হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : সন্ধ্যামণি—’নষ্ট কবিতার গাছ’

পাণ্ডুলিপির কবিতা : সন্ধ্যামণি—’নষ্ট কবিতার গাছ’

পাণ্ডুলিপির কবিতা : সন্ধ্যামণি—’নষ্ট কবিতার গাছ’
745
0

সন্ধ্যামণি
❑❑

উঠোনজুড়ে ফুটলে এখন
            সন্ধ্যামণি
দিন ফুরাল গেরস্থালির
            শঙ্খধ্বনি
বাজল, ধীরে নিভছে আলো
            আকাশপটে
সব হারিয়ে যাচ্ছে দেখি
            দূরনিকটে
এখন এলে ফুটলে এসে
            রাত্রিকুসুম
গন্ধ দিলে হারিয়ে গেল
            বিষণ্ণঘুম
সন্ধ্যা এখন নামছে গাঢ়
            আমার পাড়ায়
উঠোনজুড়ে ফুটলে বলো
            কার ইশারায়
সন্ধ্যামণি? পাঁজরতলায়
            রাখলে প্রদীপ
দুলছে হাওয়ায় এই অবেলার
            জ্বলন্ত টিপ।


লিপি
❑❑

কিছুই তো দেওয়া হলো না!
ফুলগুলো ঝরে আছে মাটির নরমে
কদমগাছের নিচে।
একটুকরো রোদ আর ছায়া
একজোড়া নিঃশ্বাস হয়ে
বিষাদ বুনছে এইখানে,
ঝিমঝিম অমল বিষাদ।
কিছুই তো দেওয়া হলো না
নীল নীল দুঃখগুলো ছাড়া,
টুপটুপ অঝোর সবুজ
দুঃখগুলো ছাড়া।


অনন্যপর্ব
❑❑

হাওয়াকে ভালোবেসে যে ফুল এগিয়ে দিল ডানা
সেই বাতাস তাকে চাপড় মারল অবিকল।
ও ফুল তুই ঝরে পড়িস নে
ও ফুল তুই বজ্রমুঠিতে গন্ধ ধরে রাখ!


ভালোবাসার নাও
❑❑

অশ্রু এসে ভিড় করেছে তাই
ফুলগুলো সব বলল ভেসে যাই
ঠাঁই মেলে নি হৃদয়গাছে তার
জল পুড়েছে নদীও ছারখার
কান্না হয়ে ভাসতে ভাসতে যাও
সাগর পেরোও ভালোবাসার নাও।


যা পাখি তুই
❑❑

পাখি তুই উড়ে যা গন্তব্যের দিকে।
আমার দুহাতে নীল দাগ,
কিছুতেই তিমিরবিনাশী নয়।
তুই উড়ে যা আলোয় পাখি, যা
আমি তো পেয়েছি শুধু ধূসর সময়
যেখানে ফুল নেই, স্বপ্ন নেই
যেখানে বাজবরণের কাঁটায় মৃত জোনাকি
স্মৃতি ফেলে গেছে!


বিদায়
❑❑

রাত নামল
বড্ড শীত করছে।
তুমি তো জানো
আমার হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে যায়।

চাইলেই সব কিছু মেলে না এখানে—
এটা বুঝতে পারি নি আগে।
বুকটা হাট করে খোলা
হাত বুলিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে কেউ।
এখানে বড্ড ভয়,
এখানে বড্ড ঠান্ডা হাওয়া!
ঝড় জলের আগে
দুর্বল পাঁজরটুকু ঢাকা হয় নি।

কোথায় গেলে আবার তেমন হওয়া যায়?
বুকে বড্ড সর্দি জমে গেছে
কুয়াশা ঘেরাও করেছে চোখ
ভাঙা জানালা দিয়ে শীত ঢুকে পড়ছে হুড়মুড় করে।
অনেকখানি দেরি হয়ে গেছে।
যেতে হবে, যেতেই হবে।


আশ্রয়
❑❑

জীবনের সমস্ত শান্তিকে বিঘ্নিত করে
হে বাতাস কেন উড়ে বেড়াচ্ছ পাগলের মতো?
যাও ডালে গিয়ে বসো,
গাছ তো তোমার দিকে পাতা বাড়িয়েই আছে।
এখানে থেকো না, এই শূন্যে কিছু নেই, আশ্রয় নেই।
ওখানে যাও, ওখানে তোমার স্মৃতি পড়ে আছে,
আছে পাখির কূজন, ডিম।
শূন্যে উড়ো না, এখানে বড় অন্ধকার
নিত্য বৈশাখী মেঘ!


জীবন আমার
❑❑

জানালায় একটা ফুল উঁকি দিয়েই ছুটে চলে গেল।
ট্রেনটা এখন আমার ঘাড় পাকড়িয়ে ছুটছে।

বুকের ভেতর সেই যে কাজলবিল,
সে তো পুকুর হয়ে গেছে অনেককাল।
এখানে আকাশ ছোট হয়ে গিয়ে
জলের উপর ছেড়ে রেখে গেছে কয়েকটা  তারার ফসিল
তারা এখন জোনাকির মুমূর্ষু ইচ্ছের মতো দপদপ করে নাচছে।

ভাগ্য আমাকে ভেলকি দেখায় সময় পেলেই,
জীবন আমাকে মজা দেখায় রোজ;
যেন কত অপরাধই না করেছি।
মাটির দেশ শহর হয়ে গেছে অনেকদিন
আর মনগুলো হয়ে গেছে খাঁ খাঁ রোদের মতো কড়া।


আমার অসুখ
❑❑

কবে ভালো হব আমি?
আমার অসুখ তো কিছুতেই সারছে না!
হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এলাম জলের সঙ্গে
নদী বড় প্রতারক, দোলা দিয়ে দূরে চলে যায়,
একথা বুঝতে বুঝতে আকাশে সন্ধ্যা নামল
তারাও ফুটল একটা দুটো।
আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আর
অনেক মূল্যে গাঁথা বুকফুলগুলো
ছড়িয়ে গেছে পথে
আমি মাটিতে হাত দিয়ে
খুঁজে বেড়াচ্ছি দুচোখ আমার।


দূরে ছায়ায়
❑❑

বাঁশি তুমি দুলছ
আর হাড়ের ভেতরে বিষ নেচে উঠছে
তারা বেদম পোড়াচ্ছে আমাকে।
তোমার সংহারে ধমনি ছিঁড়ে যাচ্ছে খুব
বড় বিশ্বাসী হয়ে উঠছে স্বপ্ন।
তুমি তো সাপ নাচাও
তোমার ঝাঁপিতে অনেক শিকার।
আমার হাড়ের ভেতরে বিষতরঙ্গ দিয়ো না
আমি শিকার নই, বিশ্বাস করো হে সুর
অমন নূপুর ছেড়ে দূরে যেতে দাও,
অনেক দূরে, যেখানে একলা ছায়া,
যেখানে ছিলাম।


অচেনা জেলের জালে হারিয়ে গিয়েছে স্মৃতিগাছ
❑❑

পোড়াতে পোড়াতে জল নদীর ওপারে গেছে দিন
রূপনারায়ণে মুখ পেতে আছে চাঁদের সঙিন
সেতুর উপর দিয়ে দেশলাই ট্রেন গেছে চলে
কলকাতা, ময়দান, বইপাড়া সবকিছু ফেলে
শিরাময় দুটো হাত কাঁপন মেলেই আজো স্থির
ফুটপাতে দুটো চোখ দাঁড়িয়েই, কাজলগভীর
আচমকা দিনগুলো খেয়ে গেছে সময়ের মাছ
অচেনা জেলের জালে হারিয়ে গিয়েছে স্মৃতিগাছ।


গন্তব্য নেই
❑❑

ওভারব্রিজের উপরে হাওয়া নেই
বৈদ্যুতিক পোস্টের মাথায়
চুপচাপ বসে আছে একলা শালিক
একের পর এক ট্রেন চলে যাচ্ছে কোথাও
এই পথের চারপাশে একদিন ফুল ছিল
পাখিদের ওড়াউড়ি ছিল
এখন মাছের কাঁটার মতো পড়ে আছে রেলের লাইন।


বেঁচে ওঠার পর
❑❑

একটা নোংরা আলো শরীরে জড়িয়ে আছে,
ঘষে ঘষে তুলে ফেলতেই ফিরে এল
শান্ত অন্ধকার,
আলোর চেয়ে উজ্জ্বল।


একটি অনন্য বুলেট
❑❑

একটা নিরাপরাধ বুলেট ছুটে যাচ্ছে
যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে…
হাওয়ায় অরণ্যগন্ধ
বুলেটটি ছুটে যাচ্ছে বুক লক্ষ্য করে
সে আততায়ী নয়, কামার্ত কেবল
সে আলিঙ্গন দেবে
সে ভেদ করে চলে যাবে
বুক থেকে বুক।


সকাল
❑❑

সকালের আলোটা কেউ নিয়ে চলে গেছে
মাটিতে ছড়িয়ে আছে ফুল।
এত মেঘ যে কোত্থেকে আসে এখানে,
আর অন্ধকারে রেখে যায় আমাকে।
নিয়নের আলোয় শুধু কাগজের ফুলটা দুলছে,
নির্বিকার।


বদল
❑❑

মানুষ ঘন ঘন পাল্টে যায়
কুঁড়িরা বদলে ফেলে ডাল।
রোজ যে গাছে জল দিয়েছে
সে নয়
বরং, কী আশ্চর্য, যে ছিঁড়ে নিয়েছে
বোঁটা থেকে
তার কাছেই আমৃত্যু গন্ধ বিলোয় ফুল।
জীবন কত কী শেখায়
কত কিছুই!


অপেক্ষা
❑❑

তোমার দিকে মনের হাওয়ামোরোগ ঘুরেই আছে
অনেকদিন
তোমার কাছে যাবার জন্য পায়ের তলায় চাকাগুলো
বহুদিন থেকেই অস্থির
কিন্তু তোমার লন্ঠনের আলো তো এদিকে এসে পৌঁছায় নি
এদিকের অন্ধকার তো তোমার খুবই অচেনা।


ম্যাজিক
❑❑

ডান হাতে ফুল ছিল
আচমকাই বাঁ হাতে চলে এল সে
তারিফ করল আঙুলের, পেশির, নখের
ডান হাত আশ্চর্য হয়ে দেখল
তার মুঠো শূন্য হয়ে গেছে।
অন্ধকার হাততালি দিয়ে হেসে উঠল—
ম্যাজিক ম্যাজিক!


প্রতারক চাঁদের কাহিনি
❑❑  

দুরের প্ল্যাটফর্মে সন্ধ্যা নেমেছে আবার
বাঁশবনের মাথায় ডানা মেলেছে বাদুড়
পিপুলের ছায়াঘেরা পথে
দুটো নিঃশ্বাস হেঁটে যাচ্ছে পাশাপাশি

আচমকা আকাশে উঠেছে প্রতারক চাঁদ
বিলের পদ্মকুঁড়ি কেটেছে পোকায়।


ময়দান জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে একা
❑❑

ময়দান জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে একা
কলকাতার অরণ্যে ঢুকে পড়েছে ট্রামের লাইন
ঘোড়াগুলো আসে নি আজ
একটাও আর্মি কপ্টার ওড়ে নি আকাশে
পাততাড়ি গুটিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে একশো শালিক
ঘুড়িগুলো ওড়ে নি, হয়তো ছুটিতে গেছে তারা
ভিক্টোরিয়ার পরি শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে
আর কয়েকটা হারানো বিকেল ঘন হয়ে ঝুঁকে আছে সন্ধ্যার দিকে।


প্রিয় প্রতারক
❑❑

উছল জঘন মেলে চলে গেছে প্রিয় প্রতারক
সে আজ ফেলেছে মুছে দুঠোঁটের গাঢ় ইতিহাস
সলতে পোড়ানো রাত, ধারাপাত কবিতাযুবক
ভালোবেসে খেলার আগ্রহ, মাঠের মতন বুক, ঘাস
চুলোর আগুনে ফেলে গেঁথে রাখা অমল সুদিন
কিছু নয় শুধু তার সন্ধিসুখের কাছে ঋণ।


গান্ধর্বসন্ধ্যার গল্প
❑❑

একটা জুঁইফুল মালা
কাগজে মোড়ানো কিছু রক্তের গুঁড়ো
আর কয়েকটা গান্ধর্বসন্ধ্যা
নদীর জলে তিরতির করে কাঁপছে।
হাওয়ায় আগুন ছুড়েছে কেউ
দাউ দাউ করে পুড়ে যাচ্ছে চিতা, স্বপ্নময়।


দাঁড়াও যেখানে
❑❑

দাঁড়াও যেখানে, সেখানে তুমি কি স্থির?
দেখো, জীবন এমন নয়
তোমার ইচ্ছে হলে তুমি একজনকে দাঁড় করিয়ে রেখে অন্য কোথাও চলে যেতে পারো
কিন্তু সত্যিটা হলো, কাঠবিড়ালিও ভালোবাসাহীন জানালায় আসতে আসতে
একদিন আসা ভুলে যায়
হৃদয় তো অতলান্ত কিছু ফুল, যা শুকিয়ে যায় অযত্নে, অপমানে।
তুমি যদি ভাবো যে ফিরে এসে আবার তাকে পাবে
সেটা ভুলও হতে পারে।
যে দাঁড়িয়ে ছিল ফুল হাতে, সেখানে ফিরে এসে হয়তো তুমি দেখবে ফুল নয়, কিছু ছায়া পড়ে আছে।


[সন্ধ্যামণি : নষ্ট কবিতার গাছ বইটির মলাট এঁকেছেন অভিজিৎ পাল। উৎসর্গ : অরুণ কুমার মাজী।]

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com