হোম কবিতা জোছনা ক্যারাভান

জোছনা ক্যারাভান

জোছনা ক্যারাভান
792
0

১.

ভর জোছনায় মানুষ ঠিক কি খোঁজে? একলা নিরালা জলধি, ভগ্নপ্রেম, কব্জিতে বুজেআসা ব্লেডেলেখা নাম; নাকি স্রেফ স্নান? কেনই বা বলি জোছনাবিলাস? ফিনকি? ক্যারাভান?

বলা যেতে পারে- ভারি পূর্ণিমা নিজেই একটা জলাধার। তাই জোর প্রস্তুতি প্রয়োজন। দেখা গ্যালো গুলুইয়ে বসে উঁকি দিলেন ওমনি নদীতে টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে উঠল অন্য একটি মুখ! হতে পারে এই সেই মেয়ে যে পুকুরে ঢিল ছোড়ার মতো কৈশরে ছুড়ে দিয়েছিল উড়ন্ত চুমু। হতে পারে মুখটা নিজেরই; ঝড়বিধ্বস্ত, নিরাশ, কাঠিনতার আড়ে অপ্রাপ্তিতে হতোদ্যম।

ভেতরে বাইরে এতো জোছনা, তবু এতো আলোহীন জীবন! মলিনতা-বিস্মৃতি ধুয়ে বেরিয়ে আসতে পারে গোপন মারী, আত্মার একাকিত্ব। সেই ছোঁবলে গলে যেতে পারে সালমাজরির কাজ, অস্থি-মজ্জা-শরীর। তখন জোছনামাতাল হয়ে আপনাকে কাঁদতে হবে আগামী কালোপক্ষ পর্যন্ত…

২.
মানুষ তো সাইকেল ঠেলে আগুনও দেখতে যায়। দেখতে যায় বন্যা, মারী, অত্যাশ্চর্যফুল। হুহু রাত ও ফাঁকা রাস্তা মাড়িয়ে পৌঁছায় আরও হুহু নির্জনে। একলা কী ভাবে তখন? অতীত ঈগল, যবের ছরার পরে’ তুমুল স্ফটিক?

বস্তুতঃপক্ষে নিজের ভেতরে একলা ও ভয়ঙ্কর নির্জনকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে সে। সেইসাথে জোছনা-পুলক। যেমন: সাইকেল ঠেলে আগুন দেখতে গিয়ে মানুষ পোড়া গেরস্তের আর্তনাদে হতচকিত হয়ে পড়ে, নিজেকে ভাবে সৌভাগ্যবান; জলভাসীর কান্নায় কাঁদে, উঁকি দেয় জ্বালামুখে, জলে খোঁজে নিজেরই আবক্ষমূর্তি; বিপদে দুদ্দাড় চালায় কাঠের পা।

কতদূর যেতে পারে ধুলো? কতদূর ধূলিধূসর? কে ঈর্ষাকে বাঁচিয়ে রাখে—নির্জন প্রেম, হুহু দ্রোহ নাকি টলটলে জ্বলন্ত বিহবলতা?

বিহ্বলতা—খরা, বন্যা, মারী ছাড়িয়ে এক অত্যাশ্চার্য ফুল । মানুষ-ই তার খড়িওঠা চিবুকে একমাত্র মালি…

৩.
হাইওয়ের পানে এগুতে এগুতে বৃষ্টিবৃষ্টি ঝিলিক, প্রিয় ভ্রম। আমরা ঢুকে পড়লাম একটা শুষ্ক লেকের মর্ম অভ্যন্তরে। উবে গেছে কান্না, তবু তাদের তরে কেঁদে চলেছেন আদম। মানুষ এতোদিন কোথায় ছিলে তুমি? কোনো গূঢ় রহস্য? হয়তো ১০টা বিশ্বযুদ্ধ অথবা কোনো এক সূক্ষ মেলাঙ্কলি!

আচানক গান, আসো এবং আমাতে আঁকো অগ্নি-উল্কি, আমাকে দেখাও একটা সিক্ত অথচ খালি-চিবুকের ঝলকানি

আমি অন্ধ। জ্বলন্ত চিকচিকে চিবুকে অন্ধরাই সবচাইতে ভালো নাবিক

৪.
জোছনার কোনো শেকড় থাকে না।
শেকড় পুড়ে যায়। অদৃশ্য মায়াবীনীল ছাই, পোড়াঘর পিঠে করে পাড়ি দেয় মানুষ।

নাফ আগুনে জোছনার নদী, তদোপরী পিঠে চেপে বসা ঘরটাও আঙ্গার। উটপ্রধান অঞ্চল থেকে তেল আসছে, তা-ই দিয়ে নেভানো হবে আগুন। হিন্দু-সাঁতালের ওপর শাদা-আগুনের কথাও আমাদের জানা। তেমনটা লিখে চিরবরফের দেশে পাড়ি জমালেন হুমায়ূন আজাদ।

জোছনা ও রোহিঙ্গার কোনো দেশ নাই, ওদের স্বপ্নের ভেতর শুধু সার-সার শাদাতাঁবুর মতো থান পরে মা কাঁদে, মা নঞ-মানুষ, দেশের ভেতরে দেশহীন।
মা, আকাশ তোমার ছেলে, আকাশ তোমার শেকড়সন্তান- ও কখনও তোমাকে ঘর থেকে বের করে দেবে না

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান