হোম কবিতা পরিদৃশ্যের পরিভাষা

পরিদৃশ্যের পরিভাষা

পরিদৃশ্যের পরিভাষা
848
0

১.
কবরের ভেতর মানুষটি আড়মোড়া ভেঙে ওঠে বসেছে; চুরুট টানছে। মৃত মানুষটির আঙুলে আটকে থাকা চুরুট জ্বলছে; চুরুট খুব ধীর গতিতে পুড়ছে যেমনটা আতশকাচের প্রখরতায় গাছ থেকে খসে পড়া শুকনো পাতার অপর পিঠে আড়ষ্ট ভঙ্গিমায় জ্বলতে থাকে ‘আগুন’।

আমরা আতশকাচ ও চুরুটের সমন্বয়ে তৈরি আকাঙ্ক্ষাজীবী জীব; মানুষটি কবরের ভেতর এইসব ভাবছে আর চুরুটের ধোঁয়া কবরের ফাঁকফোকর গলে আকাশের দিকে ওঠে যাচ্ছে।

২.
হাঁসগুলো ডানা ও পালকের ভাঁজে স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে আসছে জলাশয় থেকে; সবুজজলের জলাশয়। সবুজজলের নিচে বসিয়ে রাখা হয়েছে আমাকে। যেভাবে আমার জন্মের সময়, আমার শ্যাওলামোড়ানো আমিত্বকে, আমার নিজেরই মাংসপিণ্ডের ভেতর ঠেসে রাখা হয়েছিল।

হাঁসগুলো আমাকে বিলকুমারীর সবুজজলের নিচে বসিয়ে রেখে ফিরে যাচ্ছে ঘরে; ওদের ডানা আর পশমের নিচে জলমগ্ন স্বপ্নগুলো কাঁপতে শুরু করেছে; আর আমি জলের গভীরে বসে ভাবছি, হাঁসের শরীরে কিভাবে ‘মাংশ + স্বপ্ন’ যৌথমগ্নতায় ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।

৩.
একজোড়া হরিণ আমাদের পথ আটকে দিয়েছে। হরিণ দুটো অবিরাম স্বপ্নের মতো স্বাধীন ও লাল; যেন-বা সহসা থেমে আছে গতি, লাল রঙের ভেতর; অস্থির। যেন-বা এখনি হারিয়ে যাবে এই দৃশ্য চোখের রেটিনা থেকে দূরে, ওই গ্রীষ্মপথের ওপর, ছুটন্ত; বর্ষাঋতু বরাবর। এইসব হরিণদৃশ্য দেখে মনে হলো, দ্বীপান্তরে আছি, রমণীর জরায়ুর ভেতর, ‘স্বাধীন + লাল’।

৪.
আলোগুলো অর্গানিক। খসে পড়া পাতার মতো শূন্যে ভাসছে; সময়হীন; শীতকালীন ভাইরাস। আলোগুলো চুম্বনরত। সম্ভবত শেষচুম্বন। আলো ফুরিয়ে যাবার আগেই আরও একবার গ্লাসে ঠোঁট রাখলাম; কেউ যেন চাবি দিয়ে খুলে দিল মগজ। ‘চুম্বন’ হলো সেই চাবি যে তোমাকে পৌঁছে দেবে অর্গানিক আলোর কাছে; যেখানে, ‘চোখ + চুম্বন = জানালাবিহীন দেয়াল’; যে জানালা কোনোকালেই খোলা হলো না তোমার।

৫.
দুপাশের গাছগুলো গতরাতের বাসি হয়ে ওঠা শরীরের বাকলগুলো খুলে ফেলতে শুরু করেছে। একটা পুরোনো সাপ এইমাত্র শরীরের খোলস ছাড়িয়ে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রীষ্মপথ ধরে ধীরে ও ভ্রুক্ষেপহীন। পুরোনো ও ছেঁড়া চামড়া অর্থাৎ আমরা যাকে সাপের খোলস বলি সেই অকার্যকর নষ্ট ও বাতিল চামড়াটা দেহ থেকে পরিত্যাগ করার পর এইমাত্র সাপটি ‘সত্যিকারের সাপ’ হয়ে উঠল।

