হোম কবিতা নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-১
নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-১

নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-১

159
0

মোহাম্মদ রফিক

দে দে পাল উড়াইয়া দে

ছেঁড়া-ছেঁড়া ভাসমান মেঘ
বিচ্ছিন্ন বিবিক্ত ব্রতহীন
ব্রতচারী কোথাও উধাও
দিকচিহ্নহীন দিশাহীন দীন
কালো কালো দুঃখভারাক্রান্ত
মুখভাঙা দেহ নুয়ে পড়া
কর্মহীন কর্মযজ্ঞে যেন পশু
প্রাণিকুল ক্ষুধায় বিকৃত
বিশ্বমানচিত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
দেশান্তরে অভিবাসী জীর্ণ
পরাজিত ক্ষুব্ধ আদিবাসী
পাহাড়ে কন্দরে স্থলে জলে
মহাসমুদ্রের ঢেউয়ে চূর্ণ;
আজ তারা একে একে দলে
অলৌকিক তাড়না নির্দেশে
একীভূত একত্রিত রাশিরাশি
মেঘে-মেঘে গর্জে ওঠে এই
বাংলার আকাশে; শতকণ্ঠে
গান ধরে শ্লোগানে শ্লোগানে
বিদ্যুৎ-বহ্নিতে প্রভঞ্জনে
প্রাণিত আবেগে প্রকৃতির
একতানে ঐকতানে, মুখে
ব্রহ্মাণ্ডের মানবসংগীত
জয় হবে জয় আজ এই
পহেলা বৈশাখে, রাজপথে
ময়দানে, তৃণে, আগামীর!
আকাশ উপচিয়ে মেঘ তাই
ইতিহাসে অন্যপৃষ্ঠা খোলে।

 

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী

অনন্তধাম

যখন খুলবে ঘুমের দরোজা
তার ঘোর-মজা
দেবে কোনো চোখ—
ভুল উড়ে যাবে, নতুন চমক
দেখাবে সত্য ক্ষত-পরিসর—
তুমি-আমি চর?

এখন বাজবে জাগরণবিধি
হারানো স্বপ্ন হাওয়ার পরিধি
এপাশে-ওপাশে অদ্ভুত স্বর
হারানো প্রহর?

তখন দেয়াল কবরের নাম
অনন্তধাম!

 

 

মৃদুল দাশগুপ্ত

দুটি কবিতা


বিচিত্র বালিশে নিদ্রা দ্রুত এল নেমে
তবু সে অধিক রাতে
বেঘোর ব্যাকুল হাতে
একটি মেঘের স্তূপ ধরা দিয়ে ভিজে গেল ঘেমে।

এবার সীমানভেদী আকাশের সিকি ভাগ
                                      তারাদল-সহ
বদলালো ছায়াপথ নিকটের বা দূরের সকল আবহ
এরপর থেমে থেমে
মহাকাশ এল নেমে
                    খুলে গেল ভাঁজ
কম্পিত থুতনিতে
মৃদুভাবে টোকা দিতে
মনে হলো পেলব, সলাজ


দেখা ও সাক্ষাৎ শেষে দুদিক ফিরল হেঁটে
                                        যে যার সস্থানে
ঠিক তার আগেভাগে
সড়কের ডোরা দাগে
এগোনো পেছনো নিয়ে যারা যারা অতি সাবধানে
থতমত খেয়েছিল, তা কি অকারণ?
দশদিক একত্র হয়ে যেই আলিঙ্গন
                      মনে হলো কী বিরাট ঢিবি!

টুপ করে গহ্বরে পড়ে গেল তখন পৃথিবী

 

 

গৌতম বসু

সুকুমারীকে না-বলা কথা

আলোকচিত্রটির মতো পুরাতন হয়ে পড়েছিলাম ৷
পিছনের দালান বলতে আমার স্মৃতি যে সুবৃহৎ
অঞ্চল ধ’রে রাখে, আসলে তা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এতটুকু,
ছবি উঠবে ব’লে লুঠ হয়ে গেছে দাবার শতরঞ্চি ৷

তোমার নাম আবার উচ্চারণ করলাম, সুকুমারী,
এই কারণে যে, আজ আমি দক্ষিণের শূন্য হলঘর;
খিড়কির ফাঁক দিয়ে এক ফালি রোদ ঢুকেছে অন্তরে,
নেমে এসেছে, মন্থর ধূলিকণা সেথা সদাভাসমান ৷

তোমার নাম আবার উচ্চারণ করলাম, সুকুমারী,
এই কারণেও যে, হাতলঅলা কাঠের চেয়ারে যাঁরা
গভীর অনুকম্পায় ব’সে, তাঁরা আমার পূর্বপুরুষ,
আমিও আছি হাবাগোবা, লুঠ-করা শতরঞ্চির ’পরে ৷৷

 

 

মাসুদ খান

যোগাযোগ

গোলার্ধ দূরত্বে থাকো তুমি, প্রতিপদ দ্রাঘিমায়।

যখন সেখান থেকে কথা বলো দিনের বেলায়
সে-কথারা আসে মহাসাগরের তলায় বিছিয়ে-রাখা এক
স্ফূর্ত আলোতন্তুর ভেতর দিয়ে।

তাই তো তোমার সেই কণ্ঠস্বর কীরকম ভেজা-ভেজা
আর মৎস্যকুমারীর লাস্যভরা বুদবুদের সুগন্ধ-জড়ানো!

পক্ষান্তরে রাতের বেলায়
তোমার কথারা আসে উল্কার উষ্ণতা নিয়ে।
সারা গায়ে তারা-জ্বলা উল্কি, কিন্তু নিঝুম নির্জন এক কথার সিরিজ।

সে-কথারা আসে
দূরের আকাশে ছেড়ে-রেখে-আসা বিষণ্ন অনাথ উপগ্রহে প্রতিহত হয়ে
অন্ধকারে, সন্তানসন্ততিসহ, দাঙ্গাবিতাড়িত সারি-সারি শরণার্থীদের মতো
রুক্ষ সান্ত্রিসেপাই ও কাঁটাতার-কবলিত অনেক সীমান্ত পার হয়ে।

 

 

সাখাওয়াত টিপু

ময়নার দিকে যাচ্ছে লালফৌজ

বড় অসময়ে কাক ডাকলে নগরে
অহরহ কোকিলে বেদনা করে!
শহর তোমাকে ছেড়ে যাবেই-বা কই?
সেই স্মৃতিটুকু ঠুকরে খাবে কি কেউ?

কালো ধানগাছে বসে আছে ফিঙে
বিষণ্ন ফড়িং ভাসছে দখিনা বাতাসে
আজ সে শিকার করবে না কোনো
ভাবছে শুধুই ময়নার দিকে চেয়ে।

চুম্বন দিবস আজ, তোমাকে দেবে কি কিছু!
নিশ্চয়ই তুমি পাখি সেজে আছ একদম।
দিকে দিকে লালফৌজ নামছে শহরে-গ্রামে
কালো পাখিরা বদলে যাচ্ছে মানুষের নামে!

 

 

অশোক দেব

হ্যালুসিনেশন

উষাকাল
মেজে
একজন ফুলওয়ালি
ফর্সা করে দেয়।

কাল রাতে
চুরি হলো
মুদিওয়ালার
চিরুনি।

হা করা
দোকানের
সামনে সে
নিজেকে
ধূপ দেখায়।

ফুল বেচা টাকা
ব্লাউজে গুঁজে
সেই ফুলওয়ালি
স্তন কুড়াতে যায়।