হোম কবিতা তীব্র ৩০ : গৌরাঙ্গ মোহান্তের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌরাঙ্গ মোহান্তের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌরাঙ্গ মোহান্তের বাছাই কবিতা
773
0

দশকের বিচারে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত আশির দশকে লিখতে শুরু করেন। কাব্যিক অভিব্যক্তিকে গদ্যের কাঠমোতে আত্মসাৎ করার শক্তি তার আত্মস্থ। তার কবিতায় আমরা এক পরিব্রাজক সত্তার ভ্রামণিক অভিজ্ঞতার জারণ লক্ষ করি। সেখানে কালহীন বিশ্ব-ইতিহাসের, প্রেম ও রাজনীতির ছায়া বিস্তার লাভ করে প্রায়শ। বাংলাদেশে গদ্যকবিতার একজন একনিষ্ঠ প্রতিনিধি এ কবির জন্মদিন ছিল ৭ জানুয়ারি। কবির বাছাই করা ত্রিশটি কবিতার মাধ্যমে পরস্পর-এর পক্ষ থেকে কবিকে আমরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।

– রাশেদুজ্জামান

পানকৌড়িবোধ

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট। দেখার জন্য নিমজ্জনকে অত্যাবশ্যক ভাবি। মৎস্যমগ্নতা প্রতিনিয়ত ঘটায় শ্বাসপ্রকৃতির রূপান্তর। উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় প্রতিফলিত হয় পানকৌড়ি চিহ্নিত পথ। পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং। এ রং মৃত্যুপূর্ব প্রসারতার জন্য জরুরি। আমার কৃষ্ণতা পানকৌড়ির ঐশ্বর্যে রঞ্জিত। আমার প্রার্থনার ভেতর মাছের অলৌকিক পুচ্ছের অবিকল্প বিকিরণ।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

সংখ্যাপদ্ম

আমার অর্জিত সংখ্যার ভেতর মেঘযাত্রা। নীল জুড়ে বিস্তৃত সংখ্যাগুলোর কাছে নিরাকার বাতাসের আনাগোনা। বর্ণময় মেঘ পথরেখায় রেখে যায় সজল সাক্ষ্য। মেঘ আছে বলেই অন্তর্গত ড্যাসবোর্ডে তুমি দেখে নিতে পারো সচিত্র যাত্রাজ্যামিতি। সংখ্যাচরিত্র মনস্তাত্ত্বিক, কোথাও এদের সম্পূর্ণ প্রতিফলন নেই; না শিশিরে, না অপরাজিতায়। বুদ্ধধ্যানের ভেতর ফোটে সংখ্যাপদ্ম। প্রতিটি পদ্মের বর্ণ ও বিকাশকালের বৈভিন্ন্য শ্রম, প্রতীক্ষা ও বেদনাকে জাগ্রত করে। আনন্দ অপ্রকাশ্য বেদনায় রূপান্তরিত হয় বলে সংখ্যাবর্ণ বিচিত্র—এ রহস্য তোমার অজানা নয়। বস্তুত প্রতিটি সংখ্যা যৌথ ফল; একমাত্র সহযোগী তোমার ধ্যানদীপ্তি। এ কথা জেনে গেছি, আমাদের মৃত্যুর সাথে সংখ্যাতত্ত্বের অবসান নিশ্চিত, প্রজন্মান্তরে তা প্রচারিত হবার কোনো সুযোগ নেই।

 ট্রোগনের গান,  ২০১৬

দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র

দুর্মূল্য দুধকলার গন্ধ ভেসে এলে তোমার দিকে তাকাই। মানকচুছত্রের ঔদার্যে শটি-সোনালু পথে ভেসে আসা স্বাদ ও শব্দের কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়ে সিফুড কিংবা জীবনানন্দীয় চিত্রকল্প। আমার দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র উড়ে আসে আমার ধূসর গৃহে। স্কাইট্রেন কিংবা বিমানএঞ্জিনের ক্রমাগত হুঙ্কারের ভেতর তোমার বাক্যদল ভেসে আসে উন্মাদ মেঘে। মেঘের উপস্থাপন শতভাগ অকৃত্রিম নয়; দ্রুতগতির সাথে মেঘ ছিঁড়ে যেতে থাকে আর তোমার উচ্চারণকে করে তোলে কিছুটা অস্বাভাবিক। তবুও শূন্যতার ভেতর মেঘের করুণাই বিস্ময়কর। সূর্যতপ্ত মেঘ স্মৃতিকে প্রোজ্জ্বল করে; মেঘ ও সূর্যের ভেতর তরঙ্গিত হতে থাকে তোমার অবিনাশী শরীর।

 ট্রোগনের গান, ২০১৬

মাছের সৌন্দর্যছায়া

ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে বলে আমি হিমার্ত প্রভাত থেকে বসে থাকি ধবল বার্চের নিচে। কাদার গহন আশ্রয় থেকে শরীর ভাসাতে সময় লাগবে জেনে আমি বনের দীর্ঘতার দিকে দৃষ্টি ফেরাই—বসন্তের অবসন্নতার ভেতর কুয়াশা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সূর্য লজ্জিত; কুহকী আঁধারে ডুবে আছে বন। আমাকে ভিজিয়ে যায় অতি শীতল সাহসী বৃষ্টি। উঁচু বৃক্ষরাজির দুর্বল শাখা শীতফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অবিস্তীর্ণ পার্ক ও পাহাড় পথে যুবক-যুবতীরা নেমে পড়ে—লেকের গভীরে ঘণ্টা বেজে ওঠে। মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।

 ট্রোগনের গান, ২০১৬

কার্ল প্লেস পার্ক

আমার শূন্য অন্ধাকারে তুমি ফিরে আসো, অর্থাৎ তোমাকে টেনে আনি। প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে। আমার জন্যে নেমে আসা নক্ষত্রআলো তোমাকে প্রতিফলিত করে—আশ্চর্য গতিময় প্রতিফলন খুলে দেয় সমস্ত দরজা। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ি কার্ল প্লেস পার্কে। সবুজ লতায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে নক্ষত্রফুল; কর্তিত ঘাসের শরীর শোনায় নবজন্ম উপাখ্যান। অলৌকিক গন্ধে কেঁপে উঠে পার্ক, বাতাস, বসবার কাঠবেঞ্চ। আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রার্থিত ফলের দীপ্তি। আমার সমস্ত কোষে তখন গন্ধদীপ্তির অদৃশ্য আলোড়ন।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখে। কৃষ্ণচূড়া ফল চিরন্তন পথের পরিচায়ক হতে পারে না জেনেও আমার রেটিনা গ্রহণ করতে পারে নি ভিন্ন কোনো দৃশ্যসংবাদ। যে পথ গ্রহণকামী তা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে ওঠে। অস্পষ্টতার ভেতর কখনো জলবিভাজনের শব্দ শোনা যায়। সাদা ও কালো ডানার পাখি শাসন করে খণ্ডিত আকাশ। আকাশের অপূর্ণতার দিনে বুদ্ধিশূন্যতা তীব্রতা ধারণ করে। অবরুদ্ধ আলোর ভেতর প্রত্যেকটি ব্রিজ নির্দিষ্ট মলুহা রাগ অনুশীলন করে। নির্দিষ্টতাও ডেকে আনে বিপন্নতা। নদী পেরিয়ে গেলে কি স্পষ্ট হয় রুপালি নদীরেখা? মাছের নীরব আনন্দ অদৃষ্ট জলধারাকে পরিশ্রুত করে কিনা, আমি জানি না।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

অর্কিড ও অন্তর্গত দৃশ্য

প্রেম ও মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। ক্ষুদ্র জানলা দিয়ে দেখা যায় কেবল রোদদীপ্ত মেঘের মহড়া। সাদা মেঘের নিচে নীলের আলপনা তুলে আনে যমুনাকে। যমুনার মাঝে দাঁড়িয়ে মেঘের মধ্যে নদীর প্রতিভাস লক্ষ করি নি। মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে নদীস্রোতে ভেসে যাই। আমি ভেসে যাই অদৃশ্য হাত ধরে। ভেসে গেলে মৃত্যুর কথা মনে আসে কেন? ক্রাউন প্লাজার নির্জন কক্ষে বসে একা থাকতে পারি নি আজ সকাল বেলা। বিশাল আয়নায় বিন্যস্ত অর্কিডের মাঝে প্রতিফলিত ছিল অন্তর্গত দৃশ্য। দৃশ্যের ভেতরে ঢুকে, থেকে থেকে দেখেছি সূর্য-বিনাশের ছবি। বাস্তবতার সংকেতময় ভূমিকায় বিস্মিত হয়ে পড়ি। যন্ত্রের সহযোগী হয়ে ভুলে যাই ফুলজোড় নদীর নাম; যন্ত্রশব্দে কান রুদ্ধ হয়ে এলে গভীরবর্ণ জারবেরা অক্ষয় দেয়ালে লিখে রাখে উজ্জ্বল হাহাকার।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

শব্দজলের উষ্ণতা

অন্ধকার শূন্যতার ভেতর জেগে থাকে নিয়ন্ত্রিত গতির কম্পন। নিঃস্বর চেতনা মগ্নপাহাড়ের স্নিগ্ধতায় প্রসারিত হতে থাকে। চিরায়ু শব্দের অদৃশ্য বন্যায় আকাশ ডুবে যায়। শব্দজলের অবিকল্প উষ্ণতা নির্জন গৃহে ডেকে আনে মায়াঘোর। আমি অন্ধকারের ভেতর স্বর্ণাভ পদ্মের প্রস্ফুটন দেখি; এলোমেলো সুতোর ভেতর দীর্ঘতম জামদানি। দৃষ্টির অন্তর্গত রূপান্তর পুনরুদ্ধার করে অগভীর জল; রহস্যময় মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখি জীবনের ক্রমাগত উৎক্ষেপণ ও রাডার-এরিয়েলের অক্লান্ত ঘূর্ণন।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

জলঘুড়ি

এ বাতানুকূল কক্ষে রং ছড়িয়ে রাখে না আরব সাগরের ঝিনুক। তবুও সমস্ত শ্বাসযোগ্য বাতাসে ওড়ে ঝিনুকের জলঘুড়ি। ঘুড়ির আশ্চর্য উড়ালরেখা ভরে থাকে হিমচাঁপার আলো আর গন্ধে। চাও ফ্রাইয়ার বক্ষে টাল খেতে খেতে শেষ বেলা চলে যাব কোনো এক ভিড়প্রবণ স্কাইট্রেন স্টেশনে। স্কাইট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ে যাবে জলঘুড়ি—হিমচাঁপাকোমল উজ্জ্বলতায় জেগে থাকবে আমার জল-মৃত্তিকা-বাতাসহীন ব্যক্তিগত পথ।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

ডায়মন্ড ব্লেড

ব্যথাতুর মৃণালে জেগে আছে স্নো-পদ্ম। ভাইবারে ভেসে ওঠা শুভ্র দ্রাঘিমা ক্রমশ উন্মোচন করে ইলেকট্রন-অঙ্কিত ত্রিভুজতত্ত্ব। বহির্ফ্ল্যাটে ডায়মন্ড ব্লেড কেটে চলে স্বপ্নবর্ণ টাইলস। ঝনঝনায়মান আকাশের শীর্ষে ওড়ে পদধ্বনিময় রুমাল। চেতন-অবচেতনকে কাঙ্ক্ষিত ব্লকে কেটে জন্মগন্ধময় মৃত্তিকায় খাড়া করবার চেষ্টায় থাকি নিয়োজিত। অনুচ্চ ভবনের পাশে পড়ে থাকে শুকনো, পচা, তাজা রক্ত। রক্তসাক্ষ্য স্বীকার করে না ম্লানতা; ধুলোকণায় রেখে যায় মিহি উজ্জ্বলতা, বাতাসে সতেজ স্নো-স্বপ্ন।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

কম্পন

কতভাবেই তো প্রস্তুত হওয়া যায়! আমার প্রস্তুতিপথে মেঘ-নক্ষত্র-আকাশ ক্রোটনপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমার চোখে পাতার ত্রিমাত্রিক নৃত্য দেখে বলেছিলে কিছু কম্পন শাশ্বত হয়ে ওঠে। প্লেনের ক্ষণস্থায়ী কম্পন তোমার স্বরসত্তাকে প্রবল করে তুলছে। এবার শূন্যতা কুণ্ডলিত হলে তুমি আমার ক্ষয়িঞ্চু ত্বক আর পেশির ভেতর দেখবে যতিহীন শব্দের প্রসারতা। যন্ত্র আর বাতাস যে নিরবচ্ছিন্ন শব্দ তৈরি করে তার প্রভাব-সূত্র নিউরনে রেখে যায় অম্লান বিশ্বাস। পরিবর্তনের ভেতর যা অপরিবর্তিত থেকে যায় তাকে জেনেছি নৃত্য। ক্ষয়ের কেন্দ্রে যা অক্ষয় থেকে যায় তাকে জেনেছি কম্পন। আমি আসছি, তুমি আমার কম্পন দেখে নিয়ো।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

ভাষা, দৃশ্যের বিকৃত প্রচ্ছায়া

শুভ্র মেঘের ঊর্ধ্বগামী তরঙ্গে লেগে আছে ধূসর ছোপ। উজ্জ্বলতার অনির্ভর বিকাশ নেই। ধূসরতার শক্তি দৃশ্যকে পূর্ণ করে। বস্তুত দৃশ্যকে ভাষান্তরিত করা যায় না। ভাষা, দৃশ্যের দূর বিকৃত প্রচ্ছায়া। জীবনের উজ্জ্বল-ধূসর রহস্যের সত্য কোনো প্রতিরূপ নেই। নিরন্তর ব্যর্থ বর্ণে এঁকে যাই অতি ক্ষুদ্র আকাশ। আকাশকে চিনিয়ে রাখি প্রতীক বলে। আমাদের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র দুর্বল আকাশ। আকাশগুলো আমাদের চরিত্রের স্মারক হয়ে ওঠে। আকাশে ভেসে ওঠে প্রেমের দুর্বোধ্য পারিজাত, হৃদয়ের বিপ্রতীপ পল্লব। ব্রহ্মাণ্ডের ধুলোকণার কাছে আকাশ মূল্যহীন; এ আকাশের জন্য আমাদের যুদ্ধ, বিজয়োল্লাস। আকাশের মনস্তাত্ত্বিক  ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায় নি।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

পাখিসত্তার ক্রন্দন

পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকি। ওয়েস্টবেরির গৃহদৃশ্য থরথরিয়ে ওঠে, অনতিদূর পার্ক থেকে ভেসে আসে নিশ্বাসের উত্তাপ। বাস্তবতা দৃশ্যকে প্রসারিত করে; কিছু দৃশ্য অধিবিদ্যক অর্বিট রচনা করে—সেখানে পাখিসত্তা ঘুরে চলে, ডানাকেন্দ্রে কম্পন জাগিয়ে রাখে, গভীর চুমুকে তুলে নেয় অনিঃশেষ স্মুদি। তার চোখের ভেতর অর্থময় হতে থাকে রাত্রির কথকতা—আকস্মিকভাবে সে হয়ে পড়ে চেতানহীন। রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।

ট্রোগনের গান, ২০১৬

ঢিবি

মার পাশে বিক্ষত শিউলি দাঁড়িয়ে থাকত এক বিষণ্ন প্রহরী; কলাপাতা সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে নাড়—বানাতে বানাতে জাগিয়ে তুলত মার শিউলি শ্বাসের প্রতিধ্বনি। জামছায়ায় নৃত্যপর ছিল পুবের পদ্মপুকুর। জল শুকিয়ে গেলে পুকুরের করুণাময় মাটি দিয়ে সেরে তোলা হতো বর্ষাগ্রস্ত উঠোনের নালি ঘা। আমি বোনকে নিয়ে গড়ে তুলতাম মার জন্য অতুঙ্গ, মৃন্ময় ঢিবি। এভাবে মা, মাটি, ফুল ও বৃক্ষ আমাদের চেতনার সুগুপ্ত দ্বীপে রচনা করে শুভ্র সৌধ। ঢিবিময় বাড়ি ছেড়ে আমাদের পেরিয়ে যেতে হয় অগ্নিমান সীমানা; শরণার্থী দৃষ্টি বারংবার সিক্ত হয় মার শিউলি সৌরভে। শিউলি ও কলাগাছের কুলোচ্ছেদের চেয়ে মৃন্ময় ঢিবির অবলোপন আশঙ্কায় আমি থাকতাম উদ্ভ্রান্ত। বিধ্বস্ত স্বদেশে ফিরে দেখি প্রাণময় পুষ্প-পত্র-ঢিবি যুদ্ধস্রোতে গেছে ভেসে। পুরনো কাঁথার সেলাই কেটে মার শ্যামল শাড়ির কমনীয় টুকরো সযত্ন রেখেছিলাম তক্তপোষের উষ্ণ কন্দরে। লুটেরার নাপাক থাবায় আমাদের আসবাবপত্র চিরতরে হয়েছে দৃশ্যাতীত; এক খণ্ড ন্যাকড়াও পড়ে থাকে নি বাস্তুভিটায়। দেশের জন্য দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের রক্তবীজাঙ্কুর ধারণ করি নিরাতঙ্ক জিহ্বায়। ছাত্রাবস্থায় ফুলপ্যান্টের ব্যয় মেটাতে মার নামাঙ্কিত সুবর্ণ-লকেট সেকরার হাতে তুলে দিয়ে নির্জনতাকে করেছি লোনাক্ত। মার স্পর্শদীপ্ত শেষ চিহ্ন হারিয়ে এখন উঠোনের দিকে চেয়ে থাকি; মা যেখানে শিউলি ফুলে ডুবে থাকতেন সেই পবিত্র বেদির কাছে আমিও ডুবে থাকি অদৃশ্য জলের উষ্ণ ধারায়। এ মাটিতে শুয়ে যেন আমিও একদিন কলাপাতার সবুজ স্নেহে শীতল হয়ে উঠি।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

পারমিতার প্রত্যুক্তি

আপনি আবির্ভূত হয়েছিলেন বিদ্যুতের গতি ও স্পর্শ নিয়ে। আপনার প্রকৃতি ও চেতনার সাথে আমার স্বভাবের কোনো সাযুজ্য নেই জেনেও বিপন্ন জলায় আপনি ফেলেছেন অচ্ছেদ্য জাল। আমার বিধুর অস্তিত্ব আপনার সুবেদি সত্তায় সন্তাপী ছায়া ফেলে কি? অশান্ত সাগরতীরে পড়ে আছি নিষ্প্রাণ শঙ্খ। তরঙ্গ-তীব্রতার স্মৃতি ও সূক্ষ্ম করাতের দহন আমার অবিনাশী সঞ্চয়। সাগর-সৈকত-মানুষের কাছে কোনো দিন প্রার্থনা করি নি; অধিকারের সুবোধ্য সূত্ররাজি কখনো করি নি উচ্চারণ। অদৃশ্য সঞ্চয় নিয়ে আমার শুধু মৃত্যুময় বেঁচে থাকা! যে পথে না চললেও আমার দিন কেটে যেত সে পথ মেলে ধরেছে অভিনব অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান। অভিজ্ঞতার অগ্নি জ্বালিয়ে দিয়েছে আমার শয্যাগৃহ। আমি রাত্রির অদ্ভুত নির্জনতায় বসে পাঠ করি দৃশ্যময়, অন্তঃশীল পঙ্‌ক্তিমালা; বিষণ্ন বসনপ্রান্তে তুলে রাখি লোনা শিশির। আপনি আমার কম্পিত পার্থিবতার মনোগ্রাফ হাতে তুলে নেবেন কি?

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

আত্মবিভক্তি

উজ্জ্বল হরিণীর পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকে বিভক্ত করে ফেলি। আমার বিচ্ছিন্ন সত্তার স্নায়ুতে জমে জীবনান্তক বিষ। আমি বয়োবৃদ্ধ এন্তাজ ওঝার গ্রাম্য শুশ্রূষাগারে ছুটে যাই। আমার জর্জরিত শরীর থেকে এক মুঠো ঢেঁকিপাতায় তিনি তুলে আনেন স্নায়ুবিষ। গাঢ় সবুজ ঢেঁকিপাতা ছাইবর্ণ হয়ে ওঠে। গভীর রাতে কখনো কখনো আমি অদ্বিতীয় হয়ে উঠি। আমার অন্তরিন্দ্রিয় থেকে তখন ঝরতে থাকে সৌর কিরণ; বস্তুরাশির খোলস ভেদ করে তা স্বরূপের সারল্য ঝলকিত করে তোলে। বিবর্ণ ঢেঁকিপাতা আর প্রতারণার দহন মুহূর্তে সমার্থক পদে উন্নীত হয়।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

বৃষ্টির আলোকময় পাখা

যেতে চাই না, তবুও যাই। অন্ধকারে বনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকি। অন্ধকারে বৃষ্টি নামে—এ সংস্কার বোধের ভেতর বদ্ধমূল। বৃষ্টির উড়াল দেখব বলে অন্ধকারে ঊর্ধ্বমুখী হই। বৃষ্টির আলোকময় পাখা আকাশে ভেসে আসে না যখন তখন। আমি বৃষ্টির আবির্ভাবের জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকি। আমার বোধাশ্রয়ী শেকড় সমভূমির পলিস্বাদে আচ্ছন্ন হয়। প্রতীক্ষা জীবসত্তার আমূল পরিবর্তন ঘটায়। আমি রূপান্তরিত হই বৃক্ষে। আমার আপাত নিশ্চল শাখায় বসে রাত্রিচর পাখিরা ভাঁজে মগ্নতার প্রার্থনাসুর। ঊর্ধ্বগামী বায়ু ও মেঘের কাছে ময়ূরকণ্ঠী খামে আমরা পাঠাই মন্দ্রিত সুরের শিহরন। কেননা, সময়ের শিল্পময় প্রসারণের জন্য বৃষ্টির প্রয়োজন।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

অসম মেঘসীমার ওপর

অসম মেঘসীমার ওপর দিয়ে ছুটে চলি এবং সমস্ত চেতনায় ধারণ করি শঙ্কা ও শিহরন। আঁকাবাঁকা রেখার অনেক নিচে পড়ে থাকে নদীর নিথর শরীর। নদীর প্রার্থনা ভেসে আসে গাঢ় নীল শূন্যতার অসীমতায়। এখানে দিগন্ত জুড়ে মেঘের ভাসমানতা। আলোকিত শুভ্র মেঘের ফাঁকে ফাঁকে জেগে ওঠে ক্রন্দিত মুখ। সূর্য উজ্জ্বল করে রাখে ভূ-পৃষ্ঠের সজীব মানচিত্র। নামহীন নদী, অরণ্য কিংবা ভূ-অঞ্চলের চপলতা ক্ষীয়মাণ মনে হয়। ভূ-খণ্ডের কোথায় ধান, কোথায় গম উৎপাদিত হয় তা দৃশ্যমান নয়। ধাবমান গৃহে ভাত আর জলের সুলভতা আমাকে বিহ্বল করে। আমি আলোর উৎস মহাশূন্যের দিকে তাকাই; অতঃপর ভাতের উৎস ভূ-মণ্ডলের দিকে দৃষ্টিপাত করি। অদৃশ্য কৃষকের ক্রন্দন আর্দ্রতর করে শূন্যতার নীলিম বক্ষ। মহাশূন্যে স্পষ্ট হয়ে পড়ে জীবন ও শূন্যতার সম্পর্ক। শূন্যতাও ফিরে যেতে চায় জীবনের কাছে। শূন্যতা জীবন ছাড়া পূর্ণ হয় না। মেঘ গড়িয়ে পড়ে বৃক্ষপত্রে, অসীম নীলতা মিশে যায় সাগরের জলে। শূন্যতাকে অর্থময় করা হলে শস্যদানা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

স্রোতফেনাময়তা

ঝলসিত সিয়েনার রঙে ছোপানো জাগ্রত জীবন বিষণ্নতার শস্যভূমি। নিশ্চুপ থাকি, অনন্ত স্রোতফেনা উজানপথে ফিরে মহাকালের অদৃশ্য গৃহে আশ্রয় খোঁজে। আমি সমস্ত জানলা খুলে ম্লান আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। ধূসর পাখির গান অরণ্যের সবুজ আভায় মেশাতে থাকে বেপথু জলের প্রস্রবণ। আমার আকুল কণ্ঠে উচ্চারিত হয় গান থামাবার গূঢ় শব্দাবলি; মুহূর্তে পাখি অদৃশ্য হয়ে যায়। দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত যে অরণ্য মগ্নতার তরঙ্গ বইয়ে দেয় তা-ও নিমেষে হয়ে পড়ে দৃশ্যাতীত। সজোরে কে যেন বন্ধ করে রাখে আমার সকল জানলা। আমি আপন অন্ধকারে বসে সমুজ্জ্বল স্ফটিকের উষ্ণতা নিতে থাকি।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

অভিবাসী জল

শারদ বৃষ্টির শব্দের ভেতর ডুবে থাকি। মাধবকুণ্ড বনের ভেজা বাতাসের সাথে আমি গন্ধহীন গোলাপের দেশে ফিরে যাই। যে ওকদৃশ্য উদ্বাস্তু আলোককে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যায় আমি তার রহস্যময় শক্তির ঘ্রাণ খুঁজি। স্তব্ধ ওকবন যখন কাঠবেড়ালিকে চঞ্চল করে তোলে, পরিতাপময় অসংখ্য সুতো থেকে ঝরে পড়ে মিরপুরের মগ্ন জল। শীতল পাথরপথ জলের ছায়ায় জেগে ওঠে, চিরঞ্জীব সেলোফেনে সাজিয়ে রাখে বিষণ্ন চিহ্নধারা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তুষারের চতুরঙ্গ ভেদ করে লক্ষ্যকামী পথিকের দল অহর্নিশি ছুটে চলে। শুধু পদ্মপ্রাণ পথিকের দৃষ্টি ও করোটিতে ভেসে ওঠে জলপ্রতীকের মর্মশরীর।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ

শূন্যতা কেবিন ক্রুর কৃত্রিম উজ্জ্বলতায় কেঁপে ওঠে। আমার কম্পিত দৃষ্টি বিরামপুরের স্ফীত পথে প্রসারিত হলে তুমি মুহূর্তেই চীনের বসন্ত ফুলের উচ্ছলতা নিয়ে আবির্ভূত হও। আমরা বাতাসে অঙ্গীকার, প্রতারণা ও ভবিতব্যমূলক সাংকেতিক পালক ছড়াতে থাকি। প্রার্থনা আমাদের সংবেদনা থেকে আলো ঝরাতে থাকে। পরিপার্শ্ব দুর্লভ পালকের বিচলনে প্রতপ্ত হয়ে ওঠে এবং নদীর উন্মন ধ্বনি অদৃশ্য ময়ূর পাখার ভেতর ঢুকে যেতে থাকে। প্রতারণাদগ্ধ মেঘের হাহাকার আমাদের অগভীর চুলে দুর্বহ কোরাসের প্রতিধ্বনি তোলে। ইথারাশ্রিত অঙ্গীকার বার্ডস নেস্ট সন্নিহিত বৃক্ষখুঁটির অসম্ভব সামর্থ্য দিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়ে রাখে। আমরা মহাপ্রাচীরের ওপর দিয়ে ভবিতব্যের অস্পষ্ট বাতিঘরের দিকে তাকিয়ে থাকি। দ্রুতগতি ঘোড়ার জিনে চেপে আমরা ছ হাজার মাইল পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। খর্বাকৃতি প্রহরীর অগ্নিময় কুঠার আর বল্লমে আমাদের ঘ্রাণময় সত্তা ঝলসে উঠতে থাকে। আমরা পাহাড়ের বসন্তের ভেতর, উপত্যকার শীতল হাওয়ার ভেতর হারিয়ে যেতে যেতে রোদের শুশ্রূষা গ্রহণ করি। অনন্তর দুর্বোধ্য সুরঙ্গপথে এগিয়ে আমরা শিশুদের হাতে আলোকময় ভূগোল তুলে দেই আর অনন্ত অন্ধকারে অন্তর্লীন বাতাস বিসর্জনে প্রস্তুতি নিতে থাকি।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

মেঘের প্রাচীর ও নৈঃশব্দ্যের বাদামি ফুল

বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে অনন্ত জলধারা। সীমান্তে জলের বেদনা গড়ে তোলে বজ্রহীন মেঘের প্রাচীর। নৈঃশব্দ্যের বাদামি ফুলে ভরে থাকে প্রাচীরের আলোছায়া। ফুলের সংকেতগভীর গন্ধে মত্ত বাউল পেরিয়ে যেতে চায় জলময় দেয়াল। জলের চুম্বকে যোজিত হয় চাঁদবরণ খঞ্জরি। মুহূর্তে বিষণ্ন প্রাচীর ব্রাত্য গমকের সোনালু ঝরনায় বিভাসিত হয়ে ওঠে। প্রাচীরের ওপারে পরিযায়ী ওমে আচ্ছন্ন থাকে কি সহৃদয় আকাশ? সেখানে সোনালি ঘুড়ির গানে চঞ্চল হয়ে ওঠে বিকেলের মেঘ? বাতাস থেমে যাবার পর নেমে আসে শুধু অনন্ত জলধারা।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

আকাশ ও বেদনার হরফ

বেরিয়ে আসার জন্য প্রযত্ন প্রয়োজন। ইচ্ছে হলেই আকাশ দেখা যায় না। পেরোবার পথ থাকে না মসৃণ। কাঁটাগাছে পূর্ণ থাকে পথের দু’ধার। পথের বন্ধুরতা ও কাঁটাগাছের অস্তিত্বের মধ্যে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অজ্ঞাত পরিকল্পনার প্রভাময় সঙ্কেতে প্রণীত হয় যাত্রা-সম্ভাব্যতার সূত্র। পা বাড়ালেই রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কাঁটার জ্যোৎস্নাময় বিষ। আকাশ না দেখলে ক্ষতি নেই। আকাশ সকলের জন্য দর্শনীয় নয়। বৃত্তকে টুকরো করে, পাথুরে দেয়ালকে ভেঙে ফেলে আকাশ দেখার মধ্যে উত্তেজনা ও আনন্দ রয়েছে। আনন্দ যখন উপভোগ্য হয়ে ওঠে তখন বিভোরতা গভীরতর হয়। কণ্ঠের বদলে দৃষ্টি রূপান্তরিত হয় ভাষা ও বেদনার গোপীযন্ত্রে। অব্যক্ত ভাষা ও বেদনার বিভাসিত হরফ আকাশ থেকে নেমে আসে। আকাশকে কেউ কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। জ্যোতির্বিদ্যাময় আকাশের জ্ঞান সাধারণ নয়, ব্যক্তিগত। আকাশ উন্মোচন করে দর্শকের প্রয়াস ও প্রাপ্তির দূরতা এবং জীবনের অপ্রচারিত সত্য।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

শ্যামল অন্তর্গৃহ

বিকেলের সূর্য যখন নির্মল ধানক্ষেতে নেমে আসে, হলুদের হিন্দোলিত জমিন পেরিয়ে অন্তরবৃতা তোমার বাড়ি যাব। বনবিভাগ ক্যালিপটাসে ঢেকে দিয়েছে পথের দৃষ্টি; আমি ছায়াচ্ছন্ন পথে যেতে যেতে ডোবার দগ্ধ সিয়েনারং জলে দেখে নেব কচু আর কলাপাতার জোড় বিধুনন। পা-পাখার সারঙ্গিসুরে মত্ত ফড়িং-এর প্রতীক্ষায় ধঞ্চে গাছে বসে থাকবে ফিঙে, কখনো সে কলাগাছের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে সোনালি পট্টে মোড়া বাঁশকরুলের ডগায়। সূর্য স্কারলেট-প্লেটে রূপান্তরিত হলে হাঁসেরা শেষবার ধুয়ে নেবে গলা; সুপুরিবাগান ক্রমে গাঢ়তর হলে তোমার দরজায় আমি করব উতল করাঘাত। অবাক তুমি ডেকে নেবে নিভৃত গ্রহের শ্যামল অন্তর্গৃহে।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

অন্ধকার ও স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল

অন্ধকারে দূরবর্তী বাতি আর আধা-কালো আকাশের নক্ষত্র ছাড়া দ্রষ্টব্য কিছু নেই। নিরালোক গ্রামের পথে যখন হাঁটি বৃক্ষ-লতা-ডোবার গন্ধে ভেসে আসে অতীত; দৃশ্যমান ক্রেভ্যাসের মুখে রুপালি মই জুড়ে অতীত নিয়ে যায় হিম ভবিষ্যতে। দহনঅভিজ্ঞতা থেকে ধারণা জন্মেছিল, জীবন রক্তাক্ত বা রক্তপাতহীন আঘাতের সহজ শিকার। গন্দমঋতুর রূপমাধুর্য দেখে বুঝেছি জীবন একমাত্র বেদনার শস্যক্ষেত্র নয়। অভূতপূর্ব প্রাপ্তি মুছে দিতে পারে শুকনো ক্ষতের পাংশু মোহর। সিদ্ধিকুম্ভ ক্ষয়িত প্রত্নশানের সন্তাপে হতে পারে শিহরিত; তবে অন্তর্গূঢ় অস্তিত্ব থেকে নিঃসারিত হয় নিষ্ফলতার বোধ। অন্ধকারে মাটির হিমপ্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং চূর্ণিত শিলার ভেতর সংকেতময় হয়ে ওঠে স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল।

শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ, ২০১২

অধিগ্রহণকাল

নির্বাক ঝরনাজলে কেঁপে ওঠে আহত স্থলপদ্ম। আমি তার সুনীল শেকড়ের দিকে চেয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ি। শহরের নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি। বিশুদ্ধ বাতাসে ভাসে হর্নবিলের দুর্বোধ্য ভাষা। সন্ধ্যার স্থিরতায় মিশে থাকে অধিগ্রহণকাল; আমি প্রাগৈতিহাসিক গুহা-দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি সময়ের সুরঞ্জিত ঝালর। প্রথম জেগে ওঠে পাহাড়—রাতের পাখির চোখে মূর্ত হয় ভূকম্প-বিভীষিকা। কোমল স্থলপদ্ম অস্তায়মান সূর্যের ফিকে আলোয় নিমগ্ন হতে চায়। প্রস্রবণ রেখার রহস্যগতি উন্মোচিত না হলে অন্তঃপুরে সঞ্চিত হয় শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ!

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর, ২০০৯

তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা

তীরধস তাড়িত জল পরিশ্রুত নয় জেনেও জলকে বলো নির্মল হও। নির্মলতার সর্বাদৃত মানদণ্ড নেই। বিশুদ্ধতা মেনে নেয় সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণের প্রেম। শুকনো পাতার তুমুল উড্ডয়ন তোমাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যা সহজে ওড়ে না তারও ঘটে যেতে পারে পক্ষোদ্‌গম। গণিত চূড়ান্ত বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিষয়ের অভিজ্ঞা কোনো কালসারণি যোগে অধিগম্য নয়। নদীখাতের ক্রমিক বিবর্তনের সূত্র ধরে উদ্ভাসিত হয় চূড়ান্ত বিষয়ের প্রকরণজ্ঞান। ভবিষ্যৎ কমলারং ভোরের মতো স্পষ্ট নয়। শ্যামলা চাদরে ঢাকা থাকতে পারে কার্পাস কিংবা পড়েনের পরিত্যক্ত সুতো। বায়ুচঞ্চল মসলিনে ঢেকে রাখো বাসমতী সৌরভ; বাতাসের নেই কোনো কলঙ্ককালিমা।

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর, ২০০৯

তোমার কাছে যেতে

তোমার কাছে যেতে উড়তে হয় অনেক দূর। ওড়ার জন্য কর্তৃপক্ষের আদেশ নিতে হয়, শরীর খুলে দেখাতে হয় বিশুদ্ধ পরিকল্পনা। আকাশকে স্বাধীন মনে হয় না। আকাশ হয়ে ওঠে খণ্ডিত রাজতন্ত্র। আমি খণ্ড খণ্ড আকাশের সীমানা পেরিয়ে যাই; বাতাসের শীতলতা আমার শ্বাসপ্রবাহে প্রভাব ফেলে। আমি আকাশে হাঁটতে থাকি; যাত্রাপথ এক সেন্টিমিটারও কমে না। কখনো কখনো পরিভ্রমণের জন্য পায়ের কোনো ভূমিকা থাকে না। বাধ্য হয়ে পা গুটিয়ে রাখি, আবার উড়তে থাকি। সময় জোন ভাঙতে ভাঙতে ক্লান্ত হয়ে তোমার কাছে ফিরে আসি। তোমার কাছে আসতে আমার সবচে বেশি সময় লাগে।

অগ্রন্থিত

নৈঃশব্দ্যের শূন্যতা

শব্দের ভেতর দিয়ে নৈঃশব্দ্যের শূন্যতায় হাঁটি। তোমার পা-চেতনা থেকে বৃষ্টির ছবি ঝরে পড়ে। সিঁড়ির বাতাসে দীর্ঘতর হয় নাইটকুইন। দূর থেকে ছুঁয়ে দেখি ঘাসের জাগরণ। মাঠবাড়ির ধুলো নারকেলপাতায় চুমু খেয়ে আমার বুকের ভেতর শুয়ে থাকে। আমি ধুলোর গন্ধ ছড়িয়ে রাখি মেঘে। তিস্তা কিংবা আন্দামানের জলে জেগে থাকে সুবাসের স্বীকৃতি। ফুকেট শহরে বৃষ্টি হলে অভিনয়-শিল্পীর আঙুল গন্ধঢেউ এর পরিচালক হয়ে ওঠে। আমি হেঁটে ভ্রমণের সূত্র শিখে ফেলি; হেঁটে বাড়ির দূর-বাসনায় ফিরে আসি।

অগ্রন্থিত

জোনস বিচ ও নিশ্বাসরেখা

জোনস বিচের পথে ঝরে পড়বার আগে পাতাগুলো আগুনের স্বপ্ন নিয়ে ভাবছে। মৃত্যুর পরেও আগুন থেকে যায়—এ বোধ নিয়ে আমরা আটলান্টিকের অস্থিরতা দেখি। জলের নিচের পথগুলো তুমি দেখে ফেলো। যে পথে তোমার নিশ্বাস ছড়ানো সে পথ আমাকে চিনিয়ে দাও। আমরা ডুব দিয়ে তোমার নিশ্বাসরেখা অনুসরণ করি। মাছের সংলাপ-কৌশল শিখে আমরা ফিরে আসব ঝিনুকের গুঁড়ো মেশানো সৈকতে—বাতাসে তোমার চুল উড়তে থাকবে নিশ্বাসের গতি নিয়ে।

অগ্রন্থিত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

জন্ম ৭ জানুয়ারি ১৯৬২, লালমনির হাট। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব।

প্রকাশিত বই—

১. আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর [২০০৯, শ্রাবণ]
২. শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ [২০১২, ম্যাগনাম ওপাস]
৩. ট্রোগনের গান [২০১৬, পরিবেশক- সাহিত্য বিলাস]
৪. জলময়ূরের শত পালক [২০১৬, সাহিত্য বিলাস]
৫. ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা [২০১৬, পরিবেশক- কবি]
৬. Robert Forst : A Critical Study in Major Images and Symbols [2009, Shrabon]
৭. বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ [যৌথ, ২০০৫, রংপুর]
৮. পুথি রহিব নিশানী : হেয়াত মামুদ [যৌথ,, ২০০৬, রংপুর]

ই-মেইল : gauranga4613@yahoo.com