হোম কবিতা তীব্র ৩০ : শামীম কবীরের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : শামীম কবীরের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : শামীম কবীরের বাছাই কবিতা
612
0

শামীম কবীর : এলিজি

১৯৯০ সালের এপ্রিল মাস। লিটল ম্যাগাজিন, ফ্রানৎস কাফকা, সুবিমল মিশ্র, ঢাকার শিল্প-সাহিত্য—এসব কিছুর সাথে বন্ধুত্বের এক পর্যায়ে কবি শামীম কবীরের সাথে পরিচয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শামীমের সংবেদনশীল চরিত্র আর তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় পেলাম। ধনেশ পাখির মতো গম্ভীর অথচ ভেতরে ভেতরে অশান্ত কবির অবয়ব। সেঁকো বিষ আর পোড়া মদ দিয়ে তৈরি যার তারুণ্য; করতোয়ার স্রোতহীন জলের সাথে অন্তর্গত বাক্যালাপের পর নিরন্তর সে গেঁথে চলেছিল একটার পর একটা কবিতার ব্রিজ। একমুখী সে ব্রিজে ভরশূন্য পরিভ্রমণ। নিজস্বতায় ঋদ্ধ নাগরিক ব্যক্তির নৈঃসঙ্গ্য, যন্ত্রণা, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি আর বিচ্ছিন্নতাবোধের চর্মহীন কঙ্কাল যেন শামীমের কবিতা। তবে লোকজ ও স্থানিক উপাদান তার কবিতায় অনুষঙ্গ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত। তিরিশের কবিদের ধারাবাহিকতায় বাংলা কবিতায় আধুনিক নিঃসঙ্গ মানুষের যে নৈর্ব্যক্তিক উপস্থিতি; শামীম কবিতায় তারই ব্যবচ্ছেদ করেছেন মর্গের দমবদ্ধ ঘরে। সাড়ে চব্বিশ বছরের স্বল্পায়ু জীবনের প্রায় অনেকটা সময়জুড়ে কাটিয়েছেন কবিতার অনুষঙ্গে। “বিনিদ্র লাল কালো অনেকগুলো চোখ ফুটে চেয়ে আছে নলাকার কাঠ থেকে”—এই ছিল তার দেখবার যন্ত্র। জীবনের ভেতরে থেকে দর্শক হয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ শেষে অরো একটি চাঁদের দেখা পেয়েছিলেন শামীম। আর সে অভিযাত্রায় চান্দ্র ড্রাগনের শ্বাসে ঘাড় পুড়ে শক্ত হয়ে গেল। অতর্কিত একটি পিছল কাঁখ তাকে বহন করে নিয়ে যায় যুদ্ধের বাইরে—যে গর্তে তলা নেই তার। জ্ঞানী কবরের স্কন্ধে চ’রে তাকে বলতে দেখা যায়—“কাঁদে বালিহাঁস/ কাঁদে উঁচু চিল/ কাঁদে মধ্যবর্তিনীরা আর সবুজ ফাঙ্গাস/ আমি জানি না আমি কী খুঁজি/ আমি ক্যানো যে কাঁদি না।” কখনও আবার তাকে লিখতে দেখি—“তোমার বিপুল গড়নের মধ্যে কোনোখানে এক টুকরো জটিল উল্লাস আছে তার স্পর্শে বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ”—এরকম সব আপ্ত বাক্য। ঢাকায় আশির দশকে শুরু হওয়া লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের কবিতায় শামীম বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে লিখে গেছেন। ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিকতা ও আগ্রাসী, শোষণধর্মী কাঠামোর প্রতি শামীমের নঞর্থকতা শুধুমাত্র লেখার মধ্যে প্রকাশিত হয় নি; তার জীবন দর্শন ও আচরণেও তা প্রকাশ পেত। শামীমের ভেতরে বোহেমিয়ান সত্তার উপস্থিতি ছিল প্রবল। প্রচলিত ধর্ম, মূল্যবোধ, লৈঙ্গিক ও শ্রেণিগত রাজনীতি ইত্যাদির অসাড়তা, নির্মমতা, প্রাণহীন অস্তিত্ব তাকে বাধ্য করেছিল সকল ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বের বাইরে থাকতে—যা হয়তো একজন সংবেদনশীল কবি’র সহজাত স্বভাব। নব্বই থেকে চুরানব্বইয়ে ঢাকার সমসাময়িক তরুণ কবিদের সাথে লেখালেখি, তরল-কঠিন-বায়বীয় নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিভ্রমণ কবিকে নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল। তার স্বেচ্ছা জীবন- প্রক্রিয়া, মনস্তত্ত্ব, কবিতার ধরন অনেকটাই বোধগম্যতার বাইরে ছিল অনেকের কাছে এমনকি সাহিত্য পরিমণ্ডলেও, যা এখনও অনেকটা রয়ে গেছে। তার কবিতার আলোচনা মূলধারার সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়।  কবিতায় পুরাতন, অন্তঃসারশূন্য চিন্তাকে আঘাত করে নতুন চিন্তা ও শব্দের ব্যবহার শামীমকে করে তুলেছিল স্বতন্ত্র, নিজস্ব স্টাইলে দক্ষ যা সমকাল-উত্তীর্ণ। কবিতায় তার প্রকাশভঙ্গি ছিল ব্যক্তিগত যে জন্য তার পাঠকও মুষ্টিমেয় এবং বলা যায় পরবর্তী সময়ের ও নতুন ভাবনার পাঠকের জন্যই তৈরি হয়েছিল তার কবিতা। “হয়তো আমরা দুইজনই পৃথিবীতে সবুজ পাতাঅলা গিরিবাজ তৈ তৈ তৈ তৈ তৈ….”.এরকম সব বাক্য লেখার পর শামীম তৈরি করেছেন “ম্যান সাইজ আরশি কিংবা আত্মহত্যা বিষয়ে গল্প’র মতো কবিতা। দ্রষ্টব্য থেকে প্রকাশিত ’শামীম কবীর সমগ্র’-তে কবির অধিকাংশ কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে শামীমের স্বেচ্ছামৃত্য’র দু’বছর পর। এই প্রকাশনার দীর্ঘ বিরতির পর অ্যাডর্ন পাবলিকেশন ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করে নির্বাচিত কবিতা : শামীম কবীর।

– নভেরা হোসেন


গোলাপি ও ছাদের ওপর জন্মদিন


যাহা ঘটিলো

তবু কতো সন্ধ্যাকালে ঘাম মুছে ফেলে
ঘাড় থেকে দাগ তুলে জিরিয়ে খানিক
ঝিমুনির তালে তালে
লসিকা প্রবাহ টের পেয়ে
চিত্তের সিরিজ কেটে অবলা প্যানিক
অতীব অগোচরের সূক্ষ্ম সোম সোমে
ঘটিয়াছে অতি অল্প রটিয়াছে তার
অবাধ্য লাজুক ছেলে
একদিন ইমনের মল্লগন্ধ পেয়ে
প্রথমে খেপলো না-না-লাজে
পিউবিক কেশ টেনে বাজালো সেতার

ফ্যাকাশে সাদাটে রঙের উদ্ভিদ

অযোগ্য সে মিউটেশন
নিরন্তর প্রকারণ থেকে আকস্মিক টনটনে
পায়ের ও চিবুকের ও চাঁদনি নমুনা বেসেছে
ভালো ঐ খাঁজযুক্ত ব্রোমাইডের উষ্ণ জিলেটিন
মোম দিয়ে আটকে দেয়া ভূপৃষ্ঠের ফাঁকে
তার নিচে এঁদো মাটি ভেদ করে জাঁকে
অথবা পাতাল বলা সেইখানে বিবর্তন থাকে
ক্ষণ আর ক্ষণ কী প্রতুল

তারই শুভ্র ফুল
বিকটাঙ্গ টুপি আর ছাতা

বসন্তের সুরেলা সুরায় সকলেই এই একটু মাতাল
এবং সে হাঁটু গেঁড়ে ছেঁচড়ে আ আমার দিকেই
আসিতেছে লোভানি চাতাল
হোই দূরে চ’লে যাবো উল্টো পাল্টা হবো কিন্তু
সে আমাকে এখনো কি শুকনো চঞ্চু আর
সোঁদা শিশু ভেবে মৃদু গা-র
তরঙ্গে লুকিয়ে থেকে ঝিঁঝিঁর গুঞ্জন ক’রে ডাকে

আমি ও আমার বন্ধু কোনোদিন কথা বলি নাই
তবু গাছ রোদ্রে কতো ক্যাপ দ্যায় বৃষ্টিতেও ছাতা
চক্রবালে চক্ষু বীম ছুঁড়ে মারি তাই

এইবার গোলাপ ফুটেছে ফুটিয়াছে

বেঈমান শয়তানের মতো
দাঁড়িয়ে বিচার শুনি কতো
খেলনাপাতির দিন শেষ
এইবার অকপট বেশ
আনন্দে শীতের শ্বাস ফেলে
মরণ ও নামগান খেলে
হাসি চেপে শুরু হোক পাপ
সোনাভান এনেছি গোলাপ
এবার লাফিয়ে এসো সোনামণি এইবার লাফ দিয়ে এসো

যাহা রটিলো

আমাদের মতো এই উত্তরের সূর্যের প্রদেশে
চিৎকার করে উঠলো কুঁজো
জল গড়াবার সুরে আমরা কী কথা কবো
কুয়ো সারাইয়ের মিস্ত্রি ঠোঁটে ধরে সোনার গেলাশ
আর দাদা আর দিদি লাজকর্ম সেরে
বলেছিলো এই নিয়ে পরে কথা হবে
তারপরে সারারাত সেই

স্থপতিও অপ্রসঙ্গ নয়
অধিক ও অনিবার্য স্বভাবের দানা তার
এইভাবে ছাঁকুনিতে চালা হ’লে সবই ঝ’রে যায়
তার জন্যে জলপাত্রে পুডিংএর ছাঁচে
বহু কংক্রিটের মেয়ে বার মেয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ আছে
রাখা
পুরুতের ব্রহ্মতালু আঁকা
তাগড়াই রমণের স্পেসে

লোকটি উপহাসের আগে ভেবেছিলো অন্ধকারে কেউ টের পাবে না উপহাসের পরে দেখলো অন্ধকারে কেউ কিছু টের পায় না সে ভারি আরাম বোধ করলো এবং হস্তমৈথুনের প্রস্তুতি নিলো কিন্তু একটুক্ষণ পরেই তার বিরক্ত লাগলো হাত ছেড়ে সে সটান শুয়ে পড়লো আর তার শিশ্ন আধা উত্তেজনাবশত থির থির ক’রে কাঁপতে লাগলো।

এবং তখন রাতও গোলাপি

শঙ্খ ঘোষ ও চাতুর্যের সংক্ষেপিত হাতে
দুধেল ধানের ছড়া এনেছেন আমরা অবাক
এই ছাদে কিছুক্ষণ পড়ে আছে ম্যাজিকও আর
বেলুনের ছত্রছায়ে পাখা মেলে আমরা উধাও

রিক্সা চলে আমি কাঠ সবুজ শাড়িতে এই
তুমি য্যানো নবীজির স্বপ্নে দ্যাখা কেউ
তেমনি ধূমল গদ্য কিছু কিছু পদ্য ক’রে বলো
সাড়ে বারো রাত্র বেলা সবুজ আঁচল ভরা ঢেউ
চাকায় জড়িয়ে যায় প্রায় অন্ধকারে
রিক্সা থামো বলিতেছো তবু বারে বারে…
কিছুটা সময় কাটে শঙ্খ ঘোষ এরকম নন

এসব তো ছেড়ে আমি হেরার প্রায়ান্ধকারে যাবো

গোলাপি আমার জন্য মন ক্ষয় ক’রে
ক্রমেই কুঁচকে আর প্রাণপঙ্ক ক্ষ’রে
গোপনে পাপড়িগুলি পালিশে মেজেছে

‘বলোতো হে সূর্যোদয় আমি কবে সুস্বাদু ও
                                   লোভনীয় হবো’

ছাদের ওপর থেকে জন্মদিন থেকে ষোলো তলা
লাফ দিয়ে শঙ্খ ঘোষ আমাদের আশা পুরালেন 


পৈত্র


হর্হে লুই বোর্হেসের সাথে দ্যাখা হলো অকস্মাৎ
তিনি আপেল বিক্রেতা আর
ক্রেতা সাধারণ সেই আপেল কিনেছে আর
খেয়ে বহু গল্প বানিয়েছে
কেউ ক্রেতা বলে : বড়ো ঝাল ফল
সে বা তিনি উষ্মাভরে লিকার ঢালেন
কেউ বলে : এরকম সাক্ষ্য দেওয়া আমাকে সম্ভব নয়
তবে ভরা সৌম্যতায় ঘর ছিলো অতীব চতুর
এর ওর সবাকার সাক্ষ্য নিলে দেখো সুন্দরক
ফলে তারা তারাও জানে না হত্যাকালে
কোমল মসৃণ এক চাতালের মধ্যে রাখে
পাটাতন আর কার্পেটের নিচে ঠেসে ধরে কেউ
উগ্র শিক্ষিকাকে তাঁর রাগ খুব বেশি
কারাগার থেকে তাই মুক্তি পেয়ে গেনু
রক্তমাখা ছুরি হাতে বেরিয়ে এসেছি

