হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : একাই হাঁটছি পাগল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : একাই হাঁটছি পাগল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : একাই হাঁটছি পাগল
393
0

পাগলের জগৎটা যে কেমন আমরা তা জানি না। তার কী সঞ্চয়, কী-বা অপচয়, বাইরে থেকে আঁচ করা মুশকিল। হয়তো শরীরই সম্বল তার। ‘আসলে শরীরের চেয়ে মহৎ কোনো গ্রাম নেই—শহর নেই—কিছুই নেই। এটা মৃত্যুর মতোই গাঢ় এক ঋষি—ছুঁয়ে দিলেই বাজে!’ বাজে। কিন্তু কী বাজে? শরীরভরা স্মৃতি ও বিস্মৃতির ঝংকার? কোনো অর্থ কি আছে তার? স্মৃতি ও বিস্মৃতি, যুক্তি ও অযুক্তির বিপর্যাস বা ডিসটর্শন—এমন বললেও সবটা বলা হয় না। আমাদের উপলব্ধির সংজ্ঞা-সরহদ্দ পেরিয়ে চেতনার অন্য এক স্তরে যখন কেউ উপনীত হয়, ক্রমাগত ব্যর্থতার মধ্যেই স্ফূর্তি পায় তার ইশারা-ভাষা। যাকে আমরা বলি দুরূহতা। অনর্থকতাও বটে। কিন্তু সেই অনর্থকতা বা দুরূহতার আছে মায়াবী হাতছানি; অতল অগাধ জলে নামবার প্ররোচনা। একাই হাঁটছি পাগল-এর কবি এমনই এক রহস্যসুন্দর জগতের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে চলেছেন।

—সোহেল হাসান গালিব


মানুষ

মানুষ—একটি গাছের মেজাজের মতো সুন্দর। অথচ পাখিরা ফুরিয়ে যায় হেলায়—সাপের হিস হিস শব্দের নিচে—বৃষ্টির ভেতর, রঙিন পশমের জামায়।

যেন লিখে রাখা বকের স্মৃতি—ভালো-মন্দ হাওয়া। পড়ে আছে দুপুরের সমস্ত জ্বর—প্রেম ও পরিখার নিচে, এই ঋতু—টঙ্কারের ভাষায়।

অথবা মৃত্যু নিরাপদ—শালুকের হাসির ভেতর, সে এক জাদুজীবন! আমার নিদ্রা গেঁথে আছে—না সময়ের নিচে—এক বৃদ্ধ আলো তার, শুধু জামা পাল্টায়!


পরম কথা

পরম কথা নিয়ে ভাবতে ভাবতে তুমি যেকোনো মহাসড়ক ধরে হেঁটে গেলেই হয়ে উঠতে পারো একটি সুপার ল্যাম্পপোস্টের নিচে এইমাত্র জন্ম নেয়া শিশুটির মতো এক হাস্যোজ্জ্বল জীব—যার সঙ্গে এই মুহূর্তে খেলা করছে রাত্রি ও অসংখ্য তারার ঘোড়াগুলি!

সঙ্গে নিতে পারো একটি নীল বিড়াল—সাদা ইঁদুর, যাদের চোখ ভর্তি মাছ আর পাকা ধানের কল্পনার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদী ও ফসলের মাঠ,—আর যে ঘোড়াগুলি আকাশে ডিগবাজি খেতে খেতে তাদের ডানা তোমার দিকে ছুড়ে দিচ্ছে তুমি তাদের সঙ্গেও যেতে পারো আরো দূরে এবং বহুদূরে।

এমনকি হাতের আঙুল দিয়ে বাজাতে পারো অদ্ভুত সব সুর—গড়তে পারো হাজারো আকার-আকৃতি এবং মুহূর্তেই হতে পারে সে এক সোনালি ব্যাঙের জগৎ!

—যারা হাসলে ঝরে পরে হীরার বৃষ্টি কিংবা শিশুতোষ আইসক্রিম। আর আম্মার গর্ভের মতো অন্ধকার থেকে হাজারো নক্ষত্রের তোড়া হাতে তুমি হাঁটতে হাঁটতে হয়ে উঠতে পারো বিস্মৃত… বিস্মৃত… বিস্মৃত…


এই হেম

জগৎ যতবার দেখি—ফুরিয়ে যায় প্রেম, এই হেম! বিস্ময়ে জ্বলে ওঠে আমারই চোখ। আমি অন্ধ হই—তুমি উজ্জ্বল—সি-মোরগের খসে যাওয়া একটি পালকের মতো পৃথিবীময়।

অথচ আমার হৃদয়—বাজনা তোলে তোমারই কানে। যেন একই গান ত্রিশটি পাখি তার ঠোঁটে নিয়ে কুহেকাফে এসে মিলে! তারা একই দেহ। হে আলো—আমার নষ্ট চোখ, ফুরিয়ে যায় প্রেম। এই হেমসমূহ!

কী আছে আর—হ্রদে—পাহাড়ে—গাছের কিনারে? এই যাতনা তো ভয়াবহ। আলো—ফিরে এসো। আমি ফিরে যাই—তুমি আমি একই তো, প্রেমের সন্ধানে নেচে বেড়াই।


কবি, তিনিও চলে যান

যেন মাস্তুলে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ। আমাদের শরীর এমনই ছোট যে, তার ছায়াগুলো পাখিরা ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় হাওয়ায়! হে জলতরঙ্গ—ডাকার জন্য মানুষ তো মানুষের দিকেই তাকায়।

বুঝি এই আলোড়ন ফুলের মুখ থেকে আসে। আসে—পাটখড়ির শব্দের ভেতর থেকেও—আলোর মৌরি।

প্রতিটি ঋতুই যার যার—অমর হোক। আর আমার জীবন ঘুমিয়ে থাক মেয়েদের বানানো বস্ত্রের ভেতর—যার আঙুলে ফুটে ওঠে জীবন। অথচ দ্যাখো—চর্মচক্ষু এই ফল।

ফসল—সংগীতের মতো কত মৌলিক—নেচে যায় স্ফীত মুদ্রার ভঙ্গিমায়। যেন একটু আগেই চন্দ্রবিন্দু তার পোশাক খুলে বলেছিল, এখানে শুয়ে থাকা ধ্যান একটি ব্যাধের মতো—আর মৃত্যু কেবল বিন্দু বিন্দু ধারণা বিশাখার!

এবার আঁকো সব। প্রেম—হত্যাযজ্ঞ, বাড়ির পাশে বাড়ি। যারা চলে যায় আকৃতি ছেড়ে—তারা শব্দহীন প্রেমিকসমূহ। এখানে-সেখানে নম্র ছায়া, মায়ার গতি—প্রকৃতি যেন একটি আয়ুর হ্রদ—বেয়ে তিনিও চলে যান…


[একাই হাঁটছি পাগল বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী : সারাজাত সৌম; নামলিপি : অমিত মণ্ডল (কোলকাতা); প্রকাশনী : জেব্রাক্রসিং। বইটি পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, স্টল নং : ৬৬০ এবং লিটলম্যাগ : ৪৫ কর্নার-এ।]

সারাজাত সৌম

সারাজাত সৌম

জন্ম ২৫ এপ্রিল ১৯৮৪, ময়মনসিংহ। পেশা : চাকুরি।

প্রকাশিত বই :
একাই হাঁটছি পাগল [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : showmo.sarajat@gmail.com
সারাজাত সৌম