হোম কবিতা দূরত্বের সুফিয়ানা

দূরত্বের সুফিয়ানা

দূরত্বের সুফিয়ানা
483
0

কথার গম্বুজ

কথারা গড়ে তোলে মেঘের গম্বুজ।

কথা নৃশংসতা নয়—নয় বলাৎকার বা খুনের নেশা যে যথেচ্ছা তাদের ছড়িয়ে দেয়া যায়; কথা হরপ্পা সভায় দেয়াল চিত্রে নৈঃশব্দ্যের চারদিক।

মেঘ পছন্দ করে যেভাবে পাহাড়ের মাথায় ঝরে তার পায়ের নিচে ঢালুর বিন্যাসে ছড়িয়ে পড়ে।

কথারা বীজধানের জাত—কথাদের ছড়িয়ে পড়তে  বীজতলা লাগে—বীজতলা তৈরি হবার আগ পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করে।

কথারা বোঝে তুমিই তাদের মোক্ষম বীজতলা—তুমি ছাড়া অন্য কোনো আঙিনায় তারা কখনো ছড়িয়ে পড়ে না।

কথারা দৃশ্যমানে কলম—তারা আসলে নিবের মুখে লুকিয়ে থাকা তৃষ্ণা—কথারা আল্লাহর কী কুদরত লাঠির ভিতর শরবত! কথারা অনাগত শিশুর কলরব।

তুমি যত দূরেই যাও—কথারা পিপাসার হেরিটেইজ—কথারা তোমার আনত কলসের নিচে নতজানু  দূরদুরান্ত শহরের গ্রাফিক্সে নোঙর!

তুমি যেতে পারো স্টিল ওয়াটার ওকলাহোমা, অথবা বাওরের পাড় নেত্রকোণা—না-বলা কথার পাগলা ঘোড়া আলগোছে সেখানে হাজির।

ভয় নেই, যেতে পারো লেইক টিটিকাকা, কী যদি চাও হাইডা টাকায়ামা, অথবা ম্যানারোলা যেখানে খুশি চলে যেও।

কথারা তোমাকে খুঁজে বের করবেই—তুমি যে হয়েছ তাদের গর্ভবতী নারীর আচারের বয়াম, গির্জার নৈর্ব্যক্তিক ঘণ্টাধ্বনি যে বাতাসের অদৃশ্য ছনে আখড়া বানায়, আর ঝড়ের মুখে অসহায়ভাবে কাঁপে।


অধীনতাসমূহ

আমি চর্যাপদের কুপি বাতি থেকে আসি
কালামে ক্ষরণে তোমার রূপ সেলাই করি :
অণু পরমাণু ক্ষণ, সারা দিনরাত;
তোমাকে বর্ণনা করে আমার যে ভাষা
সে মৃত্যুর সুষমায় শিহরন!
খসেপড়া নক্ষত্রের আলোয়ানে মহীয়ান—
ঝুঁকিপূর্ণ, স্বাধীন ও নুন পাহাড়ি।
লোকে ভাবে, আমার জন্ম হয়েছে
পানপাতা ক্লাবের ঘরে—দুর্ভাবনা,
শরণ যাকে ছুঁতে পারে না।
তারা ভাবে—আদতে আমি বোবা,
আমি আমের লক্ষ কোটি বোলের সমান;
ইলিশের পেটে অগণন ডিমের ডৌলে
হাজার কথা বলি—কথার অঙ্কুরে
ভাসমান বধির!
তামাম দুনিয়ার বিশালতার পাশে
আমার দু’টি চোখ কতই না ছোট!

চোখের সামনে বিবিয়ানায় ফুটে থাকে
মাধুরি ও দিগন্তের ভাইফোঁটা,
সব কথার শীতলপাটি শেষে দুনিয়া
কী অপার ধৈর্যে বাথানের মহিষ।

আমার দুই চোখের আগে পাতারা কাঁপে,
না কী বা হরিণ এক ছুটে যায়—শঙ্কার আড়ালে, বাঁকে?


প্রাণের ঘুঙুর

জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে কী দেখো—

ভাবো, নভেম্বরের দখিনা বাতাসে
বার্চের পাতারা কাঁপে?
না।
আমি হারিয়ে যাচ্ছি বলে
ঘরে, বাইরে, নভোমণ্ডলে, সবখানে
আমার হৃদয় তিরতির করে নাচে!


তন্তুবায় ঘরানা

বইয়ের পাতা আর কর্ণফুলীর ঢেউয়ে ভাঁজ থাকে।

আচ্ছা তুমিই বলো বাইবেল হোক, কী হোক মহাভারত, কিংবা গীতবিতান, ওয়ার অ্যান্ড পিস, দাস ক্যাপিটাল অথবা তাজকেরাতুল আউলিয়া;
কোনো বইয়েরই মূল্য কী আছে যদি তার
পাতা খোলা না হয়?

গীতবিতান অনুক্ষণ তার গভীর জীবন দর্শন,

লিও টলস্টয় ওয়ার অ্যান্ড পিসে খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ, দাস ক্যাপিটালে অর্থনীতিকে দর্শনে উন্নীত করার মার্কসীয় মেধা, তাজকেরাতুল আউলিয়ায় বিধাতার গুঞ্জরণশীল নীরবতা আছেই, পাতা খোলামাত্রই আছে!

যত তাড়াহুড়োই করো—তুমিও তোমার যোনি, স্তন, ঠোঁট, হাসি ভুল করে রেখে যেও না, সবসময় সঙ্গে রেখো। পাতা খোলামাত্রই যেন মেধা, প্রতীক্ষা আর মৃত্যুগুলো কলরব করে উঠতে পারে!

তন্তুবায়ের সুতা নাটাইয়ের সঙ্গে ভাঁজে ভাঁজে মেলানো—সুতার ভাঁজ খুললে জামদানি শাড়ি আর কুমিল্লা খদ্দরের চাদর বোনা যায়।

বইয়ের পাতা, কর্ণফুলীর ঢেউ, তন্তুবায়ের সুতা

আর তোমার ভাঁজ একসাথে মিলালে মিকেলাঞ্জেলো পাথরের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা শিল্পপ্রতিমার সন্ধান পান।


একদানা মহাকাব্য

আমার চোখে জল টলটল করে
কিন্তু টপটপ করে মাটিতে পড়ে না।

চোখের নিচে বাড়িয়ে ধরা একজোড়া হাত কোথায়?

চোখের জল মাটিতে ফেলতে নেই;
চোখের পানি তাই চোখেই টলমল করে।

চোখের জল বুঝি কোরানের আয়াত—
তাকে মাটিতে ফেলতে নেই
নদী বা সাগরের বড় বড় ঢেউয়ের
গতির মুখে ফেলতে হয়,
না হয় তুলে রাখতে হয় তুলসীগাছের গোড়ায়।

চোখের জল ফেলতে আপাতত আমি যাই না সমুদ্রের কাছে;
একবার এতবড় জলে মিলিয়ে গেলে
তোমাকে আর পাব না, খুঁজেই পাব না—
এই জলের ফোঁটায় ঘন হয়ে তিরতির করো যে তুমি!

উপরে জলের ফোঁটা নিচে থাকে ফাটাফাটা ভূমি
মাঝখানে মাথা নুয়ে ধ্যান করে জালালউদ্দিন রুমি!


মন্ত্র না জানিয়া

তিন হাঞ্জায় পুরান ঢাকার এক খুপরি ঘরে
দুই ভাই মিলে চা খাই পিয়া পিয়া আহারে,
বটগাছের দুটি পাতা আঁতকা উঠিল কাঁপিয়া
না চিনিয়া না বুঝিয়া কই নিজামুদ্দিন আউলিয়া।


পায়ের উপর

বেঁচে থাকা এক সৃষ্টিশীল গাছের নাম, লাবণ্যময়ী পাথরের প্রবাহ ও জমাট। শীতে সবগাছ পাতা ঝরিয়ে একান্ত মৌলিকে, একেবারেই ন্যূনতমে ফিরে আসে; কিন্তু সে আলগোছে রক্ষা করে জীবন, আবার বসন্তের গোড়াতেই পুঁই মেলে, জীবন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আবার।

মানুষ জন্মের পরই হাঁটতে চায়, উদ্যোগ নেয়, এক পা ভেঙে গেলে ক্রাচ নেয়—দুই পা অকেজো হলে উইল চেয়ারে ভরসা করে, চোখে ছানি পড়ে গেলে চোখ রগড়ে ফের শস্যের সমান্তরালে তাকায়; চিরতরে দু’চোখ বন্ধ হলে ভরসাসুন্দর প্রিয়জনের কাঁধে চড়ে—তাদের পায়ে হেঁটে কবরে কী শ্মশানে যায়।

তবু্ও হাঁটে, অবিরাম হাঁটে!


পা-কাটা লোকটা

যে চলে যায়, অথবা যে জানে তার চলে
যাবার সময় এসেছে ঘনিয়ে
তার কাছে মনে হতে থাকে—
বাথানের ওপার থেকে
চাঁদটা কেন এত সাথে সাথে আসে?

এভাবে ধরতে গেলে মনেই হবে,
মনে হতে পারে—চাঁদটা কী তাহলে ডাকঘরহীন
এক বাড়ির ঠিকানায় চিঠি বিলি করার পিয়ন?
হতে তো পারেই, হবেও হয়তো-বা!
যদিবা তা-ই হয়—চিঠি কী নিয়ে এসেছে তার
খোয়া যাওয়া পায়ের শিকড়, শিকল, দাগ খতিয়ান?

চিঠি পড়লেই জানা যাবে—তার পাঁচটি আঙুল ছিল
না কী ছিল পাঁচটি থ্যাঁতলে যাওয়া লাল জবাফুল?

যে চলে যাচ্ছে এভাবেই কারুর পক্ষে
চলে যাচ্ছে সে—এই তো শেষমেশ সে-ও দাঁড়িয়েছে
উঁচু পাহাড়ের নিচু কিনারায়!

সবখানেই কিসের এমন দাগ লেগে থাকে—
কথার, স্পর্শের, আওয়াজের দাগ লেগে থাকে,
একটি মা-হারা গরুর বাছুর কেবল
হাম্বা হাম্বা ডাকে!

যে চলে যায় সে কি পা-কাটা লোকটার কাটা পা—
যে ফেলে আসা পায়ের আকার তালাশ করে?

হবে হয়তো কাটা পা—নয়তো হবে মা-হারা বাছুর
দু’জনেই কেন যে এমন হাম্বা হাম্বা ডাকে!


পাতাটি জানে

হাওয়া ছিল না, ময়দানে তেমন মোচড় ছিল না। কিন্তু গাছের পাতাটি কাঁপার অন্তরালে যতদূর হাওয়া লাগে, ততটুকু পবন কোত্থেকে যেন ঠিকঠিক আসে—স্তব্ধ পাতারা কাঁপে!

একটি পাতা বাতাসে মৃদু বাড়ি খেয়ে বোঁটা থেকে ছিড়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নতুন মাটিতোলা কিছুটা উঁচু জায়গায় এসে শোয়।

উত্তর-দক্ষিণে শোয়া পাতাটির দিকে চোখ নামাতেই দেখি একটি নতুন কবর।

আমি জানি না—পাতাটি জানে!


ডুমুর পাতাগুলো

উন্মুখর দিনগুলো যেই না ঢালুর পাষাণে হারায়—একহারা তোমার মুখের দিকে ভাবি, আর বলি : করুণাধারায় এসো, দয়া হয়ে বসো; কিন্তু আসে যে করবী ফুল, দেখি উটপাখি অসহায়। সবই বুঝি স্থিরচিত্র, স্টিল লাইফ; কড়িফুলে নাই, ফোটে নি থোকাথোকা চেরিও, নাই জগদ্দল, এমনকি ট্রাক্টর ভেঙে উগড়ে ফেলে দেয় নি বড় বড় মাটির চাঁই ও চাতাল। এমনাবধি কী আশ্চর্য, কোত্থেকে বুকের পাশ ঘেঁষে, চোখের কিনারায় বুঝি-বা জায়ফল, যেন-বা দারুচিনি ঘ্রাণ—সম্পর্ক, স্মৃতি উজানিয়া, ভাঙন, শাহেরজাদির ১০০১টি গল্প— আমার মৃত আত্মীয়রা, প্রাণের ডুমুর পাতাগুলো—ক্ষরণের, ন্যাপথলিনের চারপাশে নিবিড়ে আসে—তারা পাতে শীতলপাটি : জুড়িয়ে দেয় অতি দূর রূপকথার সবটুকু ওম—ফেলে আসা দিনের খোঁয়ারি, গন্ধ ও শীত। আমি বোধ ও বোধির অতলে  নামহীন মোকামবিহীন তাদের আকাশের ওপারে আকাশে জড়িয়ে হারাই। গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি থেকে নেমে আসা আমাদের পূর্বপুরুষের মাকড়জালি; আমি সময়ের অনন্তে দলফুলে ভাসি—আর মৃত আত্মীয়জন, তোমরা, আহা তোমরাই আমার মাতৃক্রোড় ও মর্মের গিলাপ— আমাকে স্নাত করো, কাঁধে চড়িয়ে মেলায় নিয়ে যাও—আমি যে ব্যথার চিরল চিরল পাতা, রুদ্রাক্ষ, ফুলপরি ধান, ও লোবানের গন্ধে উজাগর; আমারে লও ফেরেশতার ডানায়, ভাসিয়ে ডোবাও—যেথা মৃত্যুর সুতিশাড়ি—অমাবতী হাওয়ায়।

বদরুজ্জামান আলমগীর

জন্ম ২১ অক্টোবর ১৯৬৪; কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর। পড়াশোনা বাজিতপুরে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০ বছর দেশের বাইরে, থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। মূলত নাট্যকার, কবি ও অনুবাদক।

প্রকাশিত বই :

নাটক—
নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে [বাঙলা একাডেমি, ১৯৯৭]
আবের পাঙখা লৈয়া [জন্মসূত্র, ২০১৬]

কবিতা—
পিছুটানে টলটলায়মান হাওয়াগুলির ভিতর [অপরাজিতা, ২০০৫]
নদীও পাশ ফেরে যদিবা হংসী বলো [ঘোড়াউত্রা প্রকাশন, ২০১৯]

প্যারাবল—
হৃদপেয়ারার সুবাস [ঘোড়াউত্রা প্রকাশন, ২০১৮]

বাংলাদেশে নাটকের দল 'গল্প থিয়েটার'-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; নাট্যপত্রের সম্পাদক। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন—সমাজ ও রাজনীতি, দ্বিতীয়বার, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ণপথিক, মর্মের বাণী শুনি, অখণ্ডিত।

প্যানসিলভেনিয়ায় কবিতার প্রতিষ্ঠান 'সংবেদের বাগান'-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

ই-মেইল : ecattor@yahoo.com

Latest posts by বদরুজ্জামান আলমগীর (see all)