হোম কবিতা বই থেকে : সঞ্জয় উবাচ

বই থেকে : সঞ্জয় উবাচ

বই থেকে : সঞ্জয় উবাচ
515
0

মুয়িন পারভেজ প্রথম দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর ২য় কবিতার বই সঞ্জয় উবাচ বেরিয়েছে বাতিঘর প্রকাশনা থেকে। এখানে বই থেকে কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করা হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


বিন্তি

ত্রিপুরাপাড়ায় যাবি? চল বিন্তি, দেখে আসি মেলা
এখনও কাটেনি হিম—ফাল্গুনের ক-তারিখ আজ?
টিলার উপর ছোটো মাটির মন্দির, তাকে ঘিরে
পাখিদের মেলা বসে, ফুলেরা ফুল্লরা হয়ে নাচে
দূর থেকে ভেসে আসে আহ্বান—কার যেন গলা
তেমন কেউ তো নেই! নেত্র গেছে শহরে যে কবে
শাকরাম পাড়া ছেড়ে পালিয়েছে কিস্তির জ্বালায়
কোথায় মণীন্দ্র কাকু? দল বেঁধে যায় না শিকারে
কে তবে ডাকছে আজ? কার কণ্ঠ এমন অচেনা?
বিন্তি, চল, দেখে আসি মাইক্রোফোনটা কার হাতে

১১

কেমন শৈশব ছিল আমার মায়ের? আজ তার
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার। বুকে নামে স্তব্ধতার ঢল
ওটি-তে ঢোকার আগে মা আমার করুণ হাসিতে
চেয়েছিল একবার। সামান্য আঙুল কেটে গেলে
ভয় পেয়ে যেত খুব—আর আজ জরায়ুছেদন!
স্বপ্নের ভিতরে শুনি জরায়ুরাত্রির রূপকথা
কোন মহানক্ষত্রের টানে সেই ইশারাদোলনা
অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে ভেঙে দিয়ে এসেছি এখানে?
আমার প্রথম বিশ্ব কেটে নিয়ে আমার হাতেই
তুলে দেবে ওরা; বিন্তি, এ কি হয়? কী ক’রে-বা হয়!

১২

কোথায় সে গেছে, বিন্তি? কোন পথে চ’লে গেছে একা?
দুসপ্তাহ কেটে গেল আজও তার পাইনি উদ্দেশ
কে আমার পায়ে-পায়ে হাঁটবে নিঃশব্দে অকারণ?
হাত বাড়ালেই তার চোখের কারুণ্য ছুঁতে পারি
জানালা কাঁপিয়ে ঢুকে সে দাঁড়াত লেখার টেবিলে
তাকাত আমার দিকে নিরক্ষর আবেগে বিস্ময়ে
বোঝেনি আমার ভাষা, আমিও বুঝিনি তার মন
আমাকে মানুষ ছাড়া হয়তো সে ভাবেনি কিছুই
মানবপিপাসা নিয়ে তবু তার পথ চেয়ে আছি
আমার গেঞ্জিতে আজও লেগে আছে তার শাদা লোম

১৪

দাঁড়িয়ে দেখছে কারা ব্যাগভর্তি তরুণীর লাশ
খাদে উল্টে-পড়া বাস? কঁকিয়ে উঠছে কারা ঘুমে
অনেকদিনের ঘুম ভেঙে কারা তুলেছে মুদ্‌গর
কারা এত স্বপ্নবান ভূগর্ভে জ্যোৎস্না পুঁতে রাখে
কারা-বা নিঃস্বপ্ন ঘোরে সশস্ত্র যুবার ছদ্মবেশে
হল্লা করে গ্রামে-গ্রামে? আমিই আমার খুনি আর
আমিই হাল্লাজ? বিন্তি, তুই কি চিনিস তোর মেঘ
কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে ভাবছে কারা নদী
কাকতাড়ুয়ার চোখে কারা লিখে রাখবে উত্তর:
‘দগ্ধদেহে বেঁচে থেকে হিবিকুশা সনদ চাই না’

১৫

বুদ্ধির ভূমিকা গৌণ, ভেঙে পড়ে কৌটিল্যের চাঁদ
সংবেদে না পাও যদি সম্মোহনে কতটুকু পাবে?
নৈকট্যের সুদূরতা স্পর্শের সৌরভ মনে হয়
অনাত্মীয় ত্বকে; মিথ্যা—তারও আছে বিদ্যানিকেতন
তবু, বিন্তি, তোকে আজ খুঁজে আনি শিকারের ছলে
তোর করতলে যদি অপ্রমেয় শব্দের বঞ্চনা
শকুন্তলা হয়ে ওঠে, অঙ্গুরীয়হীন অন্ধকারে
স্মৃতির লাশের গন্ধে যদি ভারী হয়ে আসে চিঠি
তবে খুলে নিচ্ছি এই বর্ম এই তির এই ভান
একটি হরিণশিশু হাত থেকে ঘাস তুলে নিক