বলে দাও কোথা মাতা পিতা কোথা চলো
তাদের মিলনক্রিয়া বন্ধ ক’রে বেকুব বানাই
কেবল খড়ের গাদা নিরাপদ ভেবে যারা সেইখানে
টেপাটেপি ক’রছিলো তবুও তো কথা
শামুকের সঙ্গে বার্তা কহো
অবশ্য সে কথা শিখে নাই যদি আগুন লাগাই
সেইসব খড়ে
বোর্হেসের কতো পুত্র হিসাব তা নেই পুড়ে যাবে
ঘোরানো সিঁড়ির মতো পাক খেয়ে কড়ি উঠে গ্যাছে
সেইপথ বাৎলে নিয়ে
বাবারা খোঁজেন ছেলেদের
মায়ের নোলক আর বোনের কোমরবিছা বৃথা গ্যালো
বিদায়ের ঘণ্টাকালে আর ফিরে দেখি নাই
কারণ সে আদ্যোপান্ত কান্না সঞ্চয়ন করে ক’রে
একফালি ধ্বংসখণ্ড ছাপা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে
মেয়েটি প্রস্তাব করে : এসো
সাপের কুণ্ডলী খাও ব্যাঙ সেদ্ধ যতো দিন যাক

নকল প্রভাত এসে প্রশ্ন করে : আমি কি প্রভাত?
তৎক্ষণাৎ কফি আসে তার সাথে তার
ঈশ্বরের কমতি পড়া মাটি দিয়ে ঐ ছুকরি গড়া
উঁচানিচা নেই তাও অনায়াসে ভালোবাসা হয়

বোর্হেসের ক্ষুদ্র হিসেবেও
এতোবড়ো গণ্ডগোল হ’লো ক্যানো কবে
পৃথিবী যেদিন থেকে চূড়ান্ত গতির থেকে ক’মে যাচ্ছে যায়
আমি বোর্হেসের অতি শুদ্রবুদ্ধি পরীক্ষণ ক’রে
যাকে তাকে দ্যাখাবো বা দেবো এরকম
এমন ধাঁধাটি বলি :
শুরু করি : সেই গল্প হারাবোনা
গল্পটি যে শেষ হ’য়ে যাচ্ছেই
তার চেয়ে পোস্টাপিসে যান
এবং শেষের পরে বিন্দুমাত্র ট্র্যাক থেকে যায়
স’রে গিয়ে বেহিসাবে অচেনা বা কেউ চেনা
প্রকাণ্ড মাছের স্তূপ উঠানে শুকিয়ে শুঁটকি হয়
যে যে শুঁটকি হতে চাও ঐ সেই ঝুলে ঝুলে থাকো
বাঁশের ফলায় মাচা মাচা


রেডিয়োতে গান


যে মতে ধুলার স্মৃতি হ’লো ছারখার
সে মতে ফিরিলা তুমি ফিরিলা আবার
অশরীরী পুড়ে খাক শরীরী অনলে
আর তার বায়ুঘের ধিকিধিকি জ্বলে

সুর ক’রে গায় সকলে। আনন্দিত নয় উৎকণ্ঠিত নয় ভক্তিতে গদগদ নয় এমনকি নিস্পৃহও নয়। সকলে সমম্বরে টেনে টেনে সুর ক’রে হায় চিকন ও ভারি বহু স্বরে। তাদের ভঙ্গি খুব সাদামাটা ও সাঙ্গিতিক আর উচাটন নয়। স্বর মাঝে মাঝে ভেঙ্গে যায় আবার তীক্ষ্ণ হ’য়ে ওঠে তবে সুর অবিচল টানা টানা।

অশরীরী পুড়ে খাক্ শরীরী অনলে
আর তার বায়ুঘের ধিকিধিকি জ্বলে
না দেখো চর্মের চক্ষে সেই সঙ্গপনা
নকল ঘরেতে নিশি দিবস যাপনা

সকলে গাইতেই থাকে। শুধু গাইতেই থাকে। এমনকি চোখের পাপড়ি নাড়াতে পর্যন্ত ভুলে যায়। আর শ্বাস ফেলতেও মনে থাকে না। কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। কেউ উত্তরে কেউ পশ্চিমে কেউ কোনোকুনি তাকিয়ে অনর্গল গাইতে থাকে। বাতাস বয়ে যায় শিরশির ক’রে। সকলের গা ঠাণ্ডা হয়ে গ্যাছে। কিন্তু তারা নড়ে না চড়ে না খালি গায়।

না দেখো চর্মের চক্ষে সেই সঙ্গপনা
নকল ঘরেতে নিশি দিবস যাপনা
ঝুলন্ত বিষের থলি ঘরের ভিতরে
আরও আছে সখা সখি উভকাম করে

শুধু একটানা ও বিলয় বিহীন গাওয়ার শব্দ। তার মধ্যে আর কিছু নেই। সেই শব্দ বহুস্বর মিশ্রিত
হ’য়ে টান টান ফাঁপা হ’য়ে উঠেছে আর সেই ফাঁপা নলের মধ্যে ধাক্কা খাচ্ছে গানের পূর্বাপর
রেশগুলি। চলকে চলকে যাচ্ছে তার অনুরণন।

ঝুলন্ত বিষের থলি ঘরের ভিতরে
আরও আছে সখা সখি উভকাম করে
বাদ্য বাজে বদ্যি গাছে রোগের পশম
আর কাহারও নাহিকো লাজ করিছে গরম

বয়স্কদের হাঁপ ধরে না। কচিদের গলা চুলকায় না। পরনের কাপড়গুলো যে ধূসর হ’য়ে তারপর
ঝুমঝুম ক’রে খ’সে যাচ্ছে তারও খেয়াল নেই। শরীর জমাট বেঁধে যাচ্ছে তারও বোধ নেই।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেয়ে চলেছে সেই একটানা মোচড়ানো সুর মোতাবেক ধীরে ঐকলয়ে। তাল
উৎক্ষেপিত। কী রকম য্যানো। লৌকিক তবে একঘেয়ে মনে হ’তে পারে। কিন্তু খুব সরল গতিতে
চ’লছে সেটা যে বিরক্তিকর নয়। আনন্দিত নয়। একটানা। ফেঁসো।

বাদ্য বাজে বদ্যি গাছে রোগের পশম
কাহারও নাহিকো লাজ ক’রিছে গরম
অঙুলি হেলিয়া পড়ে দুধের বাটিতে
সে কেমন সাপ মরে ভঙ্গুর লাঠিতে

মাঝে মাঝে হঠাৎ বাতাস পেঁচিয়ে গিয়েই বা শিস্ ওঠে। তার প্রতিধ্বনি হয় আর ফালি ফালি হয়ে
যায় বাতাস। কিন্তু তারা নিরুদ্ধে থাকে। একেকবার শিস্ ওঠে আর তারপর অনেক বহুক্ষণ চ’লে
যায়। আর তারা গাইতে থাকে অনড় হ’য়ে। মুখ হাঁ।

অঙুলি হেলিয়া পড়ে দুধের বাটিতে
সে কেমন সাপ মরে ভঙ্গুর লাঠিতে
আর তারপরে অন্য কথা পরিচয়
কতোকাল কেটে গ্যালো হ’য়েছে প্রলয়

অকস্মাৎ দুম ক’রে ব্যাটারীর আয়ু শেষ হয়

গানটির জন্য পুঁথিপাঠের লোকায়ত সুর টান ও ধ্বনি ভঙ্গিমা সহকারে সমবেত পঠন ও ধূয়াসহ
বিলম্বিত গায়ন প্রযোজ্য।


সিংহ ঋতু


অচেনা লন্ঠন থেকে ঠিকরে আসে গোপন আলোক
ক্রমে ক্রমে অর্ধাচারী হয়ে ওঠে চতুর বিন্যাসে
কতোকাল কেটে গ্যালো পৃথিবীর মৌল অন্ধকারে
দিনান্তে মাতাল সব ফেরারীর হাতে কব্জা ক’রে
অটল মেঝের নিচে তাদের সমস্ত ভার জমা

কানগুলি উড়িতেছে বহুস্তর শব্দদের লোভে
কট্টর স্বরের লোভে আর
স্বপ্নে দেখি অবিকল উদর শোধনাগার জ্বলে
যেখানে কেশর পুড়ে তৈরি হয় প্রত্যহের ঘুম

জানি না কী ভুল থেকে শুরু হয় এই নিদ্রা তবে
বর্ষায় আমল খোঁড়া সড়কের বেদনা অবধি
রক্তস্রোত আজো আছে প্রহর কম্পিত করা সুরে
হত লাল থাবার বঙ্কিম রেশ ঘোরে ফেরে ভেজা বারান্দায়

আমাকে বিশ্বাস করো আমি কোনো অপর জানি না
এই খেলা সেরে গেলে অন্য বহু অভিধা লাফায়
আর আলোক সংবেদ ভেবে ভুল আস্তরণে মাথা কুটে
এখন পাগলপারা স্রোতের বিপক্ষে লেনদেন

অনেক লালার স্বাদ লেপ্টে আছে কমনীয় ত্বকে
নখের চিহ্নের আঁচে উপত্যকা ঘুরে উঠে আসা
একটি অচল মোহ ডিঙিয়ে কাতর সেই ত্বক
সমস্ত সাধের বিনিময়ে শুধু প্রাণ ভিক্ষা করে
সমস্ত সাধ্যের বিনিময়ে আজ প্রাণ ভিক্ষা করে

সম্ভবত নৃশংসতা কেটে গ্যাছে মহুয়া প্রভাবে
আঠালো বলয় এসে এঁটে বসে রাতজাগা ঘাড়ে
এখন সমস্ত দেনা চুকে গেলে বড়ো ভালো হয়
এখন গভীর আর অতীত লেহন করা চকিত ভুলের
ক্ষমার অযোগ্য কথা ব্যথাতুর থাবাতে মিলায়

জানি না কী ভুল থেকে শুরু হয় এই ঘুমঘোর
আস্তে আস্তে সিংহপনা মিশে যায় অচেনা আভায়


স্রোতে… স্যান্ড্রা! ফালি ফালি চাঁদ ভেসে যায়


এবার জাল ফেলেছিলাম গলুইয়ে ব’সে
তখন চাঁদ ছিলো না
আমি আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম পানির জীবন
ক্যামন নোনতা আর চ্যাপ্টা তার কোষতন্ত্র
আর উল্লাস রাগে কী রকম থরথরিয়ে কাঁপে তার বাড়
অথচ উঠে এলো ভাঙ্গাচোরা
একটা দ্বীপের টুকরো টুকরো অঙ্গ রাশি
আর তাদের ভেতর শক্ত হয়ে বসা একটা
                                                                                          মৎস্য দম্পতির বাসা
স্যান্ড্রা প্রিয় মম
এই যাত্রায় আমাকে যেতে হবে বহুদূর
প্রায় অসীমের কাছাকাছি
চক্ষু কর্ণ জিহ্বা নাসিকা ত্বক আর
                    সমুদয় অর্থ সাথে নিয়ে
আর ঝিমাই হাঁটু গেড়ে রাতের পর রাত
যেখানে ঢেউ ছিলো এখন সেখানে শুধুই জ্যোৎস্না
সাঁতার কেটে কেটে ক্লান্ত হয় স্রোতের ওপর

জাল থেকে একটা একটা করে খুলে
সমস্ত দ্বীপের টুকেরা ছুড়ে ফেল্লাম স্রোতে
কিন্তু ততোক্ষণে দম আটকে মরে গ্যাছে মাছ দুটো
এতো অনায়াসে তারা মরে গ্যালো

হে স্রোতের উপর ভেসে থাকা ফালি ফালি চাঁদ
তোমরা উড়াল দাও
আমাকে যে জেগে থাকতেই হবে এই জলকষ্ট নিয়ে 


এইখানে থামো ট্রেন


এইখানে থামো ট্রেন মাঠের পাশেই
একটু হিজলতলা একটু কাঁঠাল বন
তারপর খেলা শেষে পঙ্গপাল
গৃহে ফিরে যায় ধুলা মেখে
একে একে ছুটে আসে স্টেশনেরা
কিছুক্ষণ থেমে থাকে ফের ছোটে দূরে

আবছা দ্যাখার কথা খালি
জেগে জেগে থাকে
দ্রুতষ্মান আগের স্টপেজে
সোনাভান


অবলা সংলাপ


কী যে ভুল ঘোর লাগে কাহ্নু বাশি শুনে দুর্বল গাছের ডালে আমার যে প্রাণপাখি বাঁধা আহ আগাই পিছাই শুধু হ্নৎপিণ্ডে খুন্তি ছ্যাঁকা পুরান কাঁথার নক্সা কতো আর চক্ষেসয় জানালায় টিয়া ডাকে তীরন্দাজ কোন সে দর থেকে বুকে মারে বাণ আমার চোখের জলে বন্যা নামে বুঝি আমি কি ফ্যালানী ছাই প্রাণসখা আমাকে পোছে না কতোজন আসে যায় হাট ভাঙে করল্লার লতাটাও কঞ্চিমাচা জড়িয়ে ধরেছে ওই কলাঝড়ে হাঁটে বুঝি কেউ মর ছাই আলতা গাই ওটা কী যে ভুল নিদ নাই গলায় শাদা নলা নামতে না চায় হায় প্রাণনাথ কোন বনে ঘোরে ঘরে শান্তি মনে নাই আমার যে প্রাণ বিষ কেউ জানলে সর্বনাশ হবে ওলো সই তোকে কই কাহ্নু প্রিয় এলে বলে দিস পোড়ামুখী কলস নিয়ে যমুনা গিয়েছে।


যে কোনো বিষয়ে বেশ লেখা যায়


[সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ স্মরণে]

তা’হলে উদগ্র টিকি
গোছগাছ বেড়ে যায়
আর তারা পা-হারা-রা
মৃত্যুর অবধি শুধু খাড়া হ’য়ে থাকে

ইচ্ছা করি এই ফল
অন্য ফলে বিচিবান্ধা থাকে
(ফলে) ধরে থাকে লম্বা চওড়া ফল

ফল থেকে ফলনের অতীব
ভিতর পানে প্রবজ্যার
সাহারা কালীন
এ বৃথাই পা-ধা-নি-সা
অণ্ড এঁকে কুসুমদানির মধ্যে
সংকোচনে রেখে যেও
এ বিষয়ে পরে কথা হবে
অথচ এ জ্বালা কতো সুন্দরক সুন্দরক
যে চ্যাট বিষয়ে কিছু বলা মানে
আরেকবার আত্মহননতা
আজানের মধ্যভাগে
লিঙ্গ চ্যুত হলে? 


মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত হবে


কয়েকশো হাজার আর আরও একটি
করাতের মধ্যে শুয়ে
ঠ্যাং তুলে কে আবার গান গায়

তবে সোমবারে গায়
(তখন অনেক রাত যখন দুপুর)

সৌরালোকে—মধ্যে মধ্যে
ছিটকে আসা গোলার্ধগুলিই
সাথে সাথে মিলবার সময়
যখন তখন কেউ পা-হারার বন্ধনীতে
রং নয় রং নয় রক্ত ঝরিতেছে

নভেরা একদিন রাতে উপরোক্ত করাত দিয়ে
পা কাটবার দৃশ্য স্বপ্নে দেখলাম
তারপর জেগে উঠে জ্ঞান হাতড়ে পেলাম যে
I have been bitten
O the sickness of mine is a cosmic
event.
ফের বলি :
     অগ্রাহ্য করি না তবু তবে
     মালিনীকে জল তুলে দিতে হলে বাগানেই রাত্রপাত
                                                                                                         হবে
     যেহেতু পাদুকা আছে জেনে
     চলে যাই


ভোরবেলার স্বপ্ন নিয়ে ভাসা


যা কিছু প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা
জীবন যা কিছু ধরে রাখে
এবং যা কিছু সাঙ্গ করে
রেখে যাই পাহাড়ী মদের ধারা
আজ রেখে ঢেকে যাই
অন্যদিকে শোঁ শোঁ শোঁ বাতাস কাঁপে
মনে হয় ভ্রাতার হাতে যে ভগ্নিধাম
তার কথা

এই যে এতোটা পথ
এসবই নকল
তবে পড়া যায় মৌসুমী সাপের সাঁটলিপি
আমার প্রত্যয় আজ ভেসে যায় আধখানা পা

খণ্ড ধাবনের যতো সুরেলা প্রতীক ছিলো
ভুলে গেছি ঢলের পুরান ভাষা
কী এক ভাষার লোভে বেঁচে থাকি
কী এক প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা

যা কিছু সকল শংকা যা কিছু স্বচ্ছল
জীবনের কে কোথায় ঊষর মলের ভাণ্ড ত্যাগ করে
উদরে পুরেছে কালো গোলগাল অপেক্ষার বীজ
তার ধাবনাঙ্ক মনে করি
অন্য আধা তর্কে বেঁচে থাকে
মাথা ভেদ করে আছে শীতের গহ্বর
ঐ পথে ঝেড়ে ফেলি বিদেহী ভষ্মের কারুকাজ
তরল আগুনে ঢাকা মেঠো পথ
তাক করা জীবনের মধ্যে দিয়ে চ’লে যাওয়া
                                                                                               সোজা
ও বক্রল সরল চাকার তুমি অণ্ডকাম
আর ভেস্তে যাওয়া আধখানা ভরের সহগ
উলো আমন্ত্রণক্রমে আমি আজ সীমায় এসেছি
যাহার প্রত্যয় আজ ভেস্তে যায় আধখানা পা

সারাটা গায়ের সঙ্গে প্রলেপিত দাফন পোড়ার ঘ্রাণ
দিগ্বিদিক ঘ্রাণের আঘ্রাণে
ভেসে যাওয়া পৃথিবীতে একা আছি
পরমাংশ শোধনের কাটা ছেঁড়া সৈকতশালায়
কী এক আকুল লোভে বেঁচে থাকি ছদ্ম প্রতিদানে

এমন আতপ মৃত্যু মাটি শুধু
মৃত্তিকাই পুঁতে রাখা জানে


দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান


অস্থায়ী
সারাক্ষণ হাতে চাই চাই গানের বাকশো

কতো রঙের ঢঙের আকৃতিঅলা ফাটাফাটি গান
আর সাবেক প্রভুত নামে শৌচপর্ব সেরে
দেহ খুলে ফেলে তারা বাদসঙ্গী
সদ্য হ’লো তাদের তা পরিচয় ভুল

মনে করি ভুল আমি তাই ভুল করে সকলেই
সহজে সহজ ভুলে ভ’রে যায় রাফ খাতা
মাথাটি গোবর ভরা যদি হয় আর
সোজা যেও মুনমুন ফার্মেসী
এবং সঠিক মাপে মাপে খাপে খাপে
চাঁদ ভরে দেবে তারা
তবে আমি যা কল্পনা করি
নষ্ট হলে পুনরায় সারাবার সহজাভ
পথ থাকা চাই

আকৃতি বিশেষ নয়
যখন তা মনে হয় তাই হয়
প্রথাভাঙা দেহ পেয়ে গাইবার জন্য যা যা গান
যে সবই সতেজ হবে
কাঁখে বাকশো ও আকণ্ঠ পান
সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাকশো খান

স্থায়ী
ফের ওঠে ভেসে ভেসে খড়ের ভেতর বুনোফল
বৈশ্যদের অধিকারে আরও দিন দিন
দিবাগত রাত্র বেলা বিকিরিত কাটা তান শুনে
পুড়ে যেতে যেতে সোনাভান
বলেছিলো ‘এই চাঁদ আঁটো হয় গলে
অন্য একটা ছোটো বদলে দেবে?’ বলে বলে
তবু আমি চাঁদে চাঁদে গান নিয়ে আরও যাবো চ’লে
Perfect ice, when they call, O Machine


কচ্ছপের খোলার নিচে


কচ্ছপেরখোলার নিচে কাটালাম, দুই হাজার বৎসর, তারপর আজ, মাথা বের করব। আমার মনে পড়ছে সেই বটগাছটির কথা, যার তলায় আমি, পড়ে আছি, তার, বিশাল প্রসন্ন ডালপালা ছড়ানো, চূড়াটি তো অনন্ত উঁচুতে উঠে গেছে, না, তা হয় না, কিন্তু ভেবে, আমার বুকে আনন্দ চমকাল। আমি এর বিশালত্ব দেখে আত্মহারা। যেবার প্রথম, এ অঞ্চলে আসলাম, চারদিকে কেবল কমলা রঙের কর্কশ, ধুলোটে মাটির, ছোটোবড় টিলা আর গড়ের বেষ্টনিঅলা, একরের পর একর, ধানক্ষেত, উঠান, আংড়া, তেতালামাটির ঘর, প্রতিটাঘরের পাশে একটা করে তেজপাতাগাছ, নদীনালা, খালআর মাঠশেষে, গাড়িয়ালেরসুলিখিত, স্বপ্নপ্রকোষ্ঠ, সূত্রশালীচাকার ঘর্ঘরস্পৃষ্ট বহরের নিচ থেকে, চাকচাক গোধূলি, আকাশ, অস্তরেখা ইত্যাদির সম্মিলিত, রহস্য ও লোভ ঠিকরে পড়া, সাতাশশো’টি গ্রাম, তার মধ্যে, মহাপ্রাণ এক বৃক্ষ। দেখে, আমি, কিছুকাল তন্ময় তার প্রেমে, তারপর আত্মহারা। আমি ঘুরেফিরে, এসে, এর নিচে রোদ পোহাতে লাগলাম, প্রতিদিন। প্রতি সন্ধ্যাবেলায়, তার আবছা, ছাতার শীর্ষের দিকে, আমার ছোট্ট, বিষণ্ণ দেহ, তুলে ধরে বলতাম, চমৎকার,আজ যাই। এদিক সেদিক, ঘরে বেড়াতাম, তারপর ধীরে ধীরে, চেনা হয়ে গেল,বাগানের আলো লাগা কাচে, দিন শেষের আনন্দিত মুখ, দেখতে দেখতে, শেষ চা, টাটকা পোস্টার, টিনেরহরিণ, সিফিলিসের জীবাণু, পুলিশের ভ্যান—সব, চেনা হয়ে গেল, সবাই।


আমার ঘর


এখন সময় হ’লো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো


কাঁপন


বৃত্তের সূত্র :
বৃত্তের পাশ ছুঁয়ে থাকা হাত
আলগোছে সরে এসে একটু একটু কাঁপলো

তাকে কী বলা যায়

আমি বাহান্নজন বালকের মুখ তৈরি করি
আদলে আদলে বিদ্যুৎ স্পৃহা চমকায়
আর হাত নিচু করে যখন সরে আসি
সন্ধ্যার সুবাস রেখে চলে যাওয়া রুমালের
অগোচরে জীয়ে থাকা অজস্র কাণ্ডের সাথে
গলাগলি আর খাড়া থাকবার উন্মাদনা
শেকড়ের গুপ্ত স্ফিতির চেয়েও
উত্তুঙ্গ হয়ে ওঠে

আমি এই পৃথিবীর নই

গোলকের সূত্র :
কব্জা খুলে ছুটে ছুটে যাওয়া প্লীহার গন্ধ
ভরাপেট উগরে গিয়ে বিকেলের হিম মাখানো রোদ
গায়ে মেখে ক্রমশ উদাস হয়ে যায়

যা ভাবায়
যা কাতর করবার জন্য আনাগোনা করে
কবিতাকে আঁকড়ে থাকতে হয় এক ছোটো
                              পীত রঙের হুকের সাথে
আর হাত ফসকে পড়ে যাওয়া কাঁধের গল্প
আজ মনে পড়ে যায়

যার কাছে গচ্ছিত রাখার বেদনা
এক বোতল উগ্র জেদ আর পাশবালিশের
কান ছুঁয়ে থাকা স্বপ্নের আঁকাবাঁকা রেখা
আজ হয়ে যায় ক্ষণে ক্ষণে
যার কাছে আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে
ফেরার সময় হয়
হয় হয় হয়

সেই গন্ধে আকুল চেতনার একপাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া
এখন এই বিলয়ের বিনির্মাণ কালে
বৃত্ত ও গোলকের সমন্বয় সূত্র :
ডাক পাড়ে ডাকে
খালি ডাকে
একটু একটু ঠুকরে বেড়ানো ঠোঁটের পিনবিন্দু
স্থায়ীভাবে একবার বসতে চায়
তোমার অন্দরের ভিতর

ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি
অথচ রাজ্যের বিস্ময় চিহ্ন মাখানো ছাতুর পিণ্ড
আকাশ জুড়ে করতাল বৃষ্টির সাথে ঝরে
ঠিক য্যানো আমি ভুলে গেছি

ক্ষুধা আমি ভুলে গেছি
মেশিনের বরপুত্র আমি


একটি নোম্যানসল্যান্ডের স্বপ্ন


একটি নোম্যানসল্যান্ডের পথ বেয়ে বসে আছি
অন্য এক দোল খাওয়া মাঠে
মাঠের উত্তরে আছে উঁচু এক বিম্বনাশী টিলা
সে টিলার খাঁজে ভাঁজে ফুটে থাকে দোদুল ফুলেরা

