হোম কবিতা দুপুরবেলার স্টেশন

দুপুরবেলার স্টেশন

দুপুরবেলার স্টেশন
263
0

মধুপুর বনে
❑❑

মধুপুর বনে সকাল আসে
সেটা বুঝা গেল শাদা শাদা ফুলে
লাবণ্য একা হতে চেয়ে
ফুটে আছে দূরে

ভাঁজে ভাঁজে পথে এ হাওয়া ফিকে
ভাঙা সাঁকো আর পথ একসঙ্গে থাকে
উচ্ছিষ্ট নির্জনের শব্দকালে
ফুরফুরে প্রজাপতি নেই ফানুসে
গাছে গাছে গীত উড়ে হাঁটার মিছিলে

গারোদের বাড়ি যাই
গারোদের চলতি সিজনটা বড়ই সুনসান
গারোদের বাড়ির দিকে কাঠের ভাষা
রোদবিয়োগে হারাই
ছোট ছোট ঘর, ছোট ছোট লোকালয়
তবু গাছের পঙ্‌ক্তি জুড়ে কচি নির্মাণ

যে যা বলে বলুক লোকজনে
হাত সেঁকে নেব আমি আজ
রোদের আদরে
এমন দিনে কারা যেন গেছে দূরে
কারা কারা নেমে গেছে ঘর পাঁচিলে

মধুপুর; মধুপুর বনে সকাল আসে
পাখিরা অপেরা গড়ে
পাতাশোভা হিমে…


বর্ষা বয়ান
❑❑

জলজ মুগ্ধতা নড়ছে মধ্যবিত্ত হাওয়ায়

বিলের ওপারে—
যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি
সেখান থেকে জেনেছি কৃষাণ কৃষাণীর
বিগলিত ডাক বহুদূর হারায়

স্কুল ছুটির এই যে দুপুর
বালিকারা চেলি পথ হেঁটে গেলে
আমি তেমন কোথাও যাই না
যাব ভেবেও একই জায়গায় থাকি

শুধু দেখি কয়েকটা হাঁস
জলের আগামী দেখে
তাকিয়ে থাকা আর ভয়

তখন ছাতার নিচে কেঁপে ওঠা
বর্ষার পদচ্ছাপ ফেলে
বাবা যেন বাড়ির পথে যায়…


বহুমাত্রিক
❑❑

পাশ ফিরে দেখি একটা গ্রীষ্মকাল
ঘাম আর ক্লান্তি নিয়ে ঢুকে পড়ছে
মানুষের ক্ষুধায়

ও বউ, বউ গো
ঝরো না অপচয়ে
তুমুল ভিজে উঠো সোনালু ফুলে
আমাদের ছোট সংসার হাওয়ায় নড়েচড়ে
ব্যঞ্জনার দিকে দুঃখগুলো ছড়িয়ে পড়ে

থকথক বুকে আমি লিখে রাখি
খোলাচুল সুগন্ধি দাঁড়িয়ে থাকা বাগান
একা একা গান ছায়া হয়ে যায়
যারা কেবল মেঘমুখশ্রী ভালোবাসে

তবে বরফ পেরিয়ে আমিও মাতাব
কোনো এক বৃষ্টির দিনে
বিকালের পাতা মেলে; এই যে জীবন
স্তব্ধতা নয়, উত্তরের অপেক্ষায়…


পারাপার
❑❑

হতে পারে হারানো আমেজ
কোনো একদিনের বুক গড়ানো ঢেউ
ভেসে ভেসে দূর পাটাতন
কাছাকাছি জল নীরবতার আঁধার

ইশারায় পাতারা কাঁপে
রপ্ত করে কেমন
দূর হাওয়া বহতার লকলক

তবু টের পাই পেঙছায় নুয়ে পড়া
উদর ফুঁড়া বাঁশবন
যেন তার ভেতর একান্ত নেকাব খুলে
দহন সংকল্পে মিশে যায়

কিছু জোনাকি গোপনে থাকে
স্বভাব প্রচ্ছন্নে ঘুরে বেড়ায়
চকিত ফুল হয়ে জ্বলে রয়
আমি তারে ভাবি বেলুন—

আমি মাটির পথে পথে হাঁটি
একা বসে থাকি
ডাকাডাকি পারি সুহৃদ
জানি প্রত্যর্পণ পেরিয়ে
বহুদূরের মাটির গাঁথুনি
মরা পাতারা কেবল বয়ে নিয়ে গেছে

