হোম কবিতা বই থেকে : রাত্রি ও বাঘিনী

বই থেকে : রাত্রি ও বাঘিনী

বই থেকে : রাত্রি ও বাঘিনী
482
0

প্রতিবেশী

মাঠের ওপারে গ্রাম। ভূতে ও মানুষে মিলে সেইখানে আমাদের বাস;
প্রতিবেশী বলে কথা। তদুপরি অমায়িক। দন্তপাটি হাসিতে উজ্জ্বল।

আমাদের সঙ্গে তারা উঠবোস-খানাপিনা-মৌজমাস্তি করে;
তারা থাকে মগডালে।
তেঁতুল-পাকুড়-বট-বদ্দিরাজ গাছে দিনরাত।
আমরা মাটিতে থাকি। এটুকু ফারাক;

তা না হলে আমরাই তারা!

মিলেমিশে থাকি বলে ভূতের বাড়িতে আমরা নিমন্ত্রণ পাই
ভূতের মেয়েরা সব সোমত্থ ও লাজনম্র;
মৃদু হেসে আমাদের আপ্যায়ন করে।

অতীব রূপসী তারা
তাদের হাতের রান্না স্বাদু আর জিভে আনে জল!
হাপুস-হুপুস শব্দে কব্জি ডুবিয়ে আমরা চেটেপুটে খাই।

জর্দাসহ খিলি পান যত্নে সাজিয়ে তারা আমাদের মুখে গুঁজে দ্যায়;

আমরা তাদের চোখে চোখ রেখে বলি
আপনাদের রান্নাবান্না আপনাদের হৃদয়ের মতো!

তাতে তারা গ’লে যায়;
তাদের আয়ত চোখ কৃষ্ণপক্ষ রাতে
হঠাৎ-বিজুলি হ’য়ে রিরংসায় জ্বলে;

আমাদের নেশা ধরে;
তারা আরো ভাণ্ড-ভাণ্ড ঢেলে দ্যায় মদ।

মোরা সৎ প্রতিবেশী
ভূতে ও মানুষে মোরা এইভাবে ওতপ্রোত থাকি


আততায়ী

আমি জানি, আমার প্রস্থানপথ হয়ে থাকবে
শয়তানের পুরীষে আবিল!

স্বপ্নের ভেতরে গিয়ে জিরোবার ছল করে ডাকলে তোমাকে
কান দু’টি ভরে উঠবে প্রতিধ্বনিময় কা-কা রবে;

অথবা, আমার স্বর শুষে নেবে খর মরুবালি;

ঘুমের অশক্ত ডাল ভেঙে যাবে
চোখ দুটি খসে পড়বে নগরের নর্দমার পাঁকে

আমাকে ঘুমন্ত দেখে কালো দাঁড়কাক
অবসিডিয়ান নাইফের মতো তার ঠোঁটজোড়া নিয়ে
আমার মুখের দিকে ঝুঁকে র’বে, চেয়ে র’বে চুপ;

—সারারাত বসে থাকবে শান্ত হয়ে বুকের ওপরে।

আমি এর কিছু জানব না।


গোলাপের জন্ম

[আল মাহমুদ স্মরণে]

ধূলিধূসর এক অচেনা উপত্যকার ঢালুতে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জেগে উঠে দেখি, সহযাত্রীরা আমাকে ফণীমনসার ক্যানোপির নিচে ফেলে রেখে গেছে। বিধবাদের রজঃশোষক ত্যানার মতো নেতিয়ে পড়ে আছি; ভ্রমণক্লান্ত, ক্ষুৎকাতর একা আর নিঃসহায়।

কোন ভাষায় যে কথা বলতাম ‌এখন আর মনে নেই। মাথার উপর মৌমাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে নানান অচেনা ভাষার অবোধগম্য শব্দেরা। চারপাশে ষাঁড়ের শিশ্নের মতো লাল-লাল উঁইঢিবি আর মরীচিকার ঢেউখেলানো কুহক।

জলবিভ্রম নামের এক বিভীষিকা আদ্যন্ত ঘিরে আছে আমাকে। আমার কাতর জিহ্বাকে তা করে তুলেছে আরও তৃষাতুর, বিশুষ্ক-করুণ।

গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে তিনটে আবলুশরং ধাড়ি ইঁদুর পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে; কুতকুতে চোখে তারা আমাকে দেখছে অসীম কৌতুকে। তাদের তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টির চাবুক প্রহার করছে আমাকে। আর এক ভয়াল খড়্গের নিচে রোরুদ্যমান এ-আমার পিগমি-দেহ। তাতে একে একে গজিয়ে উঠছে উপদংশের কষগড়ানো বীভৎস লাল ক্ষত।

এখানে এই ক্যাকটাস-কলোনিজুড়ে মুহুর্মুহু অজস্র রঙের বিস্ফোরণ। ঈশানে ফণীমনসার উদ্যত বিভীষিকা। নৈর্ঋতে কর্কট ব্যাধি আর নৈঃশব্দ্যের লাল তর্জনী। এরই নিচে চুপসে যাওয়া স্তনের মতো বয়ে চলেছে আবছা এক ক্ষীণতোয়া নদী।

আকাশের গোপন কৌটা থেকে আলগোছে আবির চুরি করে অস্তাচল-কিনারে বসে একমনে নিজেকে রাঙাচ্ছে এক একচক্ষু দানব; একসময় সে তার প্রকাণ্ড লাল চোখটি টুপ্ করে ফেলে দেবে পশ্চিমের পার্পল মেঘের নিচে; কাল আবার একে সে কুড়িয়ে নেবে উদয়-প্রহরে।

তার বিষণ্ন অক্ষিগোলকে বাক্য ও মনের অতীত এক সন্ধ্যা নামল ধীরে; এর ভেতরের নৈঃশব্দ্য যেন কুণ্ডলি পাকানো এক র‌্যাটল স্নেক। এই ভাঁজময়, এই বল্মীকূটময় বক্র উপত্যকার নিচে অজগরের মতো নিঃশব্দে নড়ে উঠছে এক আলকাতরার নদী। যার নাম রাত্রি।

এসবের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে ভুলে গেছি সঙ্গীদের মুখ। কানে কেবল পতঙ্গের অস্ফুট পাখার শব্দ; খদ্যোতের নেভা আর জ্বলা এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলেছে রাত্রিকে। উপরে নিকষ কালো গালিচাটাও কোন ফাঁকে চলে গেছে এদের দখলে; আদ্যন্ত আলকাতরা-মলিন আর ফসফরাস-ঝলকিত, আদি-অন্তহীন, অগ্রপশ্চাৎহীন সেই অনন্ত গালিচা।

আর কিছু নয়; কেবলই মনে পড়ছে তোমার হারিয়ে ফেলা মুখের ডৌল আর টোলপড়া গালে মদির হাসি। তাতে ফলে আছে তিলের সৌরভ; তাতে স্বেদকণা জমে হয়ে উঠেছে নিঃশব্দে-গড়িয়ে-চলা এক নদী!

চিবুক থেকে গ্রীবা, গ্রীবা থেকে স্তনের উপত্যকার দিকে ক্রমধাবমান সেই ধারা। দু’পাশে ঈষৎ আনত লাবণ্যের দুটি চূড়া; চূড়াশীর্ষে কেউ সযত্নে বসিয়ে দিয়েছে দুটি রসে ভরা জামফল। যা অতিশয় স্বাদু আর আমন্ত্রণময়; আর তা ভবিষ্যকালের ইশারামণ্ডিত; আর তা কামনামদির।

কিন্তু সে-দুটি বাসনারক্তিম, সুপক্ক জামফল চিরকালই থেকে যাবে সাধারণের নাগালের বাইরে;

যে চায় সে পায় না; যে চায় না, সে শুধু পায়!

দ্যাখো, তোমার স্মরণে আমার লোমকূপে জেগে উঠছে অসংখ্য গুজপিম্পল। চেনা ভাষার কোনো শব্দ উচ্চারণে অপারগ আমি। এখন আমাকে ঘিরে ধরেছে ভাষাহীনতার নৈকষ্যকুলীন অরব অন্ধকার। কিন্তু ঈষৎ ঝুঁকে থাকা এ-দুটি তসবিদানায় চুম্বন করবার পর আমি আবার উচ্চারণ করতে পারছি তোমার নাম।

কেবল তোমার নাম!
কেবল তোমার নাম!!
কেবল তোমার নাম!!!

যতোবার উচ্চারণ করছি, ততোবার মাটি থেকে পাক খেতে খেতে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে এক লাল ঘূর্ণি। তোমার নামে স্যালুটের ভঙ্গিতে স্থির হচ্ছে নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর বিস্তীর্ণ ভাটিবাংলার সবক’টি গোপাটঘেঁষা জঙ্গলে নৃত্যরত দইগলের লেজ।

দোয়েলকে আমি আবার ডাকতে শুরু করেছি ‘দইগল’!

মগরা, খোয়াই, ডিঙাপোঁতা আর ধনুগাঙের ওপর থমকে থাকা মেঘের কুচি থেকে তোমার জন্যে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য অদৃশ্য পাপড়ির লাবণ্যসংকাশ।

আল মাহমুদ,

আমাদের বিস্মৃতির ধুলা সরিয়ে একদিন মৃত্যু নামের কালসর্পের ফণার উপরে উড়ে এসে বসবে এক প্রজাপতি। যার অপর নাম প্রেম।

এভাবেই উপদংশের ক্ষত থেকে প্রতি ভোরে জন্ম নেবে শতশত আশ্চর্য গোলাপ!


রাইতের নীল ডহরে

[শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্য]

আমারে তুইলা নায়ে রাইতে কারা লয়া যায় বিলে?
তেনাদের খোমাটোমা নাই। চউখ-মুখ নাই।

মুখের বদলে দেখি, শাদা কাপড়ের তিনখান ত্যানা
লড়েচড়ে আলগা বাতাসে। আর, আজগুবি নাও
নীল ডহরের জলে চেলচেলায়া-কলকলায়া চলে।

খাগড়ার আড়ালে এক কুড়া পাখি লেঞ্জা উঁচায়া কারে ডাকে?
ছররা গুলির লাহান বেবাক মাছেরা দেখি
লাফায়া-ছিটকায়া যায় দূরে;

পশ্চিমে জাঙ্গাল আর দক্ষিণে গোপাট;

বুগলে বাইদের জলে গোপনে সিনান করে
লেংটা চান্দের গোল খুবসুরত খোমা;

এইসব তেলেসমাতি দেইখা ভাবি:
আমি ক্যান এইখানে আইজ?

হুমুন্দির পোলারা ক্যান মাঝ রাইতে
তুইলা আনলো এই নীল ডহরে আমারে?

পথভুলাইন্যা কানাঅলা? পরিটরি নাকি এরা পেরতের দল?

শইল্যে হাতায় কেডা? অজাগায়-বেজাগায়
লড়ে কার হাত আর খবিস আঙ্গুল?

ডর পায়া বোবা হয়া মিচকা মাইরা থাকি আমি চুপ!

আখেরে মালুম হয়: এইটা হৈল রাইতের লিলুয়া বাতাস;
এই চান্নিরাইত, এই ফুরফুরা মিহিন বাতাসে কতশত
কাঁইপা ওঠে সরালির-মরালীর ছতরের উদলা পশম।

জলের কৈতরগুলা পাঙ্খা নাড়ে বৈতলের মতো;
পাঙ্খার আওয়াজে তারা ভইরা তোলে সাত আসমান।

কি কারণে কালবাউস, তিতপুঁটি, খইলসা-কই, উগোল-মাগুর
পানি থিকা ফাল মারে। মিশ্যা যায় পানিতে আবার!

শরতের চান্নি রাইতে মাছগুলা কী কারণে হৈল বেচইন?

মাছ দেইখা আহে উদ, আহে গুই গাতুম-গুতুম;
আহে ফেউ একলা আর দল বাইন্ধা খাটাশের দল

গর্ত থিকা হুক্কা-হুয়া খেঁকশিয়াল লাঙ্গুল উঁচায়া খেমটা নাচে!

ঘুরায়া-বেঁকায়া ঘাড় পেঁচা চায়া দ্যাখে;
কড়ুই গাছের উপ্রে বইসা এক ভেটেরান চিল
মাথার ভিত্রে তার আঁকতে আছে
প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইকের ভয়ানক ছক;

তারা য্যান অন্য কোনো মহাভারতের যুদ্ধের ভিতর থিকা
জন্ম লইতে থাকে ধীরে ধীরে; জন্ম লইতে লইতে নিজেগোর
বেশুমার আগামী যুদ্ধের ভিত্রে বইসা ধীরে নিশানা সাজায়;

অর্জুনের তীর হয়া, অব্যর্থ আয়ুধ হয়া, কিরাতের বাঁকনল হয়া
শানদার ঠোঁটে-নখে কখন যে নাইমা আসবে তারা
ফাল-পাড়া মাছেদের ঝাঁকে আচানক!

অহনে অনেক রাইত। একলা আমি তেনাদের লগে
নাও-ভাসা হয়া চলি। কই যাই কোন দিকে কিছুই জানি না

জানি এই আজিব রাইতের ভিত্রে আছে আরো রাইত;
আমার ভিত্রে আরো কতো-কতো আমি
বাইদের ভিত্রে আরো কতশত বাইদ রয়া যায়!

নাই শুরু নাই শেষ। এক আলাহিদা শুরু ও শেষের ভিত্রে আমি;
একা আর শতশত আমি। শতশত বিলে-বাইদে
শতশত হাওরে-সায়রে আমি শতশত ‘আমি’ হয়া ভাসি।

সেইসব নায়ে মাঝি নাই। আমি আর আমার বুগুলে তিনজন;

তেনাদের খোমাটোমা কিছু নাই। চউখ-মুখ নাই

মুখের বদলে দেখি, শাদা কাপড়ের
তিনখান ত্যানা খালি লড়েচড়ে আলগা বাতাসে!


প্রকৃতি ও মেশিনের ধক্

এতো শীত! এতো তীব্র শীত!
মেশিনও ঘুমিয়ে আছে কাত হয়ে ধানের জমিতে
রাত্রে এসে পেডাল ঘোরায় কেউ! গেরস্থ বা চোর!
তূর্ণগতি কুয়াশায় ভড়কে গেছে লাজুক মেশিন।

বিশ্বাস না হলে তাকে দেখে এসো
যেকোনো গঞ্জের পাশে লেংটা মাঠে, খালপাড়ে, গ্রামে
দাঁতকপাটি লেগে তার দফারফা আজ নিয়ে টানা পাঁচ দিন!

পড়ে আছে লবেজান
ক্রোধে-অন্ধ সহিসের হিমশীতল চাবুকের ঘায়ে
শীতের দৈত্যের হাতে গদা আর মুষল-প্রহারে!

জরদ্গব বৃদ্ধ যেন। নিরুত্তেজ
মেশিন জাগে না আর এই তীব্র শীতে।
ঘুমিয়েছে চিরতরে। কিংবা তার প্রত্যঙ্গ অসাড়।

এসময় দ্যাখো দ্যাখো
ঘুংড়িকাশি দিয়ে জাগছে পরমা ও প্রকৃতি-মেশিন।
জ্বালানি, পেট্রোল, তেল, টনিক-ফনিক তার এসবের কিছুই লাগে না