দক্ষিণের বায়ু এসে পরগায়নের সাথে
পাখি ও প্রজাপতির দীর্ঘশ্বাস মেশায়
অন্য সকলও

পূর্বে আছে পিত্রালয়
পথের কিনারগুলো কেটে ছেঁটে কুরতি
সেই পথে বহু মৃদু শ্যাফ্ট-এর সুরে
ভেসে আসে মায়েদের ব্যথা

অমরার নিভু নিভু বিচ্ছুরণ কালে
সে আসবে পশ্চিমের প্রকাণ্ড পশ্চিমগুলি ভেঙে
আর আমি সেই নোম্যানসল্যান্ডেতে শুয়ে ব’সে

হস্তমৈথুনের জন্য ঝোপ ঝাড় তৈরি ক’রে নেবো
আর আজ আমি উষ্ণ উজ্জ্বল কাঠের জুতোয় ঢুকে
মজা লুটি সাত-রশ্মি দিবস রজনী


কিন্তু


ভেবেছিলাম যে কোনো স্রোতের মধ্যেই এইভাবে নির্বিকার
ভাবলেশহীন যাবো আলাভোলা বাতাসের মতো, যে-রকম
জন্মগ্রহণেরও আগে, অনেক আগেই আমি মায়ের জঙ্ঘার
খুব গোপন জানালা দিয়ে দেখেছিলাম রৌদ্রের বিভ্রম

প্রতীক্ষার ভঙ্গি নিয়ে-ভেবেছিলাম পার হোয়ে যাবো ইহকাল
কোনো মতে,মাঝে মধ্যে ঘুমন্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে হয়তোবা শুধু
ধরাশায়ী হোতে হবে, পথে ঘাটে ভীষণ নাকাল
তাতে কী-বা এসে যায় (রক্তের মধ্যেই আছে কাতরতা-ধূধূ

মনোহর ইয়ার্কি সখ্যতা) আমার উচিত ছিলো শ্মশানের শীত
থেকে পোড়া কাঠ-কয়লার নিরপে আঁধার জমানো কিংবা ধুলো
আর নর্দমার গড়াগড়ি দেয়া, সন্ধে হোলে সাচ্চাপুরোহিত
সেজে উলুকভুলুক মন্ত্রে দুনিয়া কাঁপানো যেতো, নৈশভোজে খাঁটি দেশী মূলো

ভেবেছিলাম এভাবেই-নিজস্ব কল্কিতে দেবো কষে টান, হঠাৎধাঁধার
সমাধান পেয়ে গেলে চৌরাস্তায় উবু হোয়ে বোসে খুব প্রবীণ
ভূতের মতো ভেল্কিতে দেবো চু ছানাবড়া কোরে আমি নিজেই সবার
কিন্তু–থেমে দাঁড়াতেই, কেয্যান ভেতর থেকে প্রাণপণে
                              বোলে উঠলো—এভাবে কদ্দিন ওহে এভাবেকদ্দিন


শামীম কবীর


খুব ক্রুর মুখোশের মতো মনে হয় এই নাম । অতিকায়
রূপালী তিমির মতো—আমার মর্মমূলেএই খুব নিবিড়
আপন নাম নিদ্রিত রেখেছে এক বিশুদ্ধ আগুন (তন্দ্রায়
নিবে গ্যাছে তার সব তুখোড় মহিমা) এই প্রিয় সশরীর
নাম এক দাঁতাল মাছির মতো অস্তিত্বের রৌদ্র কুঁরে খায়
রাত্রিদিন; আষ্টেপৃষ্টে কাঁটাতার হোয়ে আছে—শামীমকবীর
এই তুচ্ছতর নাম : গোপনে, ত্বকের নীচে খুবনিরুপায়
এক আহত শিকারীর নামের মোহন ফাঁসে জড়ায় তিমির।

ইতিহাসে অমরতা নেই; পরিবর্তে রাশি রাশি বুলেটের
দক্ষ কারুকাজ করোটিতে, দগ্ধ লাশময় দীর্ঘ উপত্যকা
আর নীলিমার বোঁটা থেকে অনর্গল-নির্ভার নি:স্বদের
জাতীয় সঙ্গীত ঝ”রে পড়ে।ক্যাবল কুচক্রী এইনাম—পাকা
নিকারীর মতো রোয়েছে অমর য্যান, আমার সকল পথে
অয় জালের ব্যুহ কোরেছে আরোপ কোন দুর্বার শপথে।


এই ঘরে একজন কবি


এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাখা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো-তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীরলয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখণ্ড শিয়রে তার-ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো : ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্ণে রূপালী ইলিশ ছেঁকে নেবে; পঁচাঘায়ে
গোলাপের মধু ঢালা-অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষণ্ন খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।

কবির আঙ্গুল থেকে অনর্গল রক্ত ঝরে আর মূর্তিবৎ
অন্ধকারে প’ড়ে থাকে সে-ক্যামন মর্মন্তুদ অদৃশ্য বল্কলে
ঢেকে অস্তিত্বের ক্ষত। অবশ্য মাঝে মাঝেই বদ্ধ ঘরময়
গলিত বাতাস কাঁপে-অন্তর্গত সজীব গর্জনে :বাঁধা গৎ
ভুলে গিয়ে-নিদ্রিত কবির বীণা সহসা কী প্রখর আদলে
গড়ে সুরের প্রতিমা, অথচ খোলে না তার অন্ধচক্ষুদ্বয়।।


পৃথক পালঙ্কে


[কবি আবুল হাসানকে নিবেদিত]

তুমি ঠিক পলাতক নও। আমিতো এখনো দগ্ধ তৃণভূমি
থেকে পাই উপবাসী ভেড়াদের বিক্ষুব্ধ শিং-সংঙ্কেত; তুমি
কি উটের মতো জ্বলন্ত ক্যাকটাসের জমাট জল তরঙ্গ
এখনো শুনতে চাও, নাকি ঘুমের ভেতরে শুয়ে-সমকামী
আর হিজড়েদের ত্রুটিহীন ব্রক্ষ্মনৃত্য দেখবে? স্বপ্নভঙ্গ-
জানি তুমি অক্লেশে সোয়ে নাও, তবু-রাত্রির মতো নিম্নগামী
কালো জলে ভেসে যদি যায়-জননীর মতো অসহায়-বঙ্গ
তোমার, তুমিও তো পারবে না ঠিক এড়াতে যন্ত্রণার সঙ্গ।

তোমার মর্মমূলে নিসর্গের শীর্ণ লাশ সর্বদা কল্লোলিত
শ্মশানের প্রেতী গান গায়, অরণ্য-মঞ্চে এক অন্ধ নায়ক
রাতদিন তোমার অনুকরণে করে বৃক্ষপূজা, স্বপ্নাতঙ্কে
নীল কিশোরীর বুকে মোহন তোমার বাঁশি বাজে-উন্মোচিত
সত্য-সম জানি সব, হে-পাতক স্বর্গের বাগান পলাতক
নও তুমি, নির্বাসিত হোয়ে আছো-স্বপ্নহীন পৃথক পালঙ্কে।। 


জন্মান্ধের ভূমিকা


জন্মাবধি অন্ধ হোয়ে আছি-সশরীর, এড়িয়ে ধুলোর মতো-
গাঢ় রৌদ্রালোক দুইচোখে। বয়েসী বটের মূলে গুপ্ত ক্ষত
দেখিনি তাকিয়ে কোনোদিন, অথবা আড়ালে থেকে নির্নিমেষ-
জ্যোৎস্নালোভী নারীদের পাহাড়ী গ্রীবার ভাঁজে তীব্র অনূদিত
গোলাপ শিশু; পরিবর্তে আমার চৈতন্য স্রোতে কি দগ্ধ শেষ
নিঃশ্বাস ফেলে ছায়া হয় ইতস্তত ছিন্ন মেঘেরা; ঘুমন্ত
ঈশ্বরের মতো, মনে হয়-বহুকাল প’ড়ে আছি জলশেষ
শুকনো কাদায়, ত্বকের নিচেও আছেও খুব গাঢ় ছদ্মবেশ।

আমার গুহার বার্ণিশে সবুজ সতেজ অর্কিড প্রতিদিন
রৌদ্র খায়, বাতাসের উন্মুক্ত গালিচায় নির্ভেজাল প্রাচীন
অশথের মতো ছড়ায় শেকড়; ক্যাবল স্মৃতিনষ্ট আফিমে
আচ্ছন্ন রোয়েছি বোলে, গুহার আঁধারে আমি মায়াবী পিদিমে
খুঁজি রৌদ্রের প্রতিমা, আর ক্রটিহীন জন্মান্ধতা হেতু-করি
আরাধনা নর্তকীর : নির্ভুল মুদ্রায় নেচে যদি পাই সিঁড়ি।।


অথচ আমার চোখ


কেউ কেউ বলে বটে-এ আমার ভুল প্রেম। এ-রকম-খোঁড়া
নর্তকীর সাথে রাস্তায় বেড়ানো, আশে-পাশে লক্ষ মানুষের
খুব ঝাঁঝালো অবস্থিতি অগ্রাহ্য কোরে-খালা সড়কদ্বীপের
ধারে পা ঝুলিয়ে বোসে তার তেজী নৃত্যকলাময়-সুতো ছেঁড়া
অতীতের নিখাদ মলিন গন্ধ শোঁকা, খুব অন্যায়। তা-ছাড়া
যে সুরের রেশ নেই বর্তমানে, নিহত যে পাখি, এ-তো ঢের
বোকামী-তার দগ্ধ পালকের নিচে প্রচ্ছন্ন অবচেতনের
ঘোরে প্রকৃত উষ্ণতা অন্বেষণ; এ-তো অতি স্বপ্নেরও বাড়া।

অথচ আমার চোখে বিস্ফোরণের মতো লাল-নীল, ঈষৎ
ম্লান জ্বলে ওঠে দীপ্র ঝাড়বাতি, চন্দ্রালোকি জলসাঘর-
তবলায় তুফান, তুমুল নূপুর ধ্বনি, তন্ময় নহবত
কানে বাজে অবশেষে-কুয়াশায় নর্তকীর হিল্লোলিত ঊরু,
পদ্মের পাতার মতো পায়ের কাপন আর বক্ষ তোলে ঝড়
আমি দেখি, আবার-খোঁড়া নর্তকীর পায়ে তীব্র নাচের শুরু।।


একজন রৌদ্র


[উৎসর্গ : নূর হোসেন]

একজন রৌদ্র থেকে গাঢ় স্বরে শোনালো বিষণ্ণ শব্দাবলী—
আমার মৃত্যুর পর, এ-রকম রৌদ্র জেনো উঠবে না আর,
ফুলে ঝ’রে যাবে, থেমে যাবে পাখিদের গান, প্রগাঢ় ছায়ার
শীতে যাবে বনভূমি মাঠ ছেয়ে, শহরের সবকটা গলি
উপগলি ভ’রে যাবে ব্যাঙের ছাতায় আর অনুর্বর পলি
জ’মে যাবে শস্য ক্ষেতে; মধ্যরাত ভেদ কোরে কোনো সূর্যরঙ
আর পারবে না বানাতে প্রতিমা সুন্দরের, বেবুশ্যার ঢঙ
অবলা-মহলে জনপ্রিয় হবে খুব, হবে স্নিগ্ধতার বলি-

—আমার মৃত্যুর পরে অনেকেই কোরবে বিলাপ; কী নিবিড়
মানবিক বিলাপ ধ্বনিতে যাবে না নাভিমূল ছিঁড়ে স্তব্ধতার,
যে ভাবে বিয়োয় শিশু গর্ভবতী নারী, সে-রকমই তিমির
বিদারী হবে রৌদ্রহীনতার প্রতিবাদ : মুকুটের কিনার
বেয়ে সম্রাটের নিশ্চিত লুটারে ধুলায়, বেজন্মা দেবগণ
ঠিক জানি নির্বাসিত হবে-এই বোলে স’রে গ্যালো আরজন।। 


অনুসরণ


একজন অবিকল আমার মতোন লোক আজ সারাদিন
আমার সামান্য পিছে চলমান, যে রকম বিশ্বস্ত কুকুর
যে দিকেই যাই আমি, এলেবেলে ঘুর পথে, খুব শব্দহীন
পেছনে পেছনে সে-ও চলে; পার্কে, নদীর ধারে-শিষ্ট ময়ূর
য্যান পেখম গোপন কোরে আমার পেছনে চলে উদাসীন
পথিকের মতো। অকস্মাৎ পেছনে তাকালে দেখি, অল্পদূর
আনমনে ধরাচ্ছে সিগার সে, অথবা কখনো খুব মিহিন
রুমালে মোছে গরদানের ঘাম; বোঝে সে ক্যামন সুচতুর!

বুঝি না, সে কী কারণে এমন নাছোড় চলে, এ-তার ক্যামন
ব্যবহার : অবিকল আমার নকল কোরে মুখের গড়ন,
দৃষ্টির খরতা আর জটদার চুলের বহর, বেশবাস—
ক্যাবল ভিন্ন চলার প্রকৃতি তার; আমি চলি একা, আপন
খেয়াল, আর সে আমার নিবিড় পেছনে ধায় জ্বলন্ত
শ্বাসকোরে সযত্ন গোপনে, অদৃশ্য সঙ্গীন হাতে, নিজস্ব সন্ত্রাস।।


প্রিয়তমাসু


শান্ত হয়ে আসে মন তোর সাড়া পেলে
কোথায় উত্তর আর কোথায় পশ্চিম
মরিয়া গতিতে তোর দিন আর রাত্রিজোড়া
               বেনোমদ বিলি করে টেলিগ্রামে টেলিগ্রামে

কণ্ঠনালী ছিঁড়ে নিলি কী ক’রে বা বল
কেবল শ্লেষ্মার শব্দ ঘড়ঘড় করে
আকণ্ঠ গানের পরে উপচে আসা তানের বাহারে
মনে করো বিবাহের অশালীন জোড়া
আমাদের কোথায় নিয়েছে

আমি তাই শিশ্নহীন
জলপুড়ে আগুন বানাই
বিনিদ্র চিলের সাথে খ ভ্রমণ করি
টিউশনি ফাঁকি দিয়ে জ্বরে ভয়ে যখন ঠক ঠক কাঁপি
শান্ত হয়ে আসে মন
খ্যাপা
তোর সাড়া পেলে পেলে পেলে


যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ


যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ, আমি নই।
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবোনা এখান থেকে:
এতো তাড়াতাড়ি ক্লান্ত এই অবেলায়;
যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ আমি নই।
কোকিলের ঘুম ভাঙবার অনেক আগেই, অসমাপ্ত
যে বসন্ত চোলে গ্যাছে দৃষ্টির আড়ালে,
অন্যকোনো সীমিত বাতাসে—
সে আমাকে কানে কানে বোলে গ্যাছে, প্রতীক্ষায় থেকো:
—আবার শুকোবে জল, হলুদ পাতার শব্দে
সচকিত হবে বনভূমি গীর্জার চূড়োয় গাঁথা
ভগ্ন ক্রুশে সাদা চাদরের মতো
                    জ’মে যাবে মলিন তুষার, একজন
অবসন্ন পাদ্রী খুব কোমল আলোয় ঢাকা
চূড়ো থেকে পাঁচবার বাজাবেন তীব্র ঘন্টাধ্বনি;
ভোর ঘুমে-তোমার চোখের কোনে অকস্মাৎ
                    জ্বলে উঠবে সঞ্চিত বারুদ।
কোনো একদিন ফের-বসন্তের চিঠি নিয়ে তোমার অচেনা
এক সম্পূর্ণ নোতুন গান গেয়ে উঠবে-তোমার বুকের মধ্যে
নিদ্রামগ্ন বিমূর্ত কোকিল;
শুধুমাত্র-পৃথিবীর শেষতম ভোরতক প্রতীক্ষায় থেকো—

আমিতো এখনো আছি সেই বসন্তের জন্যে অনন্ত উন্মুখ প্রতীক্ষায়

আমি কি অপর কোনো ফাল্গুনের কোলাহলে মগ্ন হোতে পারি?
অন্য কোনো কোকিলের গানে আমি হবোনা মাতাল।
অসমাপ্ত-সেই বসন্তের দ্যুতি চোখে নিয়ে, তারপরে যাবো আমি,
                                                এখনতো নয়।

সমুদ্র দেখিনি আজো; শুধুমাত্র-সমুদ্র শঙ্খের
খুব ডোরাকাটা যোনিতে ঠেকিয়ে কান
               তীব্র এক টাইফুন বোয়ে গ্যাছে সমস্ত শরীরে।
এক অসফল নাবিকের দৃঢ় হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিলাম :
আমিও আঁধার রাতে সামুদ্রিক ফ্যানা নিয়ে প্রবাল দ্বীপের
খুব গোপন রত্নের ঘরে হানা দেবো, একটানে ছিঁড়ে দেবো
মাস্তুলের-সমস্ত জালের মতো কীর্ণ দড়াদড়ি।

বৃদ্ধ নাবিক আজো উপকূলে বোসে আছে—
                                 তীব্র দৃষ্টি, একা, হাতে ভাঙা হাল।
সূতরাং-সমুদ্র-শঙ্খের পেটে না ঢুকেই পালাবোনা আমি—
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবোনা এখান থেকে,
এই অবেলায়; অন্য কেউ চোলে গ্যাছে,
আমি নই; যে গ্যাছে, সে—অন্য কেউ।
পূর্বপুরুষের খুব মাটি মেশা জৈবসারে ভীষণ উর্বর
                               যে সমতল জমি—
সেখানে গহন এক তাজা বীজ পুঁতেছি গোপনে, নির্ঘুম রাতের শেষে
ঢেলেছি অঝোর বৃষ্টি, সোঁদা ঘাম, গাঢ় রৌদ্রকণা—
প্রকৃত স্বপ্নের মধ্যে
সে আমাকে বোলেছিলো, সোনালী ফসল দেবে, আমাদের
আঁধার বাড়িতে ফের জ্বলে উঠবে
শস্য গন্ধী নবান্নের আগুন।

সবেমাত্র নিদ্রিত বীজের পেটে কান রেখে অঙ্কুরোদগমের
খুব অভ্রান্ত মিহিন শব্দ শুনেছি ক্যাবল।
তার খুব বেড়ে ওঠা ফসলী শরীর আর
সূবর্ণ শস্যের শিষ না দেখেই চোলে যাবো আমি?
এই হিম জড় হাত-নবান্ন আগুনে সেঁকে, তারপরে
     যেতে পারি, যাবো:
আঁধার কাটার আগেই-যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ, আমি নই।
আগুনে পোড়ার ভয়ে- যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ, আমি নই।।         


মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ


          দেয়ালের চোখ নেই
          কেবলই স্বচ্ছতা  মাখা খাড়া
                                                                      কতোকাল
          আর এইখানে
          মাঠের মধ্যম কোণে রোপিত রাখাল

ভাসমান

          বা আমি জেনেছি বিন্দু
          বিন্দু
          কপালের গোরো বিলীনতা জমেছে বিরাট প্রান্তে
          বহু বছরের খাওয়া
          ছাদ অলা
          এ বিরাট শল্যকেশী হাওয়ার বিরক্ত প্রান্তে
          অম্লান
                         অম্লান
          ও দীঘল
          (ফোলা ফাঁপা)
          (কাঁপা কাঁপা)
                                             না আমি জেনেছি
          এই স্বপ্নমধ্যে অনুষ্ঠিত জাগা

একটি দুটি তারা ঝরছে এরকম দিনে

          তখন এটা খণ্ডিত পছন্দের ভস্মচিহ্নে চেপে
          তোমার আকৃতি নিয়ে
          একটু একটু হাসি ছড়াতে ছড়াতে
          বহু তীব্র শীর্ষ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
          এক ধরনের ভালো ও ভেঙে পড়া জ্যান্ত     (শূন্যতা  নয়)
                                                                                                         আকাশ ভেদ ক’রে
          প্রলেপের ওপর নেমে আসছি
          আমি
          শাদা ছায়া এবং উপরে
                              নতুন
          ঝিল্লীঘ্রাণ
অনুলিপন
          আধপোড়া সিগারের খণ্ডটি দূরে  ছুঁড়ে দিয়ে
          বুড়ো ভাবলেন শোধ হ’লো
          তারপর গিয়ে ঐ গোল বাড়িটার মধ্যে
                                                                                                         উঠানের নিচের সিঁড়িতে
          কাত হ’য়ে বসলো তাঁর মায়া
          এবার ফুৎকারের লোভে

কিন্তু আজ প্রতিবিম্ব বেয়ে ওঠা, মেঘের ফ্রীলের মতো কাজ করা, হরিণাভ, পাটল মাড়ির কোপ্তা ঘন হ’য়ে এ দেহ, গ্রন্থিল কষ, অভিলাষ, ভেদবমি, স্নেহতাপ, টাংস্টেন ফ্ল্যাডের শুভ, গভীর গমনকালীনতা লেগে ধাত্র, ভয় লাগে, কী রকম উঁচু মন চারদিকে, ভাঙা মই, দশদিকে, প্রেম থেকে ওড়া মাছি, ক্যানো

          বুড়ো দেখলেন সার করা শাদা বাটখারা মেঝে থেকে
          প্রতিটি ছাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে  টন টন তুলা
          আর দশলক্ষ সূর্যকুচি ভরা সিগারের
                                                                                    বলকানো
                                                                                                    পেঁজা
                                                                                                        নীল স্ট্র্যাপ (দূরে )
          ফিকে বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়ায়
                                                                                     সংক্রামক
                                                                                                      গাঢ়
                                                                                                         স্বচ্ছ  ফিলামেন্ট
          দ্যাখা যায় এরা নয়
          বৃক্ষ বৃক্ষা এইসব
          তবে
          আমি শিখতে জানি না পুড়ে হওয়া

নুন

          জল ছুঁয়ে ছিলো দেহ
          অধিকৃত শরীরের কায়া
          আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়েছি আর
          আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়ে ফেলেছি
          শুধু আর তোমার আঙ্গুল
          হেঁটে বেড়ায় আমার থ্যাঁতলানো গরম চাঁদিতে
                                                                                                                       আর
                                                                                                                                    আর
আর মাটি

          সমোদরা জেনে মাতা
                                                            তোমার
                                                                           যৌবন
                                                                                          ছুঁয়ে
                                                                                                    যাই
দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান

          
          সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাকশো
          যেতে যেতে গান গাবো
                                                            তাই
          সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাকশো
          যেতে হবে গান গেতে গেতে
          নানা রঙের উদগ্র আকৃতিঅলা ফাটাফাটি গান

          আহা পথনিদ্রা উদ্‌যাপন
                                   তোরই টান…
          টানের বিপুল বাঁধা উথলানো চরণেরা যান
          যানেদের পুত্র যান আর
          তার দিকে যে উড়ুক্কু সিঁড়িটাকে আলগোছে পান
          ক’রেছি এবং ভুলে গেছি
          তাতে গোলা গহ্বর  ছিলো আমাদের
          উষ্ণতম
                              কিউবিক
                                                  ঝালার পালায়
                                                  হায়
          যদি মৃত্যু নির্মাতার ঘরে টিক দিয়ে ছুড়ে দিই
          …উঠে গ্যালো টানা পুল
          …ভেসে গ্যালো বাঁশের দোকান
          …তখন সেই উৎবিদিত ফাঁকটায় ঝুলে
          মা
                    আমার যে রকম লাগে চক্রাকারে
          সে রকম মূর্ছা
                                             সিঁড়ি হারিয়ে আর কে কোথায় পেয়েছিলো
কবে
          তার স্পর্শে      বদলে যায় প্রভাতের ঘ্রাণ
          আর আমি
                                   ভয়ে ভয়ে
                                                  মানুষ হ’য়ে
                                                            উঠে দাঁড়াই
          কিন্তু পা কোথায়
          হা হরতন           হো ক্যুইট
          জগৎ বিশাল এক পটভূমিকায়  ঠেস ক’রে
          অচেনা হেলান পেতে শুয়ে আছো
         এই নিরুদ্বেগ স্বকালের মোহে
         আর স্বয়ম্ভু গতির আঁশ বুনে বুনে
                                                                        ঝিমুনরি তালে
         আ আ আমার রেশম ক্ষুধা
                                             এটা খাবো
                                    ওটা খাবো
                         সেটা খাবো
         সব খাবো
         তুমি
         শ্বেতরোগী
                           সেবিকা
                                             মা
                                                      বুক দিয়ে মুখ ধুয়ে দাও
জানালায় কাটা রাইফেল

         এই পথে একদিন চিঠি এসেছিলো
         একটা ভারি ঢিল আর পিঠ ভর্তি স্বচ্ছ  কথা নিয়ে
         একটা সরল সোজা ব্যারেলের উষ্ণ গহ্বর  নিয়ে
         এ অবধি
                           ঐ পার
         লম্বা খাড়া দুই রণপার মাঝে
         পড়ে আছে ঘ্রাণ খোয়ানো খোসা তার

         ঘরের যে কাঠ গর্জায় শুনি
         তরঙ্গহীন ইশারার ধ্বনি
         বাটখারা পেশা হতাশার গান
         অদৃশ্যপাতে হবে খান খান
         দেহপাতানোর গল্পের কোনাকুনি
         আঙ্গুলের মতো
                                    তুলোট কিন্তু নয়

         টেবিল হারানো যুবা
         বারেক সামনে চেয়েছিলো ঝাপটানো পাল­া
         ক্যানো…
                                    তোমরা জানো নি
         শীত পোড়াবার জন্য সে বর্গক্ষেত্র ধার করে
         হ’য়ে যায় তিন কোণ তাঁত
         তাতে বাকশের বাহির থেকে চেয়ে থাকা চোখ
         ছাপা হয়

আরেকটি জানালা

         আরও অন্যজন আছে শরীর নিয়ে
                                                               ঐ ঐ আকারের
         নাম রোগতাড়ুয়া

         তিন চার তাক ভরা…
         যা যা ভালো লেগেছিলো
                                                               মাঠে
                                                                        মঞ্চে
                                                                                 আর
         মহামিলনের হেন হেন প্রজাতি বা প্রাশনের বহু ফুর্তি
         সার ক’রে রাখা আছে আছে
         একদিন এক বসন্তের  ভয় দৃশ্য করা কাচ
         সেই বিনিময় বইতে বইতে ভারি আর
                                                               খাটো হ’তে আছে
         বাঁচাপর্ব  কালের এক লোভে
         আর বাস্তবিক  জেনে হীন উদস্থিতি মান

         ২.
         শার্সিতে অর্ধেক কাঁধ সারারাত ঝুলে থাকে
         আর পর্দার ঐপারে লুকানো ছেলেটির
                                                               অদৃশ্য দু পায়
         আমি ছোটো ছোটো কাগজের বল ছুঁড়ে মারছি
         ও যখন টু উ উ দেবে
         বাতাস চাখতে চাখতে এগিয়ে আসবে আরেকজন
         যার ওকে খুঁজে বার ক’রবার কথা
         মাঝরাতে জানালায় কী দেখিতেছিলা
                                                               ধনেশ পাখি

         ৩.
         খেলতে খেলতে
                           ধুলা হ’য়ে গ্যালো আমাদের
                                                                                 খোলা
এক রকমের দুটি

         ক১.
         শতরঙ্গে ঝালপালা এক গোলকের কেন্দ্র থেকে
         গোপনে বেরিয়ে আসা বিন্দু
         তা অজানা উত্তাপ ছেড়ে ছেড়ে
         ঘাসগুলোকে অবাক ও পলকে আহত ক’রে
         বক্রল মিহিন এক রশ্মিমুণ্ডে চেপে
         যেতে যেতে
                  যেতে
                           আছে
         সে জানে দৈর্ঘ্য প্রস্থ বলে কিছু নেই
         তবে তাকে থেকে যেতে হবে
         আর কেন্দ্র হারা গোলক কিছু বুঝরবার আগেই
         ভিতরের ফাঁপা চাপে ফেটে
         ভিন্ন ভিন্ন হ’য়ে ছড়িয়ে পড়লো বিশাল
         এক অন্তকামী শূন্যের  ভেতর
         শূন্যটি  বিশাল আর অন্তকামী
         এবং চোখা শীর্ষ অলা ঘাসের
         একটা সরু  পোড়া লাইন শুধু
         এখনও র’য়ে আছে তার মধ্যে ভেসে
         একটা কিছু ঘটনার অপেক্ষা   

         অথচ বিন্দুটি জানে না আসলে সে অস্থির

         ক২.
         অনিবার্য উচ্ছতার  আকাশ অবধি
         লম্বা সরু হয়ে একা একা উঠে যেতে আছে
         গোড়ালিতে সুঁই ও রসের দাগ
         আর অবাধ উর্বর কুয়াশা ভেদী মধ্যমার পরে
         আর আমরা কিছু দেখিনি

         আমরা কে কে যে
         কজন বা কতো
         ভুলে হ’য়ে গেছি আমাদের মতো

         ওরা যাবে আকাশ অবধি
         তবে আমরা তো জানিই যে আকাশটা কতোখানি উঁচু
         আর উচ্চতাগুলি অনিবার্য এবং সরু  সরু
         আর পাতাল থেকে ওঠা তাদের ভিত
                                                               নিশ্চয়ই খাঁটি
         কারণ অনেক পুরনো কিছু পাতালের ছাপচিত্রে
         অবাক করা শাক্তমুদ্রা আমাদের বহু দ্যাখা
         বহু পুনর্জন্ম ধ’রে
         আর এইসব ভিতের পাশে শুয়ে বসে
         দাঁড়িয়ে আমাদের অপেক্ষা

         অনিবার্য উচ্চতারা আকাশ অবধি
         লম্বা সরু  হ’য়ে একা একা উঠে যেতে আছে
         এবং যদিও কুয়াশা
         তবে আমরা তো জানিই যে আকাশটা কতো উঁচু
                                                                                                   হ’তে পারে
         আর একদিন পাখা কুড়ানোর জন্য
         কী বিশাল একটা ছাদ আমরা পাবো
         খোলা

স্বপ্ন

         যা মনে হয় তা মনে করার জন্য যা লাগে
         তা এক অপার উজ্জ্বল উপত্যকা
         ওই সেখানে চ’রে বেড়ায় ভাঁজে ভাঁজে
                                                               তোমার গন্ধলোলুপ সন্তান
         খেয়ে খেয়ে কর্কশ রুগ্‌ণ পাথর
         ও প্রকৃতি
         আজ দেখলাম মেঘমন্দ্র উচ্ছলতার  দাগ
         এবং বাহান্ন জন প্রপিতামাতার
         সেইসব চেহারা
         আমি আজ
         আর দেখলাম সেই
         আজ পুত্র শোকে ছেয়ে যাক আকাশ
         আকাশ থেকে ঘেমে আসুক
                                        বাতাসের গর্তে গর্তে ভরা গর্বে
         এবং পাতালের থেকে ওঠা থাক থাক ঈশ্বরলীলার দেহময়
         গোপনে প্রবিষ্ট হও এর প্রাচীনতা
         ওঁ মোজেইক ধাম
                               ও পাথরের শিখা
         তুমি আর জ্বালতে জ্বালতে জ্বালতে
         পারো না
         হায়

         আমি
                  
                      
                        ভা
                           বে
                               
                                   কি ভেসে ভেসে থাকবো প্রান্তরে
         তোমার ঘর আমাকে নিয়েই ছোটে
         আর তার গা’য় মেঘ
         জ’মে
                  জ’মে
                  জ’মে
         ঝাপসা হ’য়েছে রং
         মেঘ প্রান্তরে  শিশুমেষ চমকায়
                                                               পুলকে
                                                                        আলোকে
                                                                                 ঝলকে
         উড়ে থাকো আবহ কাঁকাল
         উড়ে থেকো

থৈ থৈ

         ভেসে যেতে যেতে যেতে যেতে
         শোকএ এসে ঠেকলো স্কন্ধহীন পায়া
         বদ্ধ শোকে
         চারবার
                  তারপর
         তখন আসলে আর কিছুই ছিলো না


নভেরা


         জানো না আমার মনে কতো কথা পড়ে আর ঝড়ে
         উড়ে যায়
         মনোনিবেশিক হাওয়া ব্যগ্র হ’লে ঝড় হয় তবে
         কয়েক সরল ছাতা খাড়া থাকে
                                                                                 দেবদারু         কৃষ্ণচ‚ড়া বট
         আর কিছু ধাতুখণ্ড আবেশী মাতাল
                                                                                 (তারা)১
         কাঁখে তুলে নিয়ে ঘোরে সমস্ত  পাতাল কিন্তু
                                                                                                   পাতা লতা নয়
         মৃদু অম্ল  অমনিবাস মুখস্থ ক’রিয়ে আরও
                                                                                          ক্ষার ও খাটাস
         আমাকে বিভ্রম ক’রে বলে আজি বিচি খাই
                                                                                           খাইনাতো শাঁস
         আহা ফলের মহিমা জেনে কী যে ভালো লাগে
         মুখে ও গালের ছালে বহু রক্ত জাগে

         তবু কোনো কথা নয়
         মূলত  মনের রস কষ ও কামনা একাকার (আরও)২
         দম্পতির  ভেতরে যে অনির্দিষ্ট একজন একথা আবার
         প্রতিবর্ত সৃষ্টিকারী অতি উদ্দীপক তবে জটিলতা নয়
         আছে তিন বাস্তবিক
                                    অদস অহং আর অধিশাস্তা
                                                                                                            (ভয়
         কর্পূরের         আছে জানি কেননা সে হবে না তরল)৩
         হায় হায়
                                                      আমার যে গুরুখণ্ড বলেছেন
         প্যাঁচ লেগে গ্যাছে  অধিশাস্তার   ভেতরে
         অদ্বিতীয় টক্সিনের মৃদু মিষ্ট ক্রিয়া দায়ী
                                                                                          সারা গা গতরে
         ফলে মৌন উপবৃত্তটির
         আলোকবর্তীতা থেকে লালাস্রাব গায়ে মেখে তরলতা পাবো
         ফলত এভাবে সব সত্তাবাদী ধ্বনি ঘণ্টা
                                                                                                            আপোষে হারাবো

         (২)
         স্বপ্ন তো অদৃশ্য বটে ঘটে যায় ঘুমের ভিতরে
         কিছু আছে ব্রহ্মচর্য সারা হ’লে
                                                      পুনঃ পুনঃ ইজ্যাকুলেশনে
         ও তারা কৃত্রিম নয়
                                        ঘুমের শরবৎ খেয়ে কিংবা না খেয়েই
         বাস্তবিক  অবস্তুর মতো বেশ ঝানু
         পালিত প্রহার শ্রেণী লেলিয়েছে কেউ বুঝি
         পেছনে কুত্তার মতো শুঁকে শুঁকে আবিষ্কার করে
         ন্যাংটো করে উবু ক’রে তার ওপরে চেপে রয়
         ভঙ্গিল কবিতা শ্রেণী সারি

         অশক্ত বালুর কথা মনে পড়ে নাটকীয় আনন্দ ভ্রমণ
         রাজাহীন চার বন্ধু
         একমাত্র কন্যাটিকে ক’লে রেখে ছেড়ে
         গেয়েছি পাওয়ার গান (যা গাওয়ালি

                                                                                 অন্য কিছু নয়)৪
         অশক্ত হাঁটার তলে গুপ্ত ধাম ভেঙে গেলে
                                                                                                   ডিমের কাছিম কভু তুমি
         আরাধ্য আবার তুমি লোনা পানি না খাওয়ার সাধ
         অহো বেঁচে থাকাটাই আমি এরকম চুপি চুপি বেঁকে যেতে দেখে
         আবার যে সুস্থ হবো
         কোন কাকা এরকম গ্যারান্টিড সাক্ষি দেবে দাও

         (৩)
         সরু  মাস্তুলের ছায়া পানিতে তরঙ্গ লেগে টলে ক্যানো
         বহু অপেক্ষার পরে মূত্র এসে লবণের
                                                                        প্রশমন গায় ক্যানো
         বেঁচে থাকাটাকে আমি ফুলে উঠে ঘেমে যেতে দেখে
         যে রকম লবণ লাগার কথা বলে থাকি
                                                               (স্নান  ঘরে সোনার বোতাম)৫
         দেখে দেখে বলে যাই অঙ্গলীনা জামা
                                                                        তুমি মোর প্রাণের সম্রাট
         তুমি নীল ডোরা শাদা মেজেন্টায় ঘনীভ‚ত হবে
         তুমি ও প্রোলোগ মিলে একত্রে উপমা ক’রো
         উপমিত একটি টেবিল
         যখন ছলনা ক’রে চিঠি শব্দ নিয়ে করে ধুলা ধুলা খেলা
         তখন জানি না কিছু খালি দেখি ধুলাটাই মুখ্য আর ঘোলা
         (সারাটা জীবন যদি উবে যায়)৬ যে তখন
                                                                        কড়া স্তবাধার
         নিয়ে বালিকারা যায় মায়ের মতোন কারো চুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে
         চিঠির গুঢ়ার্থ তারা জানে বেশ আদ্যোপান্ত  আর
         কিছুটা গোপন তবে ‘কিন্তু’ বলা অভ্যাসের মতো
                                                                                             বেশ মাদকতায়

         (৪)
         পৃথিবী গোলক তাই অবাক ও বিষণ্নতা লাগে ক্যানো আর
         একথা জানার পর চিকিৎসা কেন্দ্রের গোল
                                                                                          দুইপাশে চাপা আর ফাঁপা
         অলিন্দ নিলয় খুলে হৃদয়ের আকুতি দ্যাখাই
         একথা বলার পরে রঙ লাগে (রঙ নয় রক্ত ঝরিতেছে)৭
         নেশাকে নেশাই বলি অন্যসব দর্শনতা গুহ্যদেশে রেখে
         এবার পৃথিবী খাবো (তুমিয়ো কি খাও)৮
         এতেও সমস্যা আছে সেকথা এবার মনে আসে
         এ ঝিমুনি কেটে গেলে আর কোনো কমলা কি আছে
                                                                                                                     নেশাকর
         (যৌথ স্বপ্নে রাখা আছে জলের অগাধ নিচে
                                                                                          স্বচ্ছতম ঘর)৯
         অথবা এমন নেশা হোক
         অতি অভঙ্গুর ফলে যা আর লাগানো ক্ষণে ক্ষণে
         পরে একটা গোলক গিলে

         যথাতথা অবহেলে উৎকলিত হবো

         (৫)
         অথচ স্বপ্নের মতো মনে পড়ে গাঢ় তনু কমলা রঙের ঝোল লাগা
         আস্তর ও আভাহীন মৃদুল মেদের ঝাড়ে
                                                                                 উচ্চকিত  উদ্ধারের আগা
         আর আরও অবাধে যা আদ্যকথাগুলি
         (চোখে মুখে স্বপ্ন ও আনন্দ মাখা হয়ে হোমো সভ্যতার কথা বলি)১০
         বলি বা না বলি তবু
                                                               না বলার অপেক্ষাতে থেকে
         সে আমাকে সাঙ্গ ক’রে উবে গ্যাছে ধানমন্ডি লেকে

         (৬)
         আঁকা ছবিগুলো থেকে সমস্ত আঁচড় তুলে নিয়ো
         দিয়ো দিয়ো সেই যন্ত্র
         যন্ত্রণার উপ সমাবেশে নিয়োজন
         অথবা শুকাবো চোখ কর্দমাক্ত ক্রন্দনাভাশীল
         আর যাহা তুমিয়ো যেমন কটু
         অনুরূপ কটু বিপিতার সাথে আজ
         প্রথমে লড়াই হবে বুক বরাবর
         পরে কান্না উল্লসিত সহ-সাধারণে
                                                                        মিলেমিশে
         আমাকে সাধন ক’রে এনেছিলো গুরু
         প্রাপ্ত আর অস্বভাবী দু’জনার মাঝে
         সখের আকার ছাড়া
                                          অনুপুঙ্খ  লম্বাতম ঘাসে
         কে কোথায় রত (তার)১১ মাচার আকার
         বহু প্রণোদনা দেবে
         জুতা দিলে নেশা হয় নেশা বান্ধা রেখে (ফল)১২
         মাল্য শিখে বান্ধা প’ড়ো বধু
         নির্বাচনে খাড়া হবে কচি চতুষ্টয়
         ভঙ্গিল কবিতা শ্রেণী পার হ’য়ে তারপর
         ব্যর্থ আর জুতা হাতে হেঁটে ফিরি
         ভগ্নাংশ হৃদয় ভরা পথ

         ফেরার সময় দেখি
         অকস্মাৎ ঝাঁক ঝাঁক স্তন প্রদর্শনী
         সুরতির মতো শব
         প্রাচীন ঘরের আড়ে
         শাদা কালো
         বহুতলা
         যুদ্ধাগত গোড়ালির উড়ো উপকথা ভেদ ক’রে
         এলোমেলো হ’য়ে তুমি এলে

         (৭)
         যে কারণে যাকে খুঁজি সে কারণে তাকে
         ভুলতে পারলে বড়ো ভালো হ’তো অধিকন্তু
                                                                                          সাম্যমান হ’তো
         ইন্দ্রিয়সমূহ
         যার উপ ও অধিক উপ যন্ত্রপাতি মল প্রশ্ন করে
         কে কখন কোথায় কিভাবে কাকে সমবেদী মনোজীবনের
         সেসব সরল কথা জাটিলান্ত ক’রে কও
                                                                                          মেটাবলিজম
         অপচিতি উপচিতি মূলত শক্তির সাথে পরাক্রম করে
         আর জানে না আমার মনে কতো আলাপন
                                                                                          ঝ’রে পড়ে

         (৮)
         প্রলাপে আকণ্ঠ গান ভারা ভরা নিয়ে যাবো আবার কোথায়
         বা কোথায় নয় তার আদ্যোপান্ত  ঠিকানার সাথে
         এবার নিজেকে তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত  মোতাবেক বেঁধে
         বিহঙ্গম চালকের পাছা মেরে অতোপরে
                                                                                          ধারা বর্ণনায়
         সে সব সকল কথা শোনাবো বা শোনাবো না
                                                                                          যারে তারে সেধে
         শুধু ক’বো ধাঁধাগুলি
         জবাবে আবার যদি খুশি হয় বিপিতার বৌ
         মূলকে বিখণ্ড হবো
         যাবো না সে কণ্ঠপানে আর রাণীমার
         উদ্গারিত শত শোলা
                                                      এইখানে ভাসমান ঐখানে রাই-এর বাজার
         অবিক্রিত থেকে যাবে কলরব থেমে যাবে
         ভেঙে যাবে খাড়া বাইশতলা সিঁড়ি ঘর

         উহু কী যে ঊর্ধ্বাসনে ব’সে কাঁদাবার সাধ অসাধ্যই রয়
         কিন্তু আর আরও কিছু যেটুকু রহিলো
         সে আমাকে তুলে নিলো তুলে নিয়েছিলো

         পাদটীকা :
         ১.         না বিয়ালো মা না বিয়ালো ঝি
                     ঝাল খেয়ে মলো পাড়া পড়শি

         ২.         সমুদ্রে ডোবালেও ঘড়া    যা ধরবার তা ই ধরা

         ৩.         ছেলে দেখলো বাপের ভাতের ঢাকনা সরয়ে কুত্তায় মুখ দিলো
                      ঘরে আর ভাত ছিলো না,
                      পরে মা সেই ভাত গুছিয়ে বাপকে দিলো খেতে
                      ছেলে বাবলো “যদি কই তো মার খায় মা-য়
                      আর না কই তো বাপে কুত্তা খায়”

         ৪.          দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস দিলে বাদল আসে
                      দক্ষিণা পেলে ব্রাহ্মণ বিদায় হন
                      নদীর পানি দক্ষিণে গড়াতে গড়াতে বান থামে

         ৫.          পটাপট খুলে যায় ঘামা কামিজের কাঁখ
                      চাবির ছিদ্রের চোখ আর ভঙ্গি
                      দুয়ে মিলে-জংধরা-শ্লথ
                      যে যাহারে ধ্যায়
                      সে তারে না পায়

         ৭.          প্যারালাল ইউনিভার্সের সেই প্রতিরূপটির প্রভাব
                      ফলে মাখামাখি মিশ্রিত একটি চরিত্র
                      যৌগিক নয় মিশ্রণ

         ৮.         যে থাকে কয়লার কাছে
                      ময়লার আঁচ আছেই আছে

         ৯.         পানির নিচেই ঘর আর ঘরেই বাস ঘরের বাইরে
                      ঘেরাবাগান
                      সেইখানে তোমাকে রেখেই বাগান ভেজিয়ে যাই
                      মাছের লালার সাথে গ’লে অই লোকে অর্থাৎ
                      এই লোকে নির্গত হ’লাম

         ১০.        জোঁকের গায়ে জোঁক বসে না—তাই

         ১১.        মানুষের কতো দশা-ক্ষণে হাতি ক্ষণে মশা

         ১২.        সুহাসিনীর নিটোল কাঁকরগুলো ছাতু হবে

         তাই এতোসব—
         পাহাড়ি ছাড়াই তার লজ্জা ওড়াচ্ছি  কুলোয় তুলে
         হাত রি রি ক’রে আজ সোমবার
         ডৌল


আরো এক টুর্নামেন্ট


HORUS HAS BEEN BITTEN.
O RE! A SCION OF YOURS HAS BEEN BITTEN!
HORUS HAS BEEN BITTEN!

“The atmosphere changes at once.
The sickness of horus is a cosmic event.”

একদা সেখানে ছিলো নীরবতা
(এবং) ছিলো নিবিড়তা
একজন দুইজন আর কিংবা তিনজন
ক্রমে লোকালয় স’রে গ্যাছে
স্বচ্ছ  ভিজে সকালের আড়মোড়া কালে
সব মনুষ্যই ম’রে গ্যাছে
প্রকম্পিত  হ’লো বুঝি জন্মের রহস্য
তাই তা ই রদ করি আর
সরাই মালিক বলে : জন্মের আগেই
আমি চুয়াত্তর নাম পেয়েছি শোনোনি (?)

নীল ঊর্ধ্বাকাশ
ভরপুর গাছে গাছে ফ্যাঁসফেসে গেছো আলাপন
আমি তো প্রলাপ ভেবে শতবার বিভ্রান্ত হ’লাম
তারপর সেই গল্প আছে আর আসে
প্রাচীর ও ন্যায় গ্রন্থাদির মোটা ঠেলে
অযথা সঙ্গম করি মোটে সাতজন       

তবু তো আমরা কাজ খুঁজি
রাত ভোরে মেনিফেস্টো লিখে
শহরে প্রচার করি উভলিঙ্গ খেলা 

আবহাওয়া স্থায়ী নয় চিরন্তন
মাঝে মাঝে বাত্যা এসে উড়িয়ে নিয়েছে
আজ রাতে লেডি টাইপিস্ট
আপনি আমার থেকে মজুরী পাবেন :
লিখে দিন মহাবৈশ্বয়িক রোগ ও বিছানাখানা

আমার ছায়াও হাঁটে ঘুরতে ঘুরতে ঘূর্ণি  তুলে
সেই ঝড়ে কম্পমান  আকাশ বাতাস

প্রকার জানার পর মাঝে মাঝে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি
পার্কে ব্রথেলে আর গল্পঘরে খুঁজে
কিছুতেই আমাকে পাইনি খুঁজে কতো
যে রোগে আবার জন্ম হবে
তার জন্যে মৃত্যু লাগে না কি (?)

হয়তো আমরা দুইজনই
পৃথিবীতে সবুজ পাতা অলা গিরিবাজ
তৈ তৈ তৈ তৈ তৈ
আমরা বিদায় নেবো
যদি বা জিজ্ঞেস করে সাড়ে ছশো কোটি জনগণ
অপেক্ষা ক্ষণেক
তারপর পড়ে গিয়ে মূর্ছিত  হবার ভানও আছে
একদার নীরবতা
এখনো অটুট আছে
যদি তুমি উত্তরের বিপদ সংকুলে
একা যাও
যেতে পারো মাথার ওপর তারা চিনে
ডাক শুনে পেছনে হাঁসের নৌকা তাড়া করে
আমাদের জাল ভাই জাল বোন
পিতা মাতা জাল কিনা জানাটা জরুরি
তবে এই পিতা মাতা থাকতে হয় আছে

অনেক ওপরে  স্পেস
নভোযানগুলি ধ্বসে গ্যাছে
তাদের ইলেক্ট্রন উল্কা জ্ব’লে যায়
কোনো একদিন
তুমুল ঘড়ির দোলক আর দোলক চলে  

এখন সূচনা  পর্ব
বলা যাক নদী থেকে অনাব্য এবং সাথে
সাদাটে কাগজ নিয়ে মাতালের অভিনয়
হাতেখড়ি করি
কী যে লিখি
হয়তো আমার কিংবা
হয়তো তোমার কিংবা
তাহাদের নামের বানান লিখে
পশ্চিমের এলোকেশে কেশর উড়িয়ে তার
দস্তাবেজ  জলাঞ্জলি দিলো
আমি দ্যাখা ছাড়া অন্যকিছু অনুমিত নই

পথে আমরা প্রচুর ক্যানাবিস খেলাম। ফলে
সবকিছু ভুলে গেছি। অবশ্য অন্যের কথা না
জানলেও আমি সেই অসুখটাই চাচ্ছিলাম । কারণ
The Sickness of mine is cosmic event.
কেবল এইটিই আমার মনে আছে।

পথে বা পথের ধারে
শান্ত  গ্রাম আছে
সেখানে সায়র আছে
রাখাল রাত্তির বেলা করুনের  তীব্র সুর তোলে।


উভলিঙ্গ লাল জামা


ঘাটের কাছে নৌকা বাঁধা আছে
আমরা শুধু আর চলি
আরও অনেক দূরে
মাঝি নেই

শাকান্ন খেয়েছো প্রাতে
আজ নৈশ কাল পেটে কাটাবে কিভাবে

অনুপম ইস্পাতের  ফলা লেগে
হাত পা গতর কাটে
কেটে যায়

অদ্যাবধি থামে নাই ট্রেন
চেনা টেনে ছিঁড়ে গ্যাছে
এইভাবে পিছু ছোটে দর দর গ্রাম

তারপর জেনে নেয় জন্মের নিধান
বাইনারী কোড অঙ্ক
সৎমায়ে এসব স্নেহের

সর্বনাশ ধ্বংস হবে এখনি পৃথিবী
আর তার উভলিঙ্গ লাল জামা ওড়ে
ক্যানো যে নগর ধ্বংস হোলো না য্যামন
ফালি ফালি অন্ধকারে ঢেকে গ্যালো চাঁদ
এখন এ চিরতার তেতো জলে নিয়ে
রজনীগন্ধার ডাঁটা রেখেছেন তুই

ফালি ফালি বুকের পাঞ্জর ওড়ে
রাশি রাশি কোটি কোটি
আর তারা আস্ফালিত ক’রে
লাল জামা যততত্র ঘোরে

বৃষ্টির অনেক ঝাপ্টা চ’লে গ্যাছে তবু
লাল জামাটির রং অবিকৃত আছে
আর সেটা ছেলে মেয়ে কিংবা মেয়ে ছেলে
উভয়ে প’রবে আর দম দেবে বোল

না আমার উভলিঙ্গ জামাটিকে লাল যার
কি ক’রে বিক্রিত ক’রি সারারাত তাই ভেবে
চুক্ষ চারটি লাল ক’রে ফেলি

ফলে তখন আর লাল উভলিঙ্গ জামাটিকে
চিনতে পারি না কিছুতেই
বর্ণকানা সেলস্ গার্ল চুমু দিয়ে আস্তে  বলে আসুন আবার

এইভাবে বেসে বসি
ভালোবেসে আমি তাকে পরের সপ্তায়
উভলিঙ্গ লাল জামা পরিয়েছি
সযত্নে  ক’রেছি খুন
একেবারে রক্তপাত নেই

মনে হয় মন ছাঁকা গাদ
ঐ আধেক চন্দ্রকে ডেকে বলো
সে খাবে না দুতভাজা
তোমার পেছনে থাকে আমার লিঙ্গের সমতল

কিছুই পারে না জানি
সেখানে এখন চৈত্র মাসে
বসন্তের  পাতা ঝরে কিছুই পাবে না
ঝরাপাতা হত তাই
সত্যিকারে কিছুই পাবে না
আজ রাত হ’য়ে যাচ্ছে  সখি
যদি চলে যাই
তবে আর কোনো দিন দ্যখা হবে নাই


১৯ এপ্রিল


ক.
তোমাকে যে কথা বলা হবে
তার সব নিয়ে গ্যাছে চান্দ্র ড্রাগনেরা

চান্দ্র ড্রাগনেরা ভালো ভদ্র সদাচারী
কেবল তোমার জন্য কথা আনতে গিয়ে
ড্রাগনের শ্বাসে পুড়ে শক্ত হ’লে ঘাড়

ফালি ফালি মিথ্যের আলোরা এসে এসে
গাছের পাতার ফাঁকে খেলা করে
তখন অমল পথ রমাঠাকুরের
সন্দেশের দোকানের পাশ পানে একদিন
প্রভাত বেলায় তুমি মিষ্টি খেয়ে
আমাকেও খাইয়েছিলে বহু

সেইসব কিছু কিছু মনে পড়ে হাফ প্যান্ট প’রে
এখন যুবতী কিংবা ডাঁসা দেখলে তাঁবু খাড়া হয়
এমন অলক্ষ্যে কবে কৃশ কৃকলাশ হ’য়ে গেছি
আর তোর জন্মদিনের বহু হাইড্রোজেন নিয়ে গেছি
একটিও ওড়ে নাই
এবং এখন আমি ইস্তফা  দিলাম ম্যা’ করণে
অনাবশ্যকের বসে ইচ্ছাতিরোহিত পন্থে
বারোটি প্রবাল কেতু উড়াবার সন্ধ্যায়নে বাতি
ফ্যালকন
আর সেই ড্রাগন ছড়ানো পথে গিয়ে বলো :
আমি আছি ধ্রবমতো যার আসল অবস্থাই অজানাটি

খ.
মায়ের সাথে বাক্যালাপ হয় আধা বৈষয়িক। একদিন
সে আমাকে বল­ : তোর জীবনটা ছন্নছাড়া ভাবে কেটে
যাবে। আমি কিছুই ভাবলাম না এ বিষয়ে।
বাকশো পেতে বসা আর
ঘরের প্রকোষ্ঠে জন দুই ক্রেতা ঝানু
ঘ’ষে মেজে বিষয়াদি সমতল হতে হোক
মা’মনিকে চুমু দিয়ে তাহার সম্মতি ভরা হাত
মাকেও  নিয়ে স্থির বুদ্ধি উপচিতি
প্রচুর অভ্যাস আর ফাঁকে ও ফোকরে
সক্রিয় চশমার খাপে ছাড়া
স্পেক্টাকেলস্ সত্যি অভিমানী

গ.
বহু গরু খোয়া গ্যাছে কবে কবে কাল
আমি তার ঠিকানাও দিতে পারি জেনে
সে এক খোয়ার তাহা জেনে
অথচ বাদামী রাত মাতাল বন্ধুকে নিয়ে কেঁপে
অট্ট হেসে অবশেষে পাগলের অভিনয় করে
এরকম অভিনয়ে চদ্মবেশে আরও বেশি খুন করা যেতো
অবশ্য সঙ্গিনী ভালো যথাযথ চুমু খাওয়া
তারপর বুকের নিচেই আর নামতে দেয়নি বটে
অপরাঙ্গে মোটা ও গেরুয়া শক্ত প্যান্টি পরা
ফলে তারা পরিচয় নেয় নাই যুবতীদিগের আকাক্ষার
হঠাৎ অবাক লাগে এইভাবে কী ক’রে সব চলে অথবা
অবাক লাগেনি বরং আমি ছিলাম রাজ প্রতিনিধি চোর
কাঠ ভৈরবীতে

ঘ.
খুন করা বিষয়ে আমার পরিচিত এক জেলে আছে
অর্থাৎ সে খুনী এবং একাধিকবার খুন ক’রেছে :
                              “একলা ঘরে স্বপন দেখলা
                              একশো টাকার কাফন কিনলা… …”
জেলে বল­ তারপর তোমাকে খুন করা সোজা এইখানে
হাজার হাজার মিটার গভীর কুয়া আছে। সেইখানে
ধাক্কা দিয়ে তোমাকে ফেলে দেবো। কেউ কোনো হদিস
পাবে না। আমি কুয়ায় বড়শি ফেলে আফ্রিকান
মাগুর ধরবো।

ঙ.
যেসব ধ্যানীর কথা গল্প শুনি আমি জানি
তারা নির্বাক
সুপার মার্কেটে বসে মৌচাক ঘূর্ণ্যমান
ঝাপ খোলা ইস্কুলের ইউনিফর্ম
ভেসে চলে দোঁহে এক সাথে
তাদের পকেট ছিলো ফুটো আর পকেটে ছিলো
ভাঁপা পিঠা গুঁড়ো গুঁড়ো চ’লে গ্যাছে ক্রাইম অবধি
অবশিষ্ট পিঠা খেয়ে সেই দাগ মোতাবেক চলা
হবে বা না হবে লবেজান
সে খবর মাইক্রোফোনে ছোটে

চ.
ঊনিশে এপ্রিল ছিলো সোমবার—বেলা সাড়ে দশ
অতি একটি সাধারণ জন্ম  হ’লো কিন্তু আমি
দেখতে অপরূপ সে সময়
আমার ভূমিষ্ঠ কালে একটা দাঁড়কাক পাঁচবার ডেকে
উঠেছে। এটা নাকি কারো জন্য সুখবর কারো জন্য
দুঃখবর। অবশ্য কাক ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই আমার
মাতমহির হাত থেকে কুসুম গরম পানির একটা গামলা পড়ে
মেঝে টলে গ্যালো। এটা মাতামহির কুসংস্কার হতে
পারে।
কিন্তু অনেক পরে মার কাছে শুনেছি যে আমাকে
প্রসবকালে যে ব্যথা ও কষ্ট তিনি পেয়েছেন জগতে তার
তুল্য আর যন্ত্রনা  নাই।

ছ.
নামে চাখি মধুময়ী জগতের ভাণ্ড খুলে চেখে
কোনো কিছুই না রেখে
তার মতো আর সুখ নাই


গন্ধদুহিতা


অতর্কিত একটি পিছল কাঁখ
আমাকে বহন করে
যুদ্ধের বাহিরে একা অনবদ্য কন্যাকায়
                              মিঠা সংগঠন
একটি অচল মগজের মোম আজ আরো
সত্যি সত্যি জ্ঞানী হ’য়ে ওঠে

শত্রুভূমি  কাছে এসো
শত্রুভূমি  কাছাকাছি আসো
আমরা আবার চলি মৃদঙ্গের বেশে
          মধুমতি ডিঙ্গা সবজে বিকাল
মধুমতি
              ডিঙা
                         সবজে বিকাল
                    এবং
যে গর্তে থাকি তলা নেই তার
যে গর্তে থাকি
                    তলা
                               নেই
          তার
                    এবং এবং থাকি
          যে গর্তে
তলা নেই তার
                    তলা
                           নেই
       নেই
নেই
       নেই
              নেই
আসিতেছে বা আসে যে  দুহিতার গন্ধ চাপ চাপ
উলো গন্ধ উচাটন বিষ্টি দিনে গুঁড়ো গন্ধ
ও প্রবাহ তার বক্রল মিহিন সোঁদা সবুজাভ ঘ্রাণমাখা
                                                               ফ্লোরে
ও গন্ধ ও দুহিতার  হিমেল নিরাগ গন্ধ
কী বিক্রিয়া করো
যে এদিকে ফলে ব্যগ্র মলত্র বিধান
আর আসে ভালো গন্ধ
আমার সোনার গন্ধ
এবার লাফিয়ে এসো
এইবার লাফ দিয়ে আসো সোনমনি
তোমাকে সম্মুখে নিয়ে ধাই
মানে এরকম হ’তো যদি তবে
এমন উচ্চতা  নেই
যে আমিও লম্ব হবো
যেদিকে সেদিকে এই সুনির্মল ব্র্যাকেট প্রতীম
দ্বিধার জানালা থেকে ঝুলে থাকা পাঁচ পেগ
অতিক্রান্ত  লতা

এ দেহ উড্ডীন হোক বালিশে হেলানো ওম নিয়ে
দু’হাতে মঞ্চের ভিড় ঠেলে ঠেলে
সত্য সত্য কথার প্রমাণ নিয়ে
আক্ষরিক  নিউরো পঙ্ক পার নিচে আর
যৌথ হননের এক একা মূর্তি
উদরে গন্ধক পোড়া বিনিদ্রাকে লয়ে
                     ঢোকে চন্দ্রবাটি পেটে

আমার শোবার ঘরে রেল যায়
              সেই জ্ঞানী ভোলা
ক্যামোন আছিস ওরে
মড়াদের চোখ থেকে মলম ছিনিয়ে এনে
এতোকাল পঁচিশ বছর
ক্রুদ্ধ হয়ে জেগে যে আছিস
তোর কী বা ফল
পৃথিবীর মহাকীর্তনের সন্ধ্যা
              বাতিতে বাতিতে জ্ব’লে উহ্য হয়ে যায়

হায় হায়
জ্বলিতে জ্বলিতে জ্ব’লে গুহ্য হয়ে যায়
                            অর্থখেয়ে
ওগো দুহিতার  গন্ধ কী সব অচল কথা কও
যথা আমাদের বসন্তের  বাথরুমে
            চারু কারু ঝাড়ু আর
            পানির ছিটায় বেঁধা
            অন্য এক বধির প্রধান

অন্য কেউ
                  মূলত  বধির
তিন ছাড়া অন্য সংখ্যা কিছু নয়
তিন ছাড়া আর সবই অর্থহীন
যাকে আমি শিশ্নদান করেছিলাম সেও জানে
জানালায় কান পেতে শীৎকার শোনার আশা করে

তিন হলো সংখ্যা এক
তিন-এ বুঝি—ব্রহ্মাণ্ডের ফাটলের মানে
সেসব ফাটল বেয়ে আমার দুইটি ছায়া
        নেমে আসে পিতামাতাকারে
আর যাকে শিশ্নদান ক’রেছিনু
ভাগ্য হলো সেও বোঝে তিনের মহিমা

২.
তিন-এ আসে আমি ছায়া আর
                        ছায়ার ছায়াটি
অথবা যৌথ-র ছায়া এবং প্রচ্ছায়া

৩.
পৃথিবীতে মাতৃত্ব নিঃশেষ হয়ে গেলে
সুলভ্য মাটিতে ঝাঁক ঝাঁক কায়া-ইলেক্ট্রন নেমে আসে
উড়ে উড়ে আসে তারা সুবর্ণপাখির ডানা চুরি ক’রে

উড়াল যখন শেষ হয়
মাঠ মাটি দগ্ধ করে ঝাঁঝালো গর্তের মধ্যে
স্লিপিং পিলের আকারে
প্রকারে তো নয়—নেমে পড়ে ঐসব
        দার্শনিকতাহীন ইলেক্ট্রন

আমরা তো জেনে আছি—দশমাস ব্যথা
দশটি দিনের পরে বের হয় নধর গোলাপি মাংস ফুল
—মা-ও তাকে হত্যা করে

আমি শুধু চিরকাল সংক্ষেপিত ক’রেও
এসব দেবো নাতো ব’লে
আমি হবো তিন ছায়াময়—কায়াটি অদৃশ্য করে
আমি শুধু ত্রিজগুলি আমার মা-কে দিয়ে
বলবো আরও তিন ছেলে নাও তুমি আর
আমাকে পাগল করে দিয়ে
পৃথিবীতে ছেড়ে দাও মুক্তি দাও মেয়ে