১৬

যে-নদীর জল নেই তার কেন পাড় ভাঙে রাতে
এত ভিড় চারপাশে, কেন এত আগুনের গান
সবাই মাঠের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে, বাতাসের দিকে
নিজেরই মুখচ্ছবি থেকে দূরে। ঝিঁঝিঁর বিলাপে
কাতর যে-শালবন, তার খোঁজ পাবে কি মানুষ
অনেক হেঁটেছি, বিন্তি, চল ওই পুকুরের ধারে
আমরা দুহাত মেলে হারগোজা-ঝোপ হয়ে থাকি
যে-কথার অবসর মেলেনি এখনও, তার মতো
কোনও এক পানকৌড়ি নিজেকে একান্তে পেয়ে সুখে
আমাদের করতলে নিঃশব্দে ঝরিয়ে নেবে জল

 

ইসাবেলা

‘তোমার ঘুমন্ত মুখ কী রহস্যময়, ইসাবেলা!’
বলত সে কতবার, শুনতাম আর হাসতাম
আয়নায় নিজেরেও চিনতে পারি না ঠিকমতো
ঘুমের ভিতরে গায়ে উড়ে আসে যে-দেশের ধুলো
সে তো আমারই দেশ, ডাকে তবু আলাস্কার জল
ঢেউয়ের পর ঢেউ, চকিতে আবছা ভেসে ওঠে
সেই মুখ, ‘ইসাবেলা, শোনো গান যোজনগন্ধার’
আমারই নাম ধ’রে সে কি ডাকে সমুদ্রলীনারে?

এমন মরমব্যথা কোন মুখে কার কাছে কই
আমার উতলা জলে উনুন যে নিভে গেছে, সই!

 

ক্যাসপার

পিছনে হায়েনারা সামনে কাঁঁটাতার
কোথাও পথ নেই পালিয়ে যাওয়ার

সাগরপাড়ে তাই শিশুটি পড়ে আছে
যেন-বা শামুকের বুকের খুব কাছে

এভাবে লাশ দেখে লাশের ছবি তুলে
হাঁটা ও দৌড়ের দৃশ্য গেছি ভুলে

আমার ভিতরেও হয়তো খোঁড়া কেউ
উপুড় পড়ে আছে, গুনছে শুধু ঢেউ

রাখতে ধ’রে আমি পারিনি, ক্যাসপার
তোমার সেই ছবি দৌড়ে যাওয়ার

 

বেঠোফেন

একটি গানের কথা বলছে সবাই

রেলস্টেশনের ধারে
টঙের দোকানের সামনে ঝুঁকে
আগুনদড়িতে সিগারেট ধরাতে গিয়ে
চাইছে কেউ গান

একটি ন্যাংটো ছেলে দৌড়ে এল স্লিপার পেরিয়ে
দেশলাইয়ের মতো ভিজে গেছে তারও চোখ
এত বৃষ্টি কেউ দেখেনি এই পোড়া শহরে
আর এত গানের আকুতি
‘একটি গান, মামা!’

বিছানায় ইস্কুলব্যাগ ফেলে ধপ ক’রে
খুকু বলছে, ‘গান ছাড়ো মা, গান!’

সূর্যাস্তের ভার নিয়ে কুঁজো বুড়োটিও
হেঁটে যাচ্ছে আর পথের ঠোঙা থেকে
খুঁজছে কোনও গান

 

জুলকারনাইন

অচিরেই আসবেন হয়তো-বা ইমাম মেহেদি
কালো পতাকার নিচে দলে-দলে দাঁড়াবে লোকেরা
ধরণী উঠবে কেঁপে হ্রেষাধ্বনি আর অভ্রভেদী
চিৎকারে। রক্তস্রোতে ভেসে যাবে পথ ও প্রশ্নেরা

জেরুজালেমের পথে আসবে ইসার মহাকাল
তার আগে ইয়াজুজ-মাজুজ ছুটবে দিকে-দিকে
আর সেই হন্তারক, চোখকানা নিষ্ঠুর দাজ্জাল
মক্কা ও মদিনা ছাড়া খুঁড়ে নেবে পুরো পৃথিবীকে

এক হাতে অগ্নি তার, অন্য হাতে জলের এস্রাজ
সত্যমিথ্যা ছাড়া যেন নেই আর শস্য পৃথিবীর
এতই সরল যদি ক্রুশবিদ্ধ জীবনের মানে
এবং স্বপ্নও যদি কূটাভাসহীন, তবে আজ
হে জুলকারনাইন, গ’ড়ে দিন একটি প্রাচীর
সমস্ত চৈতন্য, দ্বিধা মাথা কুটে মরুক সেখানে

 

আকিরা কুরোসাওয়া

আজও দস্যু আসে পউষমাসে, ফসল কাটার দিনে
ধানসবজি সবই যে নেয় ন্যায্যদামে কিনে
ওরা জোর করে না

ওরা জোর করে না, বেচাকেনা বড় পরিপাটি
ওজনে নেই কারচুপি, ভাই, মানুষ ওরা খাঁটি
নেই ছলচাতুরী

নেই ছলচাতুরী, বাহাদুরি, কেবল নেশার ঘোরে
একটু গালিগালাজ বা কান ম’লে দেওয়া জোরে
তাই পলে-পলে

তাই পলে-পলে আজ সকলে ওদের আশায় ঘামে
নয়তো ভালো কাপড়-খাবার জোটে না গেরামে
বলি আশল কথা

বলি আশল কথা, এমন প্রথা—দস্যুতা চায় চাষি
বউঝিরাও ভালোবাসে দস্যুরাজের বাঁশি
তবু কয়েকজনে

তবু কয়েকজনে সংগোপনে শহরপথে যাই
দেখেশুনে খুঁজে আনি সপ্ত সামুরাই
ওদের চুল পেকেছে

ওদের চুল পেকেছে, বেড়ে গেছে বয়েস যেন শীতে
দিনে ওরা থাকে মাঠে, রাত্তিরে ছাউনিতে
ওরা ঢাল-তলোয়ার

ওরা ঢাল-তলোয়ার ফেলে এবার কাস্তে হাতে নিয়ে
কালি মেখে ভূত সাজবে শিশুর দলে গিয়ে
ওদের নেই অপমান

ওদের নেই অপমান, নেই পিছুটান; হয়তো-বা চুপ মেরে
খড়ের গাদায় শুয়ে শুয়ে শুনবে, ‘হা রে রে রে’
আজও দস্যু আসে

 

সঞ্জয় উবাচ

পাণ্ডবদের রথ গেছে থানচিতে, চিম্বুকে
ম্রো ভাষার এক পাণ্ডুলিপির মতো পাড়ায়
কুরুরাও গেছে লংগদু থেকে নানিয়ারচর
বড়ইতলির আঁকাবাঁকা পথে বনরূপায়

স্বয়ং শ্রীমতী কালিন্দী রাণী দিয়েছেন চিঠি
হাসিমুখে তাই পথ ছেড়ে দেয় সেপাই-দূত
বাচ্চা হাতির বৃংহিত হয়ে বেজে ওঠে দিন
করাতিরা বনে গান গেয়ে গেয়ে তাড়ায় ভূত

বাঁশকুড়ুলের মতো যেন মন দুর্যোধনের
লাউয়ের খোলে ঝরনার জল করেন পান
রাধামনু-ধনপুদির দুঃখে কাতর শকুনি
শোনেন একাকী চন্দ্রগ্রস্ত ঝিঁঝিঁর তান

কেউ-কেউ গেছে বরকল থেকে লেমুঝিরিপাড়া
বহুদূর থেকে হেঁটে হেঁটে নির্ভরতা আসে
তাঁবু ঘিরে ঘিরে কুয়াশাপরিরা নাচে রাতভর
রক্তশিশির ঝরে না সবুজ পাতায়, ঘাসে

বাণের বদলে বীণ নিয়েছেন কর্ণার্জুন
পাহাড়ে এখন নিবিড় শান্তি, মান্যবর
লোগাং, নাইক্ষ্যংছড়ি আর ভূষণছড়ায়
মহুয়ামাতাল হয়ে আছে সব ধনুর্ধর

মুয়িন পারভেজ

জন্ম ২৬ আগস্ট, ১৯৭৬; পশ্চিম আঁধারমানিক, ভুজপুর, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। পেশায় আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালত।

প্রকাশিত বই—
'মর্গে ও নিসর্গে' [কবিতা; ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০১১]
সঞ্জয় উবাচ [কবিতা; বাতিঘর, ফেব্রুয়ারি ২০১৯]

ই-মেইল : muyinparvez@gmail.com