আমরা এইভাবে সাপের মতো পুরোনো অকার্যকর নষ্ট ও ছেঁড়াফাটা চামড়া অর্থাৎ শরীরের খোলস বা মুখোশ যাই বলি না কেন পরিত্যাগ করতে পারি না। গ্রীষ্মপথ ধরে সত্যিকারের একটা সাপ আর একজন নকল মানুষ গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে শহরের দিকে।

৬.
অনুভবলিপি অর্থাৎ ভাষাচিহ্ন, আমরা যাকে ‘লেখা’ বলছি পক্ষান্তরে ওইগুলো তোমার ‘জমজ’। যখন কোনো কাজ থাকে না, তখন এইরকম বৈশিষ্ট্যহীন সন্ধ্যায় আমাদের জমজেরা ঘুরে বেড়ায় রাস্তায়। আমাদের ডাকনামের শরীরে রাখাইন তাঁতি মাকুর হাতে বুনে দিয়েছে শীতের চাদর। চাদর নিজেই এক ‘ভাষা’ যে কিনা উষ্ণতার ভেতর মিশিয়ে দেয় গান।

৭.
উড়াল দিয়েছে পাখি। ডানার মর্মর থেকে ভেসে আসছে গান; গানের ভেতর থেকে একজোড়া পাখি উড়ে এসে একটি আমার কাঁধে আরেকটি ডান হাতের কব্জিতে বসল। কার বুকে ঘঁষে দেবো ‘পালক’? ‘পালক, অর্থ ‘কথা’, যে তোমার ‘জমজ’।

৮.
জানালার বাইরে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে হাত বাড়িয়ে ওকে লটকে দেই আয়তাকার জানালার গ্রিলের ওপর। স্পর্শকাতর সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে, তলিয়ে যাচ্ছে, কেউ ওকে ধরছে না, হারিয়ে যাচ্ছে জানালা থেকে।

ঘন হয়ে আসছে ছায়া; ঝুঁকে দেখতে গিয়ে গাঢ় হয়ে এল ‘দৃষ্টি’। জানালার বাইরে কেউ আকাশ রাখে নি; যেখানে টানিয়ে রাখব সূর্য। জানালার বাইরে ‘হাহাকার’ শব্দটি ঝুলে রয়েছে।

৯.
আমার চোখ হাঁ করে তাকিয়ে আছে শূন্যতার দিকে। শূন্যতা ভাসছে; যেভাবে খসে পড়া গাছের পাতা ভাসতে থাকে বাতাসে, খয়েরি ও খসখসে, শিরাওঠা। আমার চোখের ভেতর একটা আস্ত সমুদ্র ঢুকে পড়েছে; তা না হলে আমি কেন দেখতে পাচ্ছি সমুদ্রসীমায় কাঁপতে থাকা শূন্যতা; গতরাতের খুন হয়ে যাওয়া ‘নির্জনতা’। নির্জনতাগুলো গান হয়ে গাছে গাছে নাচছে। শিশিরের ঠোঁট থেকে ঝড়ে পড়ছে স্মৃতি। নৈঃশব্দ্যের ছবি আঁকতে গিয়ে এঁকে ফেলেছি সিগারেট, একটা শিরাওঠা খসখসে খয়েরি পাতা, মোঘল আমলের ময়ূর। আর তখন চারদিক অন্ধকার করে চিতোয়ানের ফরেস্টে বৃষ্টি নামল, ‘ঘন + গভীর’। আমাদের ‘জমজবৃষ্টি’।

১০.
ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে রাত্রি; জমাট এবং ছাইবর্ণের; বহুব্যবহৃত সেলাইকরা কাথার মতো। যেখানে সেলফোনের টাওয়ার নেই সেইখানে ভেসে বেড়াচ্ছে রাত। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে গুপ্তঘাতকের মতো নিসর্গ; অর্গানিক অন্ধকারের আঁশটে গন্ধ। নোনা বাতাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ফটোগ্রাফ। মনখারাপগুলো হেঁটে যাচ্ছে ফরেস্টের দিকে। রিসোর্টের দক্ষিণে লাগোয়া বনাঞ্চল; আদিম ও স্বাধীন।

(848)

শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu