হোম কবিতা গ্রাম বজ্রযোগিনী

গ্রাম বজ্রযোগিনী

গ্রাম বজ্রযোগিনী
225
0

জিজ্ঞাসার বিপরীতে বিকৃত আস্ফালনের মুখোমুখি হই প্রতিদিন,
আমরা জেনেছি—গোলকজুড়ে বিকলাঙ্গতার সমাবেশ, প্রলাপ অপলাপের নিড়ানি
বর্বর-পুরাণ সমাচার;
                    তবুও নাড়ির টান, যাদুকাটা নদীর স্রোত এই হাড়ের ভেতর
লাউড়ের গড় থেকে বজ্রযোগিনীর ভাষায় কবি সঞ্জয় বলেন—কুরু-পাণ্ডব কথা;

আমার আমিতে নির্জনে যে আনন্দআশ্রম—এ আমার গ্রাম
সুরুজের আলো হেলে পড়ে নিস্তরঙ্গ দেহের উঠোনে,
পালক উল্লাসে পাখিদের সমবায়, মাটি, ইকড় কিংবা
ছইয়ের আশ্রয়ে শান্ত নিরন্তর,
আরও কত প্রার্থনার প্রেমে আমার আমি;

বঙ্গআলেই পথ, গাছ-গাছালির সারি—সুপারি, কলা আর নারকেল বাগান;
দূরে কোথাও তালগাছ একা একা
বর্ষায় নৌকা ভিড়ে ঘরের হিথানে, শীতের মাঠে দোল খায় হলুদ বাতাস
উড়ে প্রার্থনার ধুন, ওখানে বৃষ্টির ধ্বনিতরঙ্গে কথা হয়,
মর্মর পাতার ছন্দে নেচে ওঠে লোকদল, আবার ভাদ্রের তপ্ত হাওয়ায়
হিংসুটে, নবান্নের কুয়াশায় কেমন নিবিড় পরস্পর আলিঙ্গন
কুপির আলোয় কলকল ঢেউয়ের সুরে পুথিপাঠ, ভাব বিনিময়;

এই সে গণ্ডগ্রাম দয়ালের পিরিতি ফাঁদে গাঁথে মালা রাই বিনোদিনী
মুরলী বাজে সখা, মাশুক প্রেমে আশুক পালা, গীত কালু চম্পাবতী
বাজে পাখোয়াজে ষড়গোস্বামীর নাম, প্রতি ঘরে জোনাকজ্বলা বাতি
দিঘির জলে শাপলাফুলে ফড়িং নাচে, ত্রিকোণ হিংগারফুল পাখি হয়ে উড়ে
কলসিকাঁখে এলে কোনো নারী
উতল যমুনা জলে মুরারির ছায়া, প্রেমের পার্বণে লখিন্দর বেহুলা সতী;

ব্রহ্মজ্ঞানের বাঁশি, শীলভদ্র, হিউ এন সাং-এর দীক্ষা আদি বিদ্যাপীঠে
শিষ্য হলেন রাজাধিরাজ, রাজ্যদেউল ছেড়ে মোহমুক্তির নির্বাণ,
কুরু, পাঞ্চাল, গান্ধার, কম্বোজ, অবন্তীর মিলন হয় রাইশস্যের মাঠে
সজনেডাঁটার মতো শ্রমের আঙুলে দোল খায় দোয়েলের গান;

এই তো অতীশ গ্রামে, তক্ষবিন্দু সিন্ধু ও কারবালা পরান খাঁচায় ধরে রাখি
বুনো উদাসীনতায় ইন্দুরের কুটকাট, বেদখলে ভূমি কুতকুত ক্ষমতার সন্ধিপাঠ
লুণ্ঠিত গ্রামে চেহারা বদলে যায়, পথে পথ নেই, বিল-ঝিলে নতুন জল,
কঙ্কালে পলি মেখে করোটি জয়, জরাগ্রন্ত শিরোভূষণ
শাস্ত্রসংহিতার বদল পাঠ, অধিভাষিক জামা গায়ে দলে দলে উন্দিত, পরাজয়;
এখানেই মন্বন্তর মারী, পলে পলে জরা মৃত্যু রক্ষকুলের বিকার
ভিনঠোঁটের ঠোক্করে বিক্ষত চড়ুই আর মাছরাঙার রঙিন পালক।

…এ যেন আমার জন্মগ্রাম নয়; প্রাগৈতিহাসিক আশার ছলনায় ধ্বংসস্তূপে
তাড়িত অপমানে চীবরগুণ ছেড়ে দিয়েও কাঁটাবিদ্ধ বেহায়া পায়ে, সন্ত্রস্ত
কখনও ধড়হীন কখনও মাথাহীন অস্তিত্বে ফিরে যাই গ্রামে নিশ্চল নিশ্চুপ—

ভাসান সুরে খুঁজে ফিরি মুর্শিদের জন্মভিটা, ধ্যানী রাখালের পদচিহ্ন
চিলকা খাড়ির ভেতর আম্রপালীর প্রেমপত্র, উর্বশীর নাচের মুদ্রা
উগারে খোদিত, ধানদূর্বার গুচ্ছমন্ত্র; বাউলগলায় হরপ্পা-রুদ্রাক্ষের মালা;

ধাতবশব্দে শোনা যায় ভালোবাসার নগর কীর্তন, তেভাগার দ্রোহ
কেউ মানুক আর না-মানুক, সে-তো স্বর্গজন্মভূমি
ঈশ্বরী পাটনির ঘাট ত্রিবেণীসঙ্গম;

জানকীর লাঙলের ফলার মতো আলপথে এখানেই থামি দণ্ডপ্রহর
                                                        জন্মান্তরপ্রেমে ধান্যজননী
সাকিন আমার—মাতৃস্তনের গ্রাম বজ্রযোগিনী।

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com

Latest posts by স্বপন নাথ (see all)