হোম কবিতা ফারহিন, তোমার নামে

ফারহিন, তোমার নামে

ফারহিন, তোমার নামে
974
0

শরণার্থী

অনেকদূর চলে আসার পর
আপনি বুঝতে পারলেন
ভুল রাস্তায় এসেছেন
ভুল মানুষের সাথে
ভুল স্বপ্ন দেখে
ভুল করে
ভুল।

এবার
যদি আপনি
ফিরে যেতে চান
প্রত্যাবর্তনের লজ্জা নিয়ে
আকাশগঙ্গার নিচে নিঃসঙ্গ মানুষ
আপনাকে অনেক দূর যেতে হবে একা একা একা।

মানুষ মূলত এক শরণার্থী
সারাটা জীবন পথে পথে
ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলে
কবরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে।


নিঃসঙ্গতার একশ বছর

হারিয়ে যাচ্ছে হোমিওপ্যাথিক দোকানের ছোট্ট কাচের শিশি
হাওয়াই মিঠাই, লাল জামাঅলার ঝালচানাচুর, কুলফি মালাই
শীতসন্ধ্যা শিলাবৃষ্টি, ভোরের আলস্য, ক্লান্ত কাঁথার কোমলতা
হলুদ রঙের খাম, প্যারিসের পত্রাবলি, ঝরনা-কলমের নীলরক্ত
হঠাৎ অন্ধকার, হারিকেনের আলো, রাতের দেয়ালে দৈত্যছায়া
শিউলিদির হাসি, হারমোনিকার সুর, বুকের বা’পাশে অস্থিরতা
হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের স্মৃতি, শতবর্ষের নির্জনতা, সবকিছু…


হেলেন

তারে দেখি, তারপর দেখতেই থাকি, দেখতেই থাকি। মানুষ না পরি ঠাহর করতে পারি না। হেলেন তো তুরস্কেরই রাজকন্যা ছিল, তাই না? সে বাইজান্টাইনেও ছিল হাজিয়া সোফিয়ার প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে, হৃদয়ে গ্রিসের অলিভ বনের অন্ধকার নিয়ে। অথচ সে হারিয়ে গেছে অটোমান সাম্রাজ্যের মতো। তোপকাপি প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে তার না-থাকার হাহাকার! আমি তারে খুঁজব বরফ আর বিষণ্নতার শহরে। যেখানে রোদ আর রক্ত একাকার হয়ে গেছে। আমি তারে খুঁজব হালিত পাশা এভিনিউয়ের ভিড়ে। বসফরাসের বাতাসে আমার চুল এলোমেলো হয়ে যাবে। আমি তারে খুঁজব আইপেক হানুমের অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাসে। যে আমাকে পূর্বজন্মের পাপ মনে করিয়ে দেবে। আমি তারে খুঁজতেই থাকব নিশান্তাসির সেইসব গলিতে যেখানে নৈঃশব্দ্যের ঋতু স্থির হয়ে আছে।


ফারহিন, তোমার নামে

ফারহিন, তোমার নামে

ঈশ্বরের মন খারাপ হলে
বৃষ্টি পড়ে ঘাসের আঁচলে
রক্ত জমে দেয়ালের দাগে
জিপসিরও একা একা লাগে
তাই সে সমস্তরাত্রি জাগে…

ফারহিন, তোমার নামে

সাইকেলের শব্দ কানে বাজে
বেকার যুবকও যায় কাজে
সুতা কেটে নেয় সাকরাইনে
বাপ নেয় আত্মজাকে চিনে
ইরানি ছবির মতো দিনে…

ফারহিন, তোমার নামে

কত শিশু ফুটপাতে ঘুমায়
গোলাপিরা ট্রেনে উঠে যায়
অন্য তারা থেকে আলো আসে
বুক ভাঙে জেসমিনের মাসে
মরে যাই নিশ্বাসে নিশ্বাসে…


ঈপ্সিতার জন্য রূপকথা

এক দেশে ছিল, মেয়ে, রাজকন্যা এক
সে কেমন বুঝতে তোর আম্মুকে দ্যাখ
আমি তাকে ছুঁয়ে গেছি পশুরের জলে
সুন্দরী বৃক্ষের পাশে রাত্রির কাজলে
নাম তার ইরাবতি, সাকিন দক্ষিণ
যে আমাকে বলেছিল ছেলে অর্বাচীন

আমি তো ভেবেছি পাব চিরকাল তাকে
যেভাবে বৃষ্টির ফোঁটা মাটি ছুঁয়ে থাকে
যেভাবে শৈশব কাটে হাওয়াই স্যান্ডেলে
ভেবেছি তেমনি তাকে পাব অন্ত্যমিলে

তারপর সংবাদ এল একদিন হঠাৎ
বানিয়ার দল এসে গেছে অকস্মাৎ
গরিবের বউ নাকি সকলের ভাবি
দুঃখটুঃখ করল বলে আমরা অভাবী
উন্নয়ন করতে দেবে স্বল্পসুদে ঋণ
হাসিমুখে বলল সেই বেহায়া প্রাচীন

বিনিময়ে নিতে হবে কয়লা সামান্যই
ভেবেছিল বলব আমি নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই
আমাকে চেনে নি তারা আমি সেই ফকির
মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানীর জিকির

আমার ঠিকানা পাবে খোয়াবনামাতে
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতাতে
রূপসী বাংলায় আর সোনালি কাবিনে
পথের পাঁচালী থেকে আরেক ফাল্গুনে
আমি থাকি সেই বোকা মানুষের ঘরে
যেখানে ভাতের গন্ধ প্রেম হয়ে ঝরে

এটুকু বলতেই মেয়ে চোখ বড় করে
দৃষ্টিতে একটাই প্রশ্ন : কী হল এরপরে
আমি বলি সারিয়েছি ফুসফুসের ক্ষত
সে দেখতে ঠিক তোর আম্মুটার মতো!


কালীগঙ্গা

কালীগঙ্গা ব্রিজ থেকে একদিন ঝাঁপ দেবো আমি
নিখোঁজ সংবাদ হব, রাষ্ট্র হয়ে যাবে অতঃপর
যে কিশোর চেয়েছিল তোমার অতলে ডুব দিতে
শুধু সে হারিয়ে গেছে ফেলে রেখে বিশ্বচরাচর

কান্নার মতন নদী বুকে টেনে নেবে নির্দ্বিধায়
দাহ বা দাফন ছাড়া শেষকৃত্য হবে অন্ধকারে
লাইলাক ফুলেরই গল্প; তবুও ঈশ্বর সাক্ষী থাক;
জলের কাগজে লিখে চলি আমি জন্ম জন্মান্তরে!

কালীগঙ্গা ব্রিজ থেকে একদিন ঝাঁপ দেবো আমি
জানি তুমি খুঁজবে না মেঘের ছায়ায় মৃতদেহ
যে কিশোর চেয়েছিল তোমার সান্নিধ্যে মরে যেতে
সে শুধু হারিয়ে যাবে রেখে অন্তহীন সন্দেহ

নীল নয়, সিঁদুরের মতো লাল মেঘের সন্ধ্যায়
তোমার কষ্ট হবে বুক ভেঙে গেলে অকারণে
তখন বৃষ্টির কাছে জেনে নিও আমার ঠিকানা
জলের কতটা কান্না শুধু যার অন্তর্যামী জানে!


ইউফোরিয়া

“It’s enough for me to be sure that you and I exist at this moment.”
—One Hundred Years of Solitude/ Gabriel García Márquez

দেশলাই ডুবে গেছে দূর্বাঘাসে
নক্ষত্র মুছে গেছে নীল আকাশে
বাতাস হারিয়ে গেছে দীর্ঘশ্বাসে
রক্তাক্ত কিশোর ভাসে ও তিতাসে
সর্বনাশ দ্যাখা দিচ্ছে চৈত্রমাসে
হিম ঘর ভরে উঠছে কাটালাশে
বাঁশির বিষণ্ণধ্বনি ঠোঁটে হাসে
বুক ভেঙে যাচ্ছে লাল অবিশ্বাসে
নিজের ছায়াও নেই আশেপাশে
আক্রান্ত শহর বৃষ্টি ও সন্ত্রাসে
এমন সময়ও যদি কল আসে
সংক্ষেপে জানিয়ে দিও পূর্বাভাসে :
“তারপরও আঙ্গুরলতা নন্দকে ভালবাসে…”

* শেষ লাইনটি মেজবাউর রহমান সুমন নির্মিত ও জয়া আহসান অভিনীত একটি নাটকের নাম, তাঁদের কাছে ঋণস্বীকার করছি।


ব্যর্থতা

লোকটাকে নিয়ে কেউই আসলে সন্তুষ্ট ছিল না
অল্পবয়সেই যারা
মায়াবী অক্ষরের
প্রেমে পড়ে যায়
তাদের নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া কঠিন, খুব কঠিন
সবাই নিশ্চিত ছিল তার জীবনটা জলে গেছে
তার সমস্ত সম্ভাবনা মোমের মতন গলে গেছে

শৈশবে লোকটা ভাবত সে বাতাস হয়ে যাবে
ঘরভর্তি মানুষের মধ্য থেকে গায়েব হয়ে যাবে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেমে যাবে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে
অথবা সে হবে সেই বিষণ্ণ কুকুর
যে সারাদিন শুয়ে থাকত তার দাদাবাড়ির উঠানে
রোদ উঠলে যে বিরক্ত হতো, বৃষ্টি নামলেও
বেঁচে থাকতে থাকতে যে ক্লান্ত হয়ে গেছিল

