হোম কবিতা বই থেকে : জলে ডোবা চাঁদ

বই থেকে : জলে ডোবা চাঁদ

বই থেকে : জলে ডোবা চাঁদ
790
0

ইতিহাসের শেষ রাত্রিতে

তুমি বর্তমানের
আমি ভবিষ্যতের
তুমি অতীতের
আমি বর্তমানের
আগস্ট  মাসের তীব্র গরম
জানালায় মাধবীলতা
সময় আজ উড়ন্তচাকি
শ্যাওলায় ঢাকা আস্তরণ
সব খুলে হয়েছে উন্মন
কত ময়দান লোকে সয়লাব
রক্তের ধারায় ভেসে যাচ্ছে বিছানা-বালিশ
সাঁতরে পার হও পুলসিরাত
মৃত্যু তবু পিছু ধাওয়া করে
অমোঘ নিয়তির মতো
ফাল্গুনের শেষ রাতে ঝরে পড়ে বিষ ফুল
তুমিও একভাবে গেয়ে যাও গান
শত-সহস্র  লোকের ভিড়ে
কেটে চলো হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, সুন্দরবন
মনে গাথা মানবলিপি
চোখে অশ্রুর ঘনঘটা
বর্তমান ঢুকে যাচ্ছে অতীতের গহ্বরে
তুমি আমি সকলে
এইসব ছুরি, কাঁচি, বন্দুকের গুলি
যা কিছু বিদীর্ণ করল পাঁজরের হাড়
একদিন শোভা পাবে জাদুঘরের দেয়ালে—
মগজের খুলি ফুটো হয়ে ঝরছে আকাশে
চোখ আজ শুষ্ক
চোখে আগুন, বারুদের হাতছানি
তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে পাতালে
তুমিও সবুজ ঘাস হয়ে মেলছ আকাশ
ইতিহাসের শেষ রাত্রিতে।


জলে ডোবা চাঁদ
 

১.
গোধূলি ম্লান হয়ে আসছে
ইঁদুরেরা গর্তে লুকাল
সব পাখি, সরীসৃপ
বাড়িতে বাড়িতে বিজলি বাতি
চাঁদ আজ আকাশ জুড়ে
ছাদের ব্যালকনিতে নয়নতারা
তোমার মন আজ  বিষণ্ন
চায়ে ডুবিয়ে নোনতা বিস্কুট
খাঁচার পাখিরা কিচির-মিচির ডাকছে
চাঁদ ডুবে গেল
জলে ডোবা চাঁদ
রাতের দ্বিপ্রহর শুরু হলো
গ্রান্ডফাদার ক্লকে ঘণ্টা বাজছে

২.
চাঁদ ডুবে গেল
কুয়োর জলে ডোবা চাঁদ
কত দিন নদীতে যাই না
পাহাড়ে সমুদ্রে
একটা প্রস্তরখণ্ড ভেসে যাচ্ছে বাতাসে
বাতাস এখানে ভারি
শিউলির কমলা ঠোঁট
ঝরে পড়ছে চাতালের ওপারে
চাঁদ আজ ডুবে গেল
তুমি ছুঁতে পারলে না আজকের চাঁদ


পুরানো দিনের মতো

পুরানো দিনের মতো চারপাশ
একটা কাঁচের পর্দা সরে গেল
বরফে আচ্ছাদিত পর্দা
মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে
এক ঝাঁক সারস ডানা মেলছে
জায়গাটা তোমার চেনা
কিন্তু সব যেন বদলে গেছে
রাস্তায় সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে
একদল লোক ঠেলাঠেলি করে নিয়ে যাচ্ছে হাবলের টেলিস্কোপ
লালন সাঁইয়ের মতো দেখতে একজন পাশ দিয়ে চলে গেল
একটা সাদা ফুলের তীব্র গন্ধ
কামিনী নাকি হাসনাহেনা?
এখানে তো অসংখ্য  রক্তজবা
কোথাও কি একটা বেদনা লুকিয়ে আছে?
কোথাও কি মিলনের আকাঙ্ক্ষা?
সব সরে সরে যাচ্ছে
ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে সমস্ত আকাশ
তুমি হেঁটে চলেছ কুয়াশা ভেদ করে
বরফ দিয়ে ঘেরা পর্দা
সব ভেঙে পড়েছে মাথার উপরে
এখানে কোনো ছাদ নেই
ধু ধু মরীচিকা
ওপারে যাবার অদৃশ্য সেতু এক


জয়তুন

রাস্তার ঘন ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে জয়তুনের লম্বা ঘর
লোকজন কাজে ব্যস্ত, বাচ্চার কান্না
তুমি অপেক্ষা করছ
একটু একটু করে খুলে গেল পেন্ডোরার বাক্স—
জয়তুনের ঠান্ডা ঘরে পরস্পর ঘন হয়ে উঠলে
হাতের মধ্যে হাত
পায়ে পা
অনেক বেশি আস্তে কথা বলছ
তবু মনে হচ্ছে এখানে আড়াল কম
তোমাদের দরকার ধু ধু একটা মাঠ
চারপাশ আগুন দিয়ে ঘেরা
খুলে যাচ্ছে প্রজাপতির গোলাপি পাখনা
আজ আকাশ কালো
ছাই রঙের ছোপ রংতুলিতে
গুমোট বাতাসের মধ্যে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে
ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল  ঘরের বাতাস
ঠোঁটের মধ্যে ঠোঁট
ক্রমশ টেনে নিচ্ছে পাতালে
একটা গরম হল্কা কানের দুপাশে
চারপাশটা বদলে গেল
নীল রঙের ঘন ঝোপ
দূরে ডাহুকের ডানা ঝাপটানো
পায়ের নিচে সমুদ্রের জল
ভাটায় টেনে নিচ্ছে তোমাকে
একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছ চোরাবালিতে
সমুদ্রের তলদেশে ঠান্ডা শীতলতা
উষ্ণ শরীর ডুবে যাচ্ছে
একটা কাঠ ঠোকরা পায়ে এসে ঠোকর দিল
চোখ খুলে দেখলে হাতে হাত
চোখে চোখ
একটা উষ্ণ ঠোঁট
খুলে নিচ্ছে স্তনের পাপড়ি
একটা ঋজু লৌহদণ্ড নাভির গোড়ায়
চারদিকে ঘন অরণ্য  কালো চোখ
তোমরা ভেসে যাচ্ছ বেহুলার ভেলায়
দূরে জেগে উঠছে সেরেনদ্বিপীতা


উড়ুক্কু মাছ

চারদিকে জলাধার, ছোট ছোট মুথা ঘাস
অসংখ্য ফড়িং বাতাসে ভাসছে
থানকুনি পাতার ঝোপের পাশে
একদল বকফুল ওড়ার প্রস্তুতিতে
জীবন এখানে ক্রমশ সরল হয়ে এসেছে
হাতের রেখা পড়া যাচ্ছে
তুমি চলেছ পূর্ব থেকে পশ্চিমে
কখনো উত্তর থেকে দক্ষিণে
একটা ঝড় তোমার পিছু নিল
তুমিও চলেছে ঝড়ের পিছনে
ঘন ধূসর রঙের জমাট
মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল জনপদ
শূন্যে উড়ছে ঘরের চাল
মেহগনির কাণ্ড
তুমিও ভেসে চলেছ তাদের সাথে
ভুঁইচাঁপারা শুধু মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে
একটা উড়ুক্কু মাছ লাফ দিল আকাশ পানে

(790)

Latest posts by নভেরা হোসেন (see all)