হোম কবিতা প্রিয় ১৫ : সৌমনা দাশগুপ্তের স্বনির্বাচিত কবিতা

প্রিয় ১৫ : সৌমনা দাশগুপ্তের স্বনির্বাচিত কবিতা

প্রিয় ১৫ : সৌমনা দাশগুপ্তের স্বনির্বাচিত কবিতা
42
0

গোলাঘর

এই সেই গোলাঘর, ঘুলঘুলিতে কামনা বসানো

আমি কি রোদের দিকে চলে যাব
পুষ্পপাত্রে রেখে দেবো ধাতুর যাতনা

ব্যাধ কথা বলে যায় সারাদিন
নিজেকেই তাক করে ছুড়েছি ধারাল ভল্ল

উন্মার্গগামী

হোমানলে উচ্ছ্বসিত ঘৃত ও কর্পূর

খোলশ বদল করে দেহবীজ
ইচ্ছেগাছে ঢেলে দেয় জল ও প্রদাহ


হত্যালীলা

নিহিত ছদ্মবেশী
কে গো তুমি আমাকে জাগাও

এও এক হত্যালীলা
হৃৎপিণ্ডে ছ্যাঁকা

নিংড়ে নিংড়ে খায় রক্তের সমস্ত নির্যাস
ব্যথা আর কামনার মাঝখানে

হাপরের ওঠানামা, হাঁসের সাঁতার
মাছেদের শীতঘুম থেকে দূরে
চাড় থেকে টোপ থেকে দূরে

আমি বসে রিফু করে চলি
সে কি কল্পদ্রুমের এক সোনালি কুসুম

কথা নয় গল্প নয়
শুধু শুধু স্রোত মুছে যাওয়া

ভ্রম ও সত্যের মাঝে খেলা করে কাচের পাখিটি


অসম্পাদিত 

বিষয় কুকুর হয়ে ঘোরে
লাল জিভ
মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে দাঁত
বিষয় কুকুর হয়ে ঘোরে

ভূমার চোখের জল নদী
হ্লাদিনী কমলা এক সূর্য
বিকেলের স্রোতে ভেসে
আংরা বমনের পথে পথে

বিষয় কুকুর হয়ে ঘোরে
লালা ঝরে
এটুকুই অপেক্ষা পড়ে থাকে
এইটুকু লোভ

স্বতোৎসারিত এ কূপ
ফাঁকা পেডেস্টালে স্থপতির
চোখ থেকে রক্ত ও পুঁজের
ফণাগুলি সটান দাঁড়িয়ে

বিষয় কুকুর হয়ে পথ থেকে পথে
লিখে রাখে কলমের ধ্বনি ও কামড়


ক্যাকোফনি 

হাত তুলছি ক্যাপ্টেন!
কে কার স্বপ্ন পাহারা দেয়
শীতপারাবার

ক্যাকোফনি
বিলি হওয়ার আগেই
ফুরিয়ে যাচ্ছ
তোমাকে বৃক্ষ ভাবি
ভাবি বৃদ্ধি
যৌনপতাকার নিচে
খুলে যাওয়া ভূর্জপত্র

তবে হাত তুলে দিলাম ক্যাপ্টেন!
লোমখসা বৃদ্ধ বায়স

স্কিজোফ্রেনিক এই ধারাপাত
কটুবাক্য, জং ধরা শিকলিপ্রপাত

অবাক টিয়ার ঠোঁটে জাদুতাস
টোটেম-ইঙ্গিত
আমি তবে শূকর প্রজাতির
রক্তবীজের থেকে
শুম্ভ ও নিশুম্ভ

হাত তুলছি ক্যাপ্টেন
যাও আর খেলব না

দানা বলে!
কালো ও গম্ভীর সেই
ধাতুর নলের মাঝে
খেলা করে শস্যবীজ

বুলসআই স্পর্শ করো
নিষ্প্রভ কামানের তলে
শুয়ে থাকে ঘাসের ছোবল


অমোঘ ময়ূর

শূন্যে জন্মে যে গাছ শূন্যেই মরে যায়
তার জন্য বোতলবন্দি চিঠি
সে ছিল বমির মতো প্রিয়
যখন প্রথম গর্ভ
সর্বাংশে আনত আকাশ
ধনুক তোলপাড় করে ছিলা ধরে টান
তামাম অস্থিফুল কেঁপে ওঠে জ্বরে
ও চোখে লেজার রশ্মি
রেটিনায় বিচ্ছুরিত রক্তভেজা আলো
পিন পয়োধর জুড়ে সাপ
সেদিন গ্যালাকটিক যুদ্ধ
নিশ্চুপ থাবা
ওম ধ্বনির ক্রেঙ্কার
অমোঘ ময়ূর
শত শত পুতনার বীজ খলখল খলখল
সেদিন বিরহ মধুর, সেদিন বিরহ মদির
দিকে দিকে
টানেলের অন্ধকার চিরে জন্মরব
ধূমাবতী উগ্রচণ্ডা অক্ষরের বিলাপ
লোলচর্মের গায়ে ফুটে ওঠা প্যারাডক্স
চিৎকার করে বলে
এই ধ্বনি শঙ্খমাখা
এই ছিদ্রে হলহলরূপী
বসতি গেড়েছেন নারায়ণ
আর বেদেনীর হাসি
আর ধাতবগোখরোর হাইবারনেশন
কলম লেখে না তাকে
ব্যঞ্জনবর্ণটি শুধু নড়েচড়ে বসে
পুরঃসরা শৃগালীজীবন থেকে চালপোড়া বাস
বোধন-পর্ব থেকে উঠে আসে শার্দূল
রক্তঅভ্যাস
শূলদণ্ডে নাচছে বসুধা
জানুফাটা পৃথিবীর রজরস
অপূর্ব ফ্লুইড যেন উথলি উঠিছে শব্দরূপ
নদী নদ্যৌ নদ্য:


মৃতরেখা

শাটার নামছে চুল্লিতে
জলভরা বাটি আর দর্পণে মুখ
মুখ শুধু বেঁকেচুরে যায়

বাটি চালানোর প্রহর। কেউ যেন সিঁধ কাটে
তার দেহ ঢাকা আছে কালো ও গভীর এক জোব্বায়
লাল-চোখে ঝরছে আগুন

জরা জরা জরা জরা
শোক শোক শোক শোক

তাপসহ হয়ে ওঠে দেহ-মৃদঙ্গ
টাং টাং বাজছে চামড়া
কীমাশ্চর্যম

টান মারছে মুণ্ড ধরে
শিয়রে কাঁটা নিম্নে কাঁটা
গোলার্ধ থেকে গোলার্ধ জুড়ে

ছুটে যাচ্ছে হাহাকার; মৃতরেখা


যূথদাগ

এইখানে বসে ছিল মৃত এই আগুনের পাশে
বোধ ও বোধির মাঝে পরশপাথর এক

মহিষের বাঁকা শিঙে এখনও যুদ্ধের ডাক
শঙ্খ-চক্রে বেজে ওঠে। মাংসল যূথদাগ
একেই যাপন ভেবে ফুল আঁকো পাখি আঁকো

কেঁপে ওঠে প্রজাপতি ডানায় ডানায় তার বালির আঘাত
লেখো তবে লিখে ফেলো মরুভূমি তৃষাকাতরতা

চক্রে চক্রে দাও তাকে উত্থান; সহস্রারে
শিব শিব শিব শিব

অযথা রক্তাক্ত হলো হাত

রৌদ্রচালিত এ তাঁত বুনে চলে স্মৃতি ও শৃঙ্গার
সেইদিন সর্পযজ্ঞ সেইদিন বিষগান বাজে

দিন যায় দিন যায়


নাভিমূল 

সাঁকোটিকে দোলা দেবো প্রাণবায়ু ঢেলে দেবো মৃতকল্প গাছের শরীরে
এ কোন উন্মাদ এসে ক্ষেপায় আমাকে
চণ্ডরোষের প্রহর—প্রপঞ্চ ঈশিতার খেলা
ঢেউ দাও ঢেউ দাও

ভাসাও এ নাভিমূল পুনর্নবা স্রোতজলে


দেবী

নিরঞ্জনের কিনারা ঘেঁষে রোগা এক একলা বাঘিনী
রঙের ধারাটি বয়ে যায়, কোলকুঁজো। ধুয়ে যাচ্ছে মাটি
উড়ে যাচ্ছে পরানদোতরা। প্রাণপ্রতিষ্ঠার পরে যা বলেছিলেন দেবী
ধান্য পুষ্প আর দুগ্ধবতী গাভীকুল—অথই গেরস্তি

