হোম কবিতা নরকে, র‌্যাঁবোর সঙ্গে

নরকে, র‌্যাঁবোর সঙ্গে

নরকে, র‌্যাঁবোর সঙ্গে
756
0

আমি হচ্ছে অন্য কেউ,
জীবন তোমার
জীর্ণ জয়জলসায়
শব্দের শবস্বাদ।
চাঁদের চিন্তাকাঠামো থেকে
আমার অন্ধকার বিকাশ॥
আবহমান লিরিকের ইউরিন্যাল
ক্বচিৎ ময়ূরমহল;
এই-ই তো
শতকের শ্রেষ্ঠ কবিতা
কেকা আর বর্জ্যে ভূষিত।
প্রাণের ভেতর পঙ্‌ক্তির গাছপালা
সবুজ পানশালা
আমি হচ্ছে এমনই অন্য কেউ
রাখো রাখো, টুকে রাখো
নিরোগ টিকাটিপ্পনি
টাল হওয়ার; মেদো আমার।
যাপনের জন্য জীবন এক
যাচ্ছেতাই জুয়া
মায়ের গর্ভফুলে প্রস্ফুটনপূর্ব
পেয়েছি সেই সূত্রের সুর।
মাতাল কিশোর কবির দেহদেবদারু
তবু এক প্রোজপোয়েম
গীতিগদ্য।
অমিল অক্ষরের আনন্দে
বিড়ম্বিত বেড়ে ওঠা
বাড়িয়ে চলেছি নিজেরই
ডেথ রেফারেন্সের সংখ্যা।
দেবীদের দোলনায়
ঝুলনখেলার আগেই মজেছি
কবরের কালাভ লীলায়।
আমার শ্বাসের স্রোতে প্রসারিত
খরার সমুদ্র।
অন্তরে আগুন নিয়ে
যারা সমর্পিত
জলের জায়নামাজে
তারা কেউ জানে নি
আমার একান্ত প্রভু স্বয়ং
প্রার্থনাত্যক্ত।
সামনে ধুধু ধরিত্রী
জমি আর প্রেমের
পরিসীমা মাপা যায়
শনাক্তির অপেক্ষায় আকুল
ঘৃণার উৎস-অশেষ।
আমি কবি
নাকি উদ্বাস্তু করবী?
প্রেমসঙ্কুল পরিদের
ডবকা ডানায়
চাই নি অগত্যা-আশ্রয়
আমাকে বুঝিয়ে দিলেই হতো
আমার কান্নার কাসকেট।
তোমাদের হাতে হাতে
ছন্দের শান দেয়া তলোয়ার
পায়ে উপমার আলতা-আভা।
ধন্যবাদ দেবী
পদাবলির আশীর্বাদমুক্ত আমি,
পাত্রে পাত্রে পান করি
মাটির মধুর দুধ।
বাগানব্যাকুল নই, অরণ্যে উর্বর
কোল্ডস্টোরেজে ভরা
সুসমাচারের বস্তা,
গরম পড়েছে ধারণার অতিরেক;
আলু-পচা গুদামের গন্ধ—
মুখ চেপে পালিয়ে চলি
ওই তো নন্দনের রশ্মি
সুদূরের সাগরিকা
আত্মার উপকণ্ঠে
বাক্সভর্তি আবোলতাবোল
হিংটিংছট।
হে যৌনমাঠ,
মরমি ঘাসের প্রকাশ,
শ্লীল হলেই শান্ত ও শীতল
আরতি মানেই আরাধ্য অশ্লীল
যদি কবি হও
পাবে না বন্ধুর বিন্দু
তোমার জন্যই তবে শত্রুর সিন্ধু।
বীণাটা বাজতে থেকো
আমি হচ্ছে অন্য কেউ
আমি নয়
রোদনের রাগতালনামা,
বেঁচে থাকার বিষণ্ন ব্যাকরণ থেকে
কতদূর তুমি
বসন্তের কয়েদকুটি?
জীবন নামের জানোয়ার দেখতে
চোরবাটপার, শিশু আর সন্ত
সবাই দলবেঁধে চিড়িয়াখানাতে।
যিশু তাঁর রক্ত-মহান রাস্তায়
আমার জন্যই রেখে যায়
প্রাণের পেরেক;
তাকে বুকের বিথারে লয়ে
কুয়াশাসড়ক ধরে ঈশানকোণে
গহন গ্রীষ্মাবাসে
টুপটাপ অমৃত-বরষাত।
গরলের চুমকিতে গাঁথা গম্বুজে
প্রয়াত স্বপ্নের স্মরণসভা
তুই তুমি আপনি—
সবাই ছিলে শ্রোতা
আর আমি লাজুক বক্তা।
ফরাসিদেশ থেকে আবিসিনিয়া
কতটুকু গাঢ় হলে
পাপের পরাক্রম
পাওয়া যেতে পারে পুরোপুরি
নরকের রূপ-রীতি-প্রকরণ!
শিল্প তো
অপরিমেয় অতীতের শহিদ
এখন যা আছে
শিল্পের কোট আর বুট।
শিল্পের শুমারিতে নাম নাই তোমার?
ঠেকানো যাবে না তবে
অগস্ত্যযাত্রা; কবিতার।
কবি নই আমি
বেগানা চুম্বনের চোরাকারবারি।
পবিত্র পুঁজের পালক এই প্রাণ
এক প্রাচীন পুরাকাজ;
শার্লভিল থেকে মার্সেই
উন্মাদ-তরণী বাওয়া চলছেই।
তোমাদের আলোর সকাল
গন্তব্য আমার
শোভাকুসুম শয়তান
আমি হচ্ছে অন্য কেউ
সংগীতের সলিলে সিক্ত
ঘাতকদের সময়
হাসিস, হারার, জাঞ্জিবার।
তারপর চেয়েছিলাম ভোর;
ভেরলেনে ভরপুর।
হে আমার ভালোবাসার বন্দুক
নিগ্রহেই এই বেয়াড়া বান্দার
আগ্রহ অপার।
মৃত্যুর পরও শেষ হয় না
আমার মৃত্যুর মানত।
মা তুমি ছেলের জন্মের জন্য
জারি রেখো কনফেশন।
কায়রো, বাটাভিয়া, এডেন
গেঁটে বাত, কৃমির কূটচাল
দুনিয়ার কাছ থেকে
সব আমার প্রাপ্য রাজস্ব
আশাতীত পাওয়া
স্নায়ুশূল, ক্রাচে ভরে হাঁটা।
ইসাবেল, বোন আমার
চিঠিতে, প্রেরিত কালো অবয়বে
কতটাই পাস আমার
অন্তরের আঁধার?
অন্ধকার ভ্রাম্যমাণ
ব্রাসেলস, প্যারিস, লন্ডন, সুদান
পত্রে পল্লবিত বালকের ভূয়োদর্শন
পাঠিকা ও পাঠক,
যদি তোমাকে করে
কাঙ্ক্ষিত পথভ্রষ্ট
তাহলে সার্থক
ইত্যাকার ইল্যুমিনেশনস।
আমার এলেবেলে
কবিতার খাতায়
রক্তঘামে আয়-করা
চেকবই রাখা
যেকোনো ব্যাংক থেকে
ক্যাশ করা যাবে
দেড়শ বছরের বুড়োটে কান্না
অশ্রুর আয়নায় যায়
দেখা যায়
চিরকিশোর অক্ষরের
অভিশপ্ত আয়ু।
নিকোশিয়া, আলেকজান্দ্রিয়া, সোমালিয়া
কোথায় পুঁতেছিলাম
‘আমি’ নামের আমিষ উদ্ভিদ!
তোমাদের তাপসী তরুতলায়
পড়ে আছে আমার বিক্ষত
ভাষার হৃদয়।
শস্য আর স্বর্গের মঞ্জিল ফুরোলে
সর্বত অভাবের আনন্দে
জাগ্রত শাশ্বত লুসিফার লেন।
বিষাদের প্রসূতিসদনে
সরাইখানা খুলে খাই
লেপামোছা শব্দের চুরমার।
আমার ভেতরে যে প্রসন্ন পাগল
সে কখনো হওয়ার নয়
আরোগ্যের ক্রীতদাস।
তার আত্মার অভিভাষণ
শুনে থাকলে বুঝবে
জীবন-প্রেম আর কবিতার তেরছা লড়াইয়ে
মুহুর্মুহু মৃত্যুগ্রহণ করে
জন্মবরণ করেছে সে।
কে?
যে আমি হচ্ছে অন্য কেউ।
মায়ামনীষার বেদিতে
তার তেতো তর্পণ;
অসহ সাঁইত্রিশ বছর।

ডিয়ার ভেরলেন,
চেখে দ্যাখো।
শতাব্দীর চুল্লিতে আমি কি
সেদ্ধ হয়েছি যথাযথ!
বেসুরো আমাকে ঘিরে
ধ্বনিত হোক
তোমাদের তিন উল্লাস;
লিরিক্যাল লাঞ্চ।

২৩ মে ২০২০

পিয়াস মজিদ

জন্ম ২১ ডিসেম্বর,১৯৮৪; চট্টগ্রাম। স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর
ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
নাচপ্রতিমার লাশ [২০০৯]
মারবেল ফলের মওসুম [২০১১]
গোধূলিগুচ্ছ [২০১৩]
কুয়াশা ক্যাফে [২০১৫]
নিঝুম মল্লার [২০১৬]
প্রেমপিয়ানো [২০১৯]
ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী [২০১৯]
নির্ঘুম নক্ষত্রের নিশ্বাস [২০১৯]
দুপুরের মতো দীর্ঘ কবিতা [২০২০]
গোলাপের নহবত [২০২০]
বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য [২০২০]

ই-মেইল : piasmajid@yahoo.com