হোম কবিতা জলচক্র এখানে শেষ

জলচক্র এখানে শেষ

জলচক্র এখানে শেষ
111
0

আরশের ছায়াপাতে চমকায় জল
ধুতে এসে দেখি মুখ, নদীটা গরল,
কার হাতে পাতা এই ভাসানের রাত
হাওয়াই পশমে বোনা মেঘের মহল।
সময়ের বলিরেখা মুছে দেয় নদী
জলছায়া ধরে রাখে স্মৃতিধর জল,
মাকড়জালের মতো বাতাসের সুতা
পানির পাতায় বোনে গুঞ্জরিত ছবি।
ঝিরঝির কয়লাগুঁড়া থতমত রাতে
স্রোতের বালিকা এসে ছোঁয় মরা হাত,
শববাহী ঢেউ গোনে লাশ আর লাশ
ঢেকে যায় লঞ্চঘাট কুয়াশার ভাপে।
ক্ষত খুলে ফুটে আছে কানকোর ফুল
শোকবস্তু কোলে নিশি জাগো গো রসুল।

২.
কৃষির আদরে মাটি ছাড়ে মিহি কষ
কলঙ্ক লাঘব করা জলধর্ম জানি,
নদীর চিতল পেটে তপ্ত গাল পেতে
মরিচা কিভাবে মোছে কেন যে শিখি নি!
এসব কথাও আমি একেলা শোনাই:
কষ্টভোগের শয়ন আর না যে সয়
বুকের কলস মোর ভ’রে দে রে সাঁই,
রক্ত নিরবধি বয়, নিদয়া সহায়!
সকল জাতির এক দুঃখী মুখ থাকে,
পাথরে খোদাই মন রেখে যায় দাগ—
উদরে ঘৃণার দলা বয় কোন নারী?
কচ্ছপ খামচে রাখে নখে মরা কাঠ।
নিকট দূরত্বে তুমি আমাকে ঘনালে,
অগ্নিগ্রহ নীল লাগে দূরে চলে গেলে।

৩.
এসব ভেবেছি আর অপেক্ষা করেছি
জলশয্যা থেকে উঠে দাঁড়াবে সারস,
চরের কিনার ধরে দিগন্ত উজায়ে
রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে কালপুরুষ।
সুবহে সাদিকে তার নভো প্রদক্ষিণ
শুকতারার পাশ ঘুরে স্থির হবে পুবে,
খুঁজতে খুঁজতে সেই তীরের নিশানা
বায়ুমহলের তলে আমাকেই পাবে।
পাখি শিকারি চেনে না, আমাকেও কেউ
ফাঁসুড়ে রহস্যকথা করে নি মোচন;
নদীর উরাতে তবু ভুতের তিয়াসা
মাছেদের মতো ঘুমে দূরের গ্রামেরা
আলোর করাত কাটে জলঘোলা স্মৃতি
ব্যথা জাগরূক শুধু বোবা প্রশ্নক্ষতে।

৪.
ভাগ্যরেখা ছিঁড়ে ফেলা এই বিধাতার
সংকেত উড়িয়ে চলে লোহার জাহাজ,
কফ ওঠা হাবাগোবা ছায়ার স্টিমার
পুরাকালের ইঞ্জিন বুকেতে আমার—
ধোঁয়ামেঘে ছদ্মবেশে চলছি পাড় ঘেঁষে।
সুন্দরবনের খালে ডুবেছি বহুত
মেঘনার ঘূর্ণিপাকে উঠছিমাত্র ভেসে।
বাতাসের দাঁত কাটে রেশমের গাল
বাঙালা সাগর জুড়ে জোয়ারের টান,
তটস্থ তারার চোখে তেতে ওঠে রাত
ইশারাপতনে কার দিগন্ত ছারখার।
দাউ দাউ ছলাচ্ছল মেঘ টলমল
ধুতে এসে দেখি মুখ নদীটা গরল।

৫.
স্মৃতিবাষ্প ছাড়া নাই আর কেউ
একক নদীতে ওঠে বহুস্বরা ঢেউ।
মায়ের আঁচল ধরা বালকের মতো
ঐশী রজ্জু ধরে আছে নক্ষত্রের পাড়া।
আশ্বিনী ঝড়ের টানে গরজিত স্রোতে
বালির পিপাসা নিয়ে ছোটে দুলদুল;
খুরের ছটায় তার বিজলী ঝলক
আসমানি কবিতার গুমগুম স্লোক।
শেষরাতে মোহনায় ডুকরে ওঠে নদী
আকাশের ঝাঁঝরির শত ছিদ্র গ’লে
রাশি রাশি নীল নীল সুতাশঙ্খ সাপ
রশ্মিফলা হয়ে বেঁধে প্রলয়ের জলে।
‘সুতাশঙ্খ সুতাশঙ্খ, শাঁখের আওয়াজ!
কুমারের আয়ু কিসে বলো দেখি আজ?’

৬.
দাগ দিয়ে রাখা গাছ কাটা হবে জেনে
প্রতি পলে চালাতেছে শাখার প্রসার—
আমিও কি ফিরব না আদি সরোবরে
ফাটাব না হাতবোমা মৌচাকে-মার্কেটে?
ভোরের আগেই কিছু ঘটে যাবে জানি;
দোজখ উপচে যাবে এ নদীর জল
ভরে দেবে বিশ্বময় সব ব্ল্যাকহোল।
আবার আসবে ফিরে আমার সময়
আদিতম ঘরামির স্মৃতি জোড়া দিয়ে
জলভরা নভোকূপে বসে বোবা ধ্যানে
তমোহা পাথর বুকে জড়িয়ে সন্তান
আবার বানাব আমি নতুন মানুষ,
মায়া পৃথিবীর শেষ পলিটুকু ছেনে।।

(111)

Latest posts by ফারুক ওয়াসিফ (see all)