হোম কবিতা তীব্র ৩০ : গৌতম চৌধুরীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌতম চৌধুরীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌতম চৌধুরীর বাছাই কবিতা
690
0

তরঙ্গিত স্তবগাথা


.
তবে কি বারবার বলা দোয়াগুলি কাতরোক্তিগুলি পুনর্বার হে প্রস্তর তোমাকে শোনাব
রাত্রিলুব্ধকের মতো করোজ্জ্বল অসহ্য ক্ষমায় তুমিও কি শুনে যাবে—ক্ষণমাত্র হবে উদ্ভাসিত
টিলার আড়াল থেকে ভেসে আসে যেভাবে মাদল, অবরুদ্ধ জলের স্পন্দনগুলি শোনা যাবে বালুকার নিচে
তবে কি আঁধার তুমি প্রচণ্ড জমজম হয়ে বেজে উঠবে জাতিস্মর কান্নার আলোয়
ধুয়ে দেবে দু’চোখের বিবর্ণ কোটর আর কেবলই নতুন দৃশ্য ফুটে উঠবে কানে কানে নিবিড় তৃষ্ণায়
অথবা নতুন নয়, তবুও অচেনা, ভুলে যাওয়া, মাতৃগর্ভ থেকে আরও দূর কোনও মরূদ্যান-গোধূলির নীড়ে
যেদিন উঠেছে কেঁপে থরো থরো গোক্ষুরের মাথা, অথবা আশ্রয়লিপি উড়ে গেছে সহসা ঝঞ্ঝায়
যেদিন স্তব্ধতা এসে ছুঁয়ে দেবে এই অতিনাটকীয় পথশ্রম, সত্য ও মিথ্যার বোধ লুপ্ত হওয়া এই ম্লান ভাষা
হয়তো সেদিন মাত্র, তবুও বিড়বিড় ক’রে বলে যাব না-বলা দোয়ার কত নদ-নদী, হে প্রস্তর
থেকো না বধির
.

.
আমার প্রার্থনাগুলি আজ কেন বারবার ভেঙে ভেঙে যায়, তবে বুঝি জিব্রাইল, আমি সেই
অভিশপ্ত গুহার উন্মাদ
নিজেকে প্রহার করি, ছিঁড়ে ফেলি, রক্তে রক্তে ভেসে যায় মুখচ্ছবি, অসুন্দর শরীরের ভাষা
তবে কি এখনও বাকি, আরও নির্মমতা দিয়ে ভেঙে ফেলবে দুর্বল পাঁজর আর কানে কানে
শুধু বলবে—পাঠ করো ওই লিপিমালা
আমি যে অক্ষরহীন, আমাকে বলো না ওই আগুনশিখার দিকে চেয়ে থাকতে, ফেটে পড়ছে এই মর্মমূল
পড়ুক, বলেছ তুমি, আর এই বক্ষদেশে দিয়েছ প্রবল চাপ পুনর্বার, বলেছ কেবলই—পাঠ করো
ও যে শুধু নৃত্যরত আঁকাবাঁকা জ্বলন্ত নিশান, দে পড়ে দে আমায় তোরা—কী কথা আজ লিখেছে সে
ভাই বন্ধু কেউ নেই চারিধারে, শুধু তুমি, তুমি একা, আবার তৃতীয়বার আমাকে জড়ালে
আর গভীর চুম্বন এঁকে কানে কানে জাগালে আমায়
আমিও জেগেছি, তবু জানি না নির্ভুল যদি কিভাবে পড়েছি এই কাঁপা কাঁপা রহস্যের ভাষা
এই জাগরণ তবে নিও না হরণ ক’রে, এ-ভাষা কেড়ো না ঘুমে, চারুপাঠ, ছেড়ো না আমায়
.

.
আমার প্রকৃত ধ্যান আজও কেন রচনা করি নি, সেই মনোকষ্টে হে তরঙ্গ তোমাকে পেয়েছি
খুঁজে অকস্মাৎ এ-মরুগুহায়
তুমি কোন স্বপ্নের দূরতম দিগন্ত পেরিয়ে সহসা দিয়েছ দেখা স্তব্ধতার মুঠিভরা টিলার চূড়ায় আর
বাতাসেরা আকাশেরা একমাত্র চাঁদ
এ-আলো রাত্রির নয়, দিনেরও না, ভাঙা পাঁজরের থেকে উঠে-আসা শ্বাসবন্ধ ফোঁপানির নয়, আলো নয়
হয়তো বা
হয়তো এ-গ্রহ নয়, এই চরাচর থেকে কিছু দূরে, তবু প্রায় পৃথিবীরই মতো এক রাত্রি-চাঁদোয়ায় জাগে
বাতাসের তুমুল লুণ্ঠন
আমিও লুণ্ঠিত হই ধীরে ধীরে, পড়ে থাকে গোসাপের রক্তমাখা ধনুর্গুণ, জড়িবুটি, মন্ত্রপূত পাঁচালি পয়ার
তবু এ-রিক্ততা আজ মহা-আভরণ বলে বোধ হয় হে তরঙ্গ, যদি বলো কানে কানে ওহিগুচ্ছ, কেটে যায়
সামান্য জীবন
.

.
অনেক কথার ভিড়ে হারিয়ে যেও না ওগো প্রাণপণে খুঁজে-আনা ধমনির মাতাল প্রলাপ, যদি কণামাত্র
থাক’ এই কলরোলবধির নগরে
যদি থাক’ কণামাত্র ভুতুড়ে আলোর সন্ধ্যা, নেচে-ওঠা ঝাঁকে ঝাঁকে সহস্র জোনাকি আর কাঁটালতাঝোপ
ছিঁড়ে উঠুক চিকন চাঁদ ঈদ
আগুনের প্রকম্পিত লিপিগুলি বারবার মুছে যেতে চায়, তবু সিনাই পর্বত থেকে নিশান্তের চাঁদ নেমে
এলে, বুঝি বা আবার কেঁপে ওঠে, আমার প্রাচীন চোখে বুঝি তারই আলো
সে-আলো জলের মতো পান করি, পানির মতন করি স্নান আর সপ্ত আসমান পানে ছুঁড়ে দিই খেলাভরে
সামান্য দু’ফোঁটা
আর কী আশ্চর্য দ্যাখো সে-আলো বৃষ্টির মতো নেমে আসে ব্যথাতুর এই গ্রহে, হেরা গুহা জুড়ে, স্তম্ভিত
পাথরও বুঝি গেয়ে ওঠে—বিস্ময় জেগেছে
.

.
জানি, সব ঢেউগুলি নিবে যাবে একদিন, উদ্দাম তরঙ্গমালা লীন হয়ে যাবে ধীরে নভো-নীলিমার চেয়ে
আরও দূরে সময়ের প্রকৃত ছায়ায়
আজ তবু ধমনির প্রচণ্ড আক্ষেপরাশি মাথা ঠোকে সারাদিন, সারারাত কানে কানে কী যে বলতে চায় তা
সে নিজেও জানে না
সংক্ষিপ্ত পিঞ্জর আজ লবণ-জলধি-ঘেরা কোনও দ্বীপ যেন, কেবলই বাতাস এসে লাফিয়ে পড়েছে আর
কলরোলে ভেঙে পড়ছে জলের উন্মাদ মুঠিগুলি
কিভাবে ফেরাব এই মহাবার্তা ওগো দূত জিব্রাইল, এ কি শুধু খণ্ডিতের অভিশাপ, দণ্ডিতের সারিবদ্ধ
দোজখযন্ত্রণা, প্রতিপৃথিবীর কোনও আলো নেই এর চোখে মুখে
এই হাহাকার তবে এত তুচ্ছ—তুলটকাগজে আঁকা নাবিকের মানচিত্রবৎ—ভাঁজ ক’রে তুলে রাখবে
চোরাবাক্সে, স্বপ্নে-দেখে ভুলে-যাওয়া জান্নাতের বৃক্ষশোভা কখনও পাবে না
.

.
যেন এ-আকাশ আমি নিতে পারি এই খর্ব মাথার উপরে, যেন এই নক্ষত্রনিচয় কানে কানে দিয়েছে যে-
পূর্বাভাস, আমি তার আমর্ম পতাকা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে যেতে পারি দরিদ্র মুঠিতে
যদি এই করতলে দামিনীর সকরুণ স্পর্শ এসে লাগে, যেন সে-বিদ্যুৎরাশি তুলে রাখি ক্লান্তিহীন অক্ষরে
অক্ষরে আর চিরশ্রাবণের পুঞ্জীভূত ছায়াকাতরতাগুলি এলে
ভাসিয়ে দি’ দিকে দিকে, যেন প্রদীপের ঢল ভেসে যায় সারি সারি, ভিতরে জ্বলন শুধু, ক্ষমাহীন জ্বলে
যাওয়া, তবু, শিখার স্বপ্নের মায়া প্রাণপণে কেঁপে কেঁপে ওঠে
যেন শুধু হাসি নয়, মর্মভেদী গানের সোপানে যেভাবে ঝলমল ক’রে ওঠে প্রিয় অশ্রুকণা-গুলি, ধরে রাখি
সে-কাঁপন কায়বাক্যে, মনোবাক্যে, হে তরঙ্গ, যেন সেই ধ্রুবপদ অনন্ত নিশান


আলোকিত ওহিগুচ্ছ


.
ভেসে যাচ্ছি চূড়ান্ত আলোয় আমি মহাশূন্যে, অন্ধকার ভেদ ক’রে জ্যোতির্মণ্ডলের দিকে ছুটে যাচ্ছি
অপ্রতিরোধ্য গতিতে, যেন মৃত্যু যাচ্ছে প্রাণের সমীপে
যেন-বা আমিই আলো, দুরন্ত গতির বেগে সারা দেহ থেকে আজ প্রত্যুষপ্রভার মতো আলো জেগে ওঠে,
আর দৃশ্যাতীত আলোর প্লাবনে ভেসে যায় স্থাবর জঙ্গম
ভেসে যায় বিগত-আগামী, আবাহন-বিসর্জন, চরাচর, জড় ও চেতনা, আবিষ্কার-কৌতূহল-পিছুটান, দ্বিধা
ও সংকোচ, ভেঙে-পড়া কান্নার উচ্ছ্বাস
যেন এই ভেসে-যাওয়া এতদূর অনিবার্য ছিল, তাই জন্মাবধি আমার প্রতীতি বুকের পাঁজর থেকে এই পথ
তিলে তিলে বানাতে চেয়েছে আর হেরে গেছে ঝটিকাপ্রহারে
আজ সে-প্রাকার তুচ্ছ, আমিই আমার পথ, ছুটে চলা, শতশত উল্কাপিণ্ড-গ্রহাণু-নক্ষত্রভস্ম পার হ’য়ে
লয়ের দিগন্তভূমি যেখানে মিলেছে-এসে জন্মের আলোয়
.

.
আজ আর কোনও কথা রচনা করব না, শুধু অন্ধকার গুহার পাথরে হাঁটু মুড়ে বসে বলব—গ্রাস করো সব
দুর্গমতা
গ্রাস করো প্রতিমার খড়মাটি রাংতার মুকুট, ভবঘুরে লন্ঠনের দিগন্তপ্লাবিত হাহারব, পথিকের
চিরবিহ্বলতা
গ্রাস করো শিথিল মুঠিতে-ধরা নশ্বর নির্মাণ, প্রার্থনাসভার ঘণ্টা, অবলুপ্ত সোপানরাশিতে ভেঙে-পড়া
দোমড়ানো চাঁদ
গ্রাস করো হাড়হাভাতের কান্না, মজা নদী, হিজিবিজি লিপির সংকট, ভেসে-আসা উদ্ধত মাস্তুল, কালো
ডানা ক্ষুধার্ত ঈগল
বলব কেবলই, আর হয়তো বা ধীরে ধীরে সরে যাবে চোখের পাথর, অন্ধকার গুহার চাতালে সহসা
দাঁড়াবে এসে অভিভূত আলো
আমার যা কিছু বাধা সব যদি আঁধারকে দিয়েছি অঞ্জলি, এবার আমাকে তবে গ্রাস করো ওগো আলো
মহাবিশ্বময়
.

.
কোথায় লুকাল আলো নিরবধি, আমি নানা নাম ধরে খুঁজে মরি, তুমুল আঁধারে আজ মুছে গেছে
দু’চোখের দৃষ্টিপথসীমা
তবুও অন্ধের মতো হাতড়াতে হাতড়াতে খুঁজে চলি ভূসমুদ্র, মরুপথ, অরণ্যের অজ্ঞেয় পরিধি, বরফের
চূড়ায় যেখানে সৌর-উৎসব
নেই, নেই, ছুঁড়ে ফেলি পৃথিবীর ছেঁড়াখোঁড়া মানচিত্র, তবে যাই মহাবিশ্বলোকে, কীটবৎ ভেসে চলি
অন্ধকার অনন্ত তরলে
কোথায়, কোথায় সেই জাদুরেখা, ভয়ংকর রশ্মিপথখানি, স্পর্শমাত্রে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে তুমুল
অজ্ঞতাগুলি আজন্মবাহিত
কোথাও দেখি না কেন? তবে আজ ভেঙে ফেলি নিজেকেই, ভাঙি, ভাঙি, ভাঙনের স্তূপ থেকে সহসা কি
ফুটে ওঠে আভা
তবে কি আমারই মধ্যে ছিল সেই লুণ্ঠিত মূর্ছনা, আমর্ম মূর্খতাবশে খুঁজে গেছি চারিদিকে, ভুল ক’রে
নিজেকে দেখি নি
.

৪.
সময় যে চলে যায় হে বধির, দাও তবে দুটি একটি তণ্ডুলকণিকা, দ্রৌপদীর মতো তাকে অনন্ত ব্যঞ্জনে
আজ সাজাই পাতায়
অতিথি অভুক্ত রইবে—এই পাপ অক্ষরপ্রাঙ্গণে বসে কিভাবে বা করি, বিশেষত ধূপ-দীপ-গন্ধ ও কুসুম
মোর কিছু নাই এ-পর্ণকুটিরে
কী দিয়ে বরণ করব তবে তাকে? সে যে আসবে ঝরনার শব্দের মতন শান্ত অবিচল, যেন কোনও পূষা
নক্ষত্রের থেকে বয়ে-আসা শুশ্রূষার ডানা
তবে কি প্রশ্নেরই মোহ ফিরে দেবো কানে কানে গূঢ় এক জপমন্ত্র রচনার ছলে, যেভাবে সূত্রের আভা নিয়ে
মূর্খ বারবার গড়ে তোলে ভাষ্যের নিশান
তাহলে আকাশপ্রান্তে বাড়াই ভিক্ষার হাত, মন্বন্তর থেকে ভেসে আসে স্মৃতিঘোর করুণ আঙুল
সামান্য এ-আয়োজনে আমি স্বেচ্ছাসেবীমাত্র, ক্ষুধার মূর্ছনা ঘিরে আলো আজ আমার অতিথি
.

.
ফুটেছে সামান্য পুষ্প দরিদ্রের অযত্নপ্রয়াসে, ভিখারিনী বালিকার ক্ষণমাত্র হাসির মতন, তবু তার
সারমর্মটুকু শিশিরকণার মতো তুলে নিও নির্বিকার ঢেউ
জানি এই গোত্রহীন শোভাহীন কুসুমেরা চরাচর ছেয়ে-থাকা তোমার নিবিড় পুষ্পাধারে কোনও দিন প্রবেশ
পাবে না, ঝরে যাবে অন্ধকারে তিলমাত্র বন্য গন্ধ নিয়ে
এ-গন্ধ সুরভি নয়, তবু এক মৃদুতম সময়কণিকা থেকে উঠে-আসা ঘ্রাণের পিপাসা দ্যাখো মিশে যায়
অকাতরে করুণ গ্রহের মেঘে, মন্থর বাতাসে
এ-পিপাসা দিয়েছিলে জেনো তুমি, তাই আলো লেগে আছে চোখে মুখে পাপড়ি ও ডাঁটিতে—অতি ক্ষীণ,
অস্পষ্ট, দুর্বল
তবু সেও তোমারই অনন্তগাথা, যে-গান গেয়েছে কীট পতঙ্গেরা বিহগেরা কত আলোবছরের
নিবিড় কান্নায়
.

.
জনহীন গুহাগর্ভ সহসা আঁধার হয়ে গেলে, নেমে এল আলো এই নিরক্ষর আঁখিপুটে আকুল আভায়, যেন
বহু উড্ডয়নে শ্রান্ত এক ছায়াপথ ভেঙে পড়ল অদম্য কান্নায়
আঃ কী প্রশান্ত আলোকণিকার ঢেউ দ্যাখো ছুটে যাচ্ছে গভীর ধমনি বেয়ে ঘুমন্ত গ্রহের চিদাকাশে, আঃ কী
শীতল যেন বহু নিদাঘের শেষে আলুথালু বৃষ্টি নেমেছে
গভীর গভীর শ্বাস ভ’রে মর্ম, আলোর বিহ্বল ঘ্রাণ নিতে থাকে দমে দমে, যেন তা ফুসফুস ভেদ ক’রে
ঢুকে পড়ে আরও দূর সাগরদ্বীপের মতো সুতীর্থ আত্মায়
আলোও কি কিছু চায়—এই ভাঙা পাঁজরের কণামাত্র ম্লান হাসিরাশি? তাহলে লিপির পুঞ্জ কেঁপে ওঠো
ভীরু পায়ে আলোর নিবিড়ে, আর আলোকিত হয়ে ওঠে গুহাগর্ভ নির্জন আবার
.

.
বস্তুত কোথাও কোনও পথ নেই, শুধু এক শীর্ণ তটরেখা মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে অন্ধকার সাগরগর্জনে
আর পুনর্বার চিহ্নমাত্র দৃষ্টির অতীত
আলোও তদ্রূপ ক্ষীণ এই ক্ষুদ্র গ্রহের কোটরে, বিশ্বচরাচরময় তার পদচিহ্নরাশি কেবলই ছড়ানো, শুধু
প্রণামের ভাষা দিয়ে বুঝি তাকে স্পর্শ করা যায়
সে-ভাষা জানি না, শুধু হিজিবিজি চিহ্ন আঁকি ঘনঘোর গুহার দেওয়ালে, নিশি অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে
গ্রাস করে শ্বাসনালী-অলিন্দ-নিলয়
প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত, ওষ্ঠে তাই অর্থহীন ধ্বনি বাজে প্রলাপের মতো—পথের সন্ধানে তুমি থাকো হে পথিক,
আমি আজ পথশ্রমিকের হাতে রাখি হাত, তুলে নিই তাদের নিশান
বানাব আপন পথ নিরিবিলি বৃক্ষশোভাতুর, যে-পথে শ্রীরাধা যান কম্পিত চরণে আর বাঁশি বাজে প্রাণাকুল
করা, বুঝি বা বর্ণনা শুনে আলোও আকুল হবে, ছুটে আসবে আঁধার গুহায়
.

.
তা হলে পথের কাছে নত হই, যে-পথে কেবলই নানা নাটকীয় দৃশ্য ভেঙে-প’ড়ে প্রাণভয়ে ভীত এই
জীবনকে কিছুটা সংগত ক’রে তোলে
যে-পথে হেঁটেছে চিরপথিকেরা, যে-পথ গিয়েছে দূরে দৃষ্টিহীন দিগন্তের পারে, যে-পথ বিপথগামী করেছে
সহসা কোনও চাঁদের কামড়-লাগা রাতে
বহু ভ্রমণের শেষে যে-পথে এসেছে আলো, যে-পথে সে ভ্রান্তিবশে ফিরে যেতে চেয়ে তবুও পড়েছে ধরা
দরিদ্রের ব্যাকুলতা ঘিরে, যেন অসমাপ্ত গান
যে-পথ এখনও ঘোর রহস্যের অভিমুখে চলে গেছে জনহীন, নক্ষত্রক্ষচিত—তাকেই প্রণাম করি, ঘন হয়ে
আসে রাত, আরও দূরে ভোর হ’য়ে আসে, মুয়াজ্জিন, দাও গো আজান


মনপবনের নাও


.
ওরে মন কোথা গেলি, কোন আত্মনির্বাসন ছলে হারালি মরুর প্রান্তে, কোথা জল কোথা জল বলি ঢলে
পড়ে অবসন্ন দেহ অবরুদ্ধ হোসেনের প্রায়
সামান্য আঁচলখানি ছুঁয়ে থাকি গভীর মুঠোয়, যাতে বিশ্বচরাচর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির আঙিনা হ’য়ে ফুটে
ওঠে আলোআঁধারির বুকে গোধূলি-শার্সিতে
এলোমেলো বাতাসের ঝাপটায় কোথায় হারাল সেই সূত্রবৎ সোপানভঙ্গিমা, মেলার ভিড়ের মাঝে ওরে
মন, অসংবৃত বালিকার মতো
হারাল, তবুও বুঝি বা অকুতোভয়, তাই, বালিকাও খুঁজে পায় তার পথ তার গান তার গৃহশোভা আর
ঘুমের আকাশমাঝে বৃশ্চিকের ক্ষণমাত্র স্মৃতি
আমিও কি ফিরে পাব মন-আমার কোনও এক অলীক শ্রাবণে ঘনঘোর অন্ধকারে ভেসে—যাওয়া
ভাঙাচোরা মায়াবী লন্ঠন, হাওয়ার অরণ্য জুড়ে অফুরন্ত মেঘের নিশান
.

.
কিছুই হবে না লীন, আমি শুধু ডুবে যাব মহাশূন্যে কস্তুরীর ঘ্রাণে, কেটে যাব অদৃশ্য সাঁতার তুমুল ফানায়
কেঁপে কেঁপে, বক্ষ মোর দমে দমে হবে চুর চুর
নগরকীর্তনে যথা মহানন্দে উঠেছে জিকির, আমিও তুলেছি ধ্বনি মনে মনে ওরে মন, হাসিবিগলিত আর
যুগপৎ অশ্রুভারাতুর
এখন তাহলে বল সত্য ক’রে মাশুক আমার, তুই কি বিলীন আজ আমার প্রার্থনাগানে, ব্যথামুখরিত এই
অন্ধকার খাঁচার আকাশে
তবুও মেটে না আশ, আমি যে আশিক, তাই তোকে ছিন্ন ক’রে পুনঃ চলে যাই বিরহের অবলীল স্বাদে,
অকস্মাৎ মুছে যায় পৃথিবীতে ফেরার দরজা
তবে কি সকল স্মৃতি অন্ধকারে ডুবে গেল রাত্রিশেষ চন্দ্রমার প্রায়! হায় মন, কেন ভয়, কোথা তোর বিরহী
নিশান, তারে পতপত একবার উথলিত বাতাসে উড়া
.

.
সকল শস্যের ঋতু শেষ হ’লে এ-পৃথিবী শূন্য হয়ে গিয়ে তবু যেভাবে স্বপ্নের ঘোরে রচে তোলে অনাগত
ফসলের হাওয়া, আমিও সেভাবে চাই বারে বারে ওরে মন বৃষ্টির প্রহার
শূন্যের ধারণা দিয়ে এ-কাহিনি শুরু হ’য়ে শূন্যেই মিলাবে যদি, তবে কেন রঙে রঙে এত অভিরূপ,
নীলিমার ঘাটে ঘাটে এত স্বাদ, তরীপ্রস্তাবনা
যে-মুহূর্ত ঢলে পড়বে অন্ধকারে সংজ্ঞার অতীত, আরেক মুহূর্ত এসে তুলে নেবে আলোকিত তার ধেনুগুলি
আর পুনর্বার বাঁশিতে ফুৎকার, সুরগুলি ভেসে যাবে পূর্ববৎ নদীর ওপারে
তখন কোথায় তুই মন-আমার—কদম্বের মূলে সে-বাঁশির সুর শুনে আবারও মূর্ছিত হলি যদি, চেয়ে দেখ,
আমি নই, সে আরেক প্রহরের হরষিত বাঁশরিবাদক
.

.
পথ তবু বয়ে যায়, পথিকের ক্ষণে ক্ষণে ভ্রমণকে মনে হয় ভ্রম, ও মন-ভ্রমরা তুই উড়ে যাস কোন্‌
পদ্মবনে, সাঙ্গ কর সাঙ্গ কর এই ক্ষুদ্র জীবের বিভ্রম
চেয়েছি প্রতিমা যদি সে আমার দৃষ্টিহীন অণুর পিপাসা, আজ যদি নিরঞ্জন হতে চাস ওরে মন, তোকে ধরি
প্রগাঢ় আলোয় আর ধীরে ধীরে ফিরে পাই চক্ষুর প্রতিভা
তখন বাতাসে দেখি তোরে মন, আকাশেও, দেখি জলে, ঝড়ে ও বিদ্যুতে, দেখি মানুষের ভিড়ে,
মৃত্যুভয়ে কেঁপে উঠতে উঠতে তবু শত শত স্নায়ুর তৃষ্ণায়
দেখি না কি নিজেতেও, দেখি, দেখি তোর প্রতিভাস এসে ভেঙে পড়ে অদৃশ্য আয়নায় আর শিরায় শিরায়
আজও বেজে ওঠে বয়ে-যাওয়া পথের হাতছানি
ও মন-ভ্রমরা তুই সে-ডাক শুনিস যদি আনমনে, মনশ্চক্ষে বয়ে যায় ঝিরিঝিরি আনন্দাশ্রুধারা
.

.
খুঁজেছি সামান্য স্থান ম্লান ধূলিকণাবৎ, ওরে মন, তার তরে ছুটে চলি কত অফুরন্ত পথ, কত মহানিশাঘোর
নিবিড় তমসা
মহাশূন্যতার এক মেরু থেকে যেন এক কিশোর গ্রহাণু চলেছে দুর্দাম বেগে, মাতৃতারকার কক্ষপথে ফিরে
যেতে, যদিও সে মানচিত্র জানে না, শুধু ঘ্রাণমাত্র ধমনিতে আঁকা
শুধুই অস্পষ্ট স্মৃতি, যেন কোন লোককাহিনির পাঠ ভেদ ক’রে নদীতীরপ্রান্ত হ’তে ভেসে-আসা অফুরন্ত
বাঁশি, যেন ঢেউ ছলাৎছল, যেন শূন্য নৌকার হাতছানি
যেন শুধু ভেসে চলা তোর দিকে মন-আমার, আর কোনও বৃক্ষ নেই, পক্ষী নেই, আঁখিতারা নেই, নেই
কোনও ধনুর্বাণ, লক্ষ্যভেদ, স্বয়ংবরসভার করতালিমুখরতাগুলি
একদিন তোর মর্মে ঝরে যাব বলে প্রাণপণে শিখে চলি স্তব্ধতার চারুপাঠ, জন্ম-অন্ধ ভ্রমণের ভাষা, আর
শুধু ছুটে চলি বজ্রলীন ক্ষীণ ধূলিকণা
.

.
কোথায় পালাবি তুই ওরে মন, কোন দূর সমুড্ডীন নক্ষত্র-আভায়, পড়ে নেব তোর ভাষা প্রাণপণে,
মহাশূন্যতার স্তব্ধ গহন সংজ্ঞায়
কোথায় পালাবি কোন ভূগর্ভের নিবিড় তন্দ্রায়, আমি সেই অতলের মাঝে ডুবে যাব, তোর ছায়াপথ থেকে
এক কণা আলোর আশায়
যদি আগুনের দিকে হেঁটে যাস, আমি তার জ্বলন্ত অঙ্গার হয়ে ছোঁব তোকে, বেঁধে ফেলব দাউ দাউ
আঙুলের দশটি শিখায়
প্রলয়পয়োধিজলে যদি চাস লুকাতে আকাশ, উদ্দাম ঝড়ের মতো লাফ দেবো ঢেউয়ের চূড়ায়, আর ছুটে
যাব ঘন অশ্বারোহী
কোথায় পালাবি তুই মন-আমার, চর ও অচর আজ মুঠিতে ধরেছি দ্যাখ, এ আমার ম্লান বিশ্বরূপ, তবু
এরই মাঝে দিতে হবে ধরা
পেয়েছি আভাস যদি আমার সামান্যে, তবে জাতিস্মর এ-পিপাসা জেগে রবে মৃত্যুহীন ওরে মন, এ-লিখন
জেগে রবে ছায়াতমসার কানে কানে
.

.
চলে যাবে দিন জানি চিরতরে, কখনও ফিরবে না আর ওরে মন, আঁধার জলের বুকে তাই কাটি অদৃশ্য
আঁচড় আর ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে ছবিময় মৃদুকথকতা
বোধের ওপার থেকে কে বলে সে-কথাগুলি, কে শোনে অদম্য ঢেউয়ে ভেঙে যেতে যেতে,
কে বোনে সংলাপ আর কে আঁকে আকাশব্যাপী অঝোর বর্ণনা
কে আঁকে ঝড়ের দৃশ্য, হাহাকার, ভাঙা পাঁজরের ভাঁজে গুমরে কেঁদে-ওঠা কত অন্ধশতকের রাশি রাশি
দমচাপা হাওয়া
কে ভনে রাত্রির কথা, ঘুমঘোর, সহসা আপাদমাথা কেঁপে-ওঠা আকাশস্তব্ধতা ভেদ ক’রে দুলে-ওঠা
মহাজ্ঞান, কালপুরুষের তরবারি
ও মন, আমিই তোকে বলি ব’লে মনে হয়, সারিবদ্ধ অতন্দ্র প্রলাপ, তবু অনর্গল বাক্যহারা, দেখি, তোর
পানে কান পেতে আছি, আর দিন যায়, দিন চলে যায়
.

.
নেমে আসে মার যত, যত গ্লানি, যত হীনমান—সকল আঘাতচিহ্ন গোপন গর্বের মতো বহন করেছি
প্রাণপণে, ওরে মন যেন তোর ঢেউ-জাগা দুর্বার নিশান
পথবিভীষিকাগুলি বারে বারে নিরুদ্ধ করেছে যত হৃদয়ের সামান্য নীলিমা, ডানাভাঙা পাখি এসে
ছড়িয়েছে জ্যোৎস্নাহীন গানের কঙ্কাল
বুকের গভীর থেকে ততই উঠেছে বেজে উধাও চলার বাঁশিখানি, চাবুকের দাগ থেকে ঝরে-পড়া
রক্তরেখাগুলি যেন তার সুরের চলন
আরও আগুনের ঢল যদি ক্রমে ঘিরে ফেলে পথের আভাস, জ্বলে উঠব ধিকিধিকি হাড়ে হাড়ে, রোমকূপে,
আগুনে দু’বাহু মেলে উড়ে যাব মন-আমার মানস সায়রে
.

৯.
নিজেকে ভেবেছি যদি মহাদীর্ঘ, আলোকিত বৃক্ষশাখা এসে বলেছে—ছায়ার পানে চেয়ে দ্যাখো, বোঝ না
কি তুমি এক বিমুগ্ধ বামন
বাতাসেরা আকাশেরা হাসে নি জনসমক্ষে নিতান্ত ভদ্রতাবশে, ওরে মন, আমিই হেসেছি আর ফিরে গেছি
চুপি চুপি অন্ধকার খাঁচার বলয়ে
আবার জমেছে মেঘ কোনও দিন, উড়ে গেছি সব ভুলে, ভেবেছি, ফেলেছি ছিঁড়ে দিগন্তের ম্লান পরিসীমা,
তখনই সহসা ঝড়ো হাওয়া এসে দিয়েছে ঝাঁকুনি
বলেছে—বাঁধন খোলো, আপন সীমার ডোরে ডানা বাঁধা, কী লজ্জায় দিগন্ত পেরুবে? আকণ্ঠ দ্বিধায় ফের
ঝরে গেছি গুহার প্রাঙ্গণে
এই প্রহসন তবে মন-আমার রচে যাই আত্মচরিতের, আর ভাবি, শত পতনের পরে তবু কেন এত স্বপ্ন
আঁকা দুই চোখে ক্ষমাহীন গান্ধারীর মতো
.

১০.
আমার সমস্ত দিন মুছে গেছে সব রাত্রি সব পথ সব আয়ুরেখা, শুধু ধিকিধিকি জ্বলে ওঠে এক অগ্নি,
ওরে মন, এক শুভনাম
আমার সকল মন্ত্র ঝরে গেছে সব ছন্দ সব যতি সব ইন্দ্রজাল, শিরায় শিরায় শুধু দুলে ওঠে এক নদী
চিরবহমান
ঊষর প্রান্তর বেয়ে যেতে হবে, নোনা রক্তে ভিজে যাবে জানি নগ্নপদ, ফেটে পড়বে ত্বক, ঝড়ে জলে ছিঁড়ে
যাবে কুটি কুটি সভ্যতার শেষ অবকাশ
উড়ে যাবে ম্লান ভাষা মরুশিবিরের মতো মায়াবী আশ্রয়, সিন্ধুর কুটিল লাস্যে ডুবে যাবে সপ্তডিঙা
মধুকর, ছুটে আসবে ঝাঁকে ঝাঁকে হিংস্র জলচর
তাদের দাঁতের মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে তবু, মন-আমার, একমাত্র আলো গেঁথে নেব রোমে রোমে, যাতে
যাত্রা অবসান হলে মনে হয় জেগেছিল বাংলার প্রান্তর জুড়ে যেন এক অবিনাশী বসন্তপূর্ণিমা
.

১১.
ভিজে কাগজের বুকে কুচি কুচি জলরং-তরণীর মতো করুণ প্রদীপগুলি ভেসে গেছে মন-আমার
এলোমেলো দিগন্তরেখায়, যেখানে বৃষ্টির দেশ ঝাপসা আলো মেঘলা তানপুরা
থরো থরো বাতাসঘূর্ণিতে আজ তারা কে কোথায়, রঙিন নিশানগুলি মুছে গেছে, ঝরে গেছে মৃদু প্রজ্বলন,
কেউ দূরে দিকচিহ্নহীন, তলিয়ে গিয়েছে কেউ ঘনশ্যাম কালিন্দীর জলে
তাদের সামান্য স্বপ্নে কোনও তীব্র গন্তব্য ছিল না, শুধু স্থির অঞ্জলির জলে যেভাবে বালক দ্যাখে
নক্ষত্রখচিত এক আকাশের মুখ, তারা সেই বিহ্বলতা নিয়ে ভেসেছিল শুধু
তারা ছিল নিয়তিতাড়িত, মুহূর্তের বিষণ্ণ সন্তান, তবু চিরবিস্ময়ের রক্তঢেউগুলি ধমনিতে বয়ে গেছে
ছলাৎছল, অকস্মাৎ নিবে যাবে জেনে তবুও কেঁপেছে জ্বরে কামনায় ঘনঘোর লুব্ধক আবেগে
ভেসে গেছে যারা, তারা ভেসে যাক, মুছে যাক দৃষ্টিসীমা থেকে, তবু মন-আমার তুই শুধু ছুঁয়ে থাক
আমার সর্বস্বহীন চিররিক্ততার ভাষাটুকু যাতে তোর কানে কানে বলে যেতে পারি শেষ কথা
.

১২.
কত না শতক ধরে তোর কাছে যেতে চাই ওরে মন, কৃষিভূমি, রণভূমি, কত না অনন্ত পথ পার হ’য়ে
বুকে হেঁটে হামাগুড়ি দিয়ে, ঝড়ের প্রবল রাতে ঝাপসা পাতার মতো ভেসে
কখনও স্বপ্নের মতো জেগে ওঠে চিরপথরেখা আর আমি তার নিঃসঙ্গ পথিক, যেন পথ আমারই রচনা,
তাই সহসা ভাঙন এসে মুছে দেয় সারি সারি মেঘলামুখো করুণ হরফ
প্রবল নদীর কূলে বসে থাকি, ফুঁসে-ওঠা ঢেউগুলি করতালি দিয়ে ডাকে নক্ষত্রপাতাল, বুঝি আমাকেও
ডাকে, তবু ভীরু আমি ভাবি—জানি না সাঁতার
কে আমাকে পারে নেবে, ওরে মন, তুই মনমাঝি? চিকন নৌকায় যদি উঠে বসি, যদি দিই কৃপণের মতো
শুধু দুই আনা, মাঝগাঙে তরণী ডুবাবি
তখন জলের নিচে তলাতে তলাতে যদি দিতে চাই ষোল আনা, হাঙরেরা কুমিরেরা খলখলি যদি হেসে
ওঠে, তখনও কি পাব তোকে, মন-আমার, ঘুরনসিঁড়ির মতো পাকেপাকে বিচূর্ণ পাঁজরে
.

১৩.
একা একা আসি এই নদীতীরে, গভীর গহন রাত্রি, লোকচক্ষু আশ্চর্য নির্বাক ওরে মন-আমার, এই বুঝি
প্রার্থিত সময়, কালপুরুষের ছায়া নেমে এল শান্ত চরাচরে
এই রাত্রি চলে গেলে এই রাত্রিদীর্ঘশ্বাসগুলি কখনও ফিরবে না, স্বপ্ন ও তন্দ্রার মাঝে, অবলুপ্ত নগরীর
ঝরে-যাওয়া সুষমার মাঝে, তাই এই মায়াবী ভ্রমণ
ওই বুঝি বেজে ওঠে সে-গোপন পদধ্বনিগুলি, নাকি তারা নদীর কল্লোল—প্রাণপণে কান পাতি, হায় বুঝি
সকলই মিলাল সুদূর শূন্যের পানে, তবে কি দিগন্তে ছুটে যাব
তাই ছুটি, আর দেখি দিগন্তরেখাও যেন ছুটে ছুটে কেবলই পালায়, যদি ফিরি বিপরীতে, সেও ফেরে, তা
হলে দিগন্ত শুরু কোথা থেকে, তা হলে কি সে-দিগন্ত আমিই স্বয়ং
তবে তো শূন্যতা আছে আমার পরেই, ওরে মন কেন এত ছলনা ছলিস, গহন নদীর মতো রাত্রি বয়ে যায়
আর দূর ছায়াপথ থেকে ঝরে পড়ে অঘ্রাত শিশির
.

১৪.
ওরে ও চঞ্চল মন, কোথায় হারালি তুই, ছায়াহরিণের পিছু পিছু ছুটে যেভাবে হারায় পথ ত্রস্ত আখেটিক,
আর মালিনী নদীর জলে বৃক্ষাতুর চাঁদ কেঁপে ওঠে
সে-চাঁদ রহস্যময় হেমন্তের টিলা থেকে যদি তোকে হাত ধ’রে মেরুরাত্রি ক’রে দিল পার, নিতান্ত
মুগ্ধতাবশে তোর চোখে কেন তবে নেমে এল বেহুলার ঘুম
ওরে মূর্খ, চেয়ে দেখ শীত শেষ হ’ল, নাগকিশোরের ঘুম ভেঙে গেছে, সে আজ খোলস ছেড়ে এঁকেবেঁকে
পার হয়ে যায় ছায়াপথ, দু’চোখে গভীর স্বপ্ন—ছিদ্রমুখ, লোহার বাসর
যে যার স্বপ্নের দিকে চলে যাবে, মন তুই চল তবে আরও দূর, মালিনী নদীর জলে ঝুঁকে পড়ে দেখ যদি
রাত্রি শেষ হ’ল, তপোবনবিথী থেকে ভেসে এল ঋষিকুমারীর মতো অচেনা বাতাস
ছায়াহরিণের দল নেচে ওঠে, আজ তারা ভুলে গেছে নিহত হওয়ার ভয়টুকু, যেন বা কোথাও কোনও হত্যার উৎসব নেই আকাশে বাতাসে, অরণ্যে অরণ্যে আজ জ্বলে ওঠে চকমকি, বেজে ওঠে ক্ষুধার্তের বসন্তমাদল
.

১৫.
ও মন সকল কথা কোথায় লুকালি আজ, এই মাঘনীশিথের বুকে তবু এলোমেলো হাওয়া কেড়ে নেয় ঘুম,
আর কানে কানে বলে—তুমি ভ্রমণ ভুলো না
আমি তো পথেরই পানে চেয়ে আছি, কান পেতে, শুনি যদি সে-আকুল ডাক, যাতে আকাশ মূর্ছিত হ’য়ে
পড়ে আর তারাগুলি নেমে আসে কুয়াসামন্থিত তমসায়
আমিও এসেছি নেমে মনে মনে সর্বসুখ ছেড়ে, যেন কপিলাবস্তুর আলো নিভে গেছে, আর মন চেয়ে দেখ
—পথে পথে খুঁজে মরি মহাসত্য, জরাজীর্ণ আমিও গৌতম
যদিও পাব না তার ছায়ামাত্র, মনপ্রাণ যেহেতু সঁপিনি, তবু স্বপ্নের ভিতরে সঁপে দিতে চাই, দিতে চাই
মহামৌনে ঝাঁপ, যদি মন সব কথা এখনই লুকালি
.

১৬.
ও মন আমি তো তোকে মনে মনে পেতে চাই, তবু চক্ষু দৃষ্টির ভিখারি, সে কেবলই দৃশ্য চায় পথে পথে
ভ্রমণের ছলে, যেন দিবা রাত্রি স্পষ্ট বোঝা যায়
আমি তো স্তব্ধতা দিয়ে পাড়ি দিতে চাই সব শূন্যতাকে, তবু হায় ভাষাও বাঙ্ময়, তাই কান চায় ধ্বনি আর
স্তবকে স্তবকে গাঁথা সুরের মূর্ছনা
এভাবে প্রতিটি দরজা নিজ নিজ বাতাসপ্রত্যাশী, তাই কুঠুরিতে দুরন্ত ঝাপট এসে লাগে আর দলে দলে
জেগে ওঠে আকুল প্রকৃতি
কিভাবে শমিত করি ক্ষুধার্তের এ-মহামিছিল ওরে মন-আমার, সত্যি ক’রে বলি—আমিও হেঁটেছি বুঝি
পায়ে পায়ে মাথা নিচু ক’রে, অক্ষরশরীরে মহামাত্রা পাব বলে


[কবিতাগুলি অক্ষরশরীরে মহামাত্রা পাব বলে কবিতাবইয়ের (প্রকাশ মাঘ ১৪১২)  অন্তর্গত। রচনাকাল ১৪০৯-১০। বইটি উৎসর্গিত হয়েছিল দুই অগ্রজ কবি কালীকৃষ্ণ গুহ আর ফরহাদ মজহার-এর প্রতি।]

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]
কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬]
বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭]
রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭]
কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭]।
ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮]
বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]
খেয়া: এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭]
বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮]
সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮

নাটক—
হননমেরু [মঞ্চায়ন: ১৯৮৬]

অনুবাদ—
আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com