হোম কবিতা তীব্র ৩০ : আলফ্রেড খোকনের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : আলফ্রেড খোকনের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : আলফ্রেড খোকনের বাছাই কবিতা
0
Latest posts by আলফ্রেড খোকন (see all)

আলফ্রেড খোকন বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। দশক-বিবেচনায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি নব্বইয়ের দশকে। আপাত-সারল্য ও সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার জন্য তিনি বেশ পাঠকপ্রিয়। রূঢ়তা বা শূন্যতাবোধ, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস—যা কিছুই হোক, সবই তার কবিতায় ফুটে ওঠে চিত্রকল্পের নানা অনুষঙ্গে, প্রায়শই প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় প্রচ্ছন্ন হয়ে।

কবিতার পাশাপাশি গদ্যেও তিনি সাবলীল। রয়েছে বেশকিছু গদ্যের বই। এ বছর ‘বাতিঘর’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবির নির্বাচিত কবিতা। তার থেকে ৩০টি কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


পাঁজরের উত্তাল হাড়

সমুদ্রের পাড়ে যাও—তীরে এসে দাঁড়াও
দক্ষিণে, ডানে কিংবা বামে যতদূর যাবে
একটা লাল কাঁকড়া ছটফট করছে তীরে
একটা ফড়িং ঝাফ দিচ্ছে বালুর ভিতরে।
এইসব ফড়িঙের পাখনায় উষ্ণতার হিম
জেগেছি, ঘুমুতেও চাই—বালির জাজিম;
বালুতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে একটা ঝিনুক
এই মাত্র ডুবে গেল—শ্যামল বিক্ষত মুখ,
অনেক মুখ আমি খুঁজেছি শামুক গ্রীবায়—
অনেক বিবৃতি সূর্যাস্তের ঢেউয়ে ঢেউয়ে
পড়েছি, সাদা মলাটের পাঠ্য তালিকায়
ফেনা হয়ে মিশে গেছি মৎস্যনারীদের
তলপেটে, তরঙ্গে নাভির নিরুদ্দেশে—
ডুবে যেতে যেতে কত তল অজ্ঞানতায়
এক চিমটি বালি নিয়ে ঢিবি গড়ে তুলি
মিছিলে অসংখ্য মুখ—একটা বুলবুলি
এসেছিল সমুদ্রপাড়ায়, মেনিফেস্টো হাতে
জ্যোৎস্নার জোব্বা পড়ে নিষিদ্ধ জ্যোৎস্নায়
অতিরিক্ত পোশাকের তাপে—ঘামে ও
ফেনায় পাঁজরে উত্তাল হাড়, লোলজিভে
লালা বিজড়িত—একশত ছাপান্ন বার,
দগ্ধ এবং দ্রবীভূত—ফোসকা নিঃশ্বাস
দেখে দেখে এই আমি শেষ অবিশ্রাম;
ঢেউয়ে ডুবে গেল প্রথমদিনের সূর্য।

মার্চ ১০, কক্সবাজার ২০০০

আমার বান্ধবী

আমার মৃত্যু হলে সূর্যেরও মৃত্যু হয়
চাঁদের প্রসঙ্গ আমি কখনো বলি না
আমি একবার গত শীতে মরে যাই
বড় রাস্তার মোড়ে,
কত শীতপাতা মরে পড়ে থাকে
        এই দৃশ্য চোখেও পড়ে না
আমার মৃত্যু হলে রাতে একদম ঘুমুতে পারি না
রাত এলে পাতারা ঘুমিয়ে যায়
মাঝে মাঝে সন্ত্রাসী হাওয়া এসে উচ্ছেদ করে
                                       উদ্বাস্তু পাতাদের ঘুম
ফলে সকালে যাদের দেখা পাই
বিকালে তারা মৃত্যুমুখর দূরে চলে যায়,
রাতে আমি একদম ঘুমুতে পারি না;
ও মৃত্যু রজঃস্বলা মেয়ে
                          তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না


বর

ঘুমের ভিতর কে যেন আমাকে ছেড়ে যায়

আমি তাঁর জন্য জাগরণ পর্যন্ত অপেক্ষা করি
কিন্তু আলো ছিনিয়ে নেয় আমার মনোযোগ
কোথা থেকে এসেছে তারা কোথায়ই-বা যায়
জানে না ঘুমন্তপ্রাণ জাতীয়তাবাদী সন্ধ্যায়

ঘুম ভেঙে নিজেকে দেখি ক্রমাগত শূন্যতায়
আমাকে সে ছেড়ে গেল কিনা, ওই দূর আসে
ঘুঘু ডাকে গাছের পাতারা হলুদ হয়, গাছবন—
আমি এত ঈর্ষা হই, ঈর্ষাদের নাগরিক মন

এই গ্রামে কিভাবে কিভাবে যেন সন্ধ্যা আসে
আর ঘুমের ভিতর সে আমাকে ছেড়ে যায় ঘর

জেগে থাকি আলোহীন আমি তাঁর সাধারণ বর


একটি সোনালি গাছ

অনেক কবিতা লিখে রাখা হলো রাাত্রির গোপন ড্রয়ারে।
তার মধ্যে যৌনতা ছিল; মেয়েলি অনেক ক্ষত—
                                           পুরুষালি দিন,
গ্রামে ও দূরে—ব্যাপক বারতা ছাড়া কোনও হত্যাই টেকে না;
তবুও সে বলল—‘আমাকে কথা দিন…’
আহা, বাতাস উড়ছে
               পাখি বইছে,
মাঠে মাঠে কাটা হয় ধানগাছ
ধান ফুটছে, গান ফুটছে
একটি সোনালি গাছ, টলমলে ছায়া
তারও নিচে, আরও একটু নিচে কিছু মৃত অলংকার
কতদূর বাজে—আমরা বিস্ময় করি,
কয়েকটি নতমুখ; মৌনমেয়েদের গান,
                              মৌনছেলেরা ভাবে

তারও নিচে, আরও একটু নিচে কিছু মৃত অলংকার
মাঠে মাঠে জ্বলে ফসফরাস পেলে!


চলুন উৎসব করি আজ মৃত্যুকে নিয়ে

মেয়েটি ছিল মৃত্যুর ওপাশে
ঘরে ঢুকেই আমি তাকে চুম্বনে জাগালাম;
সে পুড়ে যেতে লাগল আগুন সঞ্চরণে
আমি তাকে কাজলরেখার নাম বললাম
সে রাজপুত্র ভেবে আমাকে ছুঁয়ে দিল
আমি মৃত্যুর মতো নিঃশব্দ টান টান;
আমরা যৌথ শয্যায় মৃত্যু অবগাহন করি

বন্ধুগণ, আজ আমরা মৃত্যুর উৎসব করি
এই রোদ-রক্তিম শয্যায়—
        মৃত্যুতে লিখি নাম
        মৃত্যু পাঠ করি
আমাদের সভ্যগণ—
তোমরা সকলে মৃত্যুর দিকে তাকাও
তার ব্লাউজ খুলে প্রথমে ইস্ত্রি করো
এবং পৃথিবীর সমস্ত ঋতুবতী চুলের সুগন্ধে
প্রস্তুত করো গন্ধনির্যাস।
        যেন পান করতেই মদির হয়ে ওঠে
আমাদের যাবতীয় চারপাশ,
তারপর পরিধান করো
এবং নিজেকে নিয়োগ করো অভ্যন্তরে
        অতঃপর এই ষড়যন্ত্রমূলক সন্ধ্যায়
নতুন শ্লোক, নতুন ধর্মহীন গ্রন্থের পবিত্র নামে
আমরা পাঠ করি আমাদের আজকের কবিতা।


ইশারা

(এক ইশারায় দুই পৃথিবী হাজার বছর বাঁচে)

এই রাতে আমিও ঈমান আনি তোমার মিনতি ভরা
শব্দগুচ্ছের পর। এ শহরে গাছদের ধূলিস্নান পাতায়
পাতায় মন্থর রাত্রি এলে, দ্বাররক্ষকগণের চোখ এড়িয়ে
যা কিছু দেখে নেয়া যায়—পাড়ায় পাড়ায় মৃত-ঈশ্বর ;
তাতেই তো আমাদের সফটওয়্যার তৈরি হয়ে আছে
তাতেই তো জাদুঘর—চারিদিকে লোকোত্তর আলো
তৃষ্ণার ধারণা নিয়ে দগ্ধ যারা—যারা হৃদয় খোয়ালো
দূর গৃহকোণে কুপিবাতি দীর্ঘশ্বাসে জ্বলে, তবুও
লিখছ বসে খুব গোপনে—তারও চেয়ে একা রোজ
অপরিচিত হতে হতে পথের বাহুর কাছে যতটা সন্তোষ
জানে নি গোপন দেহ পাশ দিয়ে যে মেয়েটি হেঁটে গেছে
যে মেয়েটির ওড়নার ঢেউ বাতাসে ভাঙিয়াছিল যুবকের
গালের উপরে—বুঝেনি কৃষ্ণবাতাস, বিপন্ন নোনাজল,
মুষল জ্যোৎস্নায় নগরীর ঢিলেঢালা ছেলেমেয়ে কেউ।

ক.
রাত যদি বাড়ে বৃষ্টি যদি নামে, আমরা মৌন কিছু করি
আমাদের যৌথবাগানে ছিঁড়ে যাওয়া অন্ধকার—তাতে
উরুর সুষমা কিছু আলো। বুকের বাঁধন খুলে যারা যারা
হৃদয় দেখালো… ও মেঘদূত বার্তা কিছু জানো? তাহলে
বৃষ্টি আসুক আজ পাতায় পাতায়… আর যা কুশলতা,
রাতটা গাঢ় হলে ছড়াব এমন বারতা। ঘন অভিমানে
উড়ে গেছ মেঘ মেঘ আছ জমে, রাত যদি বাড়ে
বৃষ্টি যদি নামে—আমাদের গ্রামের সাথে তোমাদের
বাড়িটা যে বানিয়েছে তারও কথা ভাবব কিছুক্ষণ;
দোয়া হবে তার কথা মৌন উচ্চারণে। ভাব ও টীকা
কবে আর হতো লিখা তুমি আর আমি যদি না-ই দেই
মানে। রাত যদি বাড়ে বৃষ্টি যদি নামে—মহৎ এক
রাতের আশায়: —আমাদের যৌথবাগানে, তুমি নাই
আমি নাই এই কথা একদিন গীত হবে এ পাড়ার গানে

খ.
এখানে এমন ভোর পৃথিবী হলে আমিও জানলা খুলে
ধু ধু দর্শক—আলোর সম্মেলনে ফুটতে ফুটতে আলোদল
স্নিগ্ধ স্নিগ্ধ ভোর, কুয়াশায় চামেলি বাগানে হাওয়া টলমল
‘এ এক অসাধারণ মোহ’—আমাদের মোহাবিষ্ট মন।
ও ফুল-বোন তোর কোনো ডাক নাম নেই? ছিল অনেক
উপমা অই পাহাড়ের দেশে—যেন অনেক প্রফুল্ল ভোর
সে দেশের যৌথ বালিশে… গোপনে যে যে অভিমান
পৃথিবীর দেশে দেশে ঝরে—আনখ ভ্রমণের মুগ্ধতাবশে
সেখানে ভোরের কোনো গল্প আজও জমে ওঠেনি।
দুপরের রোদ কিংবা প্রার্থনা ছেড়ে, যে কেউ হেঁটে
যেতে পাড়ে নাক বরাবর। এখানে দেশের সীমা নেই;
ফুল মানে ফুল, গাছ মানে গাছ, জল মানে জল
নদী মানে নদী, মাছ মানে মাছ… কিন্তু আমার বেশ
ভালো লাগছে অন্য মানে ফিসফিসে গলার আওয়াজ।

গ.
সৌন্দর্য তো অপলার—প্রতিবার লিখে আমি
হারিয়ে ফেলি তার পুনরুদ্ধার। চৈত্রে যে বাতাস বয়
তাতে হৃদয়ের আরও বেশি উচ্ছ্লতা আরও বেশি ক্ষয়
আলো এলোকেশ চুল—আমি যার সৌরভশিকারি
অতীব নিকটে এসে দূরের উজ্জ্বল ক্রমশ হারাই;
আদিবাসী ফুলে—বন-মাধুরীদের স্বপ্ন আঙুলে
আমার পরাক্রম উড়িয়ে পাই মেঘের জুলুম।
ইথারে জড়িত কান্না আর অসম্ভব সীমিত বিকেল
দিগন্তের গোপন আত্মীয় হয়ে জেগে আছ
অনতিক্রম্য দূর, প্রীতিমুগ্ধ বাঁক—বাঁকের রাতুল।
আরও আরও মানে হবে—যত বেশি মানে হওয়া যায়
তার ভুল—ধীরে ধীরে অতিক্রম করে ওই হিমাচল
নকশি কাজের আড়ালে আড়ালে ব্যথা—মৃদু ভুল
তুমি যার স্পর্শ হও, আমি তার কয়েকটি আঙুল।

ঘ.
এ বিরহ একদিন মিথ হলে, প্রার্থনায় গীত হলে
আমাদের কী-বা লাভ, এখন অধীর হয়ে আছি
কতদূর মাঠের গল্পে সমুদ্রের পাড়ে শুয়ে শুয়ে
প্রার্থনায় বসে বসে, কার নামে ঈশ্বর ভুলেছি!
আর ওই চিরায়ত গাছদের ডালে যারা পাতামগ্ন
ফুল হয়ে মহিমা এনেছ—এইসব গোপনীয় পাশে
সকলি কামনায় মানি। আমরা একদিন পাল্কিতে
বিবাহ চেয়েছি। ফলে বিরহগীতিতে ভোরগুলো
লিখে রাখা হলো এক বর্ষায় প্রিয় আকাঙ্ক্ষার কাছে
এই কথা গীত হলে—সে যাওয়ায় মর্মরিত হলে,
আমার গ্রামের পাশে পাতাঝাউ বনে, পাতাহীন
গাছদের নিঃসঙ্গ ডালে—ফুটে রবে যে হাহাকার
সেখানে আমার কথা কিছু যাই বলে—কবির কী
এসে যায় তুমি ছাড়া এই বাক্য প্রচারিত হলে!


ফুল্লশ্রী ডট কম

আমাদের গ্রামে তোমাকে নিয়ে যাব একদিন—খুব মজা হবে, আশ্চর্য, কষ্ট তুমি পেয়ে যেতে পারো। প্রতিশ্রুতি নিয়ে এখানে মানুষ আসে সকাল সকাল, ধানের পাতায় রাতগুলি ভোর হয়ে কাঁপে, উঠোন জুড়ে মা থাকেন আর একটু দূরে বাবা রৌদ্র হয়ে থাকেন, মানুষের মন বড় হয়ে ওঠে—চুপচাপ জাগে গাছের পাতারা।

ওপারে চাঁদের আলো এই পাড়ে বাড়ি আমাদের, উপভোগ্য হলে উঠোনের বাগানে বসবে কিছুক্ষণ—যে কোনো গাছের ডালে পাখি ডাকবে—একটু একটু বাতাস, যে কোনো আকাঙ্ক্ষার মতো উজ্জ্বল হবে আকাশের তারা—খুব মজা হবে, পেয়ে যেতে পারো এক আশ্চর্য ইশারা।


সুন্দরের সর্বশেষ ধারণা

ট্রেনটি যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া—তার দৈর্ঘ্য কত দূর?
আমি থার্ডক্লাসের টিকেটে চড়েছি
                                  আমি থার্ডক্লাস
আধুনিক মানুষেরা সবাই ফার্স্টক্লাসে চড়ে
সব সুন্দরী ফার্স্টক্লাসে… আমার পাশে অসুন্দর
এই মেয়েটি নামলে বাঁচি, কিন্তু ট্রেন ছেড়ে যায়
                                         কমলাপুর
অসুন্দরের পাশে বসে কোনোদিনই ঘুম আসে না
                                         গন্ধ আসে
ফার্স্টক্লাসের ভাবনা শুধু আসে;
আমরা সবাই সুন্দরের পূজারী
        অসুন্দর এক যোনির পাশে জাগি।


উড়ে কি তোমার কাছে যায়

গাছ ওড়ে পাতা ওড়ে অবিরল ওড়ে ডাল
দল বেঁধে মেঘ ওড়ে নদী উড়ে যদি ওড়ে
উড়ে কিছু উঁচু। চূড়া ওড়ে পাখি ওড়ে দূর
ওড়ে ছোট ওড়ে বড় ওড়ে ওই মুগ্ধ দুপুর
উড়ে আরও কিছু। রোদ ওড়ে ছায়া ওড়ে
ওড়ে ফুল ওড়ে ফল ওড়ে ঘ্রাণ ওড়ে ভুল
গালের তিলের পাশে আলগোছে উড়ে চুল

মৃদু ওড়ে মধু ওড়ে শার্ট ওড়ে ফ্রক ওড়ে—
হাওয়ায় হাওয়ায়। তোমার শরীর ভেজানো
গন্ধ নাকের ডগায়। ওড়ে ডানা ওড়ে মানা
ওড়ে একা ওড়ে দোকা ওড়ে শেখা-শিখি;
ওড়ে পল ওড়ে অনুপল ওড়ে গান ওড়ে প্রাণ
ওড়ে খড় ওড়ে কুটো ওড়ে ধুলো ওড়ে ধূলি
ওড়ে আশা ওড়ে ভাষা ওড়ে অত ওড়ে ক্ষত
ওড়ে পথ ওড়ে মত ওড়ে ঘুম ওড়ে ধূম ওড়ে
বালি ওড়ে কালি ওড়ে, লেখাটাও তো ওড়ে,
উড়ে কি তোমার কাছে যায়!

84080680_2283251588638903_2290962218843373568_n


ফালগুনের ঘটনাবলি

অনেক গরল মধু পান করে আমি আজ নির্জনে বসেছি
এইখানে এত বেশি কাতরতা, এত বেশি চুপে কোলাহল
চারদিক থেকে পাতাপত্র উড়ে আসে, গোপন বাতাসের
জল, আমার ঠোঁটের ভাঁজে আহা, কী-যে মৃদু মৃদু লাগে!

অনেক গরল মধু পান করে আমি আজ নির্জনে বসেছি
একটা ছোট পাখি বনের প্রতাপ থেকে এইখানে এসে
মজা পেয়ে গেছে—মনে হয় আমাকেও বুঝে নিল খুব
একটা ক্ষীণ পিপীলিকা আমার পায়েতে ক্রমশ নিশ্চুপ;

কোনো ধ্বনি নেই, প্রতিধ্বনি কিংবা ইশারা-সংকেত
কোনো তারবার্তা, অমলের ফোনে পুনশ্চ নদী-মেঘ,
ফালগুনের ঘটনাবলি তুমি উড়ে যাচ্ছ সন্ধ্যেবেলা
একটা দোয়েল—আমার হৃদয়ে দিল অভিনব দোলা;

অনেক গরল মধু পান করে আমি আজ নির্জনে বসেছি
বিশাল দুপুরবেলা, আপাতত আর কোনো দৃশ্য নেই,
চারদিকে রুচিবদলের উপদেশ নিয়ে বসেছি নির্জনে;
আমার সরল ব্লাকবোর্ড—অদূরেই মুছে যেতে থাকো।

১০ ফালগুন ১৪১০, ঢাকা

ক.
যেকোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গ দেখার আগে বেশ মনোরম লাগে;
সম্পূর্ণ দেখার পর আগ্রহ কমে, লাল শুকিয়ে যেতে থাকে
এখন ভোরের দৃশ্য মুখোমুখি জানলার আবছায়া ছুঁয়েছে
তার হাতের ফর্সা কনুই অথবা নাভির অথৈ অনুভূতি ঘিরে
একটি সকাল আজ মগ্ন হলো—আমরা দু’জন মগ্নতাশিকারি
ভালোবেসে বহুক্ষণ, বেদনায় বহুকাল সয়ে যেতে পারি
হাড়ের ঠোঁটের ভিতর এইসব মনস্থপ্রণয় পরিণতি পায়
আমিও অস্পষ্ট থাকি, সেও আড়াল বিছিয়ে দিয়ে যায়;
দৃশ্যের মধ্যবর্তী উৎফুল্ল যৌবন নাচে কয়েকটি শুভ্র আঙুলে
বাতাস গায়ে দোলা দেয়, তাতেই গভীর স্পর্শ পেতে পারি
যেন এই দিগন্তের কাছে বসে আরও দূর মুগ্ধতাশিকারি
সেও জানে—আমিও জানি আরেকটু আড়ালের মৃদু ভাব
সরে গেলে উঠে যাব সূচনাবিহীন অবাক ভোরবেলা;
একটি সকাল আর একটি জানালা ঘিরে জমেছে খেলা
মানুষ কিছুটা অস্পষ্টশীল, তার চোখে অপরূপ আছে—
পর্দা সরে গেলে কবাটের ছায়াগুলি
                              দেহের অমেয় গলিতে নাচে।

১৫ ফালগুন ১৪১০, ঢাকা

খ.
তোমার গভীরে ছিল অমেয় প্রবেশ পথ আমি তাই ক্রমশ
পথপরিক্রমণের রেখা এঁকে চলেছি এই প্রণয়েষু ফালগুনে;
ক্রমশ গভীরে যেতে প্রাথমিক নিয়মনীতি আনে অধিকার
পথের আহ্বান এমনই হবে—প্রথমে সেই বন্ধুর আনমনে
সাড়াশব্দহীন পথের দু’ধারে যেতে পিচ্ছিলতা, অনন্যোপায়
পাখির কূজন নেই, নিঃস্তব্ধ গভীর গিরিখাদ ডাকে ইশারায়
ক্রমশরা এত বেশি মৌনমুখর, ঝরাপাতাদের কাছে শেখা
এখানে গভীর রাত্রি অবুঝ হলে—মুছে যায় অন্তর লেখা;
‘তাহলে যাওয়ার গল্পে পথ ছাড়া আর কি থাকে না কিছু।’
এখানে পাহাড় ছিল—দূরে পোড়া হাড় আরও বেশি উঁচু,
উঁচু ওই মগ্নতা—চুড়াপ্রার্থী আকাশ মৌনতা ছড়াল যখন;
মগডালে নিরবতা—পাতার টেবিলে নেই ফালগুনের মন।
দিগন্তের পোড়ামাঠ নেই তার ধ্বংসস্তূপ, স্মৃতি ও ছায়া
এপাড় দাঁড়ালে তীরে ওপাড়ে ভেসে যায় তীরবর্তী মায়া

১৮ ফালগুন ১৪১০, ঢাকা

গ.
আজ আবার সন্ধ্যার আবছা আঁধারে আমাদের দেখা হয়ে গেল
জীবন এমনই হবে, হয়তোবা তুমি তার হাত ধরে হেঁটে যাবে
একটা অপ্রিয় পাখি একা একা গান করে চলে যাবে আরও দূর
আমি শুধু বসে থাকব যতক্ষণ আমার আসন খুব মনোরম হয়
একমাত্র চলে যাওয়া থেকে মানুষ জেনেছে তার দীর্ঘ হাহাকার
যতক্ষণ তুমি আর চলে যাচ্ছ না দূরে আমার দৃষ্টি বিপন্নপ্রায়;

জীবন এমনই হবে, হয়তোবা কখনো তাহার বুকে প্রত্যাশাহীন
আবার বকুল গাছে ফুল ফুটবে—আবার বকুল কুড়োবার দিন;
কখনো একটি পাতার জন্যে ভেঙে ফেলি প্রিয় গাছদের ডাল—
তোমার আগমনী শুনে আরও বেশি অধীনস্থ হবে এই মহাকাল
হয়তো প্রচণ্ড ঘৃণা অথবা ফাল্গুন ছাপিয়ে আসবে আমাদের প্রেম;
এমন ছলনা যদি পাই অথবা এমন গভীরতর হেম—মনোলীনা
সেইসব দুগ্ধপোষ্য শিশুর মুখের ওপর একটা গভীর চুমু দিয়ে
কিভাবে জীবন আরেক জীবনে বিছিয়ে দিয়ে তার মতো যায়;
জীবন এমনই হবে, তোমাকে না দেখা গোধূলির হঠাৎ সন্ধ্যায়।

১৮ ফালগুন ১৪১০, ঢাকা

ঘ.
আমার বাহুকে সে আলিঙ্গন করেছে তার নিজস্ব ঠোঁটে
বাতাসের ঝাপটা বুঝতে যতটা সময় নিরীক্ষণ করি
তাতেই মেলে ধরে একবার জীবনের মানে খুঁজে পেতে
এলোমেলো বুকশেলফে রেখে যাই খাতার মলাট
মলাটের ভাঁজে লেখা অনেকের নাম;
আমার মুখস্থ ছিল না ঠিকমতো
তার প্রয়োজনে একটি নাম বেছে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছে
সে—থতমত;
আমরা যেভাবে রোদ্দুরে মেলে দেই ব্যথার পোশাক
বিষাদের নিঃসঙ্গ বিরতি
হারিয়ে ফেলা নদীতীর, মনোলীনা স্মৃতি
প্রিয় রাত্রি, তোমাকেও মেলে দিয়ে কুয়াশায় লিখে রাখছি
অবলঙ প্রীতি
লিখে রাখছি ঝরাপাতা, মৃতের শহর ঘুরে জীবনের গান;

আরও যদি বলি, তাহার আঙুল ছিল আকারবিহীন
বুকের ভিতর সে মৃদুস্বরে ডেকেছিল ‘আমাকেও নিন’
তাতে আমি ভেসে গেছি নদীর পোশাকে
তাতে আমি মিশে গেছি তোমাদের বুকশেলফ, তাকে;

