হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : ডায়োজিনিসের হারিকেন

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ডায়োজিনিসের হারিকেন

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ডায়োজিনিসের হারিকেন
372
0

‘ষাঁড়ের মোষের তাড়া খেয়ে খেয়ে দৌড়ে যাচ্ছি স্পেনের রাস্তায়’, এমনই এক বিপর্যস্ত উচ্চারণ ছিল জিললুর রহমানের পূর্বপ্রকাশিত আত্মজার প্রতি (ডিসেম্বর ২০১৭) কাব্যগ্রন্থের অন্তিমে। সেটি ছিল এক অসামান্য দীর্ঘকবিতা, ছিল ‘ধূলি ধুসরিত হতে হতে প্রাণের স্ফুরণ’ এবং একই সময়ে প্রকাশিত আরেকটি দীর্ঘকবিতায়ও (‘শতখণ্ড’) সদ্য শোনা গিয়েছে কবির আর্তকণ্ঠস্বর—

‘মোরগের ডাক শুনে একদিন
ভেঙেছিল কুয়াশার ঘুম
একরঙা স্বপ্নের ঘোর
রাঙা হাতখানা ধরবার ঠিক আগেই
দূর-কুকুরের মরা কান্না বেজেছিল
পাহাড়ের বুকে
তারপর থেকে শুধু জেগে থাকা’

প্রসঙ্গত, বলা যায়, ‘শতখণ্ড’ জীবনানন্দ দাশের সংজ্ঞানুসারে ‘শ্লেষে লিখিত মহাকবিতা’ যা ‘আত্মজার প্রতি’ কবিতাটি নয়। ‘আত্মজার প্রতি’ এমনই কয়েকটি সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির উদ্বেগ থেকে উৎসারিত যা রচনাটিকে ধাবিত করেছে দীর্ঘকবিতার দিকে।

ডায়োজিনিসের হারিকেন কাব্যগ্রন্থের মুক্ত পরিসর স্পর্শ করা মাত্রই জিললুর রহমানের সদ্য প্রকাশিত বই দুটি পাঠ করে উপলব্ধ ওই নৈপুণ্য দুটির কথা মনে এল। ‘জ্বেলে দাও একমুঠো সোনালি বিদ্যুৎ’ এই আবাহনের আড়ালে—উৎসরণে—নিঃশব্দ বর্গায়তনে রয়েছে কত ঘনগহন কালো মেঘ। মেঘে মেঘে কিছু শ্লেষ, কিছু অশ্রু। ঈষৎ অবিন্যস্ত, তবু যেন সেই অবিন্যাসের মধ্যেই নিহিত রয়েছে পূর্ণাততি, এককে এককে নিবিড় হয়ে উঠেছে পাঠ সংহতি।

সর্বতপাঠক মান্য করবেন, যেমন করতে চেষ্টা করেছেন ডায়োজিনিসের হারিকেন-এর পাণ্ডুলিপির এই চকিত পাঠক—কবি জিললুর রহমান যেকোনো স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর-আধুনিক চেতনাপ্রবণ কবির মতোই বিশ্বসংসারে বাস করেন। সংসারটি তার কাছে প্রাথমিকভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য এবং দৃষ্টিনন্দন। কখনো কখনো অশ্রুভেজা থাকলেও দৃষ্টিপথ আচ্ছন্ন হয় না, বিদ্রূপের ঝিলিক উঠলেও চোখ হয় না আরক্ত। এই কবি অনায়াসে বলতে পারেন ‘রাত্রি বাড়ে শ্বাপদের প্রায়/ সন্ধ্যাতারা সাক্ষী রেখে জেগে আছি ভোরের আশায়।’  অথবা, দৃষ্টির দূরত্বকেও নিরাকৃত করে দিতে পারেন সহজস্বভাষায় :

‘তুমি তো প্রোটন কণা
টেনে যাচ্ছ কত ইলেকট্রন;
জেনেছ কি অনু পরমাণু
তাদেরও রয়েছে প্রেম, আছে মন’

উদ্ধৃতি অনাবশ্যক। কবির নতুন বইটি নিঃশর্ত সমর্পণ করা হলো পাঠককে। ভূমিকালিপিপ্রয়াসীর একটিদুটি অনুরোধ রইল শুধু পাঠকের কাছে। তিনি যেন বিচার করেন, কবি কিভাবে কথনের স্পন্দনের প্রতি আস্থা রেখে ছন্দকে ব্যবহার করেছেন। ভূমিকালিপিপ্রয়াসীর অবশ্য মনে হয়েছে সত্যসচ্ছল কবির মতোই তার কাছে একটি মহাইন্দ্রিয়চেতনার মাধ্যমে সমগ্র সংবেদন ধরা পড়েছে, অর্থাৎ দৃষ্টিনন্দন মিলেছে ধ্বনিনন্দনে। উপজাত হয়েছে ধ্বনিস্পন্দ। এবং আরেকটি কথা। অবক্ষয়ী আধুনিকতার বন্দিদশা থেকে তিনি মুক্ত করেছেন নারীসৌন্দর্যকে। তাকে অভিনন্দন।

—অমিতাভ গুপ্ত


ডায়োজিনিস

আমাকে এমন প্রজাতন্ত্রে কি করে রাখবে প্লেটো
কবি নেই
ভাব-ভালোবাসা নেই

লোফালুফি চলে আকাশ তারার হাটে
লাশের মসলাপাতি
দুরন্ত বখশিশ
বাজারে কেতাদুরস্ত
ভেতরে হিজড়া প্রাণ প্রতিবাদে মূককণ্ঠ

আজ আমি দিবালোকে হারিকেন জ্বালি
বাজারে বাজারে ঘুরি
কোথায় সে সক্রেটিস
গুরুর যুক্তির ধারা পালটে যায় ভুল মতবাদে

নির্বাসন দাও আমাকে এখুনি


নিদ্রা

৩০৯ বছর, নাকি ২০টা বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম গুহার ভেতরে? পরম বিশ্বাসের ঘোরে আযৌবন কেটেছে গুহায়। ফিরে দেখি বদলে গেছে চেনা পথঘাট, হিজল তমাল আর ডাহুক কী মানুষের ভাষা—তোমার শরীরটুকু হরিতে মিলায়। আমিও হয়েছি হরি; তুমি কোন অন্তরীক্ষে—মেটে নি পিপাসা। সময় পেরিয়ে গেলে বিশ্বাসে মেলে না বস্তু, হায়! কী ভাগ্য-লিখন! প্রিয় সারমেয় উধাও কোথায়…


টান

এইভাবে ক্রমাগত টেনে নিচ্ছ
বিগ ব্যাঙ থেকে অনস্তিত্বে
ব্ল্যাক হোলে—
কালো অন্ধকারে—
ঘন হয়ে বসো আঙুলে আঙুলে
তুমি তো প্রোটন কণা
টেনে যাচ্ছ কত ইলেকট্রন;
জেনেছ কি অণু-পরমাণু—
তাদেরও রয়েছে প্রেম, আছে মন
ওজন সলিলে দেখি অনিত্য অবগাহনে
তরঙ্গ উত্তাল কর্ণফুলী যথা খরস্রোতা মন
হয়তো দেখতে পাবে—
অনন্ত যৌবন তাকে
টেনে নিচ্ছে ভিন্ন বিশ্বে
নাম ছাড়া কোনো পিংক-হোলে


ধুলোবিদ্যা

যেমন নক্ষত্রগুলো আদমসুরত সন্ধ্যাতারা, একদিন ধুলো হবে বলে অনন্ত সময় ধরে বিলিয়েছে আলোর ফোটন—দ্রুত পথচলা আলোর ইশকুল যেন ছোটনের। যেমন চাঁদের কোনো আলো নেই, পেরেশানি সারা কৃষ্ণপক্ষ জুড়ে, সূর্যের প্রখরতা সহস্র বছর কেউ বন্দনা করেছে—জানে না ধুলোর পিণ্ডে কত শক্তি জমা—একদিন শীতল কুব্জটিকা যেমন ঢেকে নেবে; বিলীন হবার জন্যে জীবনের নিত্য ধেয়ে চলা…

যেমন বিলীন বিগত আঠারো বছর কাল—স্মৃতিকথা যেমন ধবল ধূলি—আমাদের নিঃস্ব করে দেবে পৌষের কুয়াশা রাতে—যেমন জীবন তার পড়ে থাকে…

কোন দিকে এগুবে কিভাবে! ধূলির ভেতরে কোনো স্বপ্ন নেই—তবু তো অজানা পথ—অন্ধকার গলির অাঁধার মুখ কখনো আশার কথা বলে। যেমন রঙিন প্রজাপতি উঠোনের হলুদ চড়ুই—বটের ছায়ারা যেন জন্ম দেয় নতুন পেত্নীর মুখ—পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধকার মনে—দক্ষিণের সবচেয়ে জলমগ্ন জীর্ণশীর্ণ গৃহকোণে; আমাদের মায়াগঞ্জে মানুষের বটবৃক্ষ হাঁটে…

মানুষেরা লম্বা থেকে আরো লম্বা হয়—ধেয়ে যায় আলো আর আলেয়ার বিপন্নতার দিকে…


লাল ঝরনাধারা

পথ, ফিরে যাও ঘরে—জরায়ু জঠরে; মহাসড়কের দিকে চলে যাবে রক্তস্রোত—জলোচ্ছ্বাসের বেশে দালানে খিলানে বয়ে যাচ্ছে লোহিত সাগর।
গুয়ের্নিকার তুলির আঁচড়ে—ঘোড়ার-ষাঁড়ের চোখগুলো কোয়েলের ডিম হয়ে বন্ধ করে নেবে পাতা—কেবল নেত্রকোণা জমা দেবে একেকটি রক্তাভ অশ্রুফোঁটা।
নদী, জোয়ারের ঢলের বেগে ফিরে যাও—লুসাই গহ্বরে—আমাদের মেয়েরা আজ নিজেরাই নদী—আশরীর লাল ঝরনাধারা …


কাঁকড়া জীবন

ক্ষুদ্র গর্ত ছেড়ে আট পা গলিয়ে চলো
দেখে নেব জোয়ারের কত বাকি৷

কত রঙের ঢঙের ঝিনুকেরা বালুকাবেলায়
কত তারামাছ কত কাছিমের ডিম
জমে আছে চরে!

দেখে নেব জেলেদের জালে
চাপিলার ছটফটানো সূর্যাস্তের কালে
অথবা দেখব ভোরে
কতটা শিশির ধরে ঝাউপাতা৷

আমাদের লাল ত্বকে সূর্যের আলোক চাই
হতে পারে, মানুষ আমাকে আগুনে ঝলসে নেবে—
আমি লাল থেকে আরও লাল হব

তবু মনে রেখ সোনাদিয়া চরে
আমারও রয়েছে দাবি ঘুরে বেড়ানোর৷


[২০১৮ বইমেলায় প্রকাশিত জিললুর রহমানের কবিতাবই ডায়োজিনিসের হারিকেন।বইটির প্রকাশক ভিন্নচোখ, প্রচ্ছদশিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলা ৩৪৮ নং স্টলে।]

জিললুর রহমান

জন্ম ১৬ নভেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, উত্তর আধুনিক নন্দনতত্ত্ব চিন্তক জিললুর রহমান। আশির দশকের শেষার্ধ থেকে লেখালেখি করেন।
পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী।

শিক্ষা : এমবিবিএস, এমফিল (প্যাথলজি), পিএইচডি।

পেশা : সহযোগী অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

প্রকাশিত বই :

অন্যমন্ত্র [কাবিতা, লিরিক, ১৯৯৫]
শাদা অন্ধকার [কবিতা, লিরিক, ২০১০]
উত্তর আধুনিকতা : এ সবুজ করুণ ডাঙায় [প্রবন্ধ, লিরিক, ২০০১]
অমৃত কথা [প্রবন্ধ, লিরিক, ২০১০]
আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্ব : কয়েকটি অনুবাদ [অনুবাদ, লিরিক, ২০১০]

সম্পাদনা :

তরঙ্গ (১৯৯০, ১৯৯১)
‘লিরিক’ বুলেটিন (১৯৯৫)
জুলাই ২০১৭ থেকে কবি জিললুর রহমান-এর সম্পাদনার যাত্রা শুরু হবে সাহিত্যের নতুন ছোটকাগজ 'যদিও উত্তরমেঘ'।

সম্পাদনা পরিষদ সদস্য—
‘লিরিক’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা
‘লিরিক’ উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা ১,২,৩,৪

ই-মেইল : drzillur@gmail.com