হোম কবিতা পাতার প্রলাপ

পাতার প্রলাপ

পাতার প্রলাপ
432
0

কবিতাটি একটি দীর্ঘকবিতার কিয়দংশ। প্রকাশের স্বার্থে এর নাম দেওয়া হলো ‘পাতার প্রলাপ’। গ্রন্থবদ্ধ হওয়ার সময় নাম পরিবর্তন হতে পারে। এ বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে কবিতাটি লিখেছিলাম। তখনো করোনা আসে নি। সম্পর্ক, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, সংক্রমণ—এরকম নানা অনুষঙ্গ মিলিয়ে আজকের এই মৃত্যুকবলিত সময়ে কবিতাটি খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। তবে কি অবচেতনায় এই গুপ্ত ঘাতক করোনার আগমন আমি টের পেয়েছিলাম? ভেবেছিলাম, সঙ্গনিরোধ প্রয়োজন পড়বে বলে বিচ্ছিনতার মধ্য দিয়ে একাকিত্বের যে-শক্তি, তা কবিতায় সঞ্চয় করে রাখি?

– কাজী নাসির মামুন


পৌর গোরস্থানে মৃত শেয়ালের পাশে
ব্যাপ্ত চরাচর নিয়ে বসে আছি; একা।
উদ্বুদ্ধ সকাল নম্র রোদের সোনালি দেহ
              আমার পায়ের কাছে মেলে দিলে
সূর্যকে ভাবতে শিখি আলোর দালাল।
দূরে পুষ্পকঙ্কাল, মলিন ধুলো শরীরে মেখে
ললিত সৌরভ-স্মৃতি ভুলে যেতে থাকে।
হয়তো প্রেমিক তার আনত প্রেমের
ভূলুণ্ঠিত প্রতিদান মাটির সান্নিধ্যে ফেলে গেছে।
কত ভুল, পাপের নিয়তি, তীব্র তর্কের করাত
কবরের মাটির ভদ্রতা বুকে নিয়ে
একদিন নত হয়; বিচ্ছিন্ন বনের কাছে
পাখির সম্পর্ক খোঁজে। বস্তুত সম্পর্ক এক জটিল পুরাণ।
মানুষ গল্পের ক্রীড়নক হয়ে ব্যর্থতার করাল সত্যকে
একদিন নিজের সঙ্কটে বুঝে ফেলে:
দেখে, কেউ তার সঙ্গে নেই।
দেহের পুরনো ছাল ফেলে
              যেভাবে পালায় সাপ, সেরকম
অধীর নিস্তার চেয়ে সবাই পালায়।
স্মৃতিবিষ বুকে নিয়ে
আগুনে আগুনে পুড়ি আমরা সবাই একা একা।

মানুষের শ্রমে আজ উৎকীর্ণ সকাল।
মায়াবী গরুর চোখে পৃথিবীর সব মধু বোবা হয়ে আছে।
আমূল সাধনাগুলো চুপচাপ হয়;
কত মর্ম-আলাপন গভীর সঙ্কেতে
নিজের জীবনে জমা রাখে
নিঃসঙ্গ বধির।
একটা বিড়াল হাঁটে; তার ভয় চতুর পুলকসহ
              পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতে দেখি।
জীবনের লাস্য ঘিরে বহুদিন
মাতাল বাসনা ছিল আমারও; ভেবেছি
লোমশ আদর পেলে
একটা বিড়াল হব নারীর মুঠোয়।
চুপি চুপি টিকে র’বে জান্তব যৌনতা
দুর্বিনীত আমাদের সকল খেলায়।
আজ আমি সঙ্গপ্রিয়; জনতার নিষ্ফল মস্তকে
চমকের মতো মিশে আছি।
পলে পলে সাজানো সকল সংক্রমণে
গ্রীষ্মের মুগ্ধতা দেখি; আর দেখি গোপন শূন্যতাগুলো
ঘুমন্ত খরগোশের পরাজয়ে জেগেছে হঠাৎ।
কারো কারো জীবন তো বিজয়ী কচ্ছপ।

বিষণ্ন মর্মরে ঝিরিঝিরি হাওয়া-গান
আমার শরীর ছুঁয়ে গেলে
              কেন যে পাতার কথা মনে পড়ে আজ!
পাতা এক নিবিড় সবুজ হাহাকার।
বিভোর বাতাসে নড়ে; তবু
চকিতে পাখির মতো উড়তে পারে না।
ডালে ডালে তার শোক, হলুদ বেদনাগুলো
গাছের স্পন্দনে টিকে থাকে;
মড়কে মড়কে শেষ হয়। আহা পাতা!
নিঝুম মৃত্যুর দিকে আমাকেও সঙ্গে নিও।
সবুজ প্রলেপ নিয়ে ঝরে যেতে
              আমি এক পাতা হতে চাই।

নীরবতা কবরের স্পর্ধা।
উদগ্র পোকার চলাফেরা, নীল মাছি
হরিৎ গুল্মের নিচে
সামান্য মলিন ছায়া—সবকিছু মহাকাল;
তুমুল স্খলন যেন; আরেক ভঙ্গুর কোলাহলে
              পরম শান্তির দিকে নষ্ট হতে চায়।
ভাষা হয়ে ফোটে।
প্রজাপতি রঙিন ডানায় লিখে নিজের পতন।
তবু পাতা, তোমার তরঙ্গ আছে স্পর্ধিত মৃত্যুর।
নির্ঝর বেদনা আছে; বিরল মমতা এক বোঁটায় বোঁটায়।
আমি হাতে নিই; আহা! রিনি রিনি তোমার শরীর
স্পন্দিত বুকের মধ্যে তিলে তিলে গড়ে তোলে আমার সাহস।
স্ত্রী-পুত্র, বিবিধ সঙ্গ, আরো দূর ফলনবেষ্টিত স্বজনের
মুখর সত্যকে মানি; তবু
সুকণ্ঠী বন্ধুর গান, প্রেমিকা পসার
আকুল স্তনের দিকে ধাবমান সকল সুখের মেদ, আর
নম্র চুম্বনের আশা দুলতে দুলতে
ঠোঁটের ওপর
যদি কোনোদিন ক্লান্তি বয়ে আনে
আমি খুব একা হতে পারি।
কখনো চন্দনকাঠ অগ্নিদগ্ধ হলে
মানুষ পোড়ার আগে বিগলিত হই।
              কাঁদি একা একা।

Kazi Nasir

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

ই-মেইল : kazinasirmamun@gmail.com
Kazi Nasir