ফলে বইয়ের মলাটজুড়ে আমি আজ এতটা নৈঃশব্দ্য লিখেছি


চাষাড়া মোড়ে

মেঘের আর্তনাদ ছুড়ে দিলে বৃষ্টির সম্বোধন পাই
রিকশার ঘণ্টাধ্বনি বাঁক ফিরতে সহায়তা করে
যে কোনো সন্ধ্যার আগে বসিয়ে দেই খাঁ খাঁ রোদ্দুর
যে কোনো সকাল মানে শিক্ষার্থীর বগলে প্রাণপণে ইশকুল
তোমার মনের মতো কোনো কথা লেখা নেই তাতে;
আজ লিখছি ইশারা, কাল আলোড়ন
পরশু স্তব্ধতা ছড়াব দুই হাতে।
সব রোদ্দুর আকণ্ঠ জড়িয়ে ধরে—বহুদূর বেড়াতেও নেয়
আমার বাহুগুলি আত্মীয়প্রবণ
রৌদ্র-মেঘে ভাসতে ভাসতে বালুতে আছড়ে পড়ি—
বালুরা শিখেছে রোজ সমুদ্র-গর্জন;

সবচিহ্ন অজ্ঞাত পদচ্ছাপে লেখা
সব অভিজ্ঞতা নিভৃত মানুষের শান্তি পুরস্কারের মতো একা
যেমন জাদুঘরে আমি রোজ অনুপ্রবেশকারী
যেমন নির্জন দুপুরে আমি এক পতঙ্গশিকারি
গন্তব্যের শাসনে ঘেরা স্বতঃস্ফূর্ত সন্ধ্যাগুলি প্রাক-নির্ধারিত
এই রাতি এই দিন, শিশুর প্রথম গাল
তোমার প্রৌঢ়-প্রেমিকের কণ্ঠে লুপ্ত সুরের অবাক সম্ভাবনা
আমার প্রথম নামের মতো বহু-ব্যবহৃত;

যেমন চাষাড়া মোড়ের কাছে আমি রোজ একটি চিঠি
ঠিকানাবিহীন
যেমন মৃত্যুর মতো বিশ্বস্ত নয় কোনো শুভ জন্মদিন;
তোমাদের বাড়ি আমি যাই নি কখনো
        তবু স্টেশনের টিকিটগুলি বেগুনি রঙের।

ক.
আরেকবার আমাকে যেতে হবে একটি কবিতা প্রসঙ্গে।
যে-কোনো একবার যাওয়া খুব অসহ্য এবং বর্বর
আরেকবার শহরতলি হয়ে শীতলক্ষ্যার মাঝিকে বলব:
‘হে ভাই যাবে ঐ পাড়ে?’
বহুদিন আগে জলের দূরত্বে ছিলাম—ওপাড়ে যে গ্রাম
আমরা তারও চূড়ায় উঠেছিলাম
অজানা গাছটা এখনো কি আছে—সেই ছেলেমেয়েরা,
এখনো কি গান করে—তখন ঈশ্বরের বিষণ্ন অঘ্রান,
আদমজীর সব গল্প এখনো ভ্রাম্যমাণ!
এখনো বিকেলগুলি মিলে যায় সকালের কাছে,
আমাদের করমর্দন ছিল মেধাবী,
ব্যক্তিগত হৃদয়ে তাকিয়ে থাকা ছেলেটা অত্যন্ত সুবোধ;
এ-গ্রামে বসন্ত আসার আগেই কোকিলের ডাক শুরু হয়—
কোকিলকে বলেছি ‘নির্বোধ’।

চাষাড়া মোড় হয়তো বুঝে যাবে এমন অসহ্য বর্বর ক্ষত
আরেকবার আমাকে যেতে হবে একটি কবিতা প্রসঙ্গে—
একবার, মায়ের মৃত্যুদিন দেখতে যাবার মতো।

খ.
যতবার আমি তোমাকে সন্দেহ করব—যতবার
প্রথম মোড়ের ঠিকানা নেব—আমিও প্রথম বার;

সন্দেহরা সর্বদা নান্দনিক—প্রত্যহ রাস্তা পাড় হতে
একজন একজন করে ইশারা করে: ‘আয় এইদিক’
আমি তখন চতুর্দিক হয়ে যেতে যেতে
ফুটপাত থেকে একটি তরমুজের ব্যবচ্ছেদ শিখি;
বাসস্টপে দাঁড়ালে যে-যে বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে
গভীর রাত্রিতে তারা ভীষণ একাকী;
চাষাড়া মোড়ের খুব কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলে
একটি ছোট ছেলে তর্জনীতে দূরত্ব দেখিয়ে বলবে:
‘ওই যে দেখছেন না, একটু সামনে তাকান—
ওই যে দূরে একটি সিনেমাপোস্টার;
যতবার আমি তোমাকে সন্দেহ করব, যতবার
প্রথম মোড়ের ঠিকানা নেব—আমিও প্রথমবার।


মানে ভর্তি অটোগ্রাফ

পাতারা জানতে চাইল আমি বায়ুমুগ্ধ কিনা
ফড়িঙেরা বলল—‘রোদ্দুর তুই যাবি না?’

ওদের ইশকুলে পড়তে যাই সকাল সকাল
আমার পাঠ্যে থাকে পাতা-ফড়িঙের কাল

তোদের সঙ্গে যাই—তোদের কথাই লিখি;
উড়ন্ত এই ডানায় আমার কবিজন্ম প্রতীকী

মৃত বন্ধুর ঘাড়ের ওপর একটা ফড়িং নিরক্ষর
মুগ্ধতারা পাঠ্য হয় না—উড়ন্ত সব পাতাপত্তর

সোনার কাঠি রুপোর কাঠি টহলদারি দিন
মুগ্ধতারা দাঁড়িয়ে আছে—বায়োডাটাহীন;

মুগ্ধ আমি মুগ্ধ তুই—ঝগড়া করা শালিখ,
একটা অবাক ঠোঁটেই যেন অটোগ্রাফ দিক।

১১ ফালগুন ১৪১১

দুর্দান্ত সম্পর্কের খসড়া

দুর্দান্ত এক বন্ধু এসেছিল বিস্মরণের পাড়ে
দুর্দান্ত এক মুখ ভেসেছিল আয়নার ভিতরে

দুর্দান্ত এক মন্ত্র এসেছিল তোমার সম্মোহনে
দুর্দান্ত এক কবিতা লিখেছিলাম অজ্ঞাত-মনে

দুর্দান্ত এক শেকল বাঁধা থত্থুরে এই হাতে,
দুর্দান্ত একপ্রকার বিষ, চল্ খাই একসাথে…

দুর্দান্তরা আমার সম্পর্কে একপ্রকারের ‘তুই’
রৌদ্র দগ্ধ এ আঙুলে—তোদের চুড়ো ছুঁই…

২৭ ফালগুন ১৪১০

একটি বিরল ব্যাপার

তখন কস্তুরী-ঘ্রাণে আসে দু’হাজার দুই সন
আমাদের কেউ ঝর্না কেউ চূড়াপ্রার্থী মন;
গাছপালাদের ধূসর দুঃখসমেত
তোমার বাড়ি থেকে আরেকটু অজানার দিকে
একটা বিরাট স্তব্ধ ধানক্ষেত,
নুয়ে পড়ে দেখছিল নিঃশব্দতার বিরল ব্যাপার

তোমার গল্প করে একখণ্ড মেঘের মতো
সরল বৃষ্টিপাত কেনার আগে
তাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরি ছিল রুটি অথবা গরমভাত
তারা জানত—তোমার গল্পের ক্ষেত্রে আমি এক দুর্বল চরিত্র
ক্রমশ নুয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করি: ‘তারপর…?’

