হোম কবিতা তীব্র ৩০ : সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের বাছাই কবিতা
1.76K
0

বছর দুয়েক আগে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে ‘বা’ বলে একটা প্রকাশনা সংস্থা দাঁড় করাবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। পরিকল্পনা ছিল বা-এর পক্ষ থেকে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র মতো একটা সংকলন ‘বাছাই পঞ্চাশ’ নাম দিয়ে প্রকাশের। আমাদের অনুরোধে কবি তাতে সাড়াও দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কোনোকিছুই আর বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি।

কবির অনুমতিক্রমে ‘বাছাই পঞ্চাশ’ পাণ্ডুলিপি থেকে ৩০টি কবিতা নেয়া হলো পরস্পরের ‘তীব্র ৩০’ সিরিজের জন্য। উল্লিখিত পাণ্ডুলিপির ভূমিকাটিও এখানে মুদ্রিত হলো।


সোহেল হাসান গালিব

ইতিকথার আগের কথা…


যাচাই-বাছাই করা—সে আমার নয়। অগত্যা আমার চির-মুশকিল-আসান শেষে হাত লাগালেন আর তরালেন বৈতরণি আরও একটিবার এ-জীবনে। একুনে এ-সঙ্কলন আদতে “স্বনির্বাচিত” নয়। আমি তবু অট্টখুশ। গালিবের হাত থেকে রেহাই জুটেছে।

কিন্তু গালিব কি সহজে ছাড়বার বান্দা? পাথরও গলে, খালি গালিব গলে না। বইয়ের নাকি মুখবন্ধ লাগবেই। কী গেরো! অতএব “বা”-এর কালামুখ বন্ধ করতেই এ-লেখা।

কত বছর কাটল যে হাত-মকশো ক’রে-ক’রে! মুচিগিরি করলেও, ঠিক বাটা-র মালিক ব’নে যেতাম। তা না, এখন বুকের রক্ত বিক্রি করি। ও নেগেটিভ। কারো লাগবে? পয়সা দিলে জানান দিয়েন, বা ফেসবুকে ট্যাগ লাগায়ে স্টেটাস… আমার রক্ত এবং একটা বইও উপরি পাবেন। ভ্যাসের যুগ।

কত-যে মুখ, কত অসুখ ডাকে পাঠায় আমাকে ডাক! সেই শাহবাগ, চানখাঁর পুল, সেই সন্ধ্যায়-লাল বংশাল—ল্যাগব্যাগনিস সৈয়দ তারিক, সাজ্জাদ-মাছ, গাঢ় বিষ্ণু, টাল রুদ্র—আর বাংলা, বার-বাংলা, রাঁড়-বাংলা, গাঁড়-বাংলা… পরস্পর পিঠ চাপড়ায় বাংলার ছাপড়ায়… আমাদের নীলখেতে। অনাসৃষ্টির শুভসূচনায় এরশাদ শাহি খাসির দশক।

আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল বগুড়ার শামীম কবির।

কেউ পড়বে না—এই বোধ, কী-যে আশ্বস্তির! কী-যে বীভৎস জিন্দালাশের সুরতহাল! প্রিয় পাঠকেরা, হুদা অনীহায় গালিবের চাল বানচাল ক’রে দেন না? মাবুদের কাছে সকল সাবুদ জমা থাকবে…

তোমার সিনা দীর্ণ করুক আজ আমার ওফাত।


সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

তোমার জিজ্ঞাসা

কী চাই তোমাতে আমি? একটা প্রিয় মুখ?
নাকি নির্জনতা? নাকি একটুকরা আয়না?
কী চাই তোমার কাছে, সুব্রত, বলো না!
পৈতৃক রক্তের ব্যাধি, আত্মার অসুখ,
নিশ্চেতনার দহে হঠাৎ শুশুক,
সালফার-ঝাঁঝালো হাওয়া, আর হাতে গোনা
দু’চারটি চতুর হাসি, বা দু’চারটি নোনা
চুম্বন?… কামুক ওরে, সংবরো কার্মুক!
কোন্ নামে ডাকলে তুমি, জেগে উঠব ভোরে?
কোন্ ডাকে সাড়া পাব, সাড়া দেব আমি?
কী পারদ ঢাললে কালো আমার গহ্বরে
লাল নীল জন্মাবার, বা জন্ম দেবার
সন্ধ্যা নামবে ঘাসে-ঘাসে, কুম-কুম, রেশমি,
দিগন্তে অরোরা-আলো নাচবে অনিবার?

১৩ নভেম্বর ২০০৮

সমুদ্রসম্ভবা

অসম্ভব-তৃষ্ণা পেলে, আমি সিঁধ কাটলাম অনলে—
যে-তুমি অগাধ আর টৈটম্বুর অসম্ভব-জলে
উঠে এলে; গায়ে শ্যাওলা, স্বচ্ছ অ্যালগি, দু’কানে সীহর্স,
স্তনবৃন্তে স্বেদবিন্দু—জন্মান্তরে আমার পরশ

আজও তাজা, আগোলাপি, আর মধু, সোনালি ক্রন্দন—
আর অ্যাক্টিয়ন, জলকুহেলিকা, তুরীয় স্যন্দন
ছেয়ে ফেলল—শতাব্দীর দু’মেরুর আনীল বরফ;
মুছে ফেলল—মগজে নাজেল হওয়া তাবৎ হরফ…

‘ভালবাসা একটা মিথ; এ-জাদুকানাত উঠে যাক,
আমাদের কঙ্কালেরা মুখোমুখি একবার দাঁড়াক,
একবার জ্বলুক এক্স-রে আমাদের রেটিনার পিছে,
জানি, আমরা যে গ্র্যাফাইট সব আলো-আলেয়ার নীচে—’

‘চুপ! চুপ!’—তুমি বললে—‘কঙ্কাল কঙ্কালই শুধু যদি,
যদি আমরা ধ্রুবমৃত্যু, যদি আমরা গতাসু ওষধি,
যদি আমরা অ্যালামাটি কিংবা ধামাচাপা সাদা ঘাস
আমরা তবু কুরুক্ষেত্র—বিশ্বাত্মার—পুরো বারো-মাস;

‘আমরা তবু জন্মেছি যে অরমিতা কাসান্দ্রার পেটে,
ঝরেছি দু’ফোঁটা নোনতা ফেটিবাঁধা চক্ষু-মরু ফেটে
এ কি কম?’—আমি বলি, ‘শিঙা-হাতে এসেছে ওডিন—
সাগর শুকিয়ে তীরে প’ড়ে আছে।… শুভ জন্মদিন।’

                                                                                                ২৪-ফেব্রুয়ারি-২০১২

ভোরের মন্দির

ওরা দরজা ভেঙে ফেলবে, ঢুকে পড়বে আমার নমাজে,
উপড়ে নেবে তোমাকে আমার থেকে ওদের সমাজে

পাঁজরের খাঁজে চাকু চালিয়ে। আমার সুরকি-ইট
খুবলে-খুবলে খুলে নেবে—ভাই যারা, সদৃশ, সুহৃদ্—

ওরা, যারা অতিথি-কে মুখে বলে ওথিতি, কাগজে
অতিথী, যাদেরকে তুমি মেগাসিরিয়ালে দেখে কী যে

কোঁচকাও বিরক্ত ভুরু, হেসেও তো ফ্যালো রেগে গিয়ে—
ওরাই, দেশের সব টিভি থেকে পিলপিল বেরিয়ে

জর্দার কৌটার ধকে জিম্মি ক’রে রেখেছে পাড়াটা,
হাতে-হাতে হকিস্টিক, দাঁতে-দাঁতে ঘোড়া, জালি, কাটা—

ঢিল ছুঁড়ে শার্সি ভাঙছে, লাথি মারছে সদর দরজায়;
আস্তার্তে, তোমার বেদি—কালো রক্ত—সাগর গর্জায়…

                                                                                                ১১-জুলাই-২০১০

নির্বাক্

             যে বাক্য দেহ ধারণ করেছে মম
কী ভাষায় তাহা কয়েছিলে, প্রিয়তম,
                        হে বাগীশ, হে জেহোভা,
             বাক্যশরীর হ’য়েও, আমি যে রয়েছি জন্মবোবা!

             যে ভাষায় আমি শুনেছি আমার নাম
জন্মের আগে, কখনও না শিখলাম
                        আমি যে তা আগেভাগে,
             ও আলিফ লাম মিমের মালিক, এ বধ কাহারে লাগে?

             ফেরেশতাদের কী ভাষায় বলো, স্বামী,
কী ভাষায় কারে জিগাব এসব আমি?
                        পাতো কোন্ ভাষে কান?
             কী ভাষায় তোরে বন্দে তামাম মজনুন আশেকান?

             সে কি সংস্কৃত? আরবি? ফরাসি? রুশি?
কোন্ ভাষে তুমি হবা সমধিক খুশি?
                        নাকি স্রেফ বাংলায়
             বললেই ঠিক পড়বে তোমার অভিযোগ-গামলায়?

             হয়ও যদি, তবু, এই বাংলার ভাষা
কইতে কি পারে, যারা নয়, ধরো, চাষা?
                        শেখায়ই-বা কে এ-বুলি?
             বিদ্যাসাগর? নাকি টেকচাঁদ? না সুনীল গাঙ্গুলি?

২০০৪

আহ্!

আয়নার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলাম
             আলোর মেমব্রেন ছিঁড়ে—রইয়ে—সইয়ে—ধীরে—
এমন আলগোছে, যেন কোনো কিশোরীর
             হাইমেন ফেটে গেল স্বপ্নের ভিতর
গির্জার স্পায়ার দেখে। বেরিয়ে এলাম
             এমন আলগোছে, ঘুমও ভাঙে নি আয়নার;
তারপর আমার পিছে আস্তে খুলে গেল
             জন ব্যাপ্টিস্ট্-এর চোখে আস্ত অস্তাকাশ—
কাঁপন লাগল না কাঁটে, এমন সঞ্চার!
             আমাদের মাঝখানে কাচের হিজাব,
চামড়ার আড়াল কোনো থাকল না মোটেই,
             থাকল না আত্মার বাধা, থাকল না আলোর;
আমাদের মাঝখানে কেবল ঈশ্বর—
             আমাদেরই হাতে আজ খুন হ’য়ে যাবে…

১৮-সেপ্টেম্বর-০৯

চোখ

             আজ তোমার সমস্ত থেকে জল ঝরছে
যেন পানি-ভরা কোনো পুতুলে ব্রাশফায়ার করেছে কেউ
             আজ আমার রাত্রিভর তোমার জল ঝরছে
একটা আগুন-ডিমের আভায় সবই চতুর্মাত্রিক আজ
             দৈর্ঘ্য প্রস্থ বেধের সঙ্গে হল্লা করছে কাল
                          আর কী-যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব
আজ রাতে আমার রক্তের গোপন সুরগুলি বেরিয়ে পড়ছে সব
             না-সারঙ্গ না-মল্লার বরং কিছুটা যেন বিভাস
তোমার পানিতে ধুয়ে কেমন রক্তিম হ’য়ে উঠছে তারা
                          আর আমি এক ভাসমান বীণা
                                       দিক্-ভোলা নুহের জাহাজ আমি
আমার শেষ দ্বীপটা ঐ ডুবে গেল অস্তসূর্যের মতো
                          আমার শেষ নির্মাণগুলি
বিনির্মিত হ’তে-হ’তে তিরিশটি সবুজ পাখি
             তারও পরে সাতশ’-ছিয়াশি রঙিন তারামাছ
আর জলের উপরে ভাসে বিশ্বরূপার বিশাল দু’টি চোখ
             নবজাতকের চেয়ে পবিত্র সুন্দর
                          মৃত্যুর চেয়ে অমোঘ আর সরল
                                       রাত্রির চেয়ে গভীর

২১-জানুয়ারি-২০১২

নাগপঞ্চমী

১.

তাতা ধিনতাতাধিন তাতা ধিনতাতাধিন

প্রিয়, আজকে আমার শুধু ভাঙছে দুয়ার,
             ধুধু উড়ছে পরাগ কালো পাগলা ঝড়ে,
বুকে বর্শা-সমেত ছোটে মত্ত শুয়ার,
             তত শুক্র উছল, যত রক্ত ঝরে!

             ফাঁকা বৃক্কে আমার কোনো নক্তাহারী
             বাঁকা কুকরি শানায় পাকাপোক্ত হারে :
তুমি আসবে কি আর? ভালবাসবে কি আর?
গোধূলির লালিমায় মধু হাসবে, প্রিয়া?

বহে সন্ধ্যানদীর মোহতন্দ্রামদির
             মৃদু মেঘলাটে জল ভরা সর্বনাশের—
             কালী-জিহ্বা—প্রথম-রতি-ভয়-তরাসে—
আমি কৃত্তিবাসের বুকে নৃত্যামোদী;

আমি চন্দ্রিকাখোর, আমি রৌদ্রখেকো,
আমি অন্ধকারের পোষা হ্যাংলা মেকুর;
             আমি দংষ্ট্রানখর, আমি চৌর্যতুখোড়,
             আমি রূপ ও অরূপ-চাঁছা ক্ষিপ্র উখো—

             তুলে আর্তনাদের তানে মিড় মণিতের
আমি গান গেয়ে যাই একা শেষ ত্রুবাদুর;
             আমি বীর্য ঝরাই জননীর যোনিতে,
মনোনির্জনে এক ভূতপূর্ব বাদুড়…

২.

তাতাধিনতাতা ধিনতাতাধিন তাতাধিন

আমি বস্তুকে বস্তুরূপেই খুঁজি আজ
             যত মন-গড়া হাতকড়াদের খশিয়ে;
তবু মন অসতর্ক সুযোগ বুঝিয়া
             শত গিট্টুতে নিত্য পেঁচায় রশি এর!

             ভরো সৌরভে রৌরবও আজ, কিশোরী,
             বেলি-মল্লিকা-বল্লী তোমার কি শরীর?
ঢেলে মস্তানা পূর্বীতে আর পরজে
বোধি-আস্তানা নাস্তানাবুদ করো যে!

তব সঙ্গীতে লঙ্ঘিতে চাই এ-আরাফ,
             স্মৃতি-তিতলি হে, উড়তে শেখাও আমারে।
             যাব পাল তুলে সাদরা ধ্রুপদ ধামারে,
হবে কাণ্ডারী দীপ্ত তোমার চেহারা।

রাঙা কুর্তা ও ঝিলমিলে নীল সালোয়ার—
তুমি আসবে কি, বাসবে আমায় ভালো আর!
             রাজে চারপাশে কার্পেদিয়েম ভয়ানক,
             মরু-চাঁদনিতে ধন্ধ-অবোধ, নয়নও।

             এসো স্রগ্বিণী, অজ্ঞাতিমির বিদারি’,
দেহো নির্জ্ঞানে তেইশ ক্রোমোজম জুড়ায়ে,
             আনো শেষ-তম নৌকাবিলাস-নিদালি,
আলেয়ার মতো, তার পরে যাও ফুরায়ে।

৩.

তাতাধিনতা তাধিনতাতা ধিনতাতাধিন

ছিল হয়তো সুখের দিনে বন্ধু অনেক,
             তারা আজকে নিদান-কালে সব বীতরাগ।
কোনো স্বপ্ন না-দেয় আলো অন্ধজনে;
             শুধু কুশ্রী হ’য়েই চলে নেগ্রিটোরা।

             বুঝি বাজল কোথাও কাফি কিংবা গারা,
             যেন খুলছে কেলাস-ঘন প্যাঁচটা দাঁড়াশ;
শোঁকে হিংসা স্নায়ুর অমা-অন্ধ কেনাইন,
তবু শত্রু খোঁজার শেষে বন্ধুকে পাই!

মরু-ফুলটা ভবের ভোমা ডাইনামোতে
             ঘোরে উলটা—নয়ন মুদে প্রত্যেকে দ্যাখ্!
             মুখে-বহ্নি বিহঙ্গমা কোত্থেকে এক
চোখে ঢুকছে হঠাৎ, যারে চাই না মোটে…

এ কী চিন্তা ঊষর পীত পিত্ত জ্বালায় :
জাগে সংজ্ঞা জীবন্মৃতে—তপ্ত লালায়;
             হাড়ে-মাংসে রিরংসাতে খিঁচ এত যে—
             দেহে ঘুরছে ঘোরের মতো কোন্ প্যাথোজেন!

             কালীসন্ধ্যা সুরোৎসবে আঁৎকা-আকুল,
স্বীয় গল্পে কয়েদ খাটে কাফকা-কামু,
             শিলাবৃষ্টি ভবের নাটে চলবে চাকু—
খালি একটি চুমুক দেবে কল্‌বে আমূল…

৪.

তাতা ধিনতাতা ধিনতাতা ধিনতাতা ধিন

নামে মেঘ-মালা পাখ মেলে খল জুপিটার,
             দু’টি অণ্ডে কী গণ্ডগোলের মাজেজা!
পশে কাষ্ঠঘোটক-রূপী কারচুপি তার,
             রসে হায় ইহ আর পরকাল ম’জে যায়!

             মহাবিশ্বমাতার যদা দিল্ বেচইন
             দিয়ে সিন্ধু সাঁতার কত দিগ্বিজয়ী
মেলা মাইফেলে যায় খেলে রঙ্গভরে,
তবু মংগ্রেলে মংগ্রেলে বঙ্গ ভরে!

আঁটে আষ্টে ও পৃষ্ঠেতে ঢের কাঁটাতার,
             ঢাকে মসজিদে মন্দিরে জান্নাতি নুর,
             আহা মুক্তাবিহীন খোলে পচল ঝিনুক!
হ’ল গেণ্ডুয়া শেষ মসিহের মাথাটা…

             শুধু বিশ্বাসে মিলবে সে, তর্কে সুদূর :
             যত পথ আছে যাইতেছে ঘরকে শুধু—
আহা ভুল শিবিকায় কী-বিড়ম্বনা রে!
তবু দিনশেষে ভিন্‌দেশে দমব না রে।

             খাখা প্রান্তরে গান ধরে আন্তরিকা
ধ’রে একহাতে শুকতারা একহাতে চাঁদ—
             হিয়া-উদ্ভাসনের ইহা কোন্ তরিকা,
যদি শেষরাতে নিভবে এ-দিব্য প্রমাদ?

৫.

তাতাধিন তাতাধিন তাতাধিন তাতাধিন

কবরের আবরণ খোলে লোডশেডিঙে,
             কারা তিন সারাদিন থেকে যায় বাহিরে—
সাধিলাম, তা দিলাম খালি নষ্ট ডিমে,
             যা-কিছুই আমি ছুঁই, সবই হায় জাহেরি!

             কালা এক নালায়েক কলায়েদ চমরী
             হেঁটে যায় হিমালয় থেকে কেপ কমরিন—
নিশুতির শিশুটির ঘুমে লীন চোখে লোর :
বসুধার সুধাহীন বুকে দুধ শুকাল।

রে-মাছের মতো এক ভেসে যায় বলাহক,
             টানে গা’য় আকাশের পশমের মলিদা;
             নীচে তার জনতার চশমের বলিদান,
বেখেয়াল কারো হায় ফেঁসে যায় গলা-ও—

বাজে তিন পাগলের মায়া-বীণ নদিয়ায়,
ম্যাকাবার নেচে সব অভিধায় বধি আয়;
             নোনাজল-আচমন—কী-কুহক, পরাশর!
             আমি কার? কে আমার? ত্রিভুবন-ভরা শব।

             ধরণির ধমনির অব-লাল নিয়নের
কুয়াশায় বোঝা দায় কে বেজায়, ছোট কে;
             মরণের করোনার অ্যারিনায় ক্রিয়নের
সবিনয় অভিনয় ত্রুটিময় তোটকে।

সিঙ্গাপুর, মে ২০০৫

ভাটিয়ালি

ব’য়ে চলে ঢিমা স্রোতে
             রক্তের ইছামতি
                          অজানা উজান হ’তে
অজানা ভাটির প্রতি

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

ব’সে আছি হাল ধ’রে
             বিশ্বের বিচখানে
                          স্বপ্নের পাল ওড়ে
             জানি না কে গুন টানে

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

ঢেউয়ে ঢেউয়ে বুদ্বুদ
             ক-খ-গ-ঘ-ঙ আর
                          কত মর্মন্তুদ
             অশ্রুত চিৎকার

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে

কোলাহলগুলি সব
             আসমান দেয় ঢেকে
                          কাফনে যেমন শব
             অথবা আত্মা ত্বকে

আহা রক্তের নদী রক্তের নদী বয় রে


চন্দ্রকোষ

কেমন কুটিল, নীল, বাঁকা, চোখা হাসো তুমি, চাঁদ!
             হাসিতে মোতি না, ঝরে চাকুর ঝিলিক; সারারাত
রোঁয়া-রোঁয়া কুয়াশায় সায়ানাইড ঢালো তুমি, চাঁদ,
             কুয়াশা রঙিন হ’য়ে তার পর অভ্র-অন্ধকার—
অন্ধকার অভ্র হ’য়ে মাশরুমের মতো জাগে, চাঁদ,
             আকাশ বুজিয়ে দিয়ে; তোমার চোয়াল-ভাঙা দাঁত
বসে তার অজগর-গলনালি ছিঁড়ে ফেলে, চাঁদ,
             আর সারারাত শোঁ-শোঁ জখমি কালগোখরার শীৎকার—
একটা কপোতের মৃত্যু দীপান্বিতা পৃথ্বী থেকে, চাঁদ,
             উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়া; উল্কার মতন চাঁদনি-পাত
বিস্ফোরণে উপড়ে ফেলছে ভূত্বক্; লাভার মতো, চাঁদ,
             ছিটকে উঠছে আমার শোণিত, তীক্ষ্ণ তোমার ধিক্কার…

২০০৯

26513858_1715201235191657_1678182276_o


ভূষণা

আমার বরাতে আর কিছু নাই, এই বৃত্তি-ছাড়া!
             এ আমি নদের চাঁদ, আধা-নর আধেক কুম্ভীর,
আর তুমি, চাঁদ-বধূ, আমার তালাশে বলেশ্বর,
             গড়াই, কুমার, চিত্রা, মধুমতী উজাও ভা’টাও;
তোমার হৃদয়ে তবু ইচ্ছা আছে, আছে কোনো তাড়া,
             আমার বরাতে আর কিছু নাই রক্তবমি-ছাড়া।

আমাকে খুঁজো না আর, ওগো বধূ, গূঢ় কামাখ্যায়
             যখনই গিয়েছি ফেলে তোমার কোলের ভাত-ঘুম
আমি হ’য়ে গেছি এক বিপরীত-আমি, তুমি যদি
             মৃত্যুর তেজাব সাঁতরে আমাকে কখনও খুঁজে পাও
কী নেবে আমার তুমি? মানুষের বাঁকা চোখা দাঁত
             নাকি কুমিরের বাঁকা লেজ নাকি নেবে অধঃপাত?

অমোঘ অপেক্ষা ক’রে রয়েছে বত্রিশতম ঘাটে,
             সাময়িক-ম’রে-থাকা নেতা ধোবানির মাণবক
ছেলেটারই কথা বলছি—গাঙুড়ের ধুধু পরপারে
             সেখানে কাশের ভিড়ে বেতের টুকরিতে শুয়ে তার
সাধের যমজ ভাই, পালাক্রমে বাঁচে মরে দুইয়ে—
             মাঝখানে, কাপড় নয়, আস্ত-আস্ত মস্তিষ্কেরে ধুয়ে

করতেছেন ধবধবে মা। তুমি থামো সেই ঘাটে গিয়ে;
             তারপর মেরাজে যাও মায়ের আত্মায় দিয়ে ভর;
পিছনে চেয়ো না, সোনা, ডানে-বাঁয়ে তাকায়ো না ভুলে,
             রেখো না আক্ষেপ মনে, হাহুতাশ ছেড়ো না হাওয়ায়,
ইন্দ্রের সভায় তুমি নেচে-গেয়ে মেগো এই বর :
             ‘রক্তপাত বন্ধ হোক, মরতে পা’ক আমার দোসর।’

২৮-মে-০৯

আলোহিম

ও তুমি আমার অপেক্ষা পাও আধোজাগা ভোরবেলায়,
গাঙুড়ের জলে লখিন্দরের ভেলায়;
পরলোক থেকে নরলোকে এক আলোহিম উন্মোচনে
তুমি জেগে ওঠো, আমি গুলে যাই ওজোনে…

এক শূন্য সর্বনাশ, ঊর্ণানীল এক যবনিকা,
আমি একা ধাবমান, পায়ে একটা পুঞ্জাক্ষ করোটি,
গোলপোস্ট অসীম যদি, গোলকিপাররিক্ত যদি, কোন্
কোণে আমি শট নেব, আমি তাই থেমে আছি ঘড়ি,
আমি তাই ছেড়ে দিছি বলের হাতেই অভিমুখ,
আমি গোল হ’য়ে যাব নিজেই, নিজের কাছে গোল
খেয়ে হারুপার্টি হ’য়ে উসকে দেব গ্যালারির রোল;
কে বেশি উদ্বাস্তু?—আমি?—নাকি ঐ গর্ভকেন্দ্র, যার
একমুখী দরজার পিছে লাল হোতা জ্বালিয়েছে হোম?
রামধনু ধোঁয়ার মধ্যে রুরুদিষু বিদায়-আরতি
মোহে মদে ঢেকেছে আকাশ; আমি প্রভাত-পাখির
মৃদু কূজনের মতো শ্রুতিগ্রাহ্য অনুচ্চার হ’য়ে
চুকচুক চুমুকে স্বাদু কুয়াশা গিলতেছি, আমি তার
সিন্দুকে সোনার চাবি—ভিতরে অগ্নিভ অস্তাচল,
মলয় পর্বত? তার নিশ্বাস কী বিষ এই গ্রহে
ব’হে আনে? আমি তার রেণুময় ঋতুতে বারুদ
মেশাব, অথবা, দেখো, আমি নয়, সে-ই একা বুঁদ
হ’য়ে যাবে প্রতি-দমে, হয়তো আমি তখনও ঢুকি নি,
হয়তো আমি ব’য়ে যাচ্ছি, ব’খে যাচ্ছি একা পথে-পথে,
হয়তো তার দরজা নয়, খোলা আছে খালি একটা কান—
ভিতরে কি খোলে কান?—নাকি বাইরে?—বাহন?—না, যান?

                                                ১৩-মার্চ-২০১১

অধ্বনীন হাপু

ও আমার প্রাণ-সজনি, দিন-রজনি তোমার দিকে চলি,
পথের পরে পথ বেড়ে যায়, গলির পরে গলি,
             এ-পথের অন্ত কোথায়!
এ-পথের অন্ত কোথায়, কী পাব তায় এত যোজন হেঁটে?
সাঁতরে এত আঁধার আলো, ভূতের মতন খেটে
             শেষে কি গোল্লা খাব?
শেষে কি গোল্লা খাব, ঢোল বাজাব নিজের সর্বনাশে?
দেখব, ওরা পোড়ারমুখো বিশ্বজোড়া হাসে
             আমাকে সঙ্ সাজিয়ে?
আমাকে সঙ্ সাজিয়ে শিস্ বাজিয়ে নাচবে ঘুরে-ঘুরে
সাতশ’-কোটি খোট্টা, এবং পাঁচশ’-কোটি উড়ে—
             তবু তো চলতে থাকি!
তবু তো চলতে থাকি ঘোর একাকী, চাই নে ডাইনে বাঁয়ে,
হাতেই হাঁটি, যখন আমার খিল ধ’রে যায় পায়ে।
             রাস্তার কোনো বাঁকে—
রাস্তার কোনো বাঁকে যদি থাকে মরণ ঘাপটি দিয়ে,
অতর্কিতে হিরের ছুরি দেয় বুকে বিঁধিয়ে
             তথাপি পাব না টের।
তথাপি পাব না টের, প্রেক্ষাপটের বদল যদি ঘটে,
এক-গিরিসঙ্কট পেরিয়ে আর-গিরিসঙ্কটে,
             আকাশের পাড়ায়-পাড়ায়—
আকাশের পাড়ায়-পাড়ায় ধূমকেতু-প্রায় আমি যাব চ’লে—
আমার মরণ, আর, এমনকি, তোমার মরণ হ’লে
             তখনও শশব্যস্ত!
তখনও শশব্যস্ত এই অগস্ত্যযাত্রা-পথের শেষে
আগের পথটা লেগে যাবে পিছের পথে এসে।

২০০০

দ্বিরাগমন

(অংশ)

১.
তোমার প্রদোষে আমি সেদিন করেছি সন্তরণ—
লাল আর নীল আর পরালাল পরানীল মোহে
আমি তো খেয়েছি ঢেউ মুহুর্মুহুঃ বিরহে ও দ্রোহে,
তোমার ভিতরে আমি করেছি নিজের আচরণ।
তুমি তারও চেয়ে তবু দূরে ছিলে, তোমাকে স্মরণ
আমার অসাধ্য ছিল—আমার বিরুদ্ধ ছিল গলা,
আমার অবাধ্য ছিল আমার নিজের বলা, চলা,
আমার অধার্য ছিল আমার রক্তের বিস্ফোরণ।
এবং রজনি এল তোমার ভিতরে—বা মরণ।
তোমার রজনিগন্ধা অথবা তোমার হিমবাহ,
তোমার অপত্যস্নেহে শয়ান যতেক চিতাদাহ,
তারা খুব ক্লান্তিমায় ঊহ্য ক’রে দিল উচ্চারণ—
তোমার সকল তারা, লাল নীল পরালালনীল,
আমার চোখের দিকে ঝাঁপ দিল—হিংস্র আবাবিল।

৩.
এ-পথের শেষে আছে আমার স্বপ্নের কারাগার,
প্রাকার-পরিখা-ঘেরা, আর সিংহদ্বার সান্ত্রিময়,
এদের এড়িয়ে পশে, মশা-হেন, আমার প্রণয়—
অথচ এদিকে, পথে, যানজটে আমি যে জেরবার।
সে এক অপূর্ব ঘর—পদে-পদে পরিচয়পত্রে
দারুণ কেতাদুরস্ত—ভিতরের চেয়েও ভিতরে
ঘুমন্ত রাজকুমারী—ইতরের চেয়েও ইতরে
তাহারে পাহারা দেয় অনুক্ষণ, এবং একত্রে।
ফি-মোড়ে ট্র্যাফিক-লাইট, অ্যাম্বুল্যান্স্ও আট্‌কে দেয় তারা,
করুণা ফেরায় চোখ অরুন্তুদ উৎকণ্ঠার থেকে,
রাস্তার রোদের মতো দীর্ঘজিহ্ব গোধিকার ভেকে
আমাকে লেহন ক’রে চলে—ঘেয়ো কুকুরের ধারা।
আমার পৌঁছার আগে, চলি না যতই কেন বেগে,
ভাঙবে তোমার ঘুম—উঠবে এক অন্য তুমি জেগে!

৭.
তোমার আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল একমেব
অদ্বিতীয় জরায়ুতে—তুমি ছিলে আমার যমজ;
হ’তে পারে, আমরা ছিলাম দৈবী, অথবা ভ্রমজ—
কিন্তু এ-ভ্রমের শুরু যার থেকে, তাকে দেখে নেব
আজ এই সায়ম্-সুন্দর মহাপ্রস্থানের পথে;
তার কাছে জেনে নেব, কত ফাঁড়া পেরিয়ে আবার
আমাদের যাত্রা কবে সাঙ্গ হবে কোন্ এক আর
অদ্বিতীয় সমাধিতে—ফের কোন্ আদমসুরতে…
আপাততঃ আমাদের বিবিক্ত চলার কোনো মোড়ে
পরিসঙ্খ্যানের কোনো সম্ভাব্যকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত
ক’রে দিয়ে, ভাই বোনে, কেঁদে হাসি, হেসে কাঁদি, ইতো-
ভ্রষ্টস্ততোনষ্টঃ—তুমি, তোমার জ্বরের নীল ঘোরে,
তোমার গোপন খুলে দেখাও দু’একখানা সুর—
ছিনিয়ে নে’ যাই, আমি, যে তোমার ভাই, যে অসুর।

৮.
অচেনা তোমাকে এক দেখি অবলোহিত আলোয়,
আত্মার তাপের মাপে ফোটে এক ভিন্ন অবয়ব,
অহো, এক লোহিমাংশু শালপ্রাংশু জিঘাংসু বিস্ময়
আমার দু’চোখে ঢোকে—পাংশু-আঢ্য, আদ্যোপান্ত শব
বহির্জগতের কোনো নিষ্প্রাণের—বহির্জাগতিক
হিমায়িত কামনায় কেলাসিত; স্নেহহীন স্তন,
প্লাজমাহীন শিরা, আর মজ্জাহীন অস্থি-র ভৌতিক
কোটরসর্বস্ব চোখে গ্যালাক্সির নিঃশেষ মরণ…
এ-সকলই কল্পকথা হবে হয়তো, আমার ইচ্ছার
বিকল্প কেবল, তবু, আজ এই নাক্ষত্রিক ঝড়ে
যখন বিরুদ্ধগতি ব্রহ্মাণ্ডের অসীম বিস্তার
ব্রহ্মার নাভির কেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছে আত্মঘাতী রড়ে
আমিও আমার আত্মহননের বিরুদ্ধ প্রয়াণে
তোমাকে আবার দেখি—আমার জন্মের অভিমানে।

৯.
সেই তো আবার এলে! এলে যদি, কেন হেন দূরে
ব’সে আছ একেশ্বরী? মিলনের এ-কোন্ তরিকা?
খা’ব-এর আবেশে যেন চারিধারে খুঁড়েছ পরিখা—
নান্দনিক ব্যবধান?—এদিকে নন্দন যায় পুড়ে…
আর—সত্যি—কে কোথায় সয় নি কভু দেহের ব্যাঘাত?
এই দেহ সেই দেহ—তলাহীন ঝুলি যদিও-বা,
তবু সে-ঝুলির বাইরে বসে নাকি সময়ের সভা?
যে-সময়ে তুমি আমি ব’সে আছি, বদ্ধমুষ্টি হাত,
যেন মুঠি খুললে পরে উবে যাবে কোহলের প্রায়
আযোজন আয়োজন, আমাদের শেষ মিলনের—
যদিও মিলন, এও বিরহেরই নামান্তর, এর
অমারাতে শাশুড়ি-ননদি কত ঠ্যাকে পায়ে-পায়ে!
পাথর ভাঙে না, হায়, দুর্গে-দুর্গে চলে ঠোকাঠুকি—
লোহার বাসরে তব, আমি কোন্ ছিদ্র দিয়ে ঢুকি?
ঢাকা, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮


যান

কে তোকে দেবে ঠাঁই, কোথায় লুকাবি রে, পাখি?
       কোথায়, কোন্ বুকে, ডানার আবডালে, তুই
             মাভৈঃ শুনেছিলি সুদূর শৈশবে, কার?
নরম দু’টি স্তন তোকে তো ঢাকবে না আর!
       বাইরে, ভিতরেও, ব্যাপ্ত শুধু ভিন্‌ভুঁই,
             মুক্ত মহাকাশে বাষ্পকণা নাই বাকি।

জননী ভগিনী বা দয়িতা দুহিতার কথা
       ভুলিস নি কি, ভোলা, তাদের কোমলতা ভেবে
             উষ্ণ রয়েছিস! অন্ধ, চোখ মেলে তাকা,
ঐ যে সারি-সারি, আপাদমস্তক ঢাকা
       ভূতের বোরকায়, ওরা কি তোকে বুকে নেবে?
             ওরা যে ইস্টার দ্বীপের পরানীরবতা।

কোথায় পলাবি রে পল্‌কা পাখি তুই, তোকে
       বেড়িয়া কোটি-কোটি পরমাণুর চোখে ঐ
             হাজার ইন্টারপোল যে তৎপর, তোর
দেহের কোষে-কোষে হাজারো বোগদাদি চোর
       যাদের গর্দানে জন্মাবধি ঝোলে নঞ্,
             যাদের প্রতি-কোষ জন্মাবধি কালা শোকে…

একটি নুড়ি তোকে দেবে না ছায়াটুকু, আহা,
       পিছনে কালো খাদ, সামনে একটাই রাহা :
             ওঁ ভূঃ স্বাহা! ওঁ ভুবঃ স্বাহা! ওঁ স্বঃ স্বাহা!

 ১৯৯৮

যুবরাজ

আমার যুবরাজ পারে না দাঁড়াতে স্থির হ’য়ে। কিংবা, হয়তো, সে পারে। হয়তো এ শুধু এক তেমন সময়, যখন সে ধরা প’ড়ে গেছে তার দু’-পায়ের মাঝখানে, যা কীনা পদক্ষেপ তার। ও, আমার যুবরাজ পারে না দাঁড়াতে স্থির হ’য়ে। কিন্তু, হয়তো সে পারে!

সে পারে উড়তে প্রজাপতির মতন, না-উড়েও। সে পারে করতে, যে-কোনোকিছুই, কোনোকিছুইও না-ক’রেও। আমার যুবরাজ পারে উড়িবারে। কিংবা, হয়তো, পারে না সে। সকলই নির্ধারিত কোনো কুসংস্কারে। কিংবা কোনো প্রতি-কুসংস্কারে। আমার যুবরাজ উড়তে পারে না। কিন্তু সে পারে।

সে পারে চম্‌কাতে। সে পারে রম্‌কাতে। কী তা হয় ? সে জানে। আমার নিকটে আইসো, ও আমার পৃথিবীর প্রিয় সন্তানেরা! আমি বলব তোমাদের, যে-গল্প আমার যুবরাজ বলেছিল আমায়, কিংবা আমি তাকে বলেছিলাম কখনও, তার নিজের বিষয়ে, কিংবা যে-কোনো বিষয়ে, যা কীনা যথেষ্ট ভালো, আর শোনবার উপযুক্ত। সমবেত হও! সমবেত হও! হাতে-হাত! দাঁড়াও! ব’সো! শোও!

আমার যুবরাজ সূর্যের তাপ সইতে পারে না। কিন্তু হয়তো সে খুব ভালোই এ-সবকিছু সহ্য ক’রে যায়। ভ্রাতৃগণ ও মাতৃগণ! পিতৃগণ তথা দুহিতৃগণ! আইসো, সাঁতার দেও এই তৈলাক্ত রৌদ্রালোকে, এই রৌদ্রালোকের ক্বাথে। সাঁতরাও!

সে তুলল তার হাত, আমার যুবরাজ, মানবের মানব। সে তুলল তার বাহু, আহা, আরামে—আরামে। মনুষ্যপুত্র, তার পানে তাকাও। সে এবে তার সর্বোৎকৃষ্টতায়, তার সর্বাত্মকতায়। ঐ যে সে, ঐ যুবরাজ। হেরো, কী লুব্ধ জ্বলছে তার উষ্ণীষ, স্বর্ণের মতন! নাকি এ স্বর্ণ জ্বলছে তার উষ্ণীষের মতন? সে জানে। আমার যুবরাজ সাঁতরাতে পারে না রৌদ্রে। কিন্তু সে পারে।

আমার গল্পের ধুধু কিনারায়, সেখানে বসেছে এক মধুর প্রতিবিম্ব। অথবা তা হয় নিবর্তক আন্দোলন কোনো—উত্থিত, শীতের গৃহচূড়াগুলির থেকে, চিমনিময়। হয়তো তৃতীয় কে—কে হ’তে পারে? হয়তো যুবরাজ জানে। হয়তো জানে না। ইহা হলুদ, কিংবা হলুদাভ, ইহা হলুদীয়, ইহা সর্বতোভাবেই সোনালি! রঙটি তা-ই। আমার যুবরাজ করবে কী এই সোনালিকে নিয়ে? কোথায় সে নেবে নিশ্বাস?

আর তুমি, যে-তুমি ছাঁচ-ঢালাই, যে-তুমি উপজাত তোমার সহোদরার গর্ভে—তোমাকেও সুস্বাগতম্! লুকায়ো না তুমি, লুকায়ো না। এ-সকলই আনন্দময়। সকলই সর্বোৎকৃষ্ট। আনন্দরূপমমৃতম্।

আমার যুবরাজ এবে প্রশান্ত। কিংবা, হয়তো, সে নয়। সে জানে। নীহারকণার মতো গ’লে পড়ছে অশ্রু তার ফোঁটায়-ফোঁটায়, মর্মর-মেঝেয়, আর কক্ষময় কিচিমিচি উড়ছে তার আপোষা ফিনিক্স্—“টু উইট্ টু উ”… আমার যুবরাজ পারে না উড়িবারে। এবং সে পারে।

আমার যুবরাজ ঠাণ্ডা! মৃত্যু-তুহিন! ও, তোমরা তাকে করো উত্তাপিত! আইসো, রশ্মিসমূহের যত প্রতিনিধি এবং সকলে। সমাবিষ্ট করো যত ব্যঙ্গ্যব্যাজ এবং সকলই। জ’মে যাবে আমার যুবরাজ! হায়!

আইসো এই পর্বতের পিছে, এই মৃত্যুকান্ত ফাটলের পথে। আইসো, আর, হেরো! সেথা হয় নঞ্। অথবা, সেথা হয় । সে জানে। এই গ্র্যানিটের স্তরনিচয়ের নীচে, তলদেশ করো খননা, গভীর গভীর গভীর, আর আপনাকে করো উৎক্ষেপণ, ঊর্ধ্বে ঊর্ধ্বে ঊর্ধ্বে—আর, তুমি সেইখানে! বৈজয়ন্তীপুর! সেথা হয়  আমার যুবরাজ।

আমি ভাবি।

আমার যুবরাজ আসে রুশদেশ থেকে, পকেট-পকেট-ভর্তি নেক্টারিন, প্রতিটি গড়ন বরন তথা স্বাদের, প্রতিটি সম্ভবপর এবং অসম্ভবপর গড়ন বরন তথা স্বাদের। কিন্তু নেক্টারিন হয় অ-ভারতীয় ফল। আমরা জানি না। সে জানে। সে আশীর্ময়। বিশ্বের বিস্ময়। কুত্রাপি অপ্রাপ্তব্য আর, অশ্রোতব্য কদাপি।

এ-ই, তার আবির্ভাব, আর, এ-ই, তার তিরোভাব। নিনাদিত ট্রাম্পেট, আর রণিত ওবো-র সারি, আপ্যায়নে মেতে ওঠে ভিতরে-বাহিরে। আর মেঘদল, যারা না-সাদা-না-কালো, জমে, ঊর্ধ্বে ও চতুষ্পার্শ্বে, নির্মলি’ত চিম্বুক-চূড়ার। আর সেথা হয় হয় । সেথা আমি শুনতে পারি না নাস্তি। কিংবা আমি পারি… সে জানে।

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৭

আরণ্যক

কাঠুরে, বসাও কোপ—
       কেঁদে কেঁদে গান গায়
অ্যামাজন-বনে যত
       মেহগনি গাছ, হায়!

কই সে কাঠুরে কই
       যে ছিল নওজোয়ান?
কই সে কাঠুরে কই
       যে ছিল বীর্যবান্?

কাঠুরে, বসাও কোপ,
       ফালাফালা করো ক্ষুধা,
কুঠারে জঠর ফেড়ে
       ছিনিয়ে নে’ যাও সুধা!

কই সে কাঠুরে কই
       অ্যামাজনে যার ছায়া
পড়লেই, পুরো বন
       বিকিয়ে ব’সত হায়া?

কাঠুরে, বসাও কোপ,
       রমণে মরণ ঢালো!
তোমার তামাটে গায়ে
       চম্‌কাক্ কালো আলো!

কই সে কাঠুরে কই—
       উভরায় কাঁদে বন;
মেঘের মতন ধীরে
       ব’য়ে যায় অ্যামাজন।

১৯৯৫

নির্নিমেষ

            বৃষ্টিগাছের নীচে
আমরা  একলা দু’জন বসা
            ফুলার রোডের মোড়ে
চতুর    চোতের হাওয়ার পসার

            গাছে বসছে এসে
কত     অসঙ্খ্য আত্মারা
            শকুন-চোখে দেখছে
ঠাণ্ডা    আমাদেরকে তারা

            আমার আগে তুমি
নাকি    তোমার পরে আমি
            আর্নল্ডের রাতের
মরণ-   রণক্ষেত্রে নামি

            আমি হিংসা হানি
তুমি     চালাও বিবমিষা
            বৃষ্টিপাতা ঝরে
নগ্ন      ইস্পাতে আর সিসায়

            বৃষ্টিপাতা ঝরে
ছিঁড়ে    যাচ্ছে তোমার ছায়া
            আমার ছায়ার দাঁতে
এখন    তোমার ছায়ার হায়াত

            ছায়ার পাঞ্জা খোলে
অহো    কৃপীটযোনি ফণা
            বৃষ্টি গাছের নীচে
কী-যে   আত্মবিড়ম্বনা

            পঁচিশ বছর যাবৎ
ঝরল    পঁচিশ-লক্ষ পাতা
            পঁচিশ বছরের এক
মলিন   ছবি যেথায় সাঁটা

            আমি রিকশা গুনছি
তুমি     দেখছ হাতের ঘড়ি
            ফুলার রোডের মোড়ে
আমরা  ভূতের মতো গরিব

* ‘কৃপীটযোনি’ শব্দটার ঋণ মিতুল দত্ত’র কাছে

                                                                                                ১৭-নভেম্বর-২০১২

কন্যকায়

(আমার তুন্তি-কে)

সীমন্তে বসন্ত তোর এল নাকি, দুহিতা আমার?
কত পথ ত’রে এলি হামাগুড়ি দিয়ে! কোনোদিন
শুনি নি—এমন মৃদু—শাঁখার, শাঁখের অনুকার
নথের নহর তোর। আহা, স্বপ্ন, স্বপ্ন সমাসীন
জাতিস্মর এষণায়। এ-নিয়তি পাখির বিলাপ
অসৎ নৈর্ঋতে, আহা, আকাশের লাল-আঁখিকোণে
শুভ্র ফড় খশিয়েছে অভ্রভেদী এক এপিটাফ—
শুদ্ধ-রোদে-নেয়ে-ওঠা ঘাসের মেয়েরা তাই  শোনে…
রাতভর নীল-রাংতা নীলিমায় নীলা-নীল ধূম
জড়িয়ে-জড়িয়ে আঁকে, পৈতৃক সুখের অন্তরালে
চুনি-পাপ, আর পাপক্ষালনের তৈলতোয়া ঘুম,
লেবু-ফুল, চাঁদা-টিপ, ভিজে রাত,—যে-রাত পোয়ালে
তোর বুকে দুধ আসে নক্ষত্রের ঘাস হ’তে, আর
স্বপ্নের সুদূরে চলে ননিচোরা মধু—মধুবার!

ঢাকা, ১৯৯০

যৌবরাজিক পদাবলি

(অংশ)

১.
এ কী এ        অভূত্ ভুবন!      এ কেমন     চিহ্ননাশী!
আঁধারে            ভেসে এসে      আঁধারে     ফের তো ভাসি!
নকশা-কাটা ঝরকা-কাটা      এই পথে আর যায় না হাঁটা—
ও     তুমি শুনেছিলে তখন      যে-বাজা     বাজল বাঁশি?

এই         মাংস ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে     রোদ-শুকোনো ক্ষীরের পানা,
রোদ্দুরে       পায় যে পানা,    আহা!      রোদ্দুরে     হয় যে ফানা!
কোথা কোন্  মনের মানুষ,   চলো যাই     দেখে আসি।

        সকলে     সন্ধেকালে      ঘরে গে’     কী দেখতে পায়?
চটি এক,       ভাঙা ছড়ি,     যেন কার     দুষ্প্রাপ্যতায়!
আহা রে,         গড়াগড়ি,      বাতাসে     লটরপটর,
যদি-না     তুই তা ধরিস,      যদি-না     হাসিস হাসি!

   এই পালাতে মেলা গলা,      এই বুদ্বুদ্ ফাটায়ে দে,
     বিষ্ণু পড়ে চক্রে কাটা,        শম্ভু মরে কম্বু কেঁদে—
এ-জীবন     ধ’রেই সবাই      মিলে রই     আমরা ক’ ভাই,
যেমতো     আজ্ঞা করেন       শ্রীমা— স্বর্বিনাশী।

আসে সে     বেভোল ভোলা     অনাহত দণ্ড-হাতে—
তুমি তায়    ফিরিয়ে দেবে?    নাকি তায়     রাখবে সাথে?
   নাকি তার     দণ্ড নেবে?     নাকি তার     নেবে ফাঁসি?

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৭

২.
কে তুমি     আমায় খোঁজো      বিধুহীন     বিধুর রাতে
                  নিয়নে     পাস্তরিত      জায়নের     সাত তলাতে?
            কে তুমি     সন্ধিকালে      মেপলের     পত্র হাতে
            ঘুরিছ     গগন-কোণে      কোনো শ্বেত-     বামন না’-তে?

হেই হোজান্না নেমেছে মান্না, থেমেছে কান্না,
                  ডিমিটার,      বুকের খাতে?
হেই হোজান্না নেমেছে মান্না, কত তামান্না
                  জুড়েছে      সুরের সাথে!

কে গো নিজ     রক্তে নাচো      আমদির     যন্ত্রণাতে?
            মরণের     অন্ধকারে      স্মরণের     কী মৌতাতে?
      এ-জীবন     উদ্‌যাপনের      পিছনে     যে-পথ, তাতে
কেন, হায়,      ঘুরছ তুমি?      আমি এই—খোলা হাতে!

হেই হোজান্না নেমেছে মান্না, থেমেছে কান্না,
                  মরুময়      আরাফাতে?
হেই হোজান্না নেমেছে মান্না, কত তামান্না
                  জুড়েছে      সুরের সাথে!

                              কে তুমি?      কে তুমি?
                  কথা বলো!      কথা বলো!
                              বিধুর রাতে—
                  বিধুহীন      বিধুর রাতে—
কে তুমি?

ঢাকা, ১৯৯০

৬.
আমার    মাথার ভিতরে       কত       ওড়না যে ওড়ে
             ফাল্গুন-বাতাসে      আহা      আমারই নিশ্বাসে
                                         কত       ওড়না যে ওড়ে
                          ঝিকিমিকি                        চিকিমিকি
                          তারা-খচা                        ভাই রে

আমি      ওড়না সরালে        দেখি       তাহার আড়ালে
                          ঝিকিমিকি                        চিকিমিকি
                          তারা-খচা                        রাত
                                         আর এক  কুণ্ঠা-ভরা হাত

আমি      ভাবি বিস্ময়ে         এ-সব     আমার কি নহে
আমি      মাথারে শুধাই       কত       জটিল জল্পনাই
             কেন কী শখে         এমন অসুখে
             ফাল্গুন-বাতাসে      নিশ্বাসে নিশ্বাসে
                          ঝিকিমিকি                        চিকিমিকি
                          তারা-খচা                        ভাই রে

রাজশাহি, ১৯৯২

৭.
ঐ কে ডাকে আমায় আকাশ-চূড়ায় রে আকাশ-চূড়ায়
তোড়ে জোড়ে জীবন ফুরায় রে জীবন ফুরায়
ওগো মধুরকোমলকান্ত তুমি আমারে খালাস করো সময়ের কারাগার থেকে
কিংবা এবে চুপ করো চুপ করো চুপ করো মোরো না আমারে ডেকে ডেকে
আমি তো জেনেছি এই কালো হিম আলো এই আলোহিম ব্রহ্মপ্রজ্ঞাকণা
স্বপ্নে আর স্বপ্নভঙ্গে আমি আর কিছুই জানব না আমি কিছু জানব না

ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৭

১৪.
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়
                          কোথায় যে হায়—
             রাত কাঁপে আলেয়ায়,
             জোনাকির ঝরোকায়,
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়…
             নিষুপ্ত মঞ্জরি,
             স্বপ্নে কে চঞ্চরী
চুমে তোর ঘুমের গুহায়?
                          কোথায় যে হায়
সুরগুলি দূরে উড়ে যায়…

ঢাকা, ১৯৯০

26652918_1715201181858329_476191803_o


বহুড়ি

১.
দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
             আজ উঠো না আমার আতা গাছে,
ওখানে এক তোতার বাসা আছে।
দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
             কাল শিমুলের ফলটা ফেটে গেছে,
জোনাক পোকা ছুটছে রাতবিদিকে,
             আঁধার ঘরে ঢুকে সে যায় পাছে!
দেওর আমার, সাধের দেওর আমার,
আজ ফিরে যাও, পরশু কথা আছে।

২.
ঠাকুরঝি, তুই আমার চোখের নীচে
             খুঁজে মরিস কোন্ শাওনের রাত?
আমার নাভির নীচে, ঠাকুরঝি লো,
             খুঁজিস রে, বোন, কোন্ বাঁওনের হাত?

তোরে    তিন সত্যি করছি, ঠাকুরঝি,
             আমি    ষড়্ঋতুর আকাশ দেখি নি,
শুধু    একটা স্বপন দেখেছিলাম কালকে—
             মিছিল ক’রে আসছে ভাসান পালকি!

তিন সত্যি করছি, ঠাকুরঝি,
আমি সে পালকিতে চড়ি নি।

৩.
তোর চোখে, সই, সিঁদুর রাঙা মেঘ,
             বুকের ভিতর পশলা,
আমার চোখে একটু চেয়ে দ্যাখ্,
             চোতের আকাশ, ফরসা!

হেথায় ঝিঁঝির অসহ্য উৎপাত,
             হোথায় ব্যাঙের জলসা—
ছোঁব না তোর মেন্দি-পিন্দা হাত,
             আমার হাতে মসলা!

৪.
জায়ের আমার হাজার গড়খাই,
             খোয়াইডাঙায় গোরুর গাড়ির চাকা,
শুকনো ফুলে চৌদ্দটা মৌমাছি—
             ভাসুর আমার কী ফাঁকা, কী ফাঁকা!

বিলের জলে ঢিল ছুঁড়েছে কেউ,
             নিথর দেহে থিরথিরানো ঢেউ,
থরথরিয়ে কাঁপছে সিঁদুর, শাঁখা,
             ভাসুর আমার কী ফাঁকা, কী ফাঁকা!

ঢাকা, ১৯৮৯

ডিউটি অ্যান্ড দ্য প্রিস্ট

আমার পিঠে আমি, এখন পেরিয়ে যাচ্ছি পামির,
তিন-জমানা পরে আবার আমি আমার স্বামী।

ক’ষে কশা মারি আমার পাছায় বেসরকারি,
নিজের থেকে নিজের দিকে তামাম কালাহারি।

এই তো গতকালও আমায় বাসবে বুঝি ভালো
নীলপাখিটা, আজ সকালে গুটিয়ে ফেলল পালক।

আরে কী অদ্ভুত! ও-রাস্তা শাঁকচুন্নির পুত ও!
আমাকে পশ্চিমে ঠেলে পুবে ছুটছে দ্রুত।

খুব কি ছিলাম লোভী? নেহাত মধ্যপদলোপী—
ঘরকে গেলে চরকা কাটছে পত্নী পেনেলোপি।

মন বসে না তাতে, হায় রে হাত চলে না তাঁতে,
কে তোর বিচি চিবিয়ে খাচ্ছে পদ্মের মৌতাতে?

কাজেই আমি একাই চলছি আমার ভাগ্যরেখায়,
আমিই প্যানোরামা আমার মাছির চোখের দেখায়।

আমার লগে চলো, পিছে কতই কবরফলক,
অতীতে সব ধর্মবদল, আগুন এবং জলও।

অতীতে সব অতীত, যতেক চালচুলাহীন পথিক,
বালির তলায় বীণা বাজায় মৃতের সরস্বতী।

ও গো পিঠের আমি, আমার সোনার চেয়ে দামি,
আমায় ছেড়ে যেয়ো না তুমি, রাব্বুল আল-আমিন।

                                                                                                ১৯-অক্টোবর-২০১০

আমার ঘুম-ভাঙানো চাঁদ

রক্তবৃষ্টি হয় রে, আমার রক্তে বৃষ্টি হয়
এই কবিতা আমি কই নে, অন্য কেহ কয়
মাথাতে তার দুইটা টিক্কি, আমার মাথায় কয়
জানতে পারলি কাইটে যেত নাড়ি কাটার ভয়

ও গো মা কেমনো বিস্ময়
ও গো মা কেমনো বিস্ময়

বৃষ্টি পড়ে ভাটির দ্যাশে, পড়ে না উজানে
ডাইনে-বাঁয়ে ঘুঘু-ডলক, খটখটা মাঝখানে
গড়াইয়ে খায় গড়াগড়ি ইছামতির ভাঙ্গা তরি
রক্তপাথার সন্তরি রে সপ্তবিশ্বময়

ও গো মা কেমনো বিস্ময়
ও গো মা কেমনো বিস্ময়

ভিন্-বাতাসের অশরীরী, ভিন্-আকাশের চান
কী-আলেয়ায় আঁধার ধাঁধাও, না-জান না-পহ্‌চান
আমার বুকের কাছে একজন জোনাক জ্বইলে আছেন
আমার চোখের কাচে তিনি তিন-তিরিক্ষি নয়

ও গো মা কেমনো বিস্ময়
ও গো মা কেমনো বিস্ময়

আর-বার ফিরিয়া এয়েছে মাহে ফেব্রুয়ারি
ঘরে-ঘরে শুক্কুর-শনি তারকা-শুমারি
যে-নারী তার দুইটা ছায়া, আলোর সুতার শাড়ি-সায়া
আয় মেসায়া, নবির বাবুই, আমার কোলে বয়

ও গো মা কেমনো বিস্ময়
ও গো মা কেমনো বিস্ময়

নোতুন চাঁদের জন্ম হল নোতুন রাহুর ক্রোড়ে
আমরা মিছে ভিজে মলেম বধ্যভূমির ফ্লোরে
বৃষ্টি পড়ে সামনে-পিছে, বৃষ্টি পড়ে উপ্রে-নীচে
রক্তে রক্ত তরঙ্গিছে, বিষে বিষক্ষয়

ও গো মা কেমনো বিস্ময়
ও গো মা কেমনো বিস্ময়

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০১৩

প্রেম

এক        পৃথিবী-প্রমাণ শঙ্খের থেকে বেরিয়ে আসছে ওঙ্কার,
ওম্        অনন্ত হরি নারায়ণ—ভাঁজে রামকেলি রাগ ফৈয়াজ
আর       জ্যোৎস্নাস্নাত বাত্যায় কাঁপে বিবিক্ত এক লাইটহাউস,
ধুধু        দুর্গের উঁচু শার্সির নীচে নিশি-সিন্ধুর তাণ্ডব

             তানানা দেরেনা নোমতোম
             তানানা দেরেনা নোমতোম

কোনো    হানা-গির্জার ছুঁচালো চূড়ায় এক্স্-রে-চক্ষু দাঁড়কাক—
ওহ্,        রোমিও রোমিও! হোয়্যার আর্ট্ দাউ, রোমিও!
আমার    চোখের পাতায় তোমার নিশ্বাস
আহ্!      আমার চোখের পাতায় তোমার বারুদ-ঝাঁঝালো নিশ্বা
আর       জ্যোৎস্নাস্নাত ঝঞ্ঝায় দোলে উচ্ছ্রিত এক লাইটহাউস

             তানানা দেরেনা নোমতোম
             তানানা দেরেনা নোমতোম

২০০৫

হিংসা-সপ্তক

হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলব তোমার মুখোশ আমি, সবাইকে দেখিয়ে দেব
             তোমার চেহারা,
আর-একটা হৃদয়ও তুমি চেবাবার আগে ঐ মাড়ি থেকে খুলে নেব
             একটি-একটি দাঁত,
ওপড়াব তোমার চোখ—একজোড়া প্রতিসূর্য—আর-একজনও জলজ্যান্ত
             যুবাকে পাথর
বানিয়ে ফেলবার আগে,—নরম থাবায় দশটি লুকোনো নখর আমি
             উখো ঘ’ষে-ঘ’ষে
নির্বোধ মাথার মতো ভোঁতা ক’রে দেব আর হিলহিল সাপের কেশ
             অথবা কেশর
কামাব ঘৃণার ক্ষুরে—এবং তারপর দু’টি পয়োমুখ বিষকুম্ভ,
             শিশুকৃষ্ণ-প্রায়,
চুষে ছিবড়ে ক’রে ফেলব যদি মাত্র একটিবার, আর মাত্র একটিবার
             জন্ম নেওয়া যায়…

১১ মে ২০০৮

মানুষের মৃত্যু হ’লে

জানি যে অন্যায় খুবই তোমাকে এসব বলা আজ
হাজার বছর যদি কেটে গেছে অন্ধ প্রশ্নহীন,
আর আজকেই সূর্য যদি উঠতে চাইল পশ্চিম সমুদ্রে
কী কাজে সাজাই এত আইসবার্গ দিগন্তরেখায়?
নোতুন উত্তাপ কোনো সহ্য করে না কি এই ত্বক্?

        বড় দেরি হ’য়ে গেল সময়ের বা অসময়ের।
অন্ততঃ টিনের থালাটিকে যদি বাঁচাতে পারতাম
কবর-কীটের সাদা দাঁত থেকে, যদি সে-হত্যার
কোনোএকটা আখেরি নিশান থাকত তোমার স্মৃতিতে,
একটা শুকনা লেবুফুল, ছুঁড়ে ফেললে তবু যে পড়ে না
কোলাপুরি চপ্পলের তলে—আর রাশিফল থেকে
একটা অজানা রাশি কম পড়ে শুধু গণনায়
সামনে থেকে পিছে থেকে, উপরে বা নীচে থেকে, তুমি
যে-দিক্ থেকেই গোনো—মালকোষের বিবাদী পঞ্চম—

        এসবই সাব্যস্ত করতে পারত আমাদের সাক্ষাৎকারে
কেমন আলাপ থেকে ওঠা যেত কেমন খেয়ালে;
কোথা থেকে, দ্যাখো দিকি, আলটপকা টপ্পার গাধা চ’ড়ে
আমি একলা ব’সে থাকছি আর ভিক্ষা মাগছি ভিক্ষুকের,
একলাএকলি ব’লে যাচ্ছি যে-প্রসঙ্গে তোমার জানবার,
জানাবার বাকি থাকলে হাজার বছর আগে থাকত

        যখন বরেন্দ্র থেকে ডবাকের জলায়-জঙ্গলে
পানসি এসে ভিড়েছিল—পালে একটা আঁকা বাঁকা-চাঁদ—
মুখ-ঢাকা দেবী, পাড়ে, পাটাতনে মেরি ম্যাগডালিন
ঈশ্বর-বিক্ষত যোনি ঢাকছে ভেরোনিকার রুমালে…

                                                                                                ২১-জুন-২০১০

লাল চাঁদ

১.
আমার আকাশে নিভে যেয়ো না গো, চাঁদ!
ওগো চাঁদ, চাঁদ, তুমি হৃৎপিণ্ডের চেয়ে লাল চাঁদ!
সকল গোধূলি আর সকল প্রভাতে
তুমি ল’য়ো আমার সংবাদ
আমার নিষ্প্রভ দিন, আমার কুহেলিধুধু রাত
ধুয়ে দিতে তোমার প্রভা-তে।

২.
খুলি খুলে ব’সে আছি, নিউরনে ঝরিছে লানত;
আমি একলা কালো-ঘুঘু, ছায়াহারা ফরগেট-মি-নট—
যতদূরে জ্যোৎস্না যায়, যত দূরে থামে
ততদূর দূরবর্তী তবু সন্নিকট
ঈশ্বরের আব্রহ্মাণ্ড বামে
আমারে পাথর ক’রে রাখিয়াছ তোমার হারামে…

৩.
তুমিহীন আমি শুধু মৃত্যু নয়, জন্মরোধ নয়,
জন্মপূর্ব মৃত্যু আহা, সে যে এক দ্বিতীয় অন্বয়
অন্য কোনো ঈশ্বরের, ভিন্ন কোনো আকাশে, রাতুল,
সেখানে ঢাউস ঢেউয়ে কোনো চোখা রুপালি মাস্তুল
ক্রমশঃ বাবেল হ’য়ে উঠিতেছে আমার জন্যই:
বিপরীত মর্মমূলে বিপরীত শূল!

৪.
সে-ছবিও দেখেছিনু মায়ের জঠরে,
চোখে নয়—সারা গায়ে টক্কা-টরে-টরে
বেজেছিল আতঙ্কের পারা—
তৎক্ষণাৎ তোমার ইশারা!
তৎক্ষণাৎ রিরংসার জোনাকিরা মাথার ভিতরে,
তারাখচা আকাশের আরেক চেহারা…

৫.
বেরিয়ে এলেম বাইরে। ঈশ্বর, অবিনশ্বর শাপ,
আমাদের মধ্যে তুমি ইথারের মতো ফুলে আছ;
সব-আলো-বাঁকিয়ে-দেওয়া কাচও
এহেন অরাল নহে; এমন করাল নহে সাপ :
আমার চাঁদেরে তুমি শূন্যে ধর্ষিয়াছ,
তার খসমেরও আবরু লুণ্ঠিয়ো না, বাপ!

৬.
ভিড় ক’রে আসে জল, আন্ধারের গন্ধকের পানি,
দিগন্তের চক্রব্যূহ ব্যেপে তীব্র, অম্ল কলকলানি,
তারল্যের তেজাব-আক্রোশ—
আমারে শুষিয়া লহো, অয়ি শশীরানি,
চৌচির করো আরশিখানি,
ঝুরঝুর ঝরিয়া যাক পঞ্চকোণ আল্লাহ্‌-র আরশ।

০৯-অগাস্ট-২০১৩

তীর্থের পথের ধারে

তোমার তুলনা খালি তুমি, তুমিই গো মা।
             পুতেরে হুতায়া তুমি কাপড় ধুইতে গেলা,
চিক্ষুরে-চিক্ষুরে আমি ভাঙ্গিলাম গলা,
             তুমি দেখাইলা না আর মাতৃত্বের খোমা,
লইলা না আমারে কাঙ্খে। আরেক মহিলা
             চাপলিসে উঠায়া নিল, পাতার বস্তায়
ভইরা ফেলল। আমার মতো একই অবস্থায়
             গণ্ডায়-গণ্ডায় আণ্ডাবাচ্চা চাটল অবহেলা

তীর্থের পথের ধারে। হাত-পা-হারা ধড়ে
             খানকির মতো কাইজ্যা মুখে, সানকি টানাটানি,
আচমকা টুংটুং সিকি-আধলি যদি পড়ে
             মনে পড়ে সোনার-হাতে সোনার-কাঁকনখানি;
মনের ভুলে ‘মা’ ডাকলে, হেরা মনে করে
             আহা রে বেচারা। আমরা ভাবি চুৎমারানি।

২২-জুন-০৯

কবি

দান্তে-কে ফিরিয়ে নেয় নি ফ্লোরেন্স, আমাকে নেয় নি ঢাকা;
দিব্যি দেখতে পাই : অন্ধ গ্রানাদার নগর-তোরণ
পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শেষ মুর কবি, পিছে ফেলে
একটা আস্ত সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ আর তার শেষ
পাণ্ডুলিপি, যার ভাগ্যে কোনো ক্যাথলিক উনানের
জ্বালামুখ বরাদ্দ; তারপর কত করুণ শতক
মাড়িয়ে কাফেলা-হারা কোনো একা নাজেহাল উট
মরুঝড়ে বালির-কাফন-খুলে-যাওয়া মৃত এক
নগরীর মুখোমুখি এমনকি বিস্মিত-হওয়া ভুলে
দেখবে একটা কঙ্কালের হাতে একটা পাথরের বালা
ঠিক যেরকমটি তার মালকিনের হাতে ছিল কালও।

                                                                                                ১৩-জুন-২০১২

ভোরাই

শিউলি শিউলি
আমি শিউলি কুড়াতে যাই
হিমেভেজা ভোরে
পেঁজা-পেঁজা শিউলি আছে ঝ’রে
আমি ভরব গেঞ্জির কোঁচড়ে
আমার তো মা নাই ঘরে
বাপ গেছে তার পরে-পরে
আমার তো কোনো কেউ নাই
মালা গেঁথে দিব আমি তোরে
তুই হবি বোন? হবি ভাই?
আকাশের শেষ তারা মরে
কালো দুধ ঢাকে সাদা সরে

                                                                                                ২৫-অগাস্ট-২০১০

শাহ্ মখদুম

রাত : সম্‌নাম্‌বুলিস্ট্ ট্রেনটা ছুটে যায়, সুনসান
শূন্যমার্গে; যেন মর্গের দেরাজে-দেরাজে লাশ
বার্থে-বার্থে হিমায়িত ঘুম-গুমসুম ইনসান;
রাত-কানা এক টিকেট-চেকার করে খানাতল্লাশ।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম-দুম হয় হার্ডিন্‌জ্ ব্রিজ পার।

রাত : ছাইচাপা আপার-বার্থে ধূমপিণ্ডের মতো
গুলে-যাওয়া কোনো প্রত্যঙ্গের করি অনুসন্ধান,
চোখ-কান-হাত-চুল-নখ-দাঁত ছড়ায়ে ইতস্ততঃ
ঢুঁড়ি লাপাত্তা আত্মা আমার—হৈহৈ হয়রান।

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম-দুম হয় হার্ডিন্‌জ্ ব্রিজ পার।

তিরিশ-পাখির মতো উড্ডীন এক-ট্রেন খণ্ডতা,
মহান্ সেমুর্গ্ আর কত দূর? পোড়াদহ জংশন
আর কত পথ? শত-শত প্রাণ শুষে নিয়ে, অন্ধটা
কই আমাদের নঞ্ হ’য়ে, হায়, ব’য়ে যায় শন্ শন্?

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম-দুম হয় হার্ডিন্‌জ্ ব্রিজ পার।

রাত : তকরার—একবার যদি পড়শি আমায় ছুঁতো!
গলন্ত-লোহা-বহা যমুনায় খেয়া দেয় নিশি-কানু;
শরীর পালায় শরীরীকে ফেলে; সময়ের চেয়ে দ্রুত,
একটা মানুষ হবে ব’লে, ছোটে এক-ট্রেন শুক্রাণু!

উৎকণ্ঠার ন্যায় নিঃসীম পদ্মার বিস্ফার,
শাহ্ মখদুম দুম-দুম হয় হার্ডিন্‌জ্ ব্রিজ পার।

২০০৪
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

জন্ম ৭ জানুয়ারি, ১৯৬৫; ঢাকা। এমএ (ইংরেজি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া-নিবাসী। পেশা: আইটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে, সেলজ অ্যান্ড প্রডাক্ট ম্যানেজমেন্ট।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
তনুমধ্যা [চেতনা ১৯৯০], পুলিপোলাও [একবিংশ ২০০৩], কবিতাসংগ্রহ [খান ব্রাদার্স ২০০৬], দিগম্বর চম্পূ [একুশে ২০০৬], গর্দিশে চশমে সিয়া [যেহেতু বর্ষা ২০০৮], ঝালিয়া [ভাষাচিত্র ২০০৯], মর্নিং গ্লোরি [ঐতিহ্য ২০১০], ভেরোনিকার রুমাল [অভিযান (কলকাতা) ২০১১], হাওয়া-হরিণের চাঁদমারি [ভাষাচিত্র ২০১১], আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ [আদর্শ ২০১২], Ragatime [ইংরেজি কবিতা, বইপত্র ২০১৬]

উপন্যাস—
কালকেতু ও ফুল্লরা [শ্রাবণ, ২০০২]

গল্প—
মাতৃমূর্তি ক্যাথিড্রাল [পেঁচা ও প্রতিরুদ্ধ, ২০০৪]

অনুবাদ—
অন্তউড়ি [পদ্য রূপান্তরে চর্যাপদ, চেতনা ১৯৮৯]
নির্বাচিত ইয়েটস [ডব্ল্যু বি ইয়েটস-এর নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ, চৌধুরী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস বুক কর্নার ১৯৯৬]
এলিয়টের প’ড়ো জমি [টি এস এলিয়ট-এর দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড ও দ্য লাভ সং অব জে অ্যালফ্রেড প্রুফ্রক-এর অনুবাদ, চৌধুরী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস বুক কর্নার ১৯৯৮]
কবিতা ডাউন আন্ডার [অস্ট্রেলিয় কবিতার অনুবাদ, অংকুর সাহা ও সৌম্য দাশগুপ্ত’র সাথে, ভাষাচিত্র ২০১০]
স্বর্ণদ্বীপিতা [বিশ্ব-কবিতার অনুবাদ, শুদ্ধস্বর ২০১১]

ই-মেইল : augustine.gomes@gmail.com
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