মানুষের উপাখ্যান

১.
তোমার উদ্দেশে আমি বহুস্তর বুলাভা মিসাইল
স্বপ্নে নয়, ঘুমে পাঠালাম
অন্তরীক্ষে বায়ুসেনা
শত্রুতার মোহে কতো র‌্যাপ্টর-সুখোই বিমান

২.
মানুষ নিজের কাছে হয়ে যায় পর!
আস্তিনে ছুরিকা নিয়ে। মর্মমূলে আত্মঘাত নিয়ে।

৩.
মানুষেরা আপন খুলিতে আজ যাচ্ঞা করে লোহুর শরাব;
নিজেই নিজের লেজ গিলে খায় আত্মগর্বী সাপ;
শরীর পেঁচিয়ে মরে। শরীর পেঁচিয়ে শুধু মারে;

৪.
মানুষের চিন্তা, প্রেম, স্নেহ ও ঘৃণার মর্মে
ওঁত পেতে থাকে বুমেরাং;
দূষণমেঘের নিচে অবিশ্রাম কার্বনে কার্বনে
মেদুসার-মনসার-হাইড্রার সকুণ্ডল নড়ে ওঠে সাপ

৫.
লিথিজলে রাত্রি নামে। বিস্মরণ! তরী যায় ডুবে!

৬.
মানুষ চাইছে শুধু জতুগৃহ, যুদ্ধ, হ্রেষা, রক্তহোলি, খুলি আর জয়।
—মধুমেহরোগীগণ যে নিয়মে ইনসুলিন চায়;

৭.
হালাকু-চেঙ্গিস আজও ঘরে ঘরে কাটামুণ্ডু
ঘরে ঘরে ঈর্ষা-মদ উপহার হিসেবে পাঠায়;
সোনার থালায় ভরে, রুপার থালায় ভরে প্রেমের মোড়কে

৮.
চুম্বনের ছদ্মবেশে মানুষেরা মানুষীকে পাঠায় ছোবল

৯.
মহাশয়গণ শুধু শংসা চায়, দর্প চায়
করতল লাল করে কুরুক্ষেত্রে দামামা বাজায়;

১০.
মূর্খ ও গরিব লোক সামান্য তণ্ডুল পেতে
করতালি দ্যায় কিংবা বাধ্য হয় দিতে;
মূর্খ ও গরিব লোক আজীবন মুগ্ধ থাকে রঙিন ফানুসে

১১.
ভয়ে কাঁপে বসুমতি। মনুষ্য-প্রেতের লোল জিভ;
গর্জে ওঠে ধর্মাধর্ম, শকুনির হাসি আর হিংসার কামান
মানুষের খিড়কিপথে মানুষ পাঠাতে থাকে সংখ্যাহীন রণ-বায়ুযান
নখ-দন্ত-ভল্ল-তূণে মৃত্যুগামী মনুষ্যউত্থান

১২.
কৃমিভরা পেট নিয়ে দরিদ্র লোকেরা সব নিরুপায় ক্রোধে
মনুষ্যজাতির মুখে করে চলে অনন্ত পেচ্ছাপ


সিঁড়িঘর

চেয়েছিলে তীব্র রতি। সিঁড়িঘরে হঠাৎ বিকেলে!
লাল লাল চোখে ঈর্ষা। জ্বলে ওঠে যেন দাবানল;

উটকো লোকের দল। কট্‌মট্‌ কেন যে তাকায়!
তৃতীয় বিশ্বের হ্যাপা! আঁতিপাতি পেছনে কুকুর;

কেউ যদি দেখে ফ্যালে, পায় রতি-কুসুমের ঘ্রাণ?
নির্ঘাৎ ঝামেলা হবে। বিকেলের অপার্থিব আলো
সে-ও ঝানু গুপ্তচর। সঙ্গে নিয়ে বেয়াড়া বাতাস
আল্‌টপকা ঢুকে যাবে ঘরে।—তাই, আসঙ্গলিপ্সার
মৃত্যু হবে। নারীমাছগুলি ভয়ে ভুলবে সাঁতার

তার চে’ বরং চলো, ভান করি মোরা প্লেটোনিক
নিষ্কাম যক্ষের মতো লিবিডো পাহারা দিয়ে চলি;

দ্বীপান্তর? প্রেম-নাস্তি?—চারপাশে এতো যে শ্বাপদ!
এতো যে বন্দুক-চাকু-বল্লমের এতো আয়োজন!

অধর, স্তনের শোভা, লোল হাস্য, মদির ভ্রূকুটি
পুরুষের বগলের ঘ্রাণ, পেশি, চুমুর গোলাপ
রতি-মধুরতা ভুলে অপরের মর্জিমতো বাঁচো।

অলক্ষ্যে ও অনাদরে স্তন-ডালিমের বোঁটা ঝরে যাবে;
ফ্যাকাশে ও নীল হবে। অরব মরুভূ শুধু ধু-ধু
মরীচিকাময় এক অতল গহ্বর মেলে র’বে

আমার উত্থান বৃথা! ব্যর্থ রতি! তোমারও করুণ
চোখের লেগুনে ক্রমে কাত হ’য়ে তরী ডুবে যাবে

এইভাবে দিন যাবে। মুখ ভরে জমে উঠবে ছাই ;
ছেঁড়াখোড়া মন নিয়ে এইভাবে অবিরাম হেঁটে
তুমি-আমি একটু-একটু ঝুঁকে পড়বো হাঁ-মুখ কবরে

আমরা অতৃপ্ত আত্মা। আমাদের নীল দীর্ঘশ্বাস
কুকুরের বন্ধ চোখে সারারাত শিশির ঝরাবে


রাত্রি ও বাঘিনী

বাঘিনী আমাকে শুধু ডেকে চলে ভরা পূর্ণিমায়;

বারবার কাতর মিনতি করে আমি তারে বলি:
দয়া করো, আমাকে খেয়ো না, আমি
অসহায় অতি ছোটো জীব

বাঘিনী করুণা করে; আমাকে থাবায় পুরে কী ভেবে
ঘুমিয়ে পড়ে। এ-সুযোগে আমি তার মুঠো গলে নামি

বুকে হেঁটে হেঁটে তার গর্জনের সীমানা পেরোই;
সন্তর্পণে ঢুকি পড়ি বনপ্রান্তে, পরিত্যক্ত ঘুমের গুহায়

ভাবি, বাঁচা গেল! ভাবি, আমাকে পাবে না আর তার
দাঁত-নখ, অত্যধিক প্রেমের আঁচড়।

অবশেষে এ-গর্ভগৃহের ছায়ায় বসে আমি নিরাপদ!

থ্যাঁতলানো অণ্ড-শিশ্ন, কালশিটে ঊরু ও জঘন আর
এই দুটি রক্তমাখা ঠোঁটে বিশল্যকরণী ঘষে
ফিরে পাবো অনাঘ্রাত আমাকে আবার

আমাকে পাবে না আর বাঘিনীর অতিরিক্ত রতি-আক্রমণ!

কিন্তু হায়, প্রতিবারই স্বপ্নে বাঘিনী তবু পিছু নেয়;
তীব্র চোখে ফসফরাস জ্বেলে
এক লাফে সীমান্তের নদীটি পেরিয়ে
অতর্কিতে সামনে আসে; ভয়ানক দু-পায়ে দাঁড়ায়, আর
দু’বাহু বাড়িয়ে তার সে আমাকে কোলে তুলে নেয়;

ধীরে-ধীরে চুমু খায়, ঠোঁটে ও গলায় তার দাঁত-নখ গেঁথে রক্ত চাটে
বেপরোয়া জ্বালামুখে আমাকে পুড়িয়ে শুধু কাবাব বানায়

শেষ রাতে মাতাল চাঁদের নিচে অ্যাম্বুলেন্স এসে
আমাকে উদ্ধার ক’রে  দ্রুত কোনো হাসপাতালে ছোটে

(482)

জুয়েল মাজহার