এমন গল্পের পরে পৃথিবীতে চিরকাল সন্ধ্যা নেমে আসে
কাহিনি অসমাপ্ত রেখে বাড়ি ফেরে ডোরাকাটা প্রেম,
আবারও সম্ভাব্য দিন ধার্য করি;

এই হচ্ছে পদ্মার পাড়ে জ্যোৎস্নাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
তৃতীয় জন জানতে চাইল—‘এর মধ্যে ভাঙন কোথায়,
কোথায়ই-বা পদ্মার পাড়?’
আমি শুধু টের পাই, নিঃশব্দতা একটা বিরল ব্যাপার।

৬ মাঘ ১৪১১

অনেকক্ষণ মৃত্যু

‘অনেকক্ষণ মৃত্যু আমার ভালো লাগবে না’—বলল সে
তারপর পৃথিবীর তারপরে অধীর এক নীরবতা এসে
তাহাদের দু’জনের মাঝখানে একটা বিস্ময়চিহ্ন এঁকে
চলে গেল, কেউ কোনো কথা বলল না এই দৃশ্য দেখে
নিজের মুখের দিকে একবার, চলে যাবার মুখের দিকে
একবার, একটা পাতা ঝরে পড়ার পর এই মুহূর্তটিকে
‘আমরা কেউ আর মনে রাখছি না’ বলে মিলিত দু’জন
মুছে দিল ব্যক্তিগত ব্লাকবোর্ড, মুছে দিল প্রিয়তম মন;
নেই সে কোথাও আর—সন্দেহে, অবকাশে সম্ভাবনায়
তবু কেন মনে পড়ে ঝরাপাতা, চৈত্র-নিবিড় সন্ধ্যায়;
আমার ভিতরে রচিত হও একটি বিরাট বর্ণনার দিন—
আরও ভিতরে এসে বলো, ‘ভালো লাগে, শুভেচ্ছা নিন’
তখন আবার তোমাদের কথা একবার মনে পড়ে যায়,
আমার সমস্তদিন ধানের ছড়ার মতো দোলে, দোল খায়


সব সম্পর্কই

সব সম্পর্কই ছাদের উপরে কর্তব্যরত ওই তরুণীর মতো
খুব সকাল-সকাল ক্লিপ দিয়ে বেঁধে দিচ্ছে রোদ, সম্ভবত
রাতের কোলাহল শেষে শিশুর চাঁদর, ঘাম, মায়ের স্তনে
লেগে থাকা পিতার ঠোঁটের লালা নিকোটিনের কটু ঘ্রাণে
এই সম্পর্ক তৈরি হয় ভেঙে যায় আবার সম্পর্ক শুরু হয়,
এইভাবে ধূমপান করি তুমি তার পাশে বসো প্রবল ঘৃণায়
এইভাবে তোমার সঙ্গে আমার এই সম্পর্ক এই এই কাজ
এইভাবে রোদের সম্পর্কের ভিতর হঠাৎ মেঘের আওয়াজ
অথবা একটি স্নিগ্ধ দিন কিভাবে কিভাবে যেন প্রতীক্ষায়;
মেঘমল্লার বুকে নীরবতা থেকে দূরে যায় দূরে চলে যায়
প্রেমে ও প্রতাপে জিহ্বার লালায় চুমু খাই, আগলে রাখি;
বাজাও তো বাজে ওড়াও তো ওড়ে পোড়ালে পুড়তে থাকি
দারুণ দোকানগুলি সন্ধ্যায় যথারীতি ভয়ে ভয়ে খোলে—
যন্ত্রণা বেশি হলে বিপ্লবীও বসে যায় কোনার টেবিলে!

83841994_535809860358104_454112772016308224_n


সাধারণ কবিতা

আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
        এ ধরনের কবিতায়
                     শব্দের ওপর শব্দ উঠে খেলা করতে পারে না
                                যেমন মানুষের ওপর মানুষ উঠছে।

আমি খুব সাধারণ কবিতা লিখি
এ ধরনের কবিতায়
        একটিও গাছের পাতা নড়ে না,
                     ওরা সবাই ঝাঁকি মেরে
                                   গাছগুলোকে পাতাশূন্য করে দিচ্ছে
                                                 ঝাঁকচিত্রের দায় এড়াতে এড়াতে
                                                               বাংলা কবিতা যায়;

তখন সকাল,
বারান্দায় বসে চায়ে ভিজিয়ে টোস্ট খাচ্ছি
        এরপর কঠিন কবিতার গায়
                        একবার গুলতি মেরে দেখব
                                    আগামীকাল কিভাবে নুইয়ে পড়ছে
                                                দৈনিক অধীনস্থতায়।

আর একজন সহজবালিকা এলে
        হাতভর্তি সাধারণ কবিতা নিয়ে
                         দাঁড়াব রোজ ফাল্গুন সন্ধ্যায়
                                     মাটির পিরিচে।

১৯ নভেম্বর, ২০০১ ঢাকা

আবশ্যক

হেই শীত এবং কাল, তোমাদের নামগুলি পাল্টানো দরকার
একই নামের নিচে মুদ্রিত হচ্ছে আমার ভিন্ন ভিন্ন কবিতা।
একই লেপের নিচে কাটাচ্ছি শীত, আদ্রে জিঁদ, মনরো-সকাল

ব্লাকবোর্ডগুলি যথেষ্ট আধুনিক এমন মননশীল, একই অঙ্ক
বার বার মুছে ফেলা যায়।
নাম পরিবর্তনের নামে আমি কতিপয় বেদনা মুছে ফেলব;
একটা নাম একটা ডাস্টার,
আমাদের স্কুলে এতদিন পড়াচ্ছিলেন অঙ্কের অতুল মাস্টার

গতকাল যাদের হাত ধরে হেঁটেছি, আজও তাদের হাত ধরে
থাকতে হবে এমন কথা নেই, বরং উন্নত সম্পর্ক হোক;
উন্নত সম্পর্কের মধ্যে ভুলে যাবার বেদনা থাকে। যে কোনো
যাওয়ার মানে পরিবর্তন। পরিবর্তনে ব্যথা ও ব্যান্ডেজ জড়িত;

নতুন নামের হাসপাতালগুলিতে বেদনায় সুচিকিৎসা হোক—
চিকিৎসকেরা ভালো সমালোচক;
এই বসন্তে আবার বিজ্ঞাপন দেব—একটি নাম আবশ্যক।

৩ জুলাই ২০০৩

গত শুক্রবারের ঘটনা

                       চাঁদ ডোবে নাই।
বাতাস বইছিল না মৃদুমন্দ
রাস্তায় দাঁড়ায়নি চমক
বৃষ্টি হবে হবে এমন সম্ভাবনাও ছিল না
আচমকা পেছন থেকে চোখ চেপে
বলে নাই কেউ: ‘বলো তো কে?’

ভোর ছিল সাধারণ
দরজায় টোকা দিয়ে চলে গেছে সে,
একথাও মনে করা যাবে না এখন।
এমনকি তোমার জন্য
বুকের বাইরে বসেনি রঙের নীল দোকান,
আমি যখন এসব কথা লিখছিলাম
                       ইতিহাসের শাদা পৃষ্ঠায়
তখন একটা চুল উড়ে আসল লেখার খাতায়;
যেমন লিখি ফড়িঙের ওড়া
লোকে বলে ‘আর কোনো বিষয় পেল না।’
লিখছিলাম একজোড়া হাত নিয়ে
তারা বলল, ‘মানুষ কোথায়!’

তো এইভাবে লিখতে লিখতে
খাতার ওপর একটা চুল
এইভাবে লিখতে লিখতে
এড়িয়ে যাওয়া গোপনেষু ভুল—
লেখাটি মুদ্রিত হলো গত শুক্রবার,

চুলটি বাদ দিলেন দৈনিকের গাঢ় সম্পাদক।

ডিসেম্বর ২০০৮

জানালা

জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়
আকাশ একটি ধারণা

জানালা দিয়ে হাওয়াও দেখা যায়
হাওয়ার সঙ্গে পারো না

জানালা দিয়ে তোমায় দেখা যায়;
ভিতর থেকে যায় না

জানালা দিয়ে কিছুই দেখা যায় না
বাইরে যখন থাকো না!

২১.০৮.০৮

ক্রমশ

ক্রমশ ম্লান হয় তোমার পৃথিবীর রঙ
তোমার চোখের গাঢ় কালো আশ্বাস

ফুটপাতের করুণ দোকানির চোখে
যে সব অপেক্ষা থাকে, সেই শিহরন
নিয়ে ক্রমশ প্রিয় গাছদের পাতায়
ঝরছে শিশির-মেঘদের সাদা মন;

এই তো একটি শিশু আঁকল পৃথিবী
এই তো সে বসল পৃথিবীর কোলে
এই তো শিশুটি কাঁদছে একা একা;
এই তো শিশুর মা কাঁদতে এসেছে

তবুও দোকানি ভাবে আবার হবে
তাই সে ভুলে যায় মন্দাভাস দিন—
তবুও সে মন খুলে বসায় রোদ্দুর;
সাপুড়ে ছোবল নিয়ে বাজাচ্ছে বীণ,

এই তো একটি শিশু আঁকল পৃথিবী
এই তো সে বসল পৃথিবীর কোলে
এই তো শিশুটি কাঁদছে একা একা;
এই তো শিশুর মা কাঁদতে এসেছে।

অক্টোবর, ২০০৮

পাড়াগামী ট্রেন

আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়া চলে যাচ্ছে ট্রেন
আমার বন্ধুরা বসে কবিতা-টবিতা লিখছে আর
শাহবাগে এসে বিড়ি খাচ্ছে, দুধ-চা খাচ্ছে এবং
চানাচুর মুড়ি খাচ্ছে—বিজু বাজাচ্ছে বিঠোভেন।

ঢাকায় তখন বাতাস হচ্ছে—বাতাস হলে যা হয়;
গ্রামে তখন ধর্ষণ হচ্ছে, গাছ থেকে পাতা পড়ছে
জল স্থির জলের কাগজে—ঢেউ নাইপল নাইপল
চুলে দিচ্ছি মিন্দি আর শিশ্নে আঙুল অনুভূতিময়।

আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়া চলে যাচ্ছে ট্রেন
পার-কবিতা যদি তিনশো টাকা হয় তবে আরও
একটা বিকেল ঝুলবে লনে—একটি মেয়ে গ্রামে,
মেয়ের ভিতর ট্রেনের ভিতর কবিতা ও-ম্যান;

পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি—যেভাবে বাতাস এড়িয়ে
এই পঙ্‌ক্তি ছাড়িয়ে একটার পর একটা কবিতা
লিখব বলে, দুশো টাকা আর দুশো টাকার কথা
এড়িয়ে যাচ্ছি, এড়িয়ে যাচ্ছি বকশিস ছাড়িয়ে।

কাশবন দুলছে বাঁশবন দুলছে, ট্রেন যাচ্ছে ট্রেন
ধুলো উড়ছে ধূলি উড়ছে, উড়ে যাচ্ছে অন্তরঙ্গ চুল
অন্ধকারে ভালো লাগছে যথাসম্ভব যাত্রীবাহী ভুল
আমার ট্রেনে সহযাত্রী সবাই কিন্তু ফার্স্টক্লাস ব্রেণ।

ডিসেম্বর, ২০০৩

সতর্কতা

কেবলমাত্র বাহ্যিক ব্যবহারে আমি তার শুশ্রূষা নিতে যেয়ে
                                   ঠান্ডা ও বিশুষ্ক স্থান
শিশু ও সরলতার বাইরে চলে যাই, বোতলে রক্ষিত সুধা
                                   নাগালে এই হাত খান।

যা লিখি তা ব্যান্ডেজজড়িত,
                      আমার বকুলবনে একজন শাদা নার্স
                                   বেদনা তুলতে যেয়ে ব্যথায় মরিত;

যেমন শুশ্রূষার প্রতিশব্দে আর্দ্র-লাল তুলো
যেমন ব্যান্ডেজের গভীরে চাপা অসামান্য ভুলও
আর ওই দিগন্তের কাছে অথবার নিচে যত শব্দ অথবায় চাপ পড়ে
                                               তাহাদের নিচে;
এই মর্মে প্রেম, আলজিভে বোবাশব্দ
যখন আমি মাটির পিরিচে
স্যাভলন, তুলো এবং একটা ফুটফুটে চাকু—বেদনানিধন
যা লিখেছি প্রতিশব্দে, তারও নিচে চাপা পড়ে পৃথিবীর মন।

৪ অক্টোবর ২০০৩

টোল

বড় রাস্তায় ঠ্যাক দিয়া টোল খাইতেছে সরকার
ছোট রাস্তার মোড়ে ঠ্যাক দিচ্ছে ছিঁচকে মাস্তান
দেশের ভিতরে দেশ ঠ্যাকাইয়া টোল খাচ্ছে
                                               দেশসংঘ,
অঙ্গের ভিতর অঙ্গ ঠ্যাকাইয়া ঠোল খাচ্ছে কে?

