হোম কবিতা গভীরতলের রূপান্তর

গভীরতলের রূপান্তর

গভীরতলের রূপান্তর
735
0

০১ মার্চ ২০১৭

পাখিটা মেয়েটির মতো ভাবছে; আর মেয়েটি ভাবতে শুরু করেছে পাখিটার মতো। কিছু কিছু পাখি ভুল করে কাছে আসে; বাকিরা সত্যবাদী পরির ডানা নিয়ে ওড়ে যায়।

শুনেছি পৃথিবীতে এমন এক কিতাব ছিল, হারিয়ে গেছে; যেখানে লেখা ছিল, ‘এক একটি চুম্বনের সাথে মানুষের জীবনে এক একটি দিনের আয়ুরেখা যোগ হয়।’ অথচ যখনই তোমার হাতে ঠোঁট রাখি, মনে হয় এটাই শেষ চুম্বন। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে আয়ু।


০২ মার্চ ২০১৭

লিখতে লিখতে কমবেশি সকলেই অপচয় করে ফেলে নিজেদের। কেউ কেউ বাতিল উপমায় ঠাঁসা মৃতভাষা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে নক্ষত্র হয়ে কাছে ডাকে। আমি নক্ষত্রের দিকে এগুচ্ছি; বুঝতে পারছি না ইশারা। মন ও মগজ থেকে মুছে গেছে ভাষা; বহু আগেই মন ও মগজের জায়গা দখল করেছে সংকেত; ভাষাকে শাসন করছে গণিতের ডিজিট।


০৩ মার্চ ২০১৭

মানুষের ভেতর বসবাস করলেও আমাকে যখন একজন মানুষ আঁকতে বলা হলো, আমি ব্যর্থ হলাম। পারলাম না খুব স্পষ্ট করে মানুষ এঁকে দিতে। তাহলে কি ‘মানুষ’ রহস্যে মোড়ানো অশরীরী? নাকি প্রকৃতির কোনো রঙ বা রেখা দিয়ে মানুষ আঁকা সম্ভব নয়!


০৪ মার্চ ২০১৭

রাস্তার প্রতিটি বাঁকের সাথেই প্রতিটি বাঁকের কোথাও না কোথাও মিল থাকে; হয়তো স্বভাবে, নয়তো দৃশ্যে। রাস্তার আলোগুলো বলাবলি করছিল ঠিকানাগুলো লিখে রাখুন মশাই, না হলে রাস্তার বাঁকগুলো যতই সোজা হতে থাকবে রাস্তার মানুষগুলো ততই নিজেদের কাছে অচেনা হয়ে উঠবে। আর কী আশ্চর্য, সত্যি সত্যিই রাস্তার বাঁক পিছে রেখে যেইমাত্র আমি বাড়ির দিকে আসতে শুরু করেছি, অমনি এক এক করে রাস্তার মানুষগুলোর চেহারা ভুলে যেতে থাকলাম।‘বাড়ি’, হয়ে উঠতে পারে কতটা স্বার্থপর।


০৫ মার্চ ২০১৭

যান্ত্রিক হুইসেলের নির্দেশে আমরা অলাপ করছি। হুইসেল কথা বলছে, আবহাওয়া এবং আসন্ন যুদ্ধ বিষয়ে; যে যুদ্ধে সাইবার প্রজন্মের যুবক ঘর থেকে বাইরে যাবে না। যেভাবে বেলুন ওড়ানো হয় সেভাবে বেলুনের ভেতর উড়িয়ে দিচ্ছি ইশারা ও সংকেত। যুদ্ধসংবাদ।

তরকারি রান্নার জন্য কিনে আনা আলুগুলো কুশি ছড়িয়েছে। অঙ্কুরোদ্‌গম; পৃথিবীর আদি প্ররোচনা; যেটা তোমার প্রথম ভাষা। অবশেষে হুইসেলের মতো ক্রমশ সংকেত। ঐশীজীবী।


০৬ মার্চ ২০১৭

পিঁপড়েটা বৃত্তের ভেতর আটকে আছে; বৃত্তের ব্যাস ধরে হাঁটছে; হাঁটতে হাঁটতে সূচনাবিন্দুতে ফিরে এসেছে। পিঁপড়েটা আবারও প্রথম থেকে শুরু করেছে। এইভাবে শুরু থেকে শেষ এবং শেষ থেকে শুরু; যেন বা জন্ম থেকে মৃত্যু অথবা মৃত্যু থেকে জন্ম।

পিঁপড়েটা বৃত্ত অতিক্রম করতে পারছে না; আমি অতিক্রম করতে পারছি না গোলাকার পৃথিবী। পিঁপড়ে ও আমি ভাঙতে পারছি না বৃত্ত; বাইসাইকেলের টায়ারের মতো একটা বৃত্তের ভেতর আটকে গিয়েছি। আমি ও পিঁপড়ে আবারও হাঁটতে শুরু করেছি, সময় ও সূচনাবিন্দু বরাবর।


০৭ মার্চ ২০১৭

গৃহমগ্ন রমণীর মগ্নতা দেখছি। কল-তলায় কাপড় ধুচ্ছে মেয়েটি; আমি তার চোখের রঙ দেখতে পাচ্ছি না।

পোস্ট-অফিসে সে খামবন্দি চিঠি, আটকে আছে ডাকবস্তার ভেতর। চিন্তামগ্ন মন, তাকে আমি পাখি নামে ডাকি। গৃহমগ্ন রমণীর চোখের মগ্নতাকে ভাবছি প্রকৃত নামাজ।

গৃহমগ্ন নারী আটকে আছ তুমি খামবন্দি চিঠি, ডাকবাক্সের ভেতর।


০৮ মার্চ ২০১৭

দৃষ্টির আড়ালে ঘরের মেঝেতে অনেক কিছুই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে; ছোট্ট দানাদার চাউল, মসুরের ডাল, অলক্ষে মাথা থেকে খসে পড়া মরা চুল, হতে পারে তোমার সেলাই থেকে হারিয়ে যাওয়া নিঃসঙ্গ একটা সুচ। এই সমস্ত কিছুর ভেতরে ঘরের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের পায়ের ছাপ। ছাপগুলোর প্রতিচিত্র চলে যাচ্ছে গুগল-তথ্যে। গুগল ঘেঁটে জানা গেল, প্রতিটি ছাপচিহ্নই আসলে ভাষাচিহ্ন, মানব-জমজ। বুঝতে পারছি, মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য ছাপগুলো কিছু একটা বলতে চাইছে। শুনতে পাচ্ছে না কেউ।


০৯ মার্চ ২০১৭

চিন্তা করছে কুকুর, মানুষই ঈশ্বর; এই যে এঁটোমাংস, ঘরের বারান্দা সবকিছু প্রভুর কৃপা; মানুষই প্রভু।

চিন্তা করছে বিড়াল, এত আহ্লাদ, মাছ ও মাখন; কোলে তুলে আদর; তাহলে মানুষেরা নিশ্চয় ঈশ্বর ভাবছে আমাকে।

তোমাকে বিছানায় সাজিয়ে আদর করছি; তোমার ভেতর ঈশ্বর অর্থাৎ ক্রমশ বেড়ালবৈশিষ্ট্য মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।


১০ মার্চ ২০১৭

ফরেস্টের রহস্যের সাথে মিল রেখে মানুষের চরিত্র বুনন করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে লোকালয়ে।

ইচ্ছে হলো ফরেস্ট থেকে উঠে এসে রিসোর্টের বেলকনিতে মানুষ সেজে উপভোগ করি বিবাহযাপন। বিয়ের লাল পোশাকগুলোকে রক্তদানা বলে ভুল হচ্ছে বারবার। বুঝতে পারছি, পশুদের মতো মানুষও সন্তুষ্ট নয়; হতে পারে বৈবাহিক, অথবা বিচ্ছিন্ন।

শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu

শিমুল মাহমুদ

জন্ম ৩ মে ১৯৬৭, সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাঠ গ্রহণ শেষে ইউজিসি-র স্কলার হিসেবে পৌরাণিক বিষয়াদির ওপর গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, চেয়ারপারসন ও কলা অনুষের ডিন-এর দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
মস্তিষ্কে দিনরাত্রি [কারুজ, ঢাকা: ১৯৯০]
সাদাঘোড়ার স্রোত [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৮]
প্রাকৃত ঈশ্বর [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০০]
জীবাতবে ন মৃত্যবে [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০১]
কন্যাকমলসংহিতা [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
অধিবিদ্যাকে না বলুন [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৯]
আবহাওয়াবিদগণ জানেন [চিহ্ন, রাজশাহী: ২০১২]
কবিতাসংগ্রহ : সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৪]
স্তন্যপায়ী ক্ষেত্রউত্তম [অচেনা যাত্রী, উত্তর ২৪ পরগণা: ২০১৫]
বস্তুজৈবনিক [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]

গল্প—
ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৯]
মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব [পুন্ড্র প্রকাশন, বগুড়া: ২০০৩]
হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৮]
ইস্টেশনের গহনজনা [আশালয়, ঢাকা: ২০১৫]
নির্বাচিত গল্প [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]
অগ্নিপুরাণ ও অন্যান্য গল্প [চৈতন্য, সিলেট: ২০১৬]

উপন্যাস—
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ধানসিড়ি, কলকাতা: ২০১৪]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি [চৈতন্য সংস্করণ, ২০১৬]

প্রবন্ধ—
কবিতাশিল্পের জটিলতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৭]
নজরুল সাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ [বাংলা একাডেমী, ঢাকা: ২০০৯]
জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল [গতিধারা, ঢাকা: ২০১০]
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০১২]
মিথ-পুরাণের পরিচয় [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৬]

ই-মেইল : shimul1967@gmail.com
শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu