হোম কবিতা বই থেকে : ‘তাঁবুকাব্য’র দশটি কবিতা

বই থেকে : ‘তাঁবুকাব্য’র দশটি কবিতা

বই থেকে : ‘তাঁবুকাব্য’র দশটি কবিতা
184
0

প্রথম দশকের মেধাদীপ্ত কবি তুষার কবির এবার অমর একুশে বইমেলায় এনেছে তার বারোতম কবিতার বই তাঁবুকাব্য। বইটি প্রকাশ করেছে অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। এ বই প্রসঙ্গে তুষার কবির জানান—তাঁবুকাব্য বইটিতে পাঠক পৌঁছে যাবেন আরণ্যিক চিত্রকল্পের এক কুহকলাগা ভুবনে—সম্মোহিত হবেন চিত্রকল্পের জ্যোতির্ময় আলোকছটায়—বইটি খুলে দিবে একটার পর একটা ইন্দ্রিয়সমূহের দরজা!

একুশের গ্রন্থমেলায় তাঁবুকাব্য বইটি পাওয়া যাবে অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানির ৫৮৮ নম্বর স্টলে।


জঙ্গলে

জঙ্গলের তৃণপথে হেঁটে যাই বিকেলের শেষ রোদে। পুরনো ছাতিম গাছে নিকেল ঘণ্টির সাইকেল খানিক হেলান দিয়ে রেখে আমি হেঁটে যাই জেগে ওঠা ঘাসের জঙ্গলে। কোত্থেকে যেনবা ভেসে আসে শুধু ময়ূরীর মনোলগ—তার মৃদু পাখসাটে মৃদঙ্গ বাজে ধীর লয়ে! কোথাওবা সুর ওঠে দরবার-ই-কানাড়ার; কান পেতে আমি শুনে যাই বাগ্‌দেবীর কড়া নাড়া! জঙ্গলের কিছুটা ভেতরে গিয়ে দেখি এক ঘুমঘোর সরোবর—যার ছেঁড়া ছেঁড়া পদ্মের কোরকে বেজে ওঠে দূরের সরোদ! টোপাজ পাথর জ্বলে চকমকি রোদে—ফুঁসে ওঠা সাপের ফণার নিচে; তার জ্যোতির দ্যুতিতে আমি মিশে যেতে থাকি হাওয়া ও হরিদ্রায়! এ জঙ্গলেই আমি লিখে যাচ্ছি দ্যাখো ধূলিতে মোড়ানো প্রেমগাথা, রক্তের হরফে লেখা ভাঁজপত্র আর ছড়ানো পথের নোটবুক!


জঙ্গলে বেড়াতে এলে

জঙ্গলে বেড়াতে এলে আমি আসলে তোমার শরীরেই
নিঃশব্দে ভ্রমণ করি!

জঙ্গলের বুকঝিম পথে হেঁটে গিয়ে
আমি খুঁজে পাই দূরের ছড়ানো ভাঁটফুল
পাতাঝরা আমলকীবন—
কোথাও যেনবা ভেসে আসে তিতিরের ডাক
ঝোপ থেকে উঠে আসে ময়ূরীর মনোলগ
আর জলডাহুকীর গান—

জঙ্গলে বেড়াতে এসে তোমার শরীর জুড়ে লেখা হতে থাকে
আরণ্যিক নোটবুক!

জঙ্গলের কিছুটা দূরে তাঁবুর ভেতর থেকে
উঠে আসে হাল্কা পালক, শালপাতা, ঘুমহরিণীর চোখ—
আরো দূরে কালো জিপ, পোড়া ডিজেলের ঘ্রাণ,
ছায়া ও ছাতিমতলায় ডুবে যায়
হাওয়া হ্রেষার গান—

জঙ্গলে বেড়ানো মানে তোমার শরীরের অরণ্যের ভেতর
নিঃশব্দে হেঁটে যাওয়া!


জঙ্গল ও তাঁবু

তোমাকে আগেও আমি বলেছি প্রেমের জন্যে আমার একটা নিঝুম জঙ্গল চাই! অথবা প্রেমের জন্যে আমার একটা নিঃশব্দ রিসোর্ট চাই! কমপক্ষে আমার একটা সুনসান তাঁবু চাই!

অথচ তোমার পাশে বসতেই কোত্থেকে যেনবা কিছু ছায়াশরীর এসে জুড়ে যায়—তারা আচমকা ঘিরে ধরে আমাদের—তাদের চোখের লেন্স ধরে ফেলে রেস্তোরাঁর আলোআঁধারিতে হাত ধরে বসে থাকা আমাদের!

জঙ্গলের গহিন ভিতরে একটা তাঁবুর জন্যে অপেক্ষা করছে আমাদের প্রেম!


হ্রদে, হাওয়ায়

তাঁবুর ওধারে আছে এক নম্র ছোট হ্রদ। ঠান্ডা জলাশয়। ভোরে হেঁটে যাই সেই সুপেয় হ্রদের দিকে। ঝিরঝিরে হাওয়ায়। কোত্থেকে যেনবা উড়ে আসে হাজার হাজার পাখি। ফ্লেমিংগো পাখির ঝাঁক। দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে কমলা রঙের আভা তারা উড়ে যেতে থাকে পরিযায়ী পেলব ডানায়। হ্রদের সুপেয় জল পান করে আমার আকাশে উড়ে যেতে ইচ্ছে হলো ঝাঁক ঝাঁক ফ্লেমিংগো পাখির সাথে! কিছুক্ষণ আমি তাদের সাথেই মিশে যেতে লাগলাম। নিজেকে হালকা এক পালকের ওম মনে হতেই যেনবা সম্বিৎ ফিরে এল। এতক্ষণ তাহলে স্বপ্নের মাঝে ডুবেছিলাম! এইতো তাঁবুর ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে কমলা রঙের এক ফালি রোদ!


মাদল

দূরের মাদল সুরে দ্যাখো ফিরে আসে রাতের অপেরা!

বাঈজির ছেঁড়া ছেঁড়া জরির কাঁচুলি ঘিরে জেগে ওঠে মহুয়া মাদক নাচ। মল্লিকা অপেরা থেকে এক পিয়ন আমাকে আজ মুঠোভরা রঙিন টিকিট দিয়ে গেছে!

এ শরতে অপেরায় তুমুল বাঈজি নাচ হবে; দ্যাখো নটীর নাটাই ঘোরে জমিদার বাড়ির পুরনো ছাদে।

এ শারদ সন্ধ্যায় এসো, মাদলের সুরে সুরে হাত ধরে নাচি, রাত জেগে অপেরায় চোখ খুলে বাঁচি!


বর্ষাভ্রম

ঘুম দুপুরে উঠছে জেগে ধূম্র স্মৃতি
ঝুম বর্ষায় আবার তুমি পড়লে এসে—
মেঘের মেয়ে আঁকছে দ্যাখো সরস্বতী
জলের বুকে জাগছে ভূমি রাস্তা ঘেঁষে।

ঠান্ডা হাওয়া ঝাপটা মারে বজ্র চেরা
ঢেউ তোমাকে দেয় ডুবিয়ে আস্তে করে—
নদীর তীরে হাঁটছ তুমি রাত্রি ছেঁড়া
জলের সিঁড়ি ভাঙছি আমি ভগ্ন সুরে।

ভুল বেহালা বাজছে বুকে শব্দ যতি
ঝুল বারান্দা ভিজছে শুধু দুঃখক্রমে—
প্রেমের খাতা খুলেই দেখি আস্ত ক্ষতি
লিখছি তাই জলের গাথা বর্ষাভ্রমে।


পিয়ানো

প্রেমের কথাই যদি বলো তবে একবার গানঘরে ঘুরে আসো!

বাইরে তুমুল বৃষ্টি আর রেস্তোরাঁয় বাজছে একটানা মেঘের পিয়ানো! এখানে চায়ের কাপে প্রেমিকাদের ঠোঁটের দাগ লেগে যায়! এখানে বৃষ্টির শব্দে প্রেমিকাদের নতুন শেমিজ ভিজে যায়!

কোনো এক প্রেমিক কবিকে দ্যাখো, সে ভুলে গেছে তার শেষ স্বরগ্রাম—সে হারিয়ে ফেলেছে তার নোটবুক—বৃষ্টিভেজা জলের লিরিক!

