসঙ্গটিও তার দিকে তাকিয়ে হাসে।
বেণীমাধব পুকুরে ঢিল ছুড়লে পুকুরটি তার দিকে ঢিল ছোড়ে।
বেণীমাধব আগুন নিয়ে খেলা করার আগেই আগুন তাকে নিয়ে খেলতে শুরু করে।
বেণী জলের ঠিকানা না-জানলেও দিনরাত তার দুটি চোখ ভরে ওঠে, ভেসে যায় জলে।
বেণী আকাশের নিচে বাঁচে না, বরং আকাশ তার মাথার ওপর জেগে থাকে অষ্টপ্রহর।
বেণী উপগ্রহ দেখতে যায় না, উপগ্রহ বেণীকে চোখে-চোখে রাখে।
বেণী গাছের কাছে যায় না, বরং বেণীর ভেতরে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে অজস্র গাছ, ডালপালা।
বেণীর অন্ধকার ভালো লাগে, অন্ধকারও বেণীকে ভালোবেসে জড়িয়ে থাকে, পেরিয়ে যায় দিনরাতের সীমানা।
বেণী সমুদ্রে যায় না, সমুদ্র তার ভেতরে ঢেউয়ের পর ঢেউ তোলে।
বেণীর কোনো নদী নাই আর কিন্তু নদীদের আছে অসংখ্য বেণী।
বেণীর নিজের কোনো ঘর নেই, অনেক ঘর বেণীতে আশ্রয় করে নির্জনতা রচনা করে।
বেণী বৃষ্টি হয়ে ঝরে না, বৃষ্টির শব্দের মধ্যে বেণীকে পাওয়া যায় সাঙ্গীতিক আবহরূপে।
বেণীর আকাশ অনেক বড়, আকাশের বেণীরা আরো মহৎ।
বেণী পাহাড় বুকে নিয়ে ঘুমায়, দুঃখপাহাড়। পাহাড়ের দুঃখ তাদের কোনো বেণী নেই।
বেণী প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করে।
বেণী চিন্তা করে আর অবাক হতে থাকে এই ভেবে যে একটি বর্ষাকালের ভেতর দিয়ে জীবন কিভাবে প্রতীকায়িত হয়।
বেণী জানে না তার নিজের ভেতরে কত আষাঢ়-শ্রাবণ খেলা করে।
বর্ষাকাল শেষ হলে শরৎ আসে আর কাশফুলের ডানায় জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বেণী লতাপাতা ছুঁয়ে দেখা ছাড়া আর কোথাও কোনো অর্থ খুঁজে পায় না।
একটি অনর্থের জীবন বেণীকে আউলা করে তোলে।
যে-জীবন অর্থময়তার আর যে-জীবন নিহিত তাৎপর্যের তার সাথে বেণীর আর দেখা হয় না।
এতকিছু নিয়ে তার ভাবতে বয়ে যায়, কেননা বেণী ঠিকই জানে এক জীবনে মানুষের কতকিছু সয়ে যায়! বেণী এই লৌকিকতার সীমানা পেরিয়ে বাঁচতে চায় অসীম নির্জনতায়।
প্রায় নিঃস্ব বেণীর আছে সাড়ে-সাতশো পুতুল।
পুতুলদের জন্য বেণীর আছে সাড়ে-সাতশো ঘর।
পুতুলের আত্মীয়স্বজনের জন্য আছে সাড়ে-সাতশো কাঠের ঘোড়া।
এই ঘোড়াদের জন্য আছে সাড়ে-সাতশো পালতোলা নৌকা।
ঘোড়াগুলো মাঠে ঘাস খায় আর ভাবে বেণীর মতো একটা জীবন পেলে মন্দ হতো না।