কৈশোরে লোকটা ভাবত সে পানি হয়ে যাবে
চুল থেকে ঝরে পড়বে পাশের বাড়ির রূপসীর
ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেমে যাবে গাল বেয়ে বেয়ে
অথবা সে হবে সেই বোকাসোকা হাঁস
যে সারাদিন সাঁতার কাটত তার দাদাবাড়ির পুষ্করিণীতে
শিশু দেখলে যে আনন্দ পেত, বৃদ্ধ দেখলেও
মরে যাওয়ার যার কোনো ইচ্ছে ছিল না

যৌবনে লোকটা ভাবত সে আগুন হয়ে যাবে
আঙুল পুড়িয়ে ফেলবে প্রেমিকার হাত ধরতে গিয়ে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেমে যাবে দেহ বেয়ে বেয়ে
অথবা সে হবে সেই বেওয়ারিশ বিড়াল
যে সারাদিন ঘুরে বেড়াত তার দাদাবাড়ির ঘরদোরে
কাঁটা ছুঁড়লে যে তৃপ্তিতে খেত, মাছ ছুঁড়লেও
জীবন আর মৃত্যুকে যে খুব সহজভাবে নিয়েছিল

একটা জীবন সে পার করে দিল ভেবে-ভেবেই

লোকটা শেষ পর্যন্ত বাতাস হতে পারে নাই
পানি হতে না
আগুন হতেও না

সে সাড়ে তিন হাত মাটি হয়ে গেছে…


আমার বন্ধু সুরাইয়া

আমার বন্ধু সুরাইয়া একজন আরব-আমেরিকান
নিউইয়র্ক সিটির একটা ঝকঝকে তকতকে ফ্ল্যাটে তার নিবাস
সেই ফ্ল্যাটে কোনো নিপীড়ন নাই, কোনো বিতাড়ন ও বন্দিদশা নাই

দৃষ্টিতে যেটুকু ধরা পড়ে
পোশাকআশাক, চলাফেরা ও কথাবার্তায়
সুরাইয়ার সাথে তার মার্কিন বান্ধবীদের কোনো পার্থক্য নাই

কিন্তু
আমার বন্ধু সুরাইয়া
একজন ফি-লি-স্তি-নি

সুরাইয়ার মার্কিন বান্ধবীরা জানে না,
নিউইয়র্ক সিটির সেই ঝকঝকে তকতকে ফ্ল্যাটের কোনো এক কোনায়
একটি কাচের পাত্রে রাখা আছে জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের মাটি, এক টুকরো ফিলিস্তিন

সুরাইয়ার মার্কিন বান্ধবীরা এও জানে না,
প্রায় রাতেই তাদের ফিলিস্তিনি বান্ধবীর ঘুম ভাঙে আইডিএফের আগ্রাসনের দুঃস্বপ্ন দেখে
জীবন বাঁচাতে সে প্রাণপণে ছুটে চলে সেই কাচপাত্রে রক্ষিত সেই এক টুকরো ফিলিস্তিনের দিকে

আর তারপর আমার বন্ধু সুরাইয়া ভেঙে পড়ে প্রবল কান্নায়
সে কাঁদে তার পূর্বনারীপুরুষের জেরুজালেম আর গাজা উপত্যকার জন্য
সেইসব আকাশের জন্য যেসব নীলিমায় সে হারিয়ে ফেলেছে জীবন ও জলপাই

সুরাইয়া, আমার বন্ধু সুরাইয়া, তুমি, তুমি কি জানো?
ওরা পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলেছে তোমার স্বদেশ
কিন্তু জায়নিস্টরা জানে না ফিলিস্তিন মৃত্যুহীন মানুষের মানচিত্রে
ওরা বোঝে না রক্তের ভেতরেই জন্ম নেয় নতুন মানুষ
‘ফিলিস্তিনি’ শব্দটি আজ মানুষ শব্দের সুন্দরতম প্রতিশব্দ
একজন ফিলিস্তিনি মাঝরাতে মানুষের মুক্তির জন্য কাঁদে
সুরাইয়ার লাল চোখে বেঁচে থাকে হারিয়ে ফেলা সেইসব আকাশ, জীবন ও জলপাই, ইতিহাস…

ইরফানুর রহমান রাফিন

জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৯২; লেখক, অনুবাদক, গবেষক।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

চলে যাওয়া সময় [কবিতা, আনন্দম, ২০১৯]
এক অসাধারণ অন্ধ সময়ের স্মৃতি [উপন্যাস, কাউন্টার এরা, ২০২০]

ই-মেইল : irrafin2020@gmail.com