হোম কবিতা নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-২
নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-২

নববর্ষের কবিতাগুচ্ছ-২

565
0

সোহেল হাসান গালিব

মধুবন

এ জীবন অপেক্ষার মধুবন—বলি নি তোমায়?
বলি নি এখানে রাতভর শুধু তারামাছি ওড়ে
ঝাঁক বেঁধে আকাশগঙ্গায়? চাক ভেঙে কখনবা
ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা মধু, ভেবে দিন তো ফুরায়।

উড়ায় ফুলের গন্ধ—জানালার পাশে কোন যাত্রী—
কোথাও থেমেছে ট্রেন, বুঝি টেনে সে ধরে হাতটি…

লিচুর মতন শাদা মেঘে রক্তিম গোলাপজল
ছিটিয়ে এসেছে ভোর। ডানাভাঙা পাখিদের ডেকে
আজ দেবদারু-পাতা যত কথা বলে, তার সব
একদিন ভাষা পাবে আমাদের সন্তর্পণ থেকে।

যেন মৃত স্বপ্ন কার, নড়ে ওঠে বনে ও বাদাড়ে—
হাতজোড় ছায়াটির পাশে ঝলমলে রোদফণা।
শুনি এক অতৃপ্ত ডোবায় কামরাঙা কথা নিয়ে
জামরুল—ঝরে পড়ে টুপটাপ ফলেরই সান্ত্বনা।

করতালি পাবে না জেনেও ভিখারি যে গান গায়!
কুকুর-বেড়াল তার পায়ে পায়ে ঘোরে কিছুক্ষণ—
শিশুরাও মুগ্ধপ্রায়। তারপর সুর থেমে গেলে
বোধোদয় ঘটে, দল ভেঙে তারা দূরে সরে যায়।

 

 

অভীক ভট্টাচার্য

সহোদর

সুস্বাদকে বলি, “তোমা সহোদর কেবা?” বলে, “ব্রহ্ম”,
উচ্চারণকালে, দেখি, জিহ্বার নেপথ্যে আলজিভ
নড়ে ওঠে (রুহ্ যেন), পৃথ্বীর অর্ধাঙ্গে নড়ে শিব,
পুরুষকে বলি, “তোমা সহোদর কেবা?” বলে, “স্তম্ভ”।

দ্বা-এর সোদরা যদি সুপর্ণা তবে সৃষ্টিময়
এত ভাতৃজাল আর ভগ্নীজাল কে রচেছে আদি?
বাদীর সঙ্গে, দেখি, সহজাত হয়েছে বিবাদী,
খড়্গহস্ত সঙ্গে ওই উপজিত, দেখি, বরাভয়।

আমা সঙ্গে তবে আরও কেউ জাত একই গর্ভবাসে?
কার দেহে বহে গ্যাছে মাতৃরজ সমান বিকার,
ভ্রুমধ্যে আরও কার বিল্বদল, নাভিতে ৯-কার
হৃদে গজ উদ্যত ভ্রাতা অশ্বত্থামা-সর্বনাশে?

কে আরও দেখেছে পদ্মপার্শ্বে জেগে সহোদর মণি?
প্রশ্নের সোদর যদি সদুত্তর, ঝঞ্ঝার বদর,
বিধি কি একাকী, আমা মতো? কেবা বিধি-সহোদর?
ত্রিভুবন এ প্রশ্নে অম্নি বলে ওঠে, “যোনি, যোনি”।

 

 

মাজুল হাসান

জীবনানন্দ ও ১টি সাংসারিক প্রকল্প

পৃথিবী গোল এটা উদ্ঘাটনের আগেও পৃথিবী গোলই ছিল
পরে জীবনবাবু ওটাকে কমলালেবু করেছেন। প্রসঙ্গত ছুরি—
ওটি লাল হওয়ার আগে অনেক নিষ্পাপ হাত, ক্ষুধার্ত পেট
নিদেনপক্ষে একটি দুর্বিনীত কোমর ঘুরে এসেছিল
লোহার কাঠিন্য ও গ্রীষ্মসহা ফলের আর্তি এখানে উহ্য
প্রকাশ্য কেবল মিসেস টসটসে কমলা ও মহাশয় জীবনবাবু—
জীবনবাবু সময়কে কেশর-দোলানো ঘোড়া করেছিলেন
অস্থায়ী নিঝুমে বসিয়ে দিয়েছিলেন পুলিশ ও ভ্রান্ত কাঠগোলাপ
এর মাঝে কখনও কখনও ঘড়িরা হাত সমেত বিগড়ে যায় ঠিক—
কাঠগোলাপ ঝরে পড়ে, কাঠগোলাপ ঝরে… এটা দাম্পত্য-কলহ

 

 

তানভীর মাহমুদ

নিলয়

অশোধিত আলোর দমক এল অন্তরে
অচেতন কাল বয়ে গেল খড়খড়ে দেহের ওপর
প্রান্তর জুড়ে অস্ফুট স্নায়ু বয় নিরল বাতাসে।
অপলক চোখ খুঁজে পেল স্বর—
ঝর্নার ধারে এ ভুবন অগোছালো ছিল একদিন।

আলোতে নত কেশর
বহু বছরের জলে নাওয়ানো মোতি এক—
ডুব দিয়ে মিলে যাওয়া বিলীনতার ঘর এই।

 

 

রুহুল মাহফুজ জয়

হাউ টু ফরগেট অ্যা মমিসিংগা পোলা

মমিসিং গেছ তুমি
গেছ নদে, যেইখানে রইছে মরে আত্মার বিশদ আমার
মমিসিং গেছ তুমি
গেছ নাগরসনে, যাও নাই খুঁজিতে, ফেলাই আসিছি কারে আমার

মমিসিং গেলা তুমি
দুপরক্তে ব্রহ্মপুত্রচরে কেঁপে কেঁপে উঠলা জলের কিনারে
ছেমার প্রতিসরণ ফালাফালি করতেছিল জলে
ছটফটাইছিলা তুমি খুব দাড়কিনা মাছের মতন—
কাদা ঠুকরায়ে ঠুকরায়ে
দংশিত ঠোঁটের অনুকম্পা নিতাছিল পায়ের বুইড়া আঙুল—

নদে গিয়া খাইলা বাদাম
নাগরসহ গিয়া ব্রহ্মপুত্রের চরে
দুপরক্তে খুব করিলা রিসার্চ, ‘হাউ টু ফরগেট অ্যা মমিসিংগা পোলা’

প্রেম খুব ধুলা, সর্দি লাগিয়া যায়—সর্দি জমায়ে নিছিলাম বক্ষে তোমারে
ধুলিসকল ঝাইরা ফালাই, ব্রহ্মপুত্রে গিয়া ফেলাই আইলা আমারে

 

 

রোজেন হাসান

এপ্রিলের ব্যালকনি

কর্কটরাশির বর্ণশূন্য পর্দার পাশে
তুমি একজন বেহালাবাদকের সাথে থাকো
সে তোমাকে কফি এগিয়ে দেয়
তার মুখ নেই
শুধু হাত, কমলারঙের আলো
তুমি দ্যাখো পর্দায় ঝাউগাছের ছায়া
মুখর দিনগুলো থেকে আঙুলেরা
ভাসছে ধীর তন্দ্রার সুরে
তার আঙুলকে মূর্ছনার মতো
নিঃশব্দ জাফরির রঙ
নিবিড় করে তুলে।
সেতুতে রূপান্তরিত তার আত্মার দিকে
কালো বনপথ ধরে আমি হাঁটি
রাতের নিঃসঙ্গ বেবুন;
এপ্রিলের সুরম্য স্তনের,
জাফরির ধ্বনি ভাসে চতুর্দিকে
স্বরবর্ণের ভ্রমণগুলো হালকা
করে দেয় কালির আচরণ।
সেই পথে—
শুধু বিস্ময়ের হাওয়াগুলো আসে ওয়াচ-টাওয়ার থেকে
আপেল তোমাকে প্রশ্ন করে
এপ্রিলে কেন তুমি হলুদ
কৃষ্ণচূড়ার দিকে চেয়েছ
সমস্ত বৈষম্যের সন্ধি কাঠের ব্যালকনি।

 

 

মাহী ফ্লোরা

চিবুকের কাছে

বোকা মেয়ে ভেঙে ফেলে বাঁশি, ছিঁড়ে ফেলে পাতা, ভালোবেসে-বেসে সহজ কথাকে ফেলে আসে দূরগামী যন্ত্রের কাছে। দুপুর কি দুপুরের কাছে খুলে বলে ভ্রমণের সব গল্প?

পাতাদের আছে পুরনো হিংসে, এঁটো থালার ভেতর কুটো পাত, চিবুকের কাছে আছে পুরনো হিশেব, আঙুল ছুঁয়েছে তিল, সারাদিন প্রথম প্রেমের মতো অল্প!