মার্চ, ২০০০

ডাস্টার

কেবল এই রাত্রি জেগে থাকবে
আর এই রাতের নৈঃশব্দ্য এবং
মনে হবে পাশেই তো শুয়ে আছে
সে। নিঘুর্ম রাত্রির পাশে অন্ধকার
লিখে রাখা ব্লাকবোর্ডের মতন—
খুব বেশি অসহায়, অপ্রয়োজনীয়;
ডাস্টার দিয়ে মুছে দিতে দিতে
যেমন রাত্রির পিঠে জেগেছিল ভোর,
আবার ভোর মুছতে জাগল দুপুর
দুপুরকে মুছে দিতে এসেছে বিকেল
আবার বিকেল মুছতে তুমি গোধূলি,
যেমন আমাকেও মুছে দিতে এসেছ
সময় তুমি বালকের হাতে ডাস্টার!


যৌথ একাকিত্ব

রাত্রি লিখে তার পাশে বসাও তোমাকে—
একা, এবং নিঃসঙ্গ গোধূলি লিখে বসাও
তোমার পাশে প্রিয়তম ছায়া, যৌথনির্মাণ;
যে কোনো নির্মাণের পাশে যদি লেখ নাম
নাম বানানের ভুল এসে পড়ে দেবে কেউ
তখন তোমার এত বেশি অসহায় বোধ;
তখন তোমার এত বেশি আঁধার আঁধার
সম্পর্ক, তখন তোমার যাবতীয় সম্পর্কের
অসহিষ্ণু ক্রোধ, বিকশিত হবে রাত্রিতে;
যখন তোমার পাশে দেশলাই, মোমবাতি
যখন তোমার পাশে আর আলো নেই…

১১.০১.০৮ শেষরাত্র

মৃত্যু

ধরো, আজ তুমি বন্ধ করেছ তোমাকে
ঘরে নেই, বাইরে নেই, এমনকি ওই
দূরের সাইনবোর্ডেও পাওয়া যাচ্ছে না
কেবল তোমাকে। কেউ এসে খুঁজছে
আবার কেউ খুঁজছে না বলে তোমার
অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ছায়া;
তোমার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে
প্রিয় বন্ধুর মুখ—চায়ের টেবিল;
কাগজের শাদা শাদা নির্ভুল রঙপেন্সিল
ধরো, আজ তুমি বন্ধ করেছ তোমাকে

১১.০১.০৮ সকাল

কুয়াশার আড্ডায়

(মহানন্দা নদীর পাড়ে কুয়াশার আড্ডায় যত মুখ)

এই সন্ধ্যা জানবে, মহানন্দা নদী আর
নদীর পাড় ধরে সন্ধ্যাগাছের পাতারা চুরমার
নদীতে জলের ভেঙে যাওয়া মন
সুদূর পাখিটির একলা গলার গান;

আমরা গিয়েছিলাম—একথা কুয়াশা জানবে।

কুয়াশার আড্ডায় বসে পড়া নীলকণ্ঠ’র মুখ
সংবর্ধনা সন্ধ্যায় চায়ের কাপে একটা পিঁপড়ার
                                               হৃদয় উন্মুখ

একটা লাল পিঁপড়ে কামড়ে দিল ঠোঁট
হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটা গ্রীবার কাছে বলল: ‘ওঠ’
উঠে যেতে যেতে মনে পড়ল ঢেউ,
উঠে যেতে যেতে হাজার বছর আগে
                                   ফেলে আসা বাঁক
বাতাসের কাঁধ ছুঁয়ে সমাগত সন্ধ্যারা বলল:
                      ‘চলে যাবি, রাত্রিতে থাক?’
থেকে যেতে যেতে চলে গেছি দূর
থেকে যেতে যেতে একটা মুগ্ধ দুপুর
কুয়াশার আড্ডায় বসে যত মুখ লেখা
রাতের টেবিলে তারা একা, সমূহ একা!

২০ জুলাই ২০০৮, ঢাকা

বর্গা ইতিহাস

আমার পিতার হাতে ঠাকুরদের মাঠটি অনূদিত হয়েছে
একুশ বছর; সেই মাঠ এখন মিলুদের দখলে।
পিতার বয়স এখন ষাট
হাতে সাদা কাগজের পৃষ্ঠাগুলির বয়স পনের
তোমরা খুলে দেখলে বইয়ের মলাট
পিতার ভাষা ছিল লাঙলে, তোমরা তা পাঠ করলে
আমন ধানের বোলে
আমার ভাষা ছিল কলমের নিবে, তোমরা তা
অনুবাদ করলে কবিতায়,

সেদিন বিকেলে
পিতার কাঁধ থেকে জোয়াল পড়ে যায়
মায়ের চোখে জলের নিস্তরঙ্গ সম্বোধন;
মধ্যস্বত্তভোগীরা খুলে দেয় পাল—বিশ্ববিদ্যালয়;
সে-রাতে আমার কলম আর পিতার লাঙল খোয়া যায়
আমি এখন অভিধান জুড়ে কতগুলি শব্দ খুঁজে ফিরি
পিতা এখন আকাশে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকেন;
আমার এখন অভিধান লাগে!
খোলা অভিধানে চোখ রাখতেই পিতার মুখ পাঠ করি
জানালায় বৃষ্টির ঝাপটা এসে পৃষ্ঠাগুলো ভিজিয়ে দিয়ে যায়;
মায়ের চোখ মনে পড়ে
আমার কবিতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়

গাড়ির চাকা চলছে
মানুষ বাড়ছে, দালান উড়ছে
মানুষীরা আকাশ ছোঁবে, মানুষেরা ছোঁবে মেঘ;
পিতার জোড়াহাত জানে এসবের ইতিহাস
মায়ের চোখ জানে ইতিহাস গড়িয়ে পড়া জল
         অভিধান এর কিছুই জানে না।


পা

আমার পায়ের নিচে কত মৃত পা
মৃত পায়ে কত কত শিরদাঁড়া;
তবু কোথাও দাঁড়াতে পারি না।
তিল তিল বেড়ে ওঠে পিঁপড়েরা
পায়ের ভিতর বাড়ে পথ, ক্লান্ত পথিকেরা
প্রান্তরে প্রান্তরে লিখি পায়ের যন্ত্রণা