হোম কবিতা আমার চেতনা চৈতন্য ক’রে দে মা চৈতন্যময়ী

আমার চেতনা চৈতন্য ক’রে দে মা চৈতন্যময়ী

আমার চেতনা চৈতন্য ক’রে দে মা চৈতন্যময়ী
456
0

ভাঙন
❑❑

ভয়াল নদীর তীরে ঘরবাড়ি ছিল
নদীপথে ভেসে এসেছিল
একটি শরীর
কথা বলে যেত সে,
দমফুরোবার আগে বলে যেত,
বেলা ফুরোনোর কথা;
রোপণের দিন আর বপনের দিন ঘুরে গেলে
একদিন গল্পের উঠোন ফুরোবে অতর্কিত
এমনটাও বলেছিল সে
তার চুলে সুগন্ধি তেল ছিল,
ভ্রুভঙ্গিমায় ভেসে উঠেছিল চাঁদ!
ভয়াল নদীর তীরে বাসা ছিল
ফুলে উঠেছিল শ্রাবণের জল
ধারা বেয়ে এসেছিল কে
আজ তার ঋজুময়ী শরীরের গান
ভেঙে পড়ে গ্যাছে
আজ ভেসে গ্যাছে মুকুট, গহনা, কেশবন…
ঘরের দেওয়ালে আজ খেলা করে
চাঁদ ও রাক্ষস!
গলে পড়ে অবয়ব
এই দেহ, ঘর, এই সংসার,
যাপনের বায়ান্নো স্বাদ,
এই মাঠ,  ময়দান
এই স্নান, চুম্মাচাটি,
আকুতি আকুল, সব…
ভয়াল নদীর তীরে ঘর ছিল, গাছ ও আম্মা…
আজ ভয়, অশ্রু ও স্মৃতির আনন্দ সব
ভেঙে পড়ে গেছে
যেভাবে পাড় ভাঙে রোজ

ভয়াল নদীর জলে মানুষেরা
খসে পড়ে যায়


জুলাই মাসের শেষের একটি ভোর
❑❑

ঘুমের ভিতরে রঙ রুনঝুন হয়ে ওঠে
বাহিরে একাকী ভোর
জানালার কাচে উঁকি দিয়ে যায়
টাওয়ারের ফাঁকে সে আটকে রয়েছে
আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে আজ
পানি নয়, জানালায় ঝ’রে যাবে
অবদমনের রঙ,
ঘোলাটে বাষ্প হয়ে টোকা দিয়ে যাবে
দীর্ঘ রাতের সব জেগে থাকা
দিঘল কথারা,
ঘুম থেকে জেগে ওঠে মানুষ দেখবে
প্রার্থনার দিন ধুয়ে গেছে আজ!
তারা ফের বালিশ খুঁজবে
তারা সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খুঁজবে কাউকে,
সাইকেল, চায়ের দোকান, জলরেখা,
কুমোরটুলির ভিতর বেজে ওঠা
কিছুটা সময় আরো কাছে থাকবার গান,
তারা সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে
অগোছালো কথা ব’লে যাবে
জানলা বন্ধ, দরজা বন্ধ, তাই
কেউ শুনবে না কিছু
তারপর ভাঙা ভাঙা আলোও ফুরোবে
ঘরের ধারণা সকল মিশে যাবে ঘুমে
নদীর ধারণা, পারাপার…


এক্সজনেরে অ-আ
❑❑

তুমি এক্স হইছ বইলা, আমি জলদি ওয়াই পার হইয়া জেডের জেব্রা ডিঙায়ে ফিরা আসি ঘরে। তারপর, হয়তো ঘুম, হয়তো কোমা, হয়তো মরণ… ঘুমের ভিতরে অথবা মরণে নাকি জন্মান্তর থাকে! মাটি দেওয়া হইলে অথবা খাক হইলে চিতায়, আসলেই ফুরায় না কিছু। এই বিদ্যা শক্তির রূপান্তর সূত্র হইতে আমরা জানছি কিশোরবেলায়! অতএব এই হাড়মাস, এই অনুভূতি, এই যাপনের সবটুকু যদি-বা ব্যথায় মাটি হয়ে যায়, ছাই হই যায়, কিম্বা ধুঁয়া, তাইলেও তো মেঘ-বৃষ্টি, গাছ, বাস্তুচক্র ধইরা আমরা ফিরা আসি ঘরে—

‘বারবার আসি আমরা দু’জন বারবার ফিরে যাই…’

তবে জানি, মানুষ হইব না আর, তোমারে ডাকব না আর বিল্লিবেগম, বাওয়াল বেগম কিম্বা ইন্দুবালা বইলা! আহা যদি আবার ফিরে আসা হতো মানুষ হিশাবে, তাইলে যেন আর এক্স-ওয়াই গল্প না হয় যেন ভগবান! আজাইরা এ-বি-সি-ডি বিদিশি বর্ণমালাই যেন হুদাই সব এক্স-ওয়াই বিচ্ছেদের কারণ, যেন বিচ্ছিন্ন তোমার পশ্চিমা তুষার, আর আমার চাঁদের মেঘনা, হুহু ওই পুবের ঘাট!

এক্স হবা না আর, কেননা নতুন জন্মে বর্ণমালা স্বর আর ব্যঞ্জনে বান্ধা।

আমি ভোরবেলা উইঠা জানলার পাশে পড়তে বসব অ-আ,
তুমি অদূরে যে রোদের দালান
ওইখানে বইসা বইসা সুর ধরবা সা-রে-গা-মা
আমরা আর এক্স হবো না কেউ আমাদের নিজেদের সাথে

এই কথা থাক
পানি থাক মাথার কাছে
যদি ঘুম ভাঙে
যদি টেলিফোন ক’রে ওঠো তুমি
আর গেয়ে ওঠো—

‘কার উঠোনে পড়ো ঝরিয়া
ইন্দুবালা গো…’


সুরমা ও নদীর গান
❑❑

পাহাড় পেরিয়ে
সুরমার গান আসে
পাহারা পেরিয়ে
ব্যাকুলতা কার
জানে কি আর
নরম আলোর দিনে
গান ভিজে যায়
নদীর কিনারে
ডাক আসে তার
কাঁপ লাগে তিরতির
আলো ডুবে গেলে
আমাকে অনর্গল
হেমন্তের গন্ধতে পায়!
বনলতা ইস্কুলের মাঠে
শিশিরের ঝিরঝির
শিস দিয়ে চলে গেছে সাইকেল
ওইখানে
পাখিজীবনের চলাচল
মরি ওইখানে,
পাহাড় পেরিয়ে
পাহারা পেরিয়ে
সুরমার গান আসে
নিশুত রাতের বেলা
ছায়াবীথি মানুষেরা প্রেমে ডুবে যায়


এম্পটি স্পেস
❑❑

তারপর পর্দার  নিচু ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টির ভিতরে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে নীল জিন্সের ভিতর থেকে বেরিয়ে থাকা স্যান্ডেলের দুইখানি পা, তারপর ফ্রেমের মাঝখান দিয়ে দ্রুতবেগে গাড়ি, ওয়্যারলেসের শব্দ… তারপর, ডি-মেজর আবহাওয়া! দৃশ্য নেই, হয়তো-বা ছিল, এখন বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে ভিডিওগ্রাফির অবিন্যস্ত আলোকরেখা কিছুটা সময়। খোলা দরজার ভিতর দিয়ে হাওয়া ঢুকে আসে, পুরোনো রিসিভার বেজে ওঠে হঠাৎ। ডেস্কের উপর থেকে চিরকুট উড়ে যায়, বৃষ্টি প্রবল; ঘন হয়, বৃষ্টির শব্দের ভিতর দিয়ে মনে হয় পাশের ফ্ল্যাটের টিভি সিরিজের শব্দ জানলা দিয়ে ঢুকে পড়েছে বেডরুমে! নিচে বিশ্রি শব্দ ক’রে কেউ বুলেট চালিয়ে গলি থেকে বেরিয়ে গেল—বৃষ্টি থামার লক্ষণ দেখা যায় না, আলো কমে আসে! কিছুই মনে পড়ে না, স্মৃতিগৃহ, স্নানাগার, বইঘর, ঝুলবারান্দা… হয়তো রয়েছে পুরোনো আমলের বাক্সটিভি, পূর্বজনেদের ফটোফ্রেম, রিসিভার, ধুলোজমা…  অবিকল স্মৃতির ভিতর থেকে গলা তুলে দাঁড়ায়ে রয়েছে, আর পাশের অ্যাপার্টমেন্টের পাশে পুরোনো বকুল গাছ। বকুলই তো? হায় গাছেদের নাম মনে নাই, ফুলেদের নাম…! শুধু মনে আছে, পর্দার ফাঁক দিয়ে ঝাপসা নীল জিন্স আর তা থেকে বেরিয়ে থাকা শুক্ল দুইটি পা স্যান্ডেলে দ্রুত হেঁটে গেছে। তার ফ্রেম আউট হওয়ার অপেক্ষার আগেই ফ্রেমে ঢুকে পড়েছে অজস্র গাড়ি। তারা ফ্রেমের বাঁ-দিক থেকে ডান দিক হয়ে ফ্রেমের সীমানা পেরিয়েছে। আর ঝিরঝির পিকসেল, লাইন, ভিডিওগ্রাফির বিকেল সন্ধ্যায় নিভেছে হঠাৎ


মৃত্যু
❑❑

প্রতিরাতে আমরা সকলেই মৃত্যু বিছিয়ে তার উপরে শুয়ে থাকি, ভোররাতে ঘুমোই। মৃত্যু আমাদের নেয় না, বৃষ্টি নামলে অথবা বেশি হাওয়া দিলে মৃত্যু আমাদের পা দিয়ে ঠেলে সরায়। তারপর ‘এখন ঘুমো, পরে দেখা যাবে’ ব’লে বিড়ি ধরিয়ে মৃত্যু সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়! হাঁ মৃত্যু! আমরা স্বপ্নে দেখি প্রিয় স্তন, ছুঁতে যাই যখন, গাছের বাকল তখন খসে যায়, আমরা স্বপ্নে ফ্যান্টাসি দেখি, আমরা হারিয়ে যেতে চাই স্বপ্নে, আমরা মৃত স্বপ্নযাজকের লাশ কাঁধে নিয়ে ঘুমের বড়ি খাই, খোলা চুলে তখনই কে বাজায় পিয়ানো আমাদের তন্দ্রায়, আমাদের হাঁটুতে চুঁয়ে পড়ে বীর্য, আমরা বাঁশিবাদকের মুখ ভুলে যেতে যাই, আমরা রুমালে খুচরো পয়সা রেখে এইসব নাটক ফুরানোর কথা মনে মনে ভাবি, আমরা জানি আমাদের কেউ নেয় না, প্রেম, বিপ্লব, দল, খেলার মাঠ, কবিতাসভা, পত্রপত্রিকা, বার-রেস্তোরাঁ—আসলে আমরা কারো হতে চাই না, মৃত্যু বিছিয়ে ঘুমাই, ভোরবেলা মৃত্যু চলে যায়, অপেক্ষা আর কালশিটে চোখ নিয়ে দেরি ক’রে ঘুম ভাঙে, অফিসে যেতে দেরি হয়


আমার চেতনা চৈতন্য ক’রে দে মা চৈতন্যময়ী
❑❑

লাবণ্যমাংসের গলিতে
সন্ধ্যা নামবে ব’লে
আলো জ্বলে ওঠে, মাংসের ভিতরে ফেনা
উথল রাতের কারবার
জমে উঠেছিল দ্বারকা ঠাকুরের
নাচঘর থেকে নাবিকের বিশ্রামগৃহে
মহল্লায় মহল্লায়
রাত যত বাড়ে তত বাড়ে মুদ্রার ভ্রম
নেশা ধরে পর্দার ওপারে
রঙিন অমাবস্যায়…

পরিণত ঢাকের আওয়াজ, সানাইবাদকের
খয়ের, সুপারি-সহ সুরভি জর্দার পান
মায়ার ভিতর দিয়ে মৃন্ময়ী রূপের পাড়া
ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়…

দালান-কোঠার দিন ফাঁকা হয়ে যায়
খড় ভাসে, দেহ ভাসে,
বিসর্জনে বিসর্জনে রটে যায়
‘ঘাটে ঘাটে মড়া পোড়ানোর ঘ্রাণ’
মাংস ও মৃত্তিকা
উপাসনা আয়োজন, রতির আকুতি,
বেহেস্তের লোভ, বাস্তুতে ত্বক ও তন্দ্রার
নিয়ত হিসাব, ইবাদত
একভাবে পানি হয়, মাটি হয়

তবু এক পূর্ণিমা আসে বাংলার আকাশে
তবু এক কৃষ্ণ অমাবস্যা,
মায়া ও বেদনায়
ছাইমাখা ছায়া ছায়া
যুবা এক, গান গেয়ে যায়
তার নাম রামপ্রসাদ,
হালিশহরে ছিল বসত তাহার;
তাঁর নাম পান্নালাল ভটচাজ
ম’রে ছিল বাবুনগরের ঝলমল অন্ধকারে
কণ্ঠে চেপে বসেছিল কালশিটে।
ডুবে ছিল সে
হালিশহরে ভোরবেলা গঙ্গার জলে
তার কথা গানের ভিতরে রোজ
পান্নালাল ব’লে যান
তার কথা সদরুদ্দিন বলে
সদরুদ্দিনের পাতায় পাতায় তার গান
পান্নালালের কথা ফরহাদ মজহারের কবিতায়
বাংলার মাটিতে, বাতাসে
তার নাম পান্নালাল
নাম তার রামপ্রসাদ সেন

অতনু সিংহ

জন্ম ২২ আগস্ট; ১৯৮২, সালকিয়া, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র।

শিক্ষাগত যোগ্যতা : এম.এ, গণজ্ঞাপন, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

কাব্যগ্রন্থ—

নেভানো অডিটোরিয়াম [লালন প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০০৯]
ঈশ্বর ও ভিডিও গেম [হুডিনির তাঁবু প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১৪]
বনপাহাড় থেকে সে কেনই-বা ফিরবে এ-কারখানায় [কবীরা প্রকশনা, ২০১৭]
ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয় [খসড়া সংস্করণ, অক্ষরবৃত্ত প্রকাশন, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ, ২০১৮]
ঘুমের চেয়ে প্রার্থনা শ্রেয়'র পূর্ণ সংস্করণ [ঢাকা থেকে প্রকাশিতব্য]

গদ্যগ্রন্থ—

ছোটগল্প সংকলন 'অপর লিখিত মোনোলগ ও কয়েকটি প্যারালাল কাট' [হুডিনির তাঁবু প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ, ২০১০]

চলচ্চিত্র—
'প্রিয় মরফিন' স্বাধীন উদ্যোগে নির্মিত।

ই-মেইল : blackwido5@gmail.com