আমাদের দূরত্ব এক পারাপার
মার্বেল হতে গর্ত অবধি তার ক্ষীণ শ্বাস—


জীবননামা
❑❑

নাইবা হলাম যা হতে চেয়েছিলাম
হতে পারি নি বলে আক্ষেপ রাখি নি কোনো

মানুষ তো বাঁচে
ঘর থেকে কবর নিয়েই

মাটির গন্ধ এরচে ভালো

স্বপ্নের রেখা ছিঁড়ে আরেকটা স্বপ্নই
না হয় আঁকলাম তিথির ঘুমে

মানুষ তো বাঁচে
রোদে রোদে ফড়িং বসন্ত এলে
মেঘের ঝুঁটিতে একটাই চাঁদ
দেখার তুমুল বাসনা নিয়ে…


গতি
❑❑

পাতা যেন লাবণ্য ধরে আলোর পড়ে
বাতাস ফিকে হয় আরতি করে
বারবার জীবন উন্মোচনে  ভেসে গেলে
তুমিও জানো সকল কিছু একবারই মিলে

আবরণের কাছে আমাদের নখ
নিরীহ, আঁচড় কাটে না
পরবশ মানে

দুপুরের ভাঁজে মুশকিল নামে
ভাঙা সাঁকোটির ’পরে ফুল
ভ্রমরের গতি ওড়ে, রোদমেখে ঝলমলে।

ছুঁ মারা মুখ নিয়ে প্রিয় জানালায়
এই দুপুর পরাজয় ভাঙছে কেন
তবে জলের নাগাল ছুঁয়ে…


দুপুরবেলার স্টেশন
❑❑

এমনিই দূরের স্টেশন গড়ানো
কোনো দুপুর ভাসে কল্পনায়
মাঝামাঝি লকেট বেঞ্চিতে বসা
তাকানো মুখ নিয়ে ঘুরিফিরি
ঝুল বারান্দার দিকে ঝুলে পড়েছে
আলোর বিকলাঙ্গ এক আয়ুষ্কাল
কিছু শালিক ব্যাপক ক্ষিপ্রতা নিয়ে
নেমে এসে অজস্র কাক হয়ে দাঁড়ায়
তখন লোহার সুর ভেঙে
একটা ট্রেন পরিধি ছেড়ে চলে যায়
এমনিই দূরের স্টেশন গড়ানো
কোনো দুপুর ভাসে কল্পনায়
যেন আমি হেঁটে হেঁটে মিশে গেছি
ছায়ার আয়নায়
শিস দেয়া দোয়েলের মন খারাপ খুলে গেলে
গাছের গুঁড়িগুলোকে পৃথিবীর খোঁপা লাগে
জিরানো বগির কাছে
পাদপাতালি পাতার গা-ভর্তি ঘ্রাণ
মহিষেরা তার ভেতর ঘুমায়
তো সকল যাওয়ার মাঝে
বিছিয়ে থাকে যে ফেরা
তাকে হারিয়ে ফেলি
আমাকে ঘিরে এইসব আলসেমি নামে
পৃথিবীতে বসে এমনটা
আমি ভাবতেই পারি
ফুল যেমন হাওয়ার বর্ণমালা…


সুগন্ধী পাখি
❑❑

যেনবা তোমার দিকে দৃষ্টি রেখে
খুন করছ আমায়
পালকে পুরনো সেই ভাঁজ
হাসিতেও নিরাপত্তাহীন পৃথিবী আমার
শুধু ধরনটা ছিল অচেনা মুখের
প্রেম নয় ঘৃণার মতন
যেনবা আমি মানুষ হয়েও
পশুকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলাম…


ক্যাফেটেরিয়া
❑❑

কোথাও গ্রীষ্মকালীন পৃথিবী নেমে এলে
তরমুজের ফালিজুড়ে দুপুর লেগে থাকে
ছড়ানো খিরায় জমে রোদের অর্গাজম

একটি পরিত্যক্ত পোস্ট অফিসের পথে
দিগন্ত খসা ক্যাফেটেরিয়া হাসে

আকুল তাকানো মানুষ
ফাঁপানো ভয় নিয়ে
কোথায় গিয়ে থামে মানুষ কী জানে!


মধ্যাহ্ন
❑❑

মধ্যাহ্ন ঘনিয়ে এলে দেখি
মায়ের কপালজুড়ে তিলকের বাগান

মগ্ন রোদে পুড়ে বাড়িটার বয়স ফুরায়
তখন আদর জড়ানো ডাক ছোটে
ঝাপটা মারে পালিত বিড়ালের পিঠে পিঠে

এমন মধ্যাহ্ন মোড়া মধ্যবিত্ত পরিবার
একই রকম লাগে
তবু যেন একই রকম হয় না আর…

শুভ্র সরকার

জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। পেশা : চাকরি।

সস্পাদিত ছোট কাগজ : মেরুদণ্ড।

ই- মেইল : shuvrosarker31@yahoo.com

Latest posts by শুভ্র সরকার (see all)