সরিয়ে রেখেছে কবি তার উপমা-তূণীর, ব্যাসকূট

দেবীর চোখের জল—শুধু এক নদী পাতা আছে


শামাদান

আয়ুধ লুকিয়ে রাখি ঢেকে রাখি শব ও নগ্নিকা
ছিন্নভিন্ন চরাচর সাধনায় সঙ্গী হয়েছিল

আমার ভুলের নিচে চাপা পড়ে এককোষী প্রাণ
সে প্রাণে জোছনা লেগে সেই প্রাণে জোনাকির স্তব

আমি এক বানভাসী একতারা ডুবে আছে জলে
ঘাম পড়ে ভুল শামাদানে; কে কার শ্রাবণে সুর ঢালে

পড়ে ছিল শাদা পাতা। তাতে ছাড়ি নিযুত ময়ূর
অখিল হরিণ পাণে ছুটে আসে দৌড়

তবুও জলের কাছে বারবার স্বপ্ন খুলে ধরি
জড়গাছে পাতা আসে, মায়াবৃক্ষের ডালে ডালে অস্থি-কুসুম

আমি শুধু ভাঙা হাড়ে লাগিয়েছি স্ক্রু
ঘুরেছি লাটিম যেন এর ঘর তাদের দরোজা

পাবক আছেন সাক্ষী; আর জানে জল ও বাতাস
বসন্ত শোধন করে কবচ কুণ্ডল রেখেছিলে

বোবা মুখ সারি সারি পিউ কাঁহা বলেছে কোকিল


তামসভৈরব

এ সকাল তামসভৈরব; উগ্রঘোরা চামুণ্ডা মাতঙ্গী
এ সকাল অদৈবী ত্রিশূল; বিঁধে আছে ফসলের গায়ে
আজানুলম্বিত এক অভিশাপ
তীর্যকরেখায় তার ক্ষত
বহু করো তাকে, ব্রীহি করো; ইথারে ভেসেছে নামগান
সূর্যবীজ ঠোঁটে তুলে নিয়ে মত্ত কুরঙ্গম এক চলেছে বাতাস কেটে
পিঠে তার বিঁধে আছে নিজস্ব শিঙের ভার
এইখানে মিলে যাচ্ছে ঊষা ও প্রদোষ
কোথায় লুকাবে তার মুখ উপমার ভারে ন্যুব্জ একলা বাক্যটি
পঙ্‌ক্তি ভাঙার খেলা শুধু কোথা শাঁস কোথায় বা তার খোসা

স্নান শেষে ডুব শেষে উঠে দেখি পাঁক ও পলিতে ঢেকে ডুবন্ত আকাশ


চণ্ডস্বর

পত্রমোচনের দিন প্রমত্ত শিখাটি তবে জ্বেলে দিই
লবঙ্গ বনের মাঝে সে এক মন্দির, পাশে তার অগাধ দীর্ঘিকা

জলের ভেতরে ওই কার মুখ দেখি আমি

আমি কি মাংসভুক আমি কি নিজেই কেটেছি এই শিরা
করতলে এত রক্ত এত এত হায়নার ডাক

চণ্ডস্বর বেজে বেজে নিহিত সুড়ঙ্গে পাক খায়


চন্দ্রপাত

গচ্ছিত রেখে দেবো ঋণ, বৃষ্টিভেজা যত দেশলাই।

আমার গতজন্মের না-নেভা কলকে
আমার মগজভর্তি ছাই

ফিরে আসি, ফিরে ফিরে আসি
বৃশ্চিক-রাশির লগ্নে যেই ঢেউ উঠেছিল
সাগর নেয় নি তাকে

সাগর তো কিছুই নেয় না কোনোদিন
সবটা ফিরিয়ে দিয়ে চলে যায়

কর্কটরেখায় এসে ফুলে ওঠে মৃতদেহ শুধু

দ্যাখো, তার দেহের ওপর বসে আশ্চর্য শকুন

এইখানে শুধু চন্দ্রপাত
এইখানে মেঘের চেয়েও বেশি বড়ো তার ছায়া

আর দ্যাখো, শূকরীর প্রসবদৃশ্যের মাঝখানে এক বোবা জাদুকর

ডানা মেলে দিয়ে তার উড়ে যাচ্ছে দিকচক্রবালে

পেরেকে পেরেকে লেখা ময়ূরের ক্লিন্ন বেদনা


পরাজাগতিক

মৃত সেই ঘোড়াটিকে দ্যাখো। এখনও ছুটছে সে, এখনও এখনও

অথচ বুকের থেকে গাঢ় এক রক্তের ধারা, যেন কিছুই হয় নি তার, যেন শুধুমাত্র লাগামখানি হাওয়ার বেমক্কা টানে ছিঁড়ে ঝুলছে এখানে। রক্ত নয়, ঘাম নয়, এ শুধু লাগাম ছিল, এখনও এ ঘোড়ার বুকের ভাঁজে এইটুকু স্মৃতি লেগে আছে। প্রভু এসে থামাবেন তাকে, আদরে আশ্লেষে দেবেন নতুন লাগাম। তাঁর হাতে গম ও যবের দানা, ভিজে ছোলা, আস্তিনে লুকোনো বাঘনখ।

আমার সময় পড়ে আসে। আনদিনে বেভুল শাপলার বনে ব্যাধ এসেছিল। অলীক তরঙ্গজালে তার মুখ ছিল ঢাকা।

যবনিকা টেনে দিতে গিয়ে দেখি আমার শরীরজোড়া আঁশ, আঁশ নয় সে তো এক লৌহঝিনুক যেন কফিনের মতো করে জড়িয়ে রেখেছে।

আনো তবে তোমার সে হিরণ্যকুঠার। ভেঙে দাও লোহার এ খোলস আমার।

চলে যাই বালির প্রদেশে। দ্যাখো দ্যাখো আজও এ হৃদয়পিণ্ডের মাঝে রক্তনির্ঝর সেই জেগে বসে আছে। তাকে দাও হুহু মরীচিকা, দাও এক তাজা শবদেহ, খুলিভরা কারণবারির ধারা ধুয়ে দিক সবটা অরণ্যধ্বনি, পাখিডাক। বহুদিন বাদে সেই গূঢ় কাপালিক আজ বসেছে বিদ্যুতে, আর তার করোটির থেকে পরাজাগতিক এক সাপ নেমে আসে


চেরাজিভ

সাপ খেলাতে খেলাতে সেই বেদে একদিন দুধ ও মধুতে রাখে চেরাজিভ, হিরণ্ময় ছাই। তার হাতে অমৃতফল, মেধা ও খনির থেকে তুলে আনা লৌহবাকল।

দ্যাখো তার অলীক চামড়া থেকে খুলে গেছে প্রত্নদিনের গান, ঋতুআহ্লাদ। আমি তাকে আতশকাচের নিচে বড়ো করে দেখি, দেখি সেই গুলালের দিন থেকে খসে যাওয়া চাঁদ ও সূর্যের রসে বুড়ো এক মহাবুড়ো লোকগল্পের সুর অতিজাগতিক কোনও ডিম হয়ে বসে আছে, আমার মাছের পেটে তমোগুণ হয়ে বসে আছে। নিছকই একেকটা দিন শুধু রক্তক্ষরণ হয়ে ভেসে যায়। ঘোড়াদের পায়ে পায়ে ধুলোর রেণুতে তার দাগ লেগে গেছে।

এইখানে খেলা জমে ওঠে। এসো সুবাতাস এসো, দোলা দাও সাপটিকে, ঝাঁপির ভেতর থেকে টান মেরে বের করে আনো, যা কিছু জমানো ছিল অহল্যা দিনের কাছে, রাত্রির পাঠাগারে পড়া হোক সেই পুঁথি, আমার ঘুমের মাঝে সুর হয়ে বেজে যাক সে-প্রলাপ, আমার ঘামের সুরে সে-ও যেন অনাবাদি স্রোত হয়ে আগুন জ্বালাক।

প্রতিরাতে খুন হয় চারাগাছ, প্রতিরাতে নির্বিবাদী সেই এক কুপির আগুন থেকে ঘোর দাবানল, পুড়ে যায় মোহরং এ লিবাস, আমি শুধু একটা একটা করে পৃষ্ঠা উলটে দেখি চেরাজিভ ফুঁসে ফুঁসে ওঠে

(42)