জীবন নিয়ে ভাবতে গেলেই বেণী পেছনে ফিরে যায় আর তার মনে পড়ে ঘোড়দৌড়ের কথা, কিন্তু স্মৃতিগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে, বয়স বাড়ে, মেটাফর হিসেবে একটা শব্দকেই উপযুক্ত মনে হয়, ‘গোধূলি’।
বেণী এই মুহূর্তে যে বইটি পড়ছে তার নাম নীল রূপকথা
বেণী এখন যে গল্পটি পড়ে তার নাম ‘তামার আংটি’।
বেণী এখন যে-গানটি গুনগুন করছে সেটি নিঃসন্দেহে ‘বনমালী গো তুমি’…
বেণীর নিজের কোনো বাগান নেই অথচ সব বাগানে ফুটে আছে অজস্র বেণীমাধব।
বেণী কোথাও যায় না, তবু সবগুলো কবুতর দিনশেষে বেণীর কাছে ফিরে আসে।
বেণী পথ চেনে না, পথ বেণীকে চিনে রাখে।
বেণী ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনতে চায়, ঝিঁঝি পোকারা শুনতে চায় বেণীর জীবনকাহিনি, তার সুর-অসুর।
বেণী জীবনের কাছে নিজেকে সপে দিয়ে বসে আছে, জীবনের দুঃখ বেণীকে তারা পেয়েও পায় না।
বেণীর সেরকম কোনো ব্যস্ততা নেই, ব্যস্ততারা বেণীকে পায়, তাকে অবসর দেয় না একটুও।
বেণী ভাঁটফুলের মধ্যে জোনাকি দেখতে চায়, অথচ জোনাকিরা ঠোঁটে করে নিয়ে আসে অমোঘ ভাঁটফুল। নারকেল গাছের মধ্যে বেণী দেখতে পায় জীবনের মৌতাত, নারকেল গাছ বেণী-বেণী করে হয়রান হয়।
পেঁপেগাছেরা বেণীকে আমন্ত্রণ জানায় কিন্তু বেণী জানে পেঁপেগাছের সঙ্গে জীবন জড়িয়ে কোনো লাভ নেই।
বেণী দেখে পথের ধারে ফুটে আছে সোনালু ফুল। সোনালু ফুলের মতো হলুদ আর হয় না।
জারুল গাছের সাথে বেণীর কোনো সম্পর্ক তৈরি হলো না এতদিনে।
তুঁতগাছগুলো বেণীকে চিনতে পারলেও কোনো সম্বোধন না-করে দাঁড়িয়ে-তাকিয়ে থাকে। এতে কষ্ট পেলেও কিছু করার থাকে না।
একটা মাছরাঙা পাখি উড়ে যেতে-যেতে বেণীর কথা ভাবে, একটা কাঠঠোকরা পাখিও বেণীকে ছো দিয়ে তুলে নিয়ে যেতে চায় রূপকথার দেশে। বেণীও এরচেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবে না। এই জীবন বেণীর মোটেই ভাল্লাগে না। জল আর আকাশ, বৃক্ষ আর বাতাস তাকে আউলা করে দিতে থাকে। কোথাও যায় না বেণী, মনখারাপ নিয়ে বসে থাকে দূর কোনো সর্বনাশের আশায়। সে আশা করে মানুষের ভাগ্য একদিন আরো প্রসন্ন হয়ে উঠবে, মানুষ মানুষকে আরো অনেক ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখবে, মানুষের নিঃশ্বাসের কাছে শুয়ে থাকবে মানুষ, ছুঁয়ে থাকবে তারা পরস্পরের হৃদয়। মানুষ বেণীকে নিয়ে না ভাবলেও বেণী মানুষকে নিয়ে ভাবে।

*

মানুষ আজও তার কাজের প্রতিদান পেল না।
মানুষের সাফল্যে মানুষ কেন যে মুখ ভার করে বসে থাকে।
মানুষ মানুষকে তার যথার্থ সম্মান জানাতে পারল না।
মানুষের কাছে মানুষ আজো একটি অননুমেয় চরিত্র হিসেবে রয়ে গেল।
মানুষ জানল না কিসে মানুষ সুখী হয় সবচেয়ে বেশি।
মানুষ শুনল না কান পেতে মানুষের গভীর বেদনার কথা।
মানুষ বুঝল না কিসে মানুষের ‘সূক্ষ্মতম যন্ত্রণা’ হতে থাকে।
মানুষ দেখল না খেজুর গাছের মতো মানুষের কাঁটার শরীর। যেখানে হাত রাখো, কষ্ট।
মানুষ চিনল না আজো মানুষের কী রূপ।
মানুষ করে গেল জীবনভর শুধু ভেদ-বিভাজন।
মানুষের অন্তরে একটি সুন্দর বসতি আজো রচনা হলো না।
মানুষের জীবনে পাখির অবদান অস্বীকৃত থেকে গেল।
মানুষ করে গেল শুধু মানুষের বদনাম।
মানুষের হাতে হাত রেখে মানুষ বলতে পারল না তার মনের কথাটি।
মানুষ পেরোতে পারল না সঙ্কোচের বিহ্বল মাঠ।
মানুষ উড়তে পারল না তার স্বপ্নের আকাশে।
মানুষ রাতভর স্বপ্নদৌড় দিয়ে সকালে দেখে যে জীবন এক পা এগোয় নি।
মানুষের পায়ের কাছে জীবনভর বসে থেকেও সামান্য করুণা পায় না মানুষ।
মানুষ রয়ে যায় চিরকাল তার নিজস্ব নদীতীরে।
মানুষ শুনতে পায় নদীর স্রোতের সুর আর পাড় ভাঙার শব্দ।
নদী মানুষকে মহান করে কি না বোঝা যায় না, মানুষ নদীকে মহীয়ান করে তার গান-কবিতায়, অনুভবে।
পাহাড়ের কান্না যদি নদী হয়, নদীর কান্নাকে তবে কী নাম ধরে ডাকবে মানুষ?
মানুষই-বা এত কান্নার জল কোত্থেকে পায়?
জংলি ফুলের ঘ্রাণে কোন স্মৃতি ভেসে আসে?
ধানক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ জীবনকে মাড়াই করার স্বপ্ন দেখে?
পাঁচমিশালি শাকের মধ্যে জীবনের কোন রূপটির প্রতিফলন দেখতে পায় মানুষ?
সাতান্নবার কান ধরে ওঠবস করলে কোনো রোগের প্রতিকার পাওয়া যায় কি?
আগুনের দিন কোনোদিন শেষ হবে কি?
বাতাসের কানে কোন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিলে জীবনের যন্ত্রণা লাঘব হতে পারে?
রোমান্টিক অনুভূতি আর নস্টালজিয়ার বাইরে বৃষ্টির আর কোনো প্রায়োগিক দিক নেই?
গাছে ফল দেখলেই ছিঁড়ে খাওয়ার চিন্তা করা কতটা বিবেচনাপ্রসূত?
‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’ হয়ে কী কাজ মানুষের?
মানুষের জীবনে যত জানালা আছে তার মধ্যে গানের অবস্থান কোথায়?
জীবনের বহুরৈখিকতাকে ধারণ করতে পারে এমন মানুষ কই?
একটি বক্ররেখার কাছে মানুষ কতটা ঋণী?
জীবনে প্রথম শাপলা ফুল দেখার অনুভূতি মানুষ কিভাবে সামলে নেয়?
‘গাছে তুলে দিয়ে মই সরানো’র মতো তুচ্ছ ঘটনাকে মানুষ আজীবন মনে রাখে কেন?
মানুষ নিজের হীনতা মেপে দেখেছে কখনো?
মানুষের মনের আগুন নেভাতে চোখের পানি কতটা কার্যকর?
মানুষের কান্নাকে পাখিরা কী চোখে দেখে?
পাখিরা তাদের রবীন্দ্রনাথকে শেষপর্যন্ত কী নামে ডাকে?