প্রেমের কথাই যদি ভাবো তবে একবার পিয়ানোর ঘুমসুরে নেচে ওঠো!


ক্যাফে বর্ষা

বৃষ্টির মাতাল শব্দ এ রেস্তোরাঁয় গান হয়ে বাজে! ধোঁয়াওড়া কফি পেয়ালায় এ রেস্তোরাঁ মেঘের ঘুঙুরে নাচে। কামিনী ফুলের ঘ্রাণে সন্ধ্যার আলোআঁধারে প্রেমিকারা এ রেস্তোরাঁয় সুনসান বসে থাকে। পিয়ানোর টুংটাং সুরে তাদের হৃদয় ডুবে যায় কাচঘেরা জলের প্রপাতে। জানালায় জলের প্রিজম কণা তাদের আঙুলে বিভোর বেহালা হয়ে কাঁদে। বৃষ্টির মাতাল শব্দে এ রেস্তোরাঁয় জলের লিরিক শুধু বাজে!


নাবিক ও গণিকা

যে নাবিকেরা নতুন নতুন গণিকার খোঁজে নেমে যেত গন্তব্যে পৌঁছার আগেই কোনো আলোআঁধারিময় বন্দরে—দ্যাখো তারা আজ লাল পেনশন বই আর খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে জবুথবু হেঁটে যাচ্ছে এক সস্তা সরাইখানার পাশ ঘেঁষে!

শহরের যেকোনো প্রাচীন কয়েদিঘরেও ঠাঁই হতে পারত তাদের—অথচ তাদের মাথাভর্তি সমুদ্রের শব্দ আর তেল চিটচিটে অন্তর্বাসের ঘ্রাণ!

মাঝরাতে কতিপয় কয়েদি নাবিক হেঁটে যায়—জাহাজের সাইরেনে চাপা পড়ে যায় পাপ ও পতনের দাগ!


সমুদ্র ও সরাইখানা

মাঝরাতে সমুদ্র আর সরাইখানাকে আমার কাছে একই বলে মনে হয়—একই রকম কলরব, একই রকম গান ও ঘ্রাণ, একই রকম ঢেউ! সমুদ্রের উপচানো ফেনাকে মনে হয় গেলাসে গেলাসে জমা তরল আরক!

এক সমুদ্রসারস ধীর লয়ে ডানা মেলে উড়ে যায় মাস্তুলের ফুঁসে ওঠা গ্রীবা চিরে—নীল জলরাশি ছুঁয়ে তার শঙ্খঘ্রাণ যেনবা আছড়ে পড়ে মর্চে পড়া ডকইয়ার্ডের তীরে!

বাইরে সৈকত থেকে কিছুটা দূরেই এক সহিস আমার জন্যে অপেক্ষা করছে তার রোমশ শ্বেতাভ ঘোড়া নিয়ে—সে আমাকে পৌঁছে দিবে লন্ঠন জ্বালানো এক পানশালায়—যেখানে কৃস্‌টাল লবণের ঘ্রাণে আর স্ফটিক নারীর শাদা অন্তর্বাসে মাঝরাতে ভেসে বেড়ায় শুধু সমুদ্রের স্রোতকান্না!

তুষার কবির

জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬। এম.বি.এ. (মেজর ইন মার্কেটিং), সম্মানসহ স্নাতকোত্তর (ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কাব্যগ্রন্থ—

বাগ্দেবী আমার দরজায় (২০০৬)
মেঘের পিয়ানো (২০০৭)
ছাপচিত্রে প্রজাপতি (২০০৮)
যোগিনীর ডেরা (২০০৯)
উড়ে যাচ্ছে প্রেমপাণ্ডুলিপি (২০১০)
কুহক বেহালা (২০১২)
রক্তকোরকের ওম (২০১৪)
ঘুঙুর ছড়ানো ঘুম (২০১৫)
তিয়াসার তৃণলিপি (২০১৬)
হাওয়াহরিৎ গান (২০১৭)
ধূলি সারগাম (২০১৮)

কবিতা-বিষয়ক প্রবন্ধ—
কুঠুরির স্বর (২০১৬)

সম্মাননা—

‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৬’
‘দেশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৫’

ই-মেইল : tusharkabir100@gmail.com