*

বেণী এই মুহূর্তে কী করে?
আকাশে হাত-পা ছড়িয়ে বাতাসে সাঁতার কাটে।
এখন তার অবস্থান কোথায়?
দ্বৈতাদ্বৈতের মাঝখানে।
দিব্যজ্ঞান তাকে আর কাবু করে না?
না, দিব্যজ্ঞান তাকে আরো ঋণী করে।
অতীত নিয়ে তার চিন্তা কী প্রকার?
এ-বিষয়ে তার চিন্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। সে মনে করে, অতীত আসলে একপ্রকার ভবিষ্যৎকাল।
বর্ণনার সবটাই কি ভাষা?
না। এতে আছে ঘটনা, সংগীত ও ভালোবাসা।
বেণীর জীবনে সংগীতের কোনো ভূমিকা আছে কি?
বেণীর কোনো সংগীত নেই, তবে সংগীতের আছে ভিন্ন-ভিন্ন বেণীরূপ।
তার দেহ?
সে ছায়ার সন্ধান পায় না কেহ।
এতটা অশরীরী?
না। অনেকটা আলো।
কোনো দিকচিহ্ন নেই?
বেণী সব নিশানা পেরিয়ে যায়।
এত ক্রুরতা মানায় তাকে?
সে তো নদীর ওই পারে থাকে।
কলমি ফুল?
একটা কলমি ফুল দিয়ে জগতের কাছে পৌঁছানো যায় কি না, এরকম এক সম্ভাবনা বেণীকে স্থির থাকতে দেয় না।
শতায়ু বুড়ির কথা মনে আছে?
তার পান খেয়ে মুখ লাল করার দৃশ্য বেণীকে নদীতীরে সূর্যাস্তের কথা মনে করিয়ে দেয়।
হরিণগুলো?
ওরা এখন বাঘ হয়ে যে-বাঘেরা হরিণে রূপান্তরিত হয়েছে তাদের ধাওয়া করে চলেছে।
আর পালতোলা নৌকা?
নৌকাগুলো হাওয়া, খালি পালগুলো বাতাসে ভেসে যাচ্ছে নাবিকদের নিয়ে।
ওখানকার মানুষেরা কেমন?
মানু্ষগুলো শাদাকালো মানুষগুলো নীল/ দূর পাহাড়ে বসে থাকে সাতান্নটি চিল/ মানুষগুলো অলৌকিক মানুষগুলো লাল/ কাশবনেতে বৃষ্টি হলে নাবিক হারায় পাল/
বেণীও কি তবে হারিয়ে ফেলে রাস্তা?
তার তো সেরকম কোনো রাস্তা নেই। বেণী শুধু পেরিয়ে যায় নীল, হারিয়ে যায় নিদানফুলের বনে।
এত মাকড়সায় ঘেরা সেই বন?
হ্যাঁ, মৃত্যুর অনেক আগেই বেণী জেনে যায় মরণের দিনক্ষণ।
এত মৃত্যুচিন্তা কেন?
মৃত্যুচিন্তা কোথায়? সে তার চিন্তাপ্রক্রিয়া নিয়ে ভেবে হয়রান।
কী হবে এত ভল্লুক দিয়ে?
এগুলো তার ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন।
স্বপ্নে কী দেখে সে?
দেখে যে সে স্বপ্ন দেখছে।
এত স্বপ্ন?
হ্যাঁ, অজস্র ঝাউগাছ।
বেণীর স্বপ্নগুলো কেমন?
বেণীর স্বপ্নগুলো বেণীর নিজের মতো।
স্বপ্নের বেণীরা?
স্বপ্নের বেণীরা অন্যরকম।
তারা কি বোঝে জিরাফ কেমন মায়া আর পাহাড় কতটা ছায়া?
বোঝে আবার বোঝে না। কোথাও কিছু সংশয় থাকিয়া যায়।
সমবয়সী গাবগাছকে তারা কী নামে ডাকে?
কোনো নামেই ডাকে না। তারা গাছের কাছে দাঁড়িয়ে পান করে কিছুটা সবুজ আর কতক ছায়া।
ঘুমায় কখন তারা?
ঘুমায় আবার ঘুমায় না। কোথাও কিছুটা ধ্যান থাকিয়া যায়।
জলের অতলে ডুব দেয় তারা?
ডুব দেয় আবার দেয় না।
এতগুলো বেণী একজন বেণীকে কী বলে?
অনেককিছুই বলে আবার কিছু বলে না। কত কথা জীবনে উহ্য থাকিয়া যায়।
এক বেণী অনেক বেণীকে কী উপদেশ দেয়?
উপদেশ কিছু দেয় না। অনেক কথা কান পেতে শোনে আর জানতে চায় কতটা জিরাফ হলে মোক্ষ পাওয়া যায়?
সপুষ্পক উদ্ভিদটি কী বলে?
তার মুখে রা নেই। এদিকে ভেতরে-ভেতরে সে পাকা খেলোয়াড় হয়ে ওঠে।
তার অভিনয়?
পাতায়-পাতায় ঘন সবুজ রং লাগে। অভিনয়ে সে তার ঐতিহ্য বহন করে চলে।
টিয়াপাখিটির মুখ ভার কেন?
এবছর মিথ্যার ফলন ভালো হয় নি। পাকা-পাকা লাল-লাল মিথ ধরে নি গাছে।
কচুগাছে দড়ি বেধে যারা আত্মহত্যা করতে গেছে?
বেণীর পরামর্শ না-শোনায় তাদের কেউই একশোভাগ সফলতা পায় নি।
এক্ষেত্রে খরগোশের দল ও বনবিড়ালদের ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিল কি?
বেণীর কথা না-শুনে এরাও নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত হয়, পরে এক কাঠবিড়ালি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এত অবিশ্বাস আর যন্ত্রণা নিয়ে বেণী কিভাবে বাঁচে?
তার বাঁচামরায় ভেদ নেই কোনো।
যাহা তিপ্পান্ন তাহাই চুয়ান্ন?
যাহা পেঁপেগাছ তাহাই টিয়াপাখি।
শেষ ক্লাসে কাঠঠোকরাদের উপস্থিতি কেমন ছিল?
তিনটি কাঠঠোকরা এসে বাকি তেতাল্লিশটির অভাব বুঝতেই দেয় নি।
এতটা মুখর এই এপ্রিল?
হ্যাঁ, জারুলফুলের তলে এপ্রিল উঠিল জ্বলে।
ওই ফুটো দিয়ে এখনও সূর্যালোক আসে কি?
আসে, তবে তা বেণীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না। এখন তার ব্যস্ততা লাউক্ষেত পরিচর্যা নিয়ে।
কর্ষণ তত্ত্বের কাজ কতটা এগোল?
গালিভার পর্যন্ত।
তারপর?
কাঠঠোকরার দল ছুটি থেকে ফিরলে বাচ্চাদের হ্যালুসিনেশনে বোকাবাক্সের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

*

মানুষ কি শেষপর্যন্ত দুধকলা দিয়ে সাপই পোষে?
মানুষ তার মূল্যবান আয়ু দিয়ে ছেলেখেলা করে গেল?
মনুষ্যত্বের কোন স্তরে গেলে মানুষ মানুষকে দিয়ে বানরখেলা দেখায়?
পানির অপর নাম জীবন এই মিথ মানুষ এখনও বিশ্বাস করে?
বিশ্বাস জিনিসটার ওপর মানুষ আজো আস্থা রেখে বসে আছে?
মানুষের কোনো মর্যাদাবোধ নেই?
মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই এখনই প্রহসনে পরিণত হলে মানুষ আর যাবে কোথায়?
সুন্দর ইমারত আর সৌধ গড়ার নামে মানুষ এসব কী গার্বেজ বানাচ্ছে?
নদীর তলদেশ থেকে মূল্যবান বালুকণা সংগ্রহ করে মানুষ কবে সোনার সংসার তৈরি করবে?
মানুষ তার সবচেয়ে নিকটজনের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট কেন পায়?
মনুষ্য-পৃথিবীর বাইরে আর কোনো এথনোগ্রাফি আছে কি?
কী পরিতাপে মানুষ ভুলে যায় তার অতীত-বর্তমান-আকাশ-পাতাল?
মানুষ কি কোনোদিন বেণীমাধব হতে পারবে না?

মাহবুব অনিন্দ্য

জন্ম ০১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪; পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০০৯ থেকে সেখানেই নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতায়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—
ঘাসফুল অপেরা [চৈতন্য, ২০১৬]
অপার কলিংবেল [বেহুলাবাংলা, ২০১৮]

ই-মেইল : mahbubanindo@gmail.com

Latest posts by মাহবুব অনিন